কোন মানুষদের আমরা বিশ্বাস করতে পারি?

বিচারের কোন প্রত্যাশা নয়,যেগুলো লিখছি প্রাণে বেঁচে গেছি বলে আকুল আকুতি বিশ্ব মানবতার কাছে। হয়তো আর লিখাও হতোনা এভাবে। এতক্ষণে নিষ্প্রাণ দেহটা কোথায় পড়ে থাকতো। গতকাল সকালে নাশতা করতে বসেছিলাম আমরা চারজন। হঠাৎ ফোনে এক দিদির চিৎকার! দিদি আমাকে ফোন করে চিৎকার দিয়ে বলছে, এখন এই মূহুর্তে বাসা থেকে বের হয়ে একলাফে নিরাপদ জায়গায় সরে যাও! ফোন কানে রেখে পরিধেয় পোশাক সম্বল করে দৌঁড়ে বিপদজনক এক জায়গায় কোনরকম মাথাগুজে দিই! ততক্ষণে বাইরে চিৎকার আগুনের দাউদাউ শব্দ আমার হৃদপিন্ডে কাঁপন ধরিয়েছে! ওরা চাকমা খুঁজছে! চাকমা পেলে জবাই করবে! খবর আসলো ওদের কেউ কেউ বলছে, চাকমা থাকলে বের করে দেন জবাই করবো!

কিভাবে কোথায় ছিলাম সেকথা নিরাপত্তার স্বার্থে গোপন রাখছি। ফোনে কারোসাথে কথা বলার মত অবস্থা নেই। এসএমএস ছিলো বাড়িতে খবর দেয়ার একমাত্র উপায়। এখন নিরাপদ জায়গায় আছি, প্রাণে বেঁচে আছি। তাই লিখছি!

ঘটনাটা গতকাল জুন দুই তারিখ 2017শুক্রবার সকাল দশটার দিকের ঘটনা। রাংগামাটি পার্বত্য জেলার লংগদু উপজেলা। চাকরির পোস্টিং ওখানে আমার। বৃহস্পতিবার এক মটরসাইকেল চালক বাঙালির লাশ পাওয়া যায়। কোন প্রমান নেই কে বা কারা হত্যা করেছে। পরে অবশ্য ধীরে ধীরে খবর আসতে থাকে ঐ চালক দুইজন বাঙালি যাত্রী নিয়ে গিয়েছিলেন! ততক্ষণে ধ্বংসযজ্ঞ যা হবার হয়ে গিয়েছে। মুসলিমরা বলেছে আদিবাসীরা হত্যা করেছে। মূহুর্তেই আদিবাসীদের সমস্ত ঘরবাড়ি পুড়িয়ে ছাই করে দিয়েছে। একজন বৃদ্ধা মহিলাকে ইচ্ছেমত মারধর করে ঘরে ঢুকিয়ে দিয়ে আগুনে পুড়িয়ে দিয়েছে।

সেই ঊনিশশো ঊননব্বইয়ে লংগদু উপজেলায় এমন নৃশংস ঘটনা ঘটেছিলো। গতকাল আবার সেই একই ঘটনা। সবকিছু পুড়িয়ে যাবার পর প্রশাসন 144ধারা জারি করলো! বিস্ময়কর প্রশাসন সেনাবাহিনী হামলাকারী মুসলিমদের পিছনে ছিলো! যখন চাকমারা হামলা ঠেকাতে মুসলিমদের প্রতিরোধ করতে যায় তখন মুসলিমদের পিছনে লুকিয়ে থাকা সেনাবাহিনীরা ব্ল্যাংকফায়ার করে। চাকমারা পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়।

এভাবে আমরা শেষ হয়ে যাব। আমাদের অস্তিত্ব কেবল বইয়ের কোন একটা পাতায় হালকাভাবে লেখা থাকবে। এদেশ ভুলে যাবে এখানে আদিবাসী নাগরিক ছিলো। আমাদের প্রাণ গোপনে ঝরে যাবে। কেউ জানতেও পারবেনা আমরা কোরবানীর গরুর মত জবাই হয়েছি। দুঃখ লাগছে, আশ্চর্য্য হচ্ছি, প্রতিদিন যাদের সামনে পেলে বিনয়ের সাথে অন্তর দিয়ে সেবা করি তারা আমাদের ঠাসঠাস মেরে ফেলতে উদ্যত হয়!

লংগদুতে এখন আদিবাসীর আর কোন ঘরবাড়ি নেই। পরিধেয় বস্ত্রে এক পোশাকে ওরা এখন জীবনের আশংকায় পালিয়ে ঘুরছে। কত আহাজারি প্রাণের আকুলতা হাহাকার করছে। প্রমানহীন এক হত্যা, আর সেটা হয়তো এতক্ষণে হামলাকারী মুসলিমরা জেনেও গেছে হত্যাকারীরা তাদেরই মুসলিম হতে পারে! এই একটু সুযোগ পেলেই যারা আদিবাসীদের ধ্বংস করে তাদের দেশে আমাদের নিরাপত্তার কোন সুযোগ নেই। জীবনের আর কোন মায়া নেই। আমাদের স্বপ্ন ফুরিয়ে গেছে। আমরা প্রাণ আছে যতক্ষণ ততক্ষণই আছি পৃথিবীতে। একমূহুর্তও আমাদের জীবনের নিরাপদ নেই এই দেশের মুসলিমদের কাছে।

আমি ক্ষমা চাইছি ওদের মানুষ বলতে পারছিনা! এমনকি নিজেকেও মানুষ ভাবতে পারছিনা। আমি যদি মানুষ হয়ে থাকলে প্রাণের ভয়ে ওদের কাছ থেকে আমাকে পালাতে হতনা। ওরা মানুষ হয়ে থাকলে আমাদের এভাবে ধ্ববংস করতে পারতনা। আমাকে ক্ষমা করবেন আপনারা। শুধু নিজের বিবেকের কাছে প্রশ্ন করুন, আপনি নির্দোষে প্রানশঙ্কায় ভুগছেন যার কাছে তাকে কিভাবে বিশ্বাস করবেন?! কিভাবে তারকাছে মানবতার সামান্য আচরণটুকুও আশা করবেন?!

ওখানে একজন আদিবাসী ফার্মাসিস্ট, যাকে ভাল বলে পাহাড়ি বাঙালি সবাই জানে। তারকাছে প্রেসার চেক করতে, ওষুধপত্র বাকী কিনতে যেত একজন বয়স্ক সরকারি কর্মচারী মুসলিম। ছেলের মত স্নেহসূলভ আচরণ করতেন ফার্মাসিস্টের সাথে। গতপরশু ফার্মাসিস্টকে সামনে পেয়ে সেই মুসলিম লোকটি শার্টের কলার চেপেধরে মারতে উদ্যত হলো!

এ কোন মানুষদের আমরা বিশ্বাস করতে পারি?! যারা মূহুর্তেই বদলে যায়! যারা মূহুর্তেই আমাদের জন্য যমের মূর্তি ধারণ করে?! তবে আমাদের দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে। এখন হয়তো আর উপায় নেই!

( সুদর্শনা চাকমা’র ফেসবুক দেয়াল থেকে)

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 1 = 8