কেবল উগ্রজাতীয়তাবাদী এবং মৌলবাদীরাই পুর্বপুরুষদের অবদান স্বীকারে অস্বীকৃতি জানায়

আমরা গনতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, নারীর ক্ষমতায়ন, ধর্মীয় সহনশীলতা তথা সেক্যুলারিজম, বাক স্বাধীনতা, জ্ঞান বিজ্ঞানে অগ্রসরতা – এসবের মত গুরুত্বপূর্ণ জিনিসকে ‘পশ্চিমা ধারণা’ বলে নিজেদের ক্ষেত্রে চর্চায় অনীহা দেখাই; আর এতেই অস্বীকার করে যাই (জ্ঞাতসারে হোক বা অজ্ঞাতসারেই হোক) মানুষ হিসেবে আমাদের অনেক সফল অর্জনকে যা উপরের ধারণাগুলোকে বিকাশে অনেক গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছিল।

গণতন্ত্রের উদ্ভব হয়েছিল গ্রীসে, কিন্তু তখনো পশ্চিমের সব দেশ বিশেষ করে গ্রীসের পশ্চিমের কেউ এটি গ্রহণ করে নি, অথচ প্রায় সমসাময়িক এশিয়ার ইরান, ব্যাক্ট্রিয়া এবং ভারতের অনেক অংশে এর চর্চা ছিল। গণতন্ত্র বলতে কেবল ভোট প্রদানই নয়, গণতন্ত্রের আরও দুটো মৌলিক উপাদান ‘পাব্লিক ডিজকাশন’ এবং ‘পাব্লিক রীজনিং’ এর উদ্ভব হয়েছিল সম্রাট অশোকের গঠিত তৃতীয় ‘বুদ্ধিস্ট কাউন্সিল’ গঠনের মাধ্যমে। এই সময়ে বলা হয় যুক্তিতর্কে উপনীত হলে কেউ যেন বিরোধীপক্ষের কাছে নিজের পক্ষকে অপেক্ষাকৃত উত্তম বলে দাবী না করে এবং অযৌক্তিকভাবে হেয় না করে; এবং এসম্পর্কিত আইনও প্রণয়ণ করা হয়।

সম্রাট আকবর সবাইকে যার যার মত করে ধর্ম পালনে স্বাধীনতার(সেক্যুলারিজম) কথা বলেন। এসময়ে মুক্ত চিন্তার চর্চার বিধানে একটি বিখ্যাত ঘটনা হচ্ছে- তার সভাসদ ছিলেন আবুল ফজল। আবুল ফজলকে সম্রাট যখন ডেকে বলেন ‘আস্তিক, নাস্তিকদের মত প্রকাশের ধারা কেমন হওয়া উচিত?’ জবাবে আবুল ফজল বলেন ‘অবশ্যই যার যার মুক্ত চিন্তা চর্চার অধিকার আছে, কোনও ধর্মপ্রচারক ট্রেডিশনালিস্ট ছিল না, তারা ট্রেডিশনালিস্ট হয়ে থাকলে তাদের পূর্বপুরুষদের আচার বিশ্বাসই ধরে রাখত। অতএব সকল মানুষেরই মত প্রকাশ ও মুক্তবুদ্ধি চর্চার অধিকার আছে।’ মধ্যযুগে যখন ইহুদীদের উপর ইউরোপীয় সম্রাজ্যে নিপীড়ন চলছিল তখন এই উপমহাদেশে সম্রাট আকবর ধর্মীয় সহনশীলতাকে সমর্থন দিয়ে আইনানুগ পদক্ষেপ নেন।
প্রথম ক্রুসেডের সময় লায়নহার্টের নেতৃত্বে অনেক ইহুদীও নিধন-বিতাড়ন করা হচ্ছিল তখন অন্যতম বিখ্যাত ইহুদী চিকিদসক মায়মোয়ানিডসকে আশ্রয় দিয়েছিল সুলতান সালাদিন।

এই উপমহাদেশেই প্রথম কোনও রাজনৈতিক দলের প্রধান হিসেবে মহিলা(সরোজিনি নাইডু) নির্বাচিত হোন, যা নারীর ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে অভূতপূর্ব নজির, তাও মার্গারেট থ্যাচার নির্বাচিত হওয়ারও ৫০ বছর আগে!

অসাম্প্রদায়িক জ্ঞানচর্চারও এক অপূর্ব নিদর্শন এই উপমহাদেশ। গৌড়ের পাঠান শাসক নাসির শাহ’র আদেশে মহাভারতের প্রথম বঙ্গানুবাদ হয়, আর কোরান শরীফের প্রথম বঙ্গানুবাদ করেন ভাই গিরিশ্চন্দ্র সেন!

সমাজতন্ত্র কেবল ইউরোপ আর ল্যাটিন আমেরিকার কিছু দেশ গ্রহণ করেছিল বলে এটি এদের প্রোপাইটারি উদ্ভব বলে উড়িয়ে দেয়ার কিছু নেই। ইহুদীদের মধ্যে কিব্বুতজ, খ্রীষ্টানদের মধ্যে মরমন(মার্কিন প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী মিট রমনি’র কথা মনে আছে? তিনিও মরমন ছিলেন)- এরা বহুদিন সমাজতন্ত্রের অনেক মূল ধারণাকে গ্রহন করেছিল, এবং এসব এশিয়ারই ঘটনা। মার্ক্স এই তত্ত্ব নিয়ে লিখার পরে কেবল এর উদ্ভব হয়েছিল বলে ধরে নেয়ার কিছু নেই।

জ্ঞান বিজ্ঞানকে সব ইউরোপীয়রা বিকশিত করেছে, এটা ভাবাটা সবচেয়ে অমূলক। ভারতে গণিত শাস্ত্রের অগ্রযাত্রা, মধ্যপ্রাচ্যে রসায়ন, চিকিৎসাশাস্ত্রের বিকাশ হয়েছিল বিশেষ করে মধ্যযুগে, যে সময়টাকে ইউরোপীয় ইতিহাসে আবার অন্ধকার যুগ হিসেবে উল্লেখ করা হয়ে আসছে!

পৃথীবির প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় ছিল নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় যা প্রথম ধর্মীয় শিক্ষার বাইরে এসে দর্শন, পদার্থ, রসায়ন, জ্যোতির্বিদ্যা, গণিত পড়ানো শুরু করে, তার অবস্থানও ছিল এই উপমহাদেশে! অথচ বর্তমানে সবচেয়ে প্রাচীন ইতালির বোলগনা বিশ্ববিদ্যালয় তারও প্রায় দুশো বছর পর প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল!

আফ্রিকাতেই নির্মাণ শিল্পের(গিজার পিরামিড) প্রযুক্তি, মালি দ্বীপের ‘দোগন’ আদিবাসীদের জ্যোতির্বিজ্ঞান সম্পর্কিত জ্ঞান, উনিশ শতকের উগান্ডায় সিজারিয়ান অপারেশন এর বিকাশ ঘটেছিল! যেই আফ্রিকাতেই প্রথম মানবের সূত্রপাত, সেই আফ্রিকাকেই অন্ধকারাচ্ছন্ন বলা হয়!

আমরা যখন এসবকে পশ্চিমা ধারণা বলে গ্রহণে অস্বীকার করি তখন আসলে নিজেদের পূর্বপুরুষদের অবদানকে অস্বীকার করে যাই। এইসব অস্বীকৃতির জন্ম দেয়ার পেছনে ইন্ধন দেয় উগ্রজাতীয়তাবাদ, মৌলবাদ এর ঝান্ডাধারী কপটাচারী লোক। এরা বিশ্বকে এগিয়ে নিয়ে যাবার প্রধান অন্তরায়।

(সূত্র: Identity & Violence; The Argumentative Indian by Amartya Sen; Why Nations Fail by D Acenoglu & Robinson; Project Syndicate অবলম্বনে লিখা)

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 2 = 7