বামপন্থাই রাজনীতিকে বিরোধীশূন্য করে নি

২০০৯ সাল থেকে আজ পর্যন্ত বাংলাদেশের রাজনীতিতে একচ্ছত্র প্রভাব এবং শক্তিমত্তা প্রদর্শন করে চলেছে আওয়ামী লীগ। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে যে কাজটিতে সবচাইতে মনযোগ দিয়েছে তা হলো বাংলাদেশের রাজনীতিকে পুরোপুরি বিরোধীশূন্য করা। স্বাভাবিক ভাবেই তার সামনে প্রথম যে শক্তি এসেছে তা হলো বিএনপি। সরকার আর আওয়ামী একাকার হয়ে সমস্ত রাষ্টশক্তিকে নিযুক্ত করে বিরোধীদলের উপর দমনপীড়ন শুরু করেছিলো যা এখনো চলছে এবং ভিন্ন মাত্রায় ভিন্নদিকে সেই দমন প্রক্রিয়া চলছে। কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার হচ্ছে জনগন কিন্তু বিএনপির উপর সহানুভূতিশীল নয়। বরং এই দমনপীড়নের প্রেক্ষিতে জনগন খুব আবাগাক্রান্তও নয় কারন বিএনপিও একই কায়দায় বিরোধী নির্যাতন করেছে। দুটি দলের মধ্যে পার্থক্য শুধু একটি জায়গায় – আওয়ামী লীগ নির্যাতন করে টিকে আছে আর বিএনপি নির্যাতন করে টিকতে পারে নি। এক্ষেত্রে একটি ব্যাপার সহজেই অনুমান করা যায় যে, বিএনপি যদি কোনক্রমে আবারো দেশপরিচালনার ক্ষমতা পায় তবে তারা এই দমনপীড়ন দ্বিগুণ করবে। আর সেই অনুমান জনগন জানে এবং বুঝে। সে কারনেই তারা আওয়ামী দুঃশাসনেও চুপচাপ। জনগনের কাছে দুই বুর্জোয়া শক্তির পেশিশক্তির প্রদর্শনী উন্মুক্ত। কেউ পেশিশক্তির মহড়া দিচ্ছে কেউ তাতে শাণ দিচ্ছে ভবিষ্যতের জন্য। কিন্তু বুর্জোয়াদের পালাক্রমিক দ্বিদলীয় শাসনে জনগনের নাভিশ্বাস যখন তুঙ্গে তখন জনগণ সঠিক দিশা খুজে পেতে দিন গুজরান করছে।
এবং ১৯৯০ সালের পর তথা স্বৈরাচার হটানোর পর এই প্রথম বামপন্থা আওয়ামী লীগকে চ্যালেঞ্জ করেছে রাজপথে। বিরোধীশূন্য রাজনীতিতে প্রাণ ফিরিয়েছে বামপন্থা। বুর্জোয়াশক্তির দুঃশাসনের বিপরীতে সমগ্র দেশের মানুষের কাছে স্পষ্ট বার্তা গেছে আওয়ামী দুঃশাসনের বিরুদ্ধে এখনো লড়বার শক্তি কেউ না কেউ ধারন করে। জনগনের কাছে এই বার্তাও দিনকে দিন শক্তিশালী হচ্ছে দুই বুর্জোয়া শক্তির বিপরীতে পিলসুজে বাতির মতো এখনো জ্বাজ্জল্যমান বাম প্রগতিশীল শক্তি। ঢাকার রাজপথে এখন সরকারের জলকামান,রাবার বুলেট,টিয়ার শেলের বিপরীতে লড়াই হয়। জনগনের অধিকারের প্রশ্নে বামপন্থাই বাংলাদেশের বুকে এখন প্রতিবাদের শক্তি। আপামর জনগনের প্রতিনিধি হয়ে কিছু প্রতিবাদী মানুষ জেগে আছে এই কঠিন সময়েও। সরকার যখন রামপালে কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মানের জন্য উঠেপড়ে লেগেছে ঠিক তখন বামপন্থা দাঁড়িয়ে গেছে সরকারের গণবিরোধী সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ জানাতে। মিছিল, মিটিং,সেমিনার,গান,কবিতায় সারা বাংলাদেশে এক ব্যাপক জনমত গড়তে সক্ষম হয়েছে বামপন্থী এবং প্রগতিশীল বিভিন্ন সংগঠন। রামপাল ইস্যুতে সরকার বামপন্থীদের প্রথম প্রথম যখন গুরুত্ব দিচ্ছিলো না ঠিক তখন সারাদেশে এর বিরুদ্ধে ব্যাপক জাগরন তৈরি করার পেছনে ছিলো কিছু মানুষের হাড়ভাঙ্গা খাটুনি। এখন সরকারের মন্ত্রী-এমপি-উপদেষ্টাদের কারো কারো মুখের গালি আর বুলির অন্যতম একটি অংশ বামপন্থী আর বামপন্থী। হামলা-মামলা, নির্যাতন,জেল সকল কিছুই জুড়ে আছে এই রামপালবিরোধী আন্দোলনে, ভারতীয় আধিপত্যের বিরুদ্ধে বামপন্থাই দেখিয়ে দিয়েছে –কেমন করে সাম্প্রদায়িক না হয়েও ভারতবিরোধী হওয়া যায়। জাতীয় কমিটির হরতালে ছাত্র জনতার উপর শাহবাগে হামলা-নির্যাতন দেখিয়ে দেয় এবং প্রমান করে দেশের জনগনের স্বার্থের রাজপথে লড়াই করছে বামপন্থীরা। অধঃপতিত বুর্জোয়ারা যা পারে না তা ইতিহাসের দায় মিটিয়ে আজো পালন করে চলেছে বামপন্থীরা। ঢাকার রাজপথে গ্যাস বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর পর হরতাল-ঘেরাওয়ে বামপন্থীরা আওয়ামী বিরোধী লড়াই জমিয়ে তুলেছে। জাতীয় কমিটির আন্দোলন বিএনপি-সমমনাদের পরিত্যাগ করে দেখিয়ে দিয়েছে বাংলাদেশের রাজনীতিতে বামপন্থাই আগামীর বিকল্প হবার দাবি করে। এছাড়াও সামাজিক নানান অপরাধ,তনু হত্যা ,আফসানা হত্যাসহ দেশে ঘটে যাওয়া নানান ইস্যুতে রাজপথে থেকেছে বামপন্থীরা। আওয়ামী লীগের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের আলোচনার বড় অংশই এখন বামপন্থীদের গালাগাল। সরকারের মন্ত্রী-এমপিদের কথার অনেকাংশে বামপন্থী। বামপন্থীদের উপর মামলার খড়গ এখন দিন দিন বাড়ছে। ভাস্কর্য ইত্যুতে ছাত্র ফ্রন্ট, ছাত্র ইউনিয়নের শীর্ষ নেতৃবৃন্দের কয়েকজনের নামে মামলা রুজু হয়েছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে এমন মামলা রুজু করা হচ্ছে। এর অর্থ হচ্ছে , সরকারের বিপরীত লড়াই পরিচালনার একমাত্র জায়গা ধারন করে আছে এখন বামপন্থী এবং প্রগতিশীল শক্তি।

এখন কি সহসাই বামপন্থার ক্ষমতা চলে আসবে?
না। নিশ্চয়ই নয়। কিন্তু এই বুর্জোয়াবিরোধী লড়াই আগামী কয়েক বছরে একটি জায়গা তৈরি করবে যাতে বাংলাদেশের মাটিতে বামপন্থার বিরাট বিকাশ সাধিত হবে। জনগন এই দুই বুর্জোয়া শক্তির বিপরীত ভাবতে শুরু করবে। দেশের আপামর জনগনের সামনে বিকল্পের চিন্তা আসতে শুরু করবে। জনগনের মধ্যে যে দ্বিদলীয় মনস্তাত্ত্বিক ধারনা তাতে ছেদ ঘটবে। আগামীর ভারসাম্যপূর্ণ রাজনীতির মাঠ তৈরি হবে। অন্যদিকে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের রণনীতি বাস্তবায়নের স্বপ্নে বিভোর দলগুলোও লড়াই পরিচালনায় গতি পাবে। একথাটিও পরিষ্কার যে আগামীর লড়াই হবে মূলত বামপন্থা বনাম বুর্জোয়া। কারন আওয়ামী –বিএনপি বৃত্ত এখন আওয়ামী লীগের নিয়ন্ত্রনে। যদি বিএনপি কোন দিন আবার এর নিয়ন্ত্রক হয়ে উঠে তখন দুটি বিষয় জনগণের সামনে স্পষ্ট থাকবে- ১) আওয়ামি লীগের বর্তমান দুঃশাসন ২)বিএনপি জামাত জোটের বিগত দুঃশাসন। এই দুইটি দিক বামপন্থাকে নিজেদের শক্তিতে বলীয়ান হবার উৎসাহ যোগাবে এবং যোগাচ্ছে।
এই লড়াই বেগবান করতে হলে বিকল্প একটাই লড়াই-লড়াই-লড়াই।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

2 + 1 =