রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের পুনরাবৃত্তি লংগদু ট্রাজেডি ২০১৭

উপজেলার আদরকছড়া ইউপি চেয়ারম্যান মঙ্গলকান্তি চাকমাকে স্থানীয় প্রশাসন আশ্বাস দেয় যে মিছিলের কারণে তার এলাকার কোন ক্ষতি হবেনা এবং মিছিল শান্তিপূর্ণ হবে। চেয়ারম্যান মঙ্গলকান্তি চাকমা নিজের এলাকার কোন বাড়িঘর তো রক্ষা করতে পারেননি বরং নিজের বাড়িটিও পুড়ে চাহি হয়ে যায় তার!

এক সেটেলার বাঙালী ভাড়ায় চালিত মোটরসাইকেল চালকের লাশ উদ্ধারের জের ধরে রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলার লংগদু উপজেলায় পাহাড়ি আদিবাসীদের গ্রামে আগুন লাগানো হয়েছে। ঐ সেটেলার বাঙলীকে পাহাড়ি আদিবাসীরা হত্যা করেছে এমন অভিযোগে স্থানীয় সেটেলাররা ২ জুন শুক্রবার সকালে স্থানীয় একটি মসজিদে মাইকিং করে সবাইকে জড়ো করে। সেখান থেকে লাশ নিয়ে মিছিল শুরু করে সেটেলাররা। তারপর বিভিন্ন ভাগে বিভক্ত হয়ে তারা উপজেলা সদরের আদিবাসী মালিকানার দোকানগুলো জ্বালিয়ে দেয়া শুরু করে। পরে উত্তেজিত সেটেলাররা দলবদ্ধভাবে আদিবাসী গ্রামগুলোতে হামলা চালায়। ঘরবাড়ি লুটপাট করে, লুটপাট শেষে ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেয়।

উপজেলার আদরকছড়া ইউপি চেয়ারম্যান মঙ্গলকান্তি চাকমাকে স্থানীয় প্রশাসন আশ্বাস দেয় যে মিছিলের কারণে তার এলাকার কোন ক্ষতি হবেনা এবং মিছিল শান্তিপূর্ণ হবে। চেয়ারম্যান মঙ্গলকান্তি চাকমা নিজের এলাকার কোন বাড়িঘর তো রক্ষা করতে পারেননি বরং নিজের বাড়িটিও পুড়ে চাহি হয়ে যায় তার!

ঘটনার দিন শুক্রবার সকালে সেটেলার বাঙালীরা যেন লাশ নিয়ে মিছিল না করে সেজন্য জনসংহতি সমিতির নেতৃবৃন্দ আর্মি ও স্থানীয় বেসামরিক প্রশাসনকে অনুরোধ করে। লংগদু জোনের 2IC মেজর স্বয়ং জেএসএস নেতৃবৃন্দের বাড়িতে গিয়ে আশ্বস্ত করেছিলেন যে সেটেলার বাঙালীদের লাশবাহী মিছিলটি শান্তিপূর্ণ হবে। এবং পাহাড়ি আদিবাসীদের কোনপ্রকার ক্ষতিকর কিছু হবেনা। কিন্তু উপজেলা সদরের জেএসএস কার্যালয়ও সেটেলাররা পুড়ে ছাই করে দেয়।

সেটেলারদের হামলায় দোকানসহ আদিবাসীদের প্রায় ৩ শতাধিক বাড়িঘর ভস্মীভূত হয়। সহস্রাধিক আদিবাসী নারী-পুরুষ, শিশু-বৃদ্ধ গৃহহীন হয়ে জঙ্গলে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয় এবং গহীন গ্রামে আশ্রয় গ্রহণ করে। ৫ জন বৃদ্ধ ও বৃদ্ধা আগুনে পুড়ে মারা যায়। নিহতরা হলেন- গুণমালা চাকমা(৭৫), বুড়োমিলে চাকমা(৭০), প্রভাতচন্দ্র চাকমা(৭০), মিসেস প্রভাতচন্দ্র চাকমা(৬০) এবং নীলকৃষ্ণ মা(৭০)।

গত ১৯ এপ্রিল সেনাবাহিনীর নির্যাতনে নানিয়াচর কলেজের এইচএসসি পরীক্ষার্থী রমেল চাকমা সেনাবাহিনীর হেফাজতে নিহত হয়। সেনা নির্যাতনে নিহত রমেল চাকমার লাশ তার মা-বাবার কাছে ফেরত দেয়নি সেনাবাহিনী। কোনপ্রকার ধর্মীয় বা আদিবাসী রীতি-রেওয়াজ এবং পারিবারিক আনুষ্ঠানিকতার তোয়াক্কা না করেই পেট্রোল ঢেলে রমেলের লাশ পুড়িয়ে ফেলে স্বয়ং সেনাবাহিনী।

অথচ ২ জুন শুক্রবার সকালে লংগদু সেনা জোন কর্তৃপক্ষ পাহাড়ি আদিবাসী অধ্যুষিত গ্রামের মধ্য দিয়ে সেটেলার বাঙালীদের লাশ নিয়ে মিছিল করার অনুমতি দিয়েছে!
এর থেকে খুব সহজে অনুমেয় যে পার্বত্য চট্টগ্রামের সেনাবাহিনী প্রকৃত অবস্থান কী? একপক্ষ? এবং কাদের পক্ষ?

২০১৩ সালের ৩ আগস্ট একজন সেটেলার মোটরসাইকেল ড্রাইভার মদ খেয়ে মাতাল হয়ে নিখোঁজ হবার সূত্র ধরে খাগড়াছড়ি জেলার মাটিরাঙ্গা উপজেলার তেন্দং ইউনিয়নের কয়েকটি আদিবাসী গ্রাম পুড়ে দেয় সেটেলাররা। তেন্দং এর ঘটনায়ও প্রায় ৩ তিন শতাধিক আদিবাসী ঘরবাড়ি পুড়ে দেয় সেটেলাররা। সেই ঘটনায়ও সেটেলারদের প্রতি আর্মি,বিজিবি এবং পুলিশের প্রত্যক্ষ সহযোগিতা লক্ষণীয়। পরে সেই মোটরসাইকেল চালক নিজেই বাড়িতে ফেরত আসে।

এই যে কয়েক মাস বা কয়েক বছর অন্তর অন্তর একই রকম ঘটনার পুনরাবৃত্তি এসবই সামরিক ও বেসামরিক বাহিনী প্রত্যক্ষ সহগোগিতায় রাষ্ট্রীয় পরোক্ষ মদদে অত্যন্ত সুচতুর এবং সুপরিকল্পিতভাবে এই ঘটনাগুলো ঘটানো হয়। একটি স্বাধীন দেশে পরাধীনতার খাঁচায় ভরা রাষ্ট্রীয় শোষণে ইচ্ছে মতন অত্যাচারিত একটি জাতি কোথায় নিপাতিত হবে অদূর ভবিষ্যতে? নিশ্চিহ্ন করার ছকে বাঁধা ষরযন্ত্রের ফাঁদে পড়া একটি জাতি কার কাছে গিয়ে মিনতি জানাবে? এই পোড়া দেশে সবাই যে নিপীড়িত!

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

36 + = 37