“ধর্মকারী ব্লগের প্রতিষ্ঠাতা” মাহমুদুন নবী ছিলেন ঘোর অন্ধকারের মাঝে এক আলোর মশাল

ধর্মকারী.ব্লগ হল এই বাংলায় ঘোর অন্ধকারের মাঝে টিম টিম করে জ্বলা একটি ল্যাম্পপোস্ট, একটি জলন্ত অগ্নি শিখা। ধর্মকারী ব্লগ হল লক্ষ লক্ষ অমানবিক, অমানুষ, ধর্মান্ধ-হায়েনায়ের মধ্যে একটি মানববাদের প্রদীপ। কি সুন্দর শব্দশিল্পে, কি মুগ্ধকর যৌক্তিকতায়, কি সজ্জিত ব্যাঙ্গাত্বক ভাষায়, খুব অবলীয়ায় ধর্মকারী ব্লগ ধর্মের অবৈজ্ঞানিক ভিত্তিহীন আর অসারতাকে অবিরাম প্রকাশ করে চলত। এই ধর্মকারী ব্লগ সমস্ত ধর্মীয় কুসংস্কার, জঞ্জাল, মুর্খতা, অন্ধতা আর কুপমন্ডবতাকে সরিয়ে সরিয়ে, পরিস্কার করে করে পথ চলত। ইসলামিস্ট জঙ্গিদের চাপাতির কোপে নিহত অকাল প্রয়াত নাস্তিক-লেখক ওয়াশিকুর রহমান বাবু তাঁর বিখ্যাত ব্যাঙ্গাত্বক সিরিজ, “নাস্তিকদের দাঁত ভাঙা জবাব” পর্বের পর পর্ব এখানেই প্রকাশ করতো। নিলয় নীলও লিখত গৌতম বুদ্ধ যে নারীকে দুর্গন্ধ মলের সাথে তুলনা করেছেন, তার সমালোচনা করে। আমি অনেক গায়ের চর্ম মোটা ব্লগাদের দেখেছি ধর্মকারী ব্লগের নাম শুনে নাক কুঁচকাতে, ভ্রু কুঁচকাতে। এ্যাঁ এটা একটি ব্লগ নাকি? খালি ধর্মের বিরুদ্ধে লেগে থাকে! ধর্মকারী ব্লগ উগ্র, ধর্মকারী ব্লগ দিনরাত ধর্মকে পঁচায়! ধর্মকারী ব্লগের, আর কোনো কাজ নেই ধর্মকে বাঁশ দেয়া ছাড়া?

ইসলামিস্টদের হাতে অভিজিৎ রায়ের মৃত্যুর পর কিছু কিছু ব্লগার গা বাঁচানোর জন্য উগ্র আর নরম নাস্তিকের সংজ্ঞা বের করেছিল। কেউ কেউ মিছেমিছি সভ্য হবার চেষ্টা করেছিল। কেউ কেউ নাস্তিকের খোলস থেকে বের হয়ে ধর্মের প্রতি কুকুরের মতো আনুগত্যতা এনে নিজেকে মধ্যপন্থি হিসেবে প্রমাণ করার জন্য উঠেপড়ে লেগেছিল। কিন্তু ধর্মকারী ব্লগ থামেনি, ভয়ে পিছিয়ে যায়নি। ধর্মকারী ব্লগ তখনো সামনে দিকে এগিয়ে গিয়ে ধর্মান্ধতা আর কুসংস্কারের বিরুদ্ধে একের পর এক ব্যাঙ্গাত্বক ভাষায় তীর ছুঁড়ে যাচ্ছিল। এই ধর্মকারী ব্লগের বিরুদ্ধে হাইকোর্ট একাধিক বার নিষেধাজ্ঞা জারি করেও ধর্মকারীকে দমাতে পারেনি।

জানেন কি এই “ধর্মকারী ব্লগ” সৃষ্টির নৈপথ্যের কারিগর কে ছিলেন? তিনি হচ্ছেন মাহমুদুন নবী। আমাদের প্রিয় মাহমুদুন নবী। তিনি নিজেকে রাখতেন আড়ালে। কোনোভাবেই নিজেকে উপস্থাপন করতেন না, সেলিব্রেটির লোভে নিজেকে জাহির করতেন না। নৈপথ্যে থেকে শুধু ধর্মের যতসব অবৈজ্ঞানিক, অযৌক্তিক কীর্তিকলাপ তুলে ধরতেন। তিনি যতটা না লিখতেন, তারচেয়ে বেশি বানাতেন লেখক। আমাদের নিরন্তর উৎসাহ দিয়ে গেছেন ধর্মের বিরুদ্ধে লেখার জন্য। এই ধর্মকারী ব্লগের সাথে আমার পরিচয় হয় ১২ সালে। দাঁড়িপাল্লা দমাদম (Abdul mamun)-এর মাধ্যমে। সেই সময় ধর্ম নিয়ে যত ব্যাঙ্গাত্বক আর যথার্থ হাসির লেখা পড়তাম এই ধর্মকারী ব্লগে। ধর্মকারী ব্লগ যেন ধর্মের বিরুদ্ধে চলা এক বিরতিহীন কুঠারাঘাত। ১২ সালে আমার আর আমাদের পরিবারের জীবনে যে ভয়ংকর বিপর্যয় (যেটা নিয়ে আমার আত্নজীবনী “এক নাস্তিকের জবানবন্দী” নামে সিরিজ লিখছি) নেমে এসেছিল, সেই সময় আমি বাঁচার জন্য দাঁড়িপাল্লার কাছ থেকে জেনেই ধর্মকারী ব্লগ থেকেই রেফারেন্স নিতাম। মুহম্মদ তার ৬ নম্বর বিবি হাফসার সাথে প্রতারণা করে তার দাসী মারিয়া সাথে যৌনক্রিয়া অবস্থায় রত কার্টুনগুলো প্রথম এই ধর্মকারী ব্লগেই দেখেছিলাম। ধর্মের বিরুদ্ধে দ্বিধাহীন চিত্তে যে বলা যায়, তার জন্য কোনো রকম যে জড়তা থাকার প্রয়োজন নেই, এই শিক্ষাটা আমি ধর্মকারী ব্লগ থেকেই পেয়েছিলাম। এরপর আমার জীবনে অনেক ঝড় ঝঞ্চাট বয়ে গেল, ফেসবুকে ধর্মের বিরুদ্ধে লেখায় জেল হল, দেশ থেকে পালিয়ে গিয়েছিলাম এক বছর। ১৩ সালের মাঝামাঝি সময়ে আবার স্বদেশে ফিরি। আবার ধর্মের বিরুদ্ধে দ্বিগুন ইচ্ছা নিয়ে লেখালেখি শুরু করি। এবার আর রিয়েল আইডি নয়, ফেইক আইডি। প্রথমে আইডির নাম দিই, অপ্রিয় সত্য বচন, তারপর অপ্রিয় ভাষ্য, তারপর ১৪ সালের শেষের দিকে এসে “অপ্রিয় কথা”ই নাম রাখি। সম্ভবত ১৩ সালের নবেম্বর মাসের দিকে মাহামুদুন নবীর সাথে অনলাইনে আমার প্রথম পরিচয়। একদিন মেসেজে বলল, -আপনার কিছু লেখা কপি করতে পারি?

আমি বললাম, -আমার লেখা দিয়ে কি করবেন?
মাহমুদুন নবী ভাই বলল, -ধর্মকারী ব্লগে দেব। আপনার কিছু কিছু লেখা এই ব্লগের জন্য খুব উপযোগী।
আমি বলে দিলাম, -নিন।

সেদিন তিনি আমার লেখা ব্লগে দিয়ে আমাকে মেসেজে আমার লেখা ব্লগের লিংক দিলেন। আমি তাঁকে ধন্যবাদ জানিয়েছিলাম। এরপর আমাকে বলতেন, আপনার এই লেখাটা, ঐ লেখাটা নিতে পারি? মেসেজে জিজ্ঞেস করতেন আমাকে। আমি একদিন তাকে বলে দিই, ভাই এটা আমার কাছে অনুমতি নেয়ার দরকার নেই। আপনার যা খুশি নিয়ে নিয়েন। এর কয়েক মাস পর আমি “অপ্রিয় ভাষ্য” নাম পাল্টে আইডির নাম রাখি “অপ্রিয় কথা”। এর মাস দুয়েক পরে আমাকে মাহমুদুন নবী আবার মেসেজ করে, -ভাই আপনি কি আগে অপ্রিয় ভাষ্য নামে লিখতেন?
আমি বললাম,- হ্যাঁ।
তিনি বললেন, -আরে মিঞা নাম পাল্টালেন আমাকে একটু কইবেন না? আপনাকে অনেকদিন ধরে খুঁজতাছি।
আমি বললাম, -স্যরি ভাই, বলতে ভুলে গিয়েছিলাম।

তাঁর কথাবার্তার মধ্যে সবসময় রসিকতা আর আন্তরিকতা ঝড়ে পড়ত। সেই যে একজন ধর্মকারী ব্লগের প্রতিষ্ঠাতা আমি জানতাম না। আমার মনে হতো ধর্মকারী ব্লগের প্রতিষ্ঠাতা দাঁড়িপাল্লাকে। আমি তাঁকে একবার জিজ্ঞেস করেছিলাম, -কোথায় থাকেন?

মাহমুদুন নবী বলেছিল, -ভাই দেশে দেশে থাকি। জীবনের প্রয়োজনে কত কত জায়গায় থাকতে হয়।

আমি আর ভুলেও জানতে চায়নি তিনি কোন দেশে থাকেন। অনিশ্চতার মধ্যে জীবন কাটাতে কাটাতে আর অসংখ্য বার মৃত্যুর হুমকি পেতে পেতে আমাদের নাস্তিকদের একটি প্রশ্ন খুব ভয় পাইয়ে দে! তা হল, -ভাই কোথায় থাকেন?

এই প্রশ্নটি সহযোদ্ধাদের আমি নিজেও খুব কম করি। কারণ এই নাস্তিক্যবাদের জীবন এমন একটি জীবন, যে কাউকে সহজে বিশ্বাস করতে ভয় হয়। মনে মনে সন্দেহ হয়, ইনি আমার নাম-ঠিকানা জানার জন্য নাস্তিক সাঁজার অভিনয় করছে না তো? মাহমুদুন নবীর সাথে অনলাইনে আমার যোগাযোগ বন্ধ হয়েছিল দুবছর আগে। আমার দীর্ঘদিন ধরে চলা আগের আইডি “অপ্রিয় কথা” আইডিটা বন্ধ হয়ে যাবার পর। এটা নতুন আইডি। নিজের রিয়েল আইডির সব তথ্য মুছে দিয়ে আবার গত বছর নবেম্বরের দিকে এই আইডিকে ফেইক বানালাম।

তো যা বলছিলাম, আজ (গতকাল) সুষুপ্ত পাঠকের পোষ্ট পড়ে জানতে পারলাম ধর্মকারী ব্লগের প্রতিষ্ঠাতা মাহমুদুন নবী আর বেঁচে নেই। পোষ্টটা দেখে আমার গলা শুকিয়ে যায়, শোক আর কষ্টের একটি দলা যেন আমার গলার ভিতর আটকে যাচ্ছে। এই যেন কোনো প্রিয় সজ্জন হারানোর কষ্ট অনুভব করলাম আমি। মানুষটি আর কোনোদিন মেসেজে আরে মিঞা, আরে মিঞা, বলে রসিকতা করবেন না। লেখার জন্য তাগিদ দেবেন না। আমি কি করে ভুলব ধর্মান্ধতা আর কুসংস্কারের বিরুদ্ধে অবিরাম পথ চলা এই সৈনিককে? কি করে ভুলি ঘনান্ধকারের মধ্যে জ্বালিয়ে রাখা একটি মশালকে? তবে কি মাহমুদুন নবী ভাই যাবার পর তাঁর মশাল কি (ধর্মকারী.ব্লগ) নিবে যাবে? না নিবে যায়নি, তিনি জ্বালিয়ে রেখে চলে গেলেন। আমাদের উচিত তাঁর মশালকে নিরন্তর জ্বালিয়ে রাখা। তবে তাঁর মৃত্যুর সংবাদ আমাকে অনেকটা পাথর করে দিয়েছে। তাঁর অভাব কখনো পুরণ হবার নয়। বন্ধু সেল্যুট তোমায়, দীর্ঘদিন ধরে আঁধারের জীবগুলোর মাঝে দ্যুতি ছড়ানো জন্য, সেল্যুট তোমায়, তোমার আলোকিত কৃতকর্মের জন্য ……

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৩ thoughts on ““ধর্মকারী ব্লগের প্রতিষ্ঠাতা” মাহমুদুন নবী ছিলেন ঘোর অন্ধকারের মাঝে এক আলোর মশাল

  1. ধর্মকারী ব্লগ নতুনভাবে চালু

    ধর্মকারী ব্লগ নতুনভাবে চালু হয়েছে। সবাই লেখা পাঠান।

    http://www.dhormockery.org/

    যোগাযোগ dhormockeryplus অ্যাট gmail.com

    https://www.facebook.com/dhormockery.org

    আপনাকে ধন্যবাদ ও শুভকামনা। মাহমুদুন নবী দারুণ একজন মানুষ ছিলেন।

  2. ওনার মতো ধর্মের বিরুদ্ধে
    ওনার মতো ধর্মের বিরুদ্ধে দ্বিতীয় কোন সৈনিক আসবে না।। ওনাকে ভুলা যাবে না। স্মৃতির মনিকোঠায় অম্লান রবে আজীবন।।

  3. মুক্তচিন্তার প্রসারে
    মুক্তচিন্তার প্রসারে বাংলাভাষী মানুষের মনে তিনি চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন। ধর্মের অসারতা তার মত এত সহজ ও মজার করে ইতিপূর্বে আর কেউ কখনও বলেছেন বলে জানা নেই। তাকে মনের গভীর থেকে শ্রদ্ধা জানাই।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 2 = 5