আব্দুস সোবহান


আমার ওস্তাদ জনি ভাই। গাড়ী চালানোতে তার দক্ষতার সুনাম আছে। ওস্তাদ অনেক বড় ঘরের পোলা। বাপে আরেকটা বিয়ে করে তারে বাড়ি থেকে বের করে দিছে। ওস্তাদ সারাদিন গাড়ি চালায়। আর রাতে কাঁদে। তার সৎ মা তাকে বের করে দিয়ে সব একা খাবে এই দুঃখে কি ওস্তাদ এত কাঁদে? ওস্তাদ রে জিজ্ঞাসা করলে জবাব দেয় না। খালি কাঁদে আর আমার মাথায় হাত বুলায়। আর বলে, “তুই কান্দস না?”

আমি সোবহান।
আব্দুস সোবহান।
বাবার নাম আব্দুল কালাম।
“অই ফার্মগেট যাবে?”
“হ যাইব। যাইব। অই ফারামগেট, ফারামগেট। আগে যায় ফারামগেট, ফারামগেট।“
“মহিলা আছে অস্তাদ। বেরেক।“
“ভাই ভিতর থেকে ভাড়াগুলা দিয়েন ভাই। ভাড়াগুলা দিয়েন ভাই।“
“ভাই তিনজন বাকি আছে ভাই। আপনে ভাড়া দিছেন?”
“অই ভাড়া দিলাম না? কয়বার নিবি?”
“ভাই আপনে টাউনহল উঠলেন। ভাড়া দেন নি। ভাড়া দেন।“
“অই কইলাম না দিছি? একদম মাইরা…”

এভাবে আমার প্রতিটা দিন চলে। প্রতিদিন সকাল ৬ টায় গফু কাকা ঘুম থেকে ডেকে তোলে। তারপর চোখ ডলতে ডলতে কাজে যাই। গাড়ি বের করি রাস্তায়। তারপর গাড়ীর পেছনে এসে দাঁড়াই।
আমার ওস্তাদ জনি ভাই। গাড়ী চালানোতে তার দক্ষতার সুনাম আছে। ওস্তাদ অনেক বড় ঘরের পোলা। বাপে আরেকটা বিয়ে করে তারে বাড়ি থেকে বের করে দিছে। ওস্তাদ সারাদিন গাড়ি চালায়। আর রাতে কাঁদে। তার সৎ মা তাকে বের করে দিয়ে সব একা খাবে এই দুঃখে কি ওস্তাদ এত কাঁদে? ওস্তাদ রে জিজ্ঞাসা করলে জবাব দেয় না। খালি কাঁদে আর আমার মাথায় হাত বুলায়। আর বলে, “তুই কান্দস না?”
না।
আমি তো কাঁদি না।
কখনই কাঁদি নাই আমি এভাবে।
আমার কান্না জানেন সব শুকায়ে গেছে।
আমি কাঁদলেও আর পানি আসেনা।
আমার কান্না মারা গেছে।

তখন আশ্বিনের শেষের দিক। কদিন পরেই হার কাঁপা শীত পরবে। আমার মা আমাকে নিয়ে পুকুর ঘাটে যাচ্ছিল। আমার বাবা তখনো ফেরেনি মাঠ থেকে। মা আমার পিঠে দুইটা কিল দিয়ে পানিতে নামিয়ে দিল। আর বলছিল,”তুই আর তোর বাপ আমার জীবনডা শেষ করে দিলু। তোরা আর আমাকে বাঁচপার দিবুনা।“
এই কথা শুনে ঠোঁট বাঁকা করে কান্না করব তখন আবার একটা কিল।
“কানবি না। একদম কানবি না। এত বেলা হয়ে গেছে বাড়িত এসে ভাত খাওয়া হবেনা? অত কাম কিজন্যে করা লাগবে?”
আমাকে হাত ধরে বাড়ির দিকে টানতে নিয়ে যেতে যেতে গজগজ করছিল মা।
আমি শুনছিলাম।
শুনেই যাচ্ছিলাম মা কি বলে।
“অই সংসদ ভবন নামায়ে দিস। এই নে।“
“আর পাঁচ টেকা দেন। ১০ টেকা ভাড়া।“

সেদিন আমার বাবা বাড়ি ফিরেছিল খাটে করে। বাবার কি খুব বেশি ঘুম পেয়েছিল? তাই বাবা আর না ঘুমায়ে থাকতে পারেনি বলে মাঠেই ঘুমায়ে গেছে? আমি জানি না। সেদিন মা খুব কান্না করছিলো। আশেপাশেরও কিছু লোকজন কান্নাকাটি করছিল। তাদের তখন ঠিক চিনতে পারিনি।

আমি এখন বস্তিতে থাকি। অনেক সুন্দর বস্তি। তিনবেলা খাবার পাই।
খাবার।
খাবার ছাড়া জীবন চলে না।

আমার বাবা সেদিন এভাবে ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে মরিচ তুলতে তুলতে চলেই যাবে কোনদিন ভাবেনি হয়তো আমার মা। আমার মা তাই শোকে পাথর হয়ে ছিল কিছুদিন। আর আমি বুঝিনি আসলে আমার বাবা কই গেছেন। আমাকে তখন কেউ যদি জিজ্ঞাসা করত যে আমার বাবা কই গেছে, আমি জবাব দিতাম মরিচ তুলতে গেছে। আমি ভেবেছিলাম হয়ত বাবা আবার ফিরে আসবে ক্ষেত থেকে। আমাকে জরিয়ে ধরে গোসল করাতে পুকুর এ নিয়ে যাবে। আমাকে সাঁতার শিখাবে। আমাকে আবারো অনেক আদর করবে।
আদর।
আদর ছাড়া জীবন চলে না।

আমি সোবহান।
আব্দুস সোবহান।
বাবার নাম আব্দুল কালাম।

বাবা মারা যাবার পরে আমার জীবনটাতে কি হয়েছিল আমি জানিনা। আমাকে না খেয়ে থাকতে হতো। মাঝে মাঝে নতুন নতুন মানুষ এসে আমাকে খাবার সাধত। মা নিষেধ করে দেয়াতে আমি আর নেয় নাই। আমি তখন ঠিক কিছুই বুঝছিলাম না যে কেনো আমার সাথে এমন নতুন কিছু ঘটছিলো। ভেবেছিলাম বাবার মরিচ তোলা শেষ হলে বাবা ফিরবে আর আমি বাবাকে সব বলব।

বাবা কেন জানিনা আসছিলো না আর আমার না খেয়ে ঘুমাতে যাবার দিনের সংখ্যা বেড়ে বেড়ে অসহ্য অবস্থায় চলে যাচ্ছিলো।
আমি আর আমার মা এরকম কোন এক গ্রীষ্মের দিনে ঢাকায় পাড়ি দিয়েছিলাম। আমার সেই গ্রাম আর গ্রামের সুন্দর সুন্দর সব কিছু ফেলে।
আসলেই কি সুন্দর ছিল জানিনা। তবে আমার বাবা অনেক সুন্দর ছিল। আমার মনে হয় আমি তাকেই ফেলে এসেছি আমার চন্ডিপুর গ্রামে।

“মামা ফারামগেট। ফারামগেট। লাস্ট স্টপিজ।“
“অই মোম্মদপুর মোম্মদপুর। উঠেন। ভিতরে গিয়া বসেন মামা। আগে যাবে। মোম্মদপুর।“

এখন আমার মা বাসায় বাসায় বুয়ার কাজ করে। আর আমি লেগুনাতে থাকি। আমার মা আর আমি মিলে আমাদের ছোট সংসার। বস্তিতে এক রুম এর বাসা। আমি আর আমার মা থাকে।
মা।
আমার মা।

“বাজান। বেতনডা একটু বাড়ায়ে লই। আর নতুন একটা বাসায় কাম পাইলেই তোরে আর কাম করতে হইব না। তোরে ইস্কুলে দিমু। তুই বাজান আর একটু কষ্ট কর।“

আমি জানি যে আমার মায়ের একা আমাদের দুইজনকে খাওয়ানো সম্ভব না। আমি জেনেও কিছু বলিনা কোনদিন। মাঝে মাঝে মানুষ দিবাস্বপ্ন দেখে সেই শক্তি নিয়া বেঁচে থাকে। আমার মা ও না হয় একটু সেভাবেই বেঁচে থাকুক।

বেঁচে থাকা।
বেঁচে থাকা অনেক দরকার।

আমরা বাঁচার জন্যে সব করি। সব করে বেঁচে থাকি। তবু আমাদের বাঁচার জন্য কারণ লাগে।
আমি কেন বেঁচে আছি এটা কখন ভেবে দেখিনি। কিন্তু বেঁচে থাকার কারণ মনে হচ্ছে আমার মা। কোন একদিন আমার মা আমাকে নিয়ে চন্ডীপুর গ্রামের বটতলার রাস্তা দিয়ে হেঁটে আসছিল। আমি জানতাম না আমরা কোথায় যাচ্ছি। শুধু জানতাম যে আমার মা আমাকে যেখানেই নিয়ে যাক আমি ভালো থাকব। পেটে ক্ষুধা নিয়েও ভালো থাকব তবু মা তো থাকবে!
আমাকে সেদিন আমার মা একটা এতিম খানায় রেখে এসিছিলেন। সেখানে দিনে দুবেলা ভাত আর একবেলা রুটি পেতাম। সন্ধ্যার বেলা আর ভোরে আরবী পড়ানো হত। বিকেলে মাঝে মাঝে আদায় করবার জন্যে বের হতাম আমরা সবাই মিলে। দিনগুলো ভালোই কাটছিল যতদিন না অব্দি মনে হয়েছিল যে মায়ের কথা। কয়েকদিন পরেই হঠাৎ আমার মায়ের কথা ভীষণ মনে পরতে থাকে, তাকে নিয়ে খুব খারাপ স্বপ্ন দেখতাম, কিন্তু পালিয়ে বাড়ি যাবার সাহস ছিলো না।
একদিন সকালে মিন্টু ভাই এর বাবা আমার মাদ্রাসায় আসে। তার কাছে খুব ভালো কোন সংবাদ ছিলো না।
মা।
মায়ের খুব অসুখ।

খেয়ে না খেয়ে সারাদিন পরিশ্রম করার ফলে আমার মা খুব অসুস্থ হয়ে পরেছিলেন। আমি তখন ঠিক বুঝতে পারছিলাম না যে আমার কি করা উচিত। আমি তখন বেশ ছোট ভাবতাম নিজেকে। কিন্তু এই পরিস্থিতি আমাকে বড় করে তুললো। আমি ক্ষেতে কাজ করা শুরু করলাম। আমি ছোট বলে আমাকে টাকা কম দিত তবু ওই টাকা দিয়ে কোনভাবে দুমুঠো ভাত আর মায়ের ওষুধ হতে লাগলো। কিছুদিন পরে মা ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠলেন। কয়েকদিনে আমি অনেক বড় হয়ে গেছি।
গ্রামে কাজ সবসময় পাওয়া বেশ কঠিন ছিল। সবসময় মাঠে কাজ থাকেনা। আর কাজ না থাকলে তো চুলা জ্বলবে না। এভাবে একসময় আমার কাছে পরিস্কার হয়ে গিয়েছিলো যে আমাকে অন্য রাস্তা খুঁজতে হবে, আর কিছু ঋণ রেখে গিয়েছিলেন আমার বাবা, সেটাও ঘারে চেপে ছিলো।
সবমিলিয়ে তখন আমার আর মায়ের রাস্তা খুব কম ছিলো যাবার। তাই একদিন তল্পি বেঁধে রওনা দিয়েছিলাম প্রাণের শহরে। যেখানে অনেক মানুষের মত দেখতে প্রাণী থাকে।
– আমার বাপের কি হল গো! ও আমার বাবা কথা বল বাবা। কথা ক বাজান। ও বাজান তোর গায়ে এত রক্ত কেন বাজান। কে তোরে কি করছে?

আমি সোবহান।
আব্দুস সোবহান।
বাবার নাম আব্দুল কালাম।
খুব সম্ভবত আমি মারা গেছি।
আর বেঁচে থাকলে আমি আমার চেহারা আমার সামনে দেখতে পেতাম না। আমার মা কান্না করছিলেন। আমি মনে হয় রোড এক্সিডেন্ট এ মারা গেছি। আমার সারা গায়ে রক্ত আর আমার মাথার অর্ধেক খুলি নেই। মগজ গলে গলে পরছে।
শেষ মনে আছে আমি ফার্মগেটের পাশে ছিলাম। জ্যাম ছেড়ে দিতেই গাড়ী ভোঁ করে ছাড়লো ফুল স্পিডে। আমার পা টা হড়কে গেল আর আমি রাস্তায় একটা বারি খেলাম।
আমি কি তাহলে সত্যিই মরে গেলাম? আমার অনেক স্বপ্ন ছিলো, নিজের টাকায় আমার মা কে ঘরে বসে খাওয়াবো। আমার মায়ের এখন কি হবে? ওনার বয়স হয়ে গেলে ওনাকে কে দেখবে?
উনার জায়গা তো বৃদ্ধাশ্রমেও হবে না। আজকাল বৃদ্ধাশ্রমে সব ধনী ছেলেদের মা-বাবারা থাকেন। বৃদ্ধাশ্রমের কোটাও যে নেই আমার মায়ের। তবে কি রাস্তার পাশে ভিক্ষুক হয়ে ভিক্ষা করতে করতে মারা যাবে আমার মা?
আমার মা।
আমার সেই মা যে আমাকে জন্ম দিয়েছিল।
যে আমাকে বড় করেছে।
কি করলাম আমার মায়ের জন্য?

ভাবতে ভাবতে হারিয়ে যেতে থাকলাম অজানায়। যে অজানার জন্যেও আমার কোন কিছু করা হয়ে ওঠেনি।

আমি মারা গেলাম।
মারা গেলো আরেকটা মায়ের ছেলে।
মারা গেলো কিছু স্বপ্ন।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 39 = 41