অপারেশন সার্চলাইটঃ গণহত্যার নীলনকশা

২৫ মার্চ রাতে যে অপারেশন সার্চলাইট সম্পন্ন করা হয়েছিল সেটার বীজ মূলত রোপন করা হয়েছিল এর ঠিক দু বছর পূর্বের আরেক ২৫ মার্চে – যেদিন ক্ষমতায় আসেন ইয়াহিয়া খান। পিছনে ফিরে থাকালে দেখা যায়, যে গভীর ষড়যন্ত্র নিয়ে তিনি শাসন করা শুরু করেছিলেন তার ফলে এ ধরণের সামরিক অভিযান আজ হোক কাল হোক ঘটবে – সেটা একধরণের অনিবার্যই ছিল।

ইয়াহিয়া খান যখন ‘এক ব্যক্তি, এক ভোট’ নীতির নির্বাচন দেন তখন তার যে পরিকল্পনা ছিল এবং নির্বাচনের সম্ভাব্য ফল নিয়ে তার গোয়েন্দাবাহিনী যে রিপোর্ট দিয়েছিল সেটা যে এমন অবিশ্বাস্যভাবে মিথ্যে প্রমাণিত হয়ে যাবে – তাদের কেউই তা বুঝতে পারেন নি। সামরিক উর্দি পরা ইয়াহিয়া খানের ভাবনা ছিল যে, কোন একক দলই সংখ্যাগরিষ্টতা পাবে না এবং পূর্ব পাকিস্তানিদের অনেকেই হয়তোবা পশ্চিমকে সমর্থন দিবেন কিংবা টাকার লোভ দেখিয়ে তাদের কেনা যাবে। ফলে, মূল ক্ষমতা পশ্চিমেই বহাল থাকবে। অবশ্য, সেনাবাহিনী যে ক্ষমতা ছেড়ে দিবে সেটাও বিশ্বাস করা কঠিন। কেননা, আর যাই হোক, সেনাবাহিনী তার নাগালের ভেতরে থাকা ‘ক্ষমতা’ গণতন্ত্রের প্রক্রিয়ার মাধ্যমে হস্তান্তর করে দিবে জনগণের প্রতিনিধিদের কাছে– সেটাও অবিশ্বাস্য ব্যপার। ইয়াহিয়া খানের নির্বাচন দেয়ার পিছনে মূল কারণ ছিল তিনি আইয়ুবের পতন থেকে শিক্ষা গ্রহণ করেছিলেন এবং জানতেন শুরুতেই স্বৈরাচারী মনোভাব প্রকাশ করা যাবে না। তাই গণতন্ত্রের বিভ্রান্তিকর ছদ্মবেশে তিনি মূলত তার ও পশ্চিমের ক্ষমতাকে সুদৃঢ় করার পরিকল্পনায় ছিলেন। তার বেসামরিক উপদেষ্টা প্রফেসর জি. ডব্লিউ. চৌধুরী সেপ্টেম্বরের ১০ তারিখে এই সাক্ষাৎকারেও বলেন, ‘পশ্চিম বা পূর্ব পাকিস্তানের কোন একক দলই সংখ্যাগরিষ্ঠ হিসেবে আবির্ভাবের সম্ভাবনা নেই। পূর্ব পাকিস্তানের সদস্যদের একক দলভুক্ত হয়ে মুখোমুখি হবার প্রশ্নই নেই, যদি তা ঘটে তাহলে এর পরিণতি হবে পাকিস্তানের বিলুপ্তি।’

৬৬’র পর থেকে শেখ মুজিবের আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা, মাওলানা ভাসানীর নির্বাচন বর্জন এবং প্রলয়ংকারী ঘুর্ণিঝড়ে আক্রান্তদের প্রতি পশ্চিমাদের উদাসীনতা – এসকল কারণেই ইয়াহিয়া খানদের সকল অনুমানকে ভুল প্রমাণ করে আওয়ামীলীগ ১৬৯ টি আসনের মধ্যে ১৬৭ টি আসন জিতে গনপরিষদে মেজরিটি পায়। নির্বাচন জিতে শেখ মুজিব ঘোষনা দেন, ৬ দফার ভিত্তিতেই নতুন সংবিধান রচনা হবে। অ্যান্থনী মাসকারেনহাসের মতে, এই অবস্থায় ইয়াহিয়া খানের সামনে দুটো উপায় খোলা থাকে; গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে, অথবা গণরায়কে অস্বীকার করে ক্ষমতা হস্তান্তর করা যাবে না। এ ছাড়া আর কোন পথ খোলা ছিল না। ইয়াহিয়া খান যে প্রথম পথে হাঁটবেন সেটাও অসম্ভব, তাই অবধারিতভাবে তিনি বেছে নিলেন দ্বিতীয় পথটাই। সে জন্যে দেখা যায়, তিনি বলছেন আওয়ামীলীগ যতদিন তাদের খসড়া সংবিধানের নমুনা তাদের কাছে পেশ না করবে ততদিন পরিষদের অধিবেশন বসবে না। আবার তিনি পরামর্শ দিচ্ছলেন, আওয়ামীলীগ যেন পিপলস পার্টির সঙ্গে সমঝোতায় আসে। এসবই যে মূলত আওয়ামীলীগের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর না করার ষড়যন্ত্র সে আরো স্পষ্টভাবে বুঝা যায় ডিসেম্বরের শেষের দিকে; একজন জেনারেল বলেন, Don’t worry… we will not allow these black bastards to rule over us.

অন্যদিকে পিপলস পার্টির ভুট্টো সাহেব আওয়ামীলগের এমন বিজয়ে নিজে খুবই অসহায় বোধ করলেন, কেন্দ্রে ও জাতীয় পরিষদে তার কোন ভূমিকাই থাকবে না। তিনি উপলধ্বি করলেন যে, তার ব্যক্তিস্বার্থের সাথে সামরিক চক্রের স্বার্থের মিল রয়েছে; তাই হাত মেলালেন ইয়াহিয়া খানের সাথে। ১২ জানুয়ারি ইয়াহিয়া খান সমঝোতার জন্যে ঢাকায় এসে শেখ মুজিবের সাথে মিলিত হন। কোন সমঝোতা না করেই ১৪ তারিখ তিনি ঢাকা ত্যাগ করেন। শেখ মুজিকে ভবিষ্যতের প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, Ask him(Mujib), he is the future prime minister of Pakistan. আবার এর পরেই ভুট্টো ঘোষণা দেন, বোঝাপড়ার ভিত্তিতে সংবিধান রচনা করতে হবে, সংখ্যাগরিষ্ঠতা দিয়ে নয়।

ইয়াহিয়ার এই সফরের, এম আর মুকুলের মতে, দুটো উদ্দেশ্য ছিল; প্রথমত, পরিবেশ সম্পর্কে ওয়াকেবহাল হওয়া এবং দ্বিতীয়ত, অ্যাডমিরাল আহসান, লেঃ জেনারেল ইয়াকুব, খাদিম হোসেন রাজা ও রাও ফরমান আলীকে স্ব – স্ব পদে বহাল রেখে সামরিক অভিযান সম্ভব কি না – সেটা নিশ্চিত হওয়া। এইজন্যে দেখা যায় মার্চের শুরুতেই আডমিরাল আহসানকে পদত্যাগে বাধ্য করা হয় কেননা তিনি ইয়াহিয়ার নির্দেশ বাস্তবায়নে অপারগ ছিলেন। কিছুদিন পর জেনারেল ইয়াকুব খানও পদত্যাগ করেন, কেননা, তার ভাষায়, পাকিস্তানি ভাইদের (পূর্ব পাকিস্তানি) হত্যা করা তাঁর দ্বারা সম্ভব না। অপারেশন সার্চলাইট যে কতটা পরিকল্পনামাফিক হয়েছিল তার আরেকটা প্রমাণ দেয়া যেতে পারে। সামরিক অভিযানের কিছু দিন আগে রাও ফরমান আলী ও খাদিম হোসেন রাজার স্ত্রীদেরকে প্রশ্ন করা হয় এ বিষয়ে(সামরিক অভিযান) তাদের স্বামীদের মতামত পরীক্ষা নিরীক্ষা করার উদ্দেশ্যে। সে সাক্ষাৎকারে এটা নিশ্চিত হয় যে, They would faithfully carry out the orders. তারপরও যদি তারা ‘refused to crack down’, সে জন্যেও ব্যবস্থা রাখা হয়। তাদের বদলি হিসেবে পাঠানো হয় মেজর জেনারেল জাঞ্জুয়া ও মেজর জেনারেল মিঠাকে।

সে যাই হোক, ইয়াহিয়া ঢাকা থেকে ফিরে ‘শিকার’ করার নাম করে লারকানায় ভুট্টোর বাড়িতে সফর করেন। সেখানেই প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নেয়া হয় যে, পূর্ব পাকিস্তানে সামরিক বাহিনীর শক্তি বৃদ্ধি করা হবে। অনেকেই বলেন যে, লারকানা বৈঠকের এক সপ্তাহের মধ্যেই যুদ্ধের প্রস্তুতি নেয়া শুরু হয়। ২৭ ফেব্রুয়ারি থেকেই পূর্ব পাকিস্তানে সৈন্য আসতে শুরু করে।২ মার্চ থেকে ২৪ মার্চের মধ্যে পাকিস্তান আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থার বানিজ্যিক ফ্লাইট শ্রীলংকা হয়ে ঢাকা পথে ১২০০০ সেনা বহন করে আনে। বাঙালিদের বিভিন্ন জায়গায় বদলি করা হলো; সেস্থানে নিয়ে আসা হলো অবাঙালিদের।

যড়যন্ত্র সত্ত্বেও ২৭ জানুয়ারি ভুট্টো পূর্বপাকিস্তানে আসেন শেখ মুজিবের সাথে দেখা করতে। কোন ফলপ্রসূ ফলাফল ছাড়া তিনি ঢাকা ত্যাগ করেন ৩০ জানুয়ারি। সে আলোচনা সম্পর্কে অ্যান্থনী মাসকারেনহাস বলেন, এটা ‘তখনকার মতো আলোচনার গতি রক্ষা করে জনগণ ও আওয়ামীলীগ উভয়কে প্রতারণা করাই যথেষ্ট ছিল’।

১৩ ফেব্রুয়ারি ইয়াহিয়া খান ঘোষণা দেন যে, ৩ মার্চ ঢাকায় গণপরিষদের বৈঠক বসবে। পরিকল্পনা মোতাবেক পরিস্থিতি ঘোলাটে করতে ১৫ ফেব্রুয়ারি ভুট্টো হুমকি দেন, পশ্চিম থেকে কাউকে ৩ মার্চের অধিবেশনে যোগ দিতে দেয়া হবে না, ‘প্রয়োজন হলে খাইবার থেকে করাচি পর্যন্ত রক্ত গঙ্গা প্রবাহিত হবে’। তখন থেকে ইয়াহিয়ার মূল উদ্দেশ্য ধীরে ধীরে পরিষ্কার হওয়া শুরু হয়; নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা দেয়ার তার যে কোন ইচ্ছাই নেই সেটা প্রমাণিত হয় ২১ শে ফেব্রুয়ারি। তিনি তার বেসামরিক মন্ত্রীসভা ভেঙে দেন। যে ঘটনাকে পাকিস্তানিরাই বলেছেন, It marked the end of civilian involvement in his regime। বেসামরিক মন্ত্রীসভা ভেঙে দেয়াটাকে তারা চিহ্নিত করছেন reversion to pure Martial Law rule হিসেবেই।

ঠিক পরেরদিনই রাওয়ালপিন্ডিতে সকল সামরিক গভর্ণর এবং সামরিক প্রশাসকদের বৈঠকে ইয়াহিয়া খান সিদ্ধান্ত নেন যে, অস্ত্রের ভাষায় পূর্ব পাকিস্তানিদের বশে আনা হবে। তার কয়েকদিনের মধ্যেই জেনারেল ইয়াকুব ‘অপারেশন BLITZ’ চূড়ান্ত করার আদেশ দেন। অবশ্য, ১৯৭০ সালের ঘূর্ণিঝড়ের পরে যখন জনগণের অসন্তোষ চরমে তখন নিরাপত্তা জনিত কারণে ‘অপারেশন BLITZ’ প্রণয়ন করা হয়। জেনারেল ইয়াকুবের মতে, তিনি সেটা ৭০’র নভেম্বরেই পরিকল্পনা করেন। তার ভাষাতে, ‘...to meet the eventuality of an insurgency and toe total collapse lf law and order during the period of general elections is E. Pakistan in December, 70. In his hypothetical situation, the mission was to restore order rapidly by the stringent enforcement of martial law, selective arrest of anti-Pakistan elements, vigorous implantation of order to secure key points vital area using minimum force. The object was gain control to be able to meet external intervention.’ তিনি আরো জানান, তাঁর সময়ে এই অপারেশন কার্যকর করা হয় নি কেননা ৫ মার্চই পদত্যাগ করেছিলেন।

পূর্বেই উল্লেখ করেছি, ২৭ ফেব্রুয়ারি থেকে পূর্ব পাকিস্তানি সৈন্য আসা শুরু হয়ে যায়। ১ মার্চ ভূট্টো ঘোষনা দেন যে, তাঁর দলের উপস্থিতি ছাড়া গণপরিষদের অধিবেশন হলে তিনিও পশ্চিমে গণ-আন্দোলন গড়ে তুলবেন। এর প্রেক্ষিতে ইয়াহিয়া ‘রাজনৈতিক সংকট’র অজুহাতে তেসরা মার্চের অধিবেশন স্থগিত করে দেন এবং নতুন কোন তারিখও ঘোষনা দেন নি। বক্তৃতায় তিনি বলেন, ‘আজ পাকিস্তান সবচেয়ে কঠিন রাজনৈতিক সংকটের সম্মুখীন হয়েছে’। মূলত, ভুট্টোর হুমকি এবং ইয়াহিয়ার এমন ঘোষনা তাদের একই পরিকল্পনার অংশ এবং সেটা হচ্ছে সামরিক অভিযানের জন্যে কিছুটা সময় এবং অভিযানের জন্যে মোক্ষম অজুহাত তৈরি করা। তারা জানতেন এমন ঘোষণায় পূর্ব পাকিস্তানের পরিস্থিতি আরো খারাপের দিকে যাবে। তাই, ইয়াহিয়া যে সংকটের কথা তাঁর বক্তৃতায় বলেন সেটা ইচ্ছাকৃত ভাবে তৈরি করা সংকট। ফলশ্রুতিতে যা হওয়ার কথা ছিল তাই হয়েছে; পূর্ব বাংলায় শুরু হয়ে যায় অসহযোগ আন্দোলন যা দেখে অহিংস আন্দোলনের আজীবন ভক্ত খান ওয়ালী খান বলেছেন, ‘এমনকি গান্ধীজীও বিস্মিত হতেন’। এবং এই আন্দোলন পঁচিশ তারিখ পর্যন্ত অব্যাহত ছিল।

একদিকে চলছিল আন্দোলন, অপরদিকে ঘটছিল কিছু উল্লেখযোগ্য ঘটনা। মার্চের প্রথম সাতদিনের মধ্যেই একাধিকবার গভর্নর বদলি করা হয়। এডমিরাল আহসান ও সাহেবজাদা ইয়াকুবের কথা পূর্বেই উল্লেখ করেছি। মার্চের এক তারিখ যখন অধিবেশন স্থগিত করা হলো, তারা দুজনেই এ ঘোষনার বিরোধিতা করেন এবং পরিস্থিতি যে আরো ভয়াবহ হবে সে সম্পর্কেও সাবধান করে দেন। সাহেবজাদা ইয়াকুবের পর গভর্নর হিসেবে টিক্কা খান ৬ মার্চ নিয়োগ পান এবং ৭ মার্চ ঢাকা আসেন। ২৫ মার্চের গণহত্যার পরিকল্পনাকে বুঝতে এই ঘটনাগুলোর গুরুত্ব অনেক। গণহত্যা যেহেতু একটা সিস্টেমেটিক কিলিং, তাই এটা কিছু ধাপে ধাপে সংঘটিত হয়ে থাকে। তেমনি একটা ধাপ হচ্ছে, Polarization। প্রতিটা গণহত্যার শুরুতেই উগ্রপন্থীরা মঞ্চ থেকে সরিয়ে ফেলার চেষ্টা করে সকল “মডারেট”দের যারা গণহত্যার গতি কমিয়ে দিতে পারে, যাকে বলা হয় Polarization। এ জন্যেই মার্চের প্রথমেই গণহত্যা বাস্তবায়নে অপারগ দুজনকে সরিয়ে তাদের স্থলে নিয়ে আসা হয় ‘বেলুচিস্তানের কসাই’ খ্যাত টিক্কা খানকে; ১৯৭০ সালে বেলুচিস্তানে বিদ্রোহ দমনের নামে তিনি নির্মম হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে এই কুখ্যাতি অর্জন করেছিলেন। অবশ্য একাত্তরের পরবর্তীতে পৃথিবীর গণমাধ্যম তাকে ‘Butcher of Bengal’ নামেই চিহ্নিত করত। এমন ঘৃণ্য একজন মানুষকে হঠাৎ করে পূর্ব পাকিস্তানে নিয়ে আসা মূলত গণহত্যার পরিকল্পনারই অংশ।

এই সময়ের মধ্যেই সামরিক অভিযানকে কেন্দ্র করে আরো কিছু ঘটনা ঘটতে থাকে। পাকিস্তান থেকে সৈন্য আসছিল ক্রমাগত ভাবে। এই সৈন্য মোতায়েন বন্ধ করতে ভারত তার আকাশসীমার উপর দিয়ে পূর্ব পাকিস্তানগামী সকল বিদেশী বিমান উড্ডয়নে নিষেধাজ্ঞা জারি করে। যুদ্ধের সামগ্রী নিয়ে জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরে এসে পৌছালে বাঙালি কুলিরা জাহাজ থেকে অস্ত্র খালাস করতে অস্বীকার করে। সেই সাথে সেবাহিনীর বাঙালি সদস্যরা বিদ্রোহ করতে পারে আশংকায় তাদেরকে বিভিন্ন জায়গায় বদলি করা শুরু হয়। ইপিআর’দের হাত থেকে অস্ত্র কেড়ে নেয়া হয়; কিছু কিছু স্থানে ইপিআর’দের নিরস্ত্র করতে গেলে পশ্চিমের সেনাদল ও জনতার মধ্যে সংঘর্ষ লেগে যায়। হতাহতের ঘটনাও ঘটতে থাকে। এই যুদ্ধ সরঞ্জামাদির বৃদ্ধি এবং অধিকসংখ্যক সেনাবাহিনীর উপস্থিতি মূলত ভবিষ্যতে একটি সামরিক অভিযানের ইঙ্গিতই দিচ্ছিল।

আলোচনার জন্যে ১৫ মার্চ ঢাকায় আসেন ইয়াহিয়া খান এবং ১৬ তারিখ থেকেই দফায় দফায় শেখ মুজিবের সাথে বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হতে থাকে। মূলত, এই আলোচনা-বৈঠক ছিল শুধুই প্রহসন; সামরিক অভিযানের প্রস্তুতির জন্যে কিছুটা কালক্ষেপনের দরকার ছিল তাদের এবং একারনেই এই আলোচনা ব্যবস্থা। একদিকে বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনার অভিনয় চলছিল অন্যদিকে সামরিক প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছিল। ১৭ মার্চে শেখ মুজিবের সাথে বৈঠকের পরপরই ইয়াহিয়া টিক্কা খানকে বলেন, The Bastard is not behaving. You get ready’। টিক্কা খাদিম হোসাইন রাজাকে রাতে ফোন করে জানান, Khadim, you can go ahead!’ ১৮ মার্চেই রাও ফরমান আলী ও খাদিম হোসাইন রাজা ‘অপারেশন BLITZ’কে নতুনরূপ দেন এবং এর নাম ঠিক করা হয় Operation Searchlight। পাঁচ পৃষ্ঠার এই পরিকল্পনাটি রাও ফরমান আলী নিজ হাতে লিখেন। ২০ তারিখ এটা পড়ে শোনানো হয় টিক্কা খানকে এবং তিনি এটাকে অনুমোদন দেন। তাঁর মানে, এতদিন ধরে চলতে থাকা পরিকল্পনার খসড়া এবার পূর্ণ রূপ নিল।

পাঁচ পৃষ্ঠার এই পরিকল্পনার শুরুতেই বলা হয়, আওয়ামীলীগের কর্মকান্ডের সাথে যারা জড়িত তারা বিদ্রোহী হিসেবে চিহ্নিত হবে এবং যেহেতু আওয়ামীলীগের সমর্থক আর্মির মধ্যেও ঢুকে পড়েছে তাই, the operation has to be launched with great cunningness, surprise, deception and speed combined with shock action. অপারেশন সমগ্র দেশে একসাথে শুরু করার পরিকল্পনা নিয়ে বলা হয়, শেখ মুজিব সহ সকল রাজনৈতিক নেতা ও ছাত্রনেতাদের যেন অবশ্যই গ্রেফতার করা হয়। সেই সাথে ছাত্র-শিক্ষক-সংস্কৃতিকর্মীদের মধ্যে যত চরমপন্থী আছেন তাদেরকেও গ্রেফতারের আদেশ দেয়া হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে বিশেষ নজর দেয়া হয় এবং সেখানে শতভাগ সফল হওয়ার আদেশও দেয়া হয়। কোন কোন অঞ্চলে কে কে দায়িত্বে থাকবেন এবং কখন আক্রমণ শুরু হবে – এর সবই উল্লেখ ছিল এই পরিকল্পনায়।

বাংলাপিডিয়া থেকে অপারেশন সার্চলাইটের পরিকল্পনা সংক্ষেপে তুলে দিলাম,

‘১. একযোগে সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানে অপারেশন শুরু হবে।
২. সর্বাধিক সংখ্যক রাজনীতিক ও ছাত্রনেতা, শিক্ষক ও সাংস্কৃতিক সংস্থার চরমপন্থীদের গ্রেফতার করতে হবে।
৩. ঢাকার অপারেশনকে শতকরা ১০০ ভাগ সফল করতে হবে। এ জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দখল করতে হবে।
৪. সেনানিবাসের নিরাপত্তা অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে।
৫. যাবতীয় অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগ মাধ্যম বিচ্ছিন্ন করে দিতে হবে। টেলিফোন এক্সচেঞ্জ, রেডিও, টিভি, টেলিপ্রিন্টার সার্ভিস, বৈদেশিক কনস্যুলেটসমূহের ট্রান্সমিটার বন্ধ করে দিতে হবে।
৬. ইপিআর সৈনিকদের নিরস্ত্র করে তদস্থলে পশ্চিম পাকিস্তানি সৈনিকদের অস্ত্রাগার পাহারায় নিয়োগ করতে হবে এবং তাদের হাতে অস্ত্রগারের কর্তৃত্ব দিতে হবে।
৭. প্রথম পর্যায়ে এ অপারেশনের এলাকা হিসেবে ঢাকা খুলনা, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, যশোর, রংপুর, সৈয়দপুর ও সিলেটকে চিহ্নিত করা হবে। চট্টগ্রাম, সিলেট, যশোর, রংপুর ও কুমিল্লায় প্রয়োজনে বিমানযোগে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে।‘

অপারেশন সার্চলাইটে ঢাকা শহরে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠায় প্রাধান্য দিয়ে পাকিস্তান সামরিক কর্তৃপক্ষ উপরোক্ত পরিকল্পনা বাস্তবায়নে নিম্নোক্ত সিদ্ধান্ত নেয়:

‘১. পিলখানায় অবস্থিত ২২নং বালুচ রেজিমেন্ট বিদ্রোহী ৫ হাজার বাঙালি ইপিআর সেনাকে নিরস্ত্র করবে এবং তাদের বেতার কেন্দ্র দখল করবে।
২. আওয়ামী লীগের মুখ্য সশস্ত্র শক্তির উৎস রাজারবাগ পুলিশ লাইনে ৩২নং পাঞ্জাব রেজিমেন্ট এক হাজার বাঙালি পুলিশকে নিরস্ত্র করবে।
৩. ১৮ পাঞ্জাব রেজিমেন্ট শহরের হিন্দু অধ্যুষিত নবাবপুর ও পুরনো ঢাকা এলাকায় আক্রমণ চালাবে।
৪. ২২নং বালুচ, ১৮ ও ৩২নং পাঞ্জাব রেজিমেন্টের বাছাই করা একদল সৈন্য আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী শক্তিকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইকবাল হল (জহরুল হক হল), জগন্নাথ হল ও প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের লিয়াকত হল আক্রমণ করবে।
৫. বিশেষ সার্ভিস গ্রুপের এক প্লাটুন কমান্ডো সৈন্য শেখ মুজিবুর রহমানের বাড়ি আক্রমণ ও তাঁকে গ্রেফতার করবে।
৬. ফিল্ড রেজিমেন্ট দ্বিতীয় রাজধানী ও সংশ্লিষ্ট বসতি (মোহাম্মদপুর-মিরপুর) নিয়ন্ত্রণে রাখবে।
৭. শক্তি প্রদর্শনের উদ্দেশে এম ২৪ ট্যাংকের একটি ছোট্ট স্কোয়াড্রন আগেই রাস্তায় নামবে এবং প্রয়োজনে গোলা বর্ষণ করবে।
৮. উপর্যুক্ত সৈন্যরা রাস্তায় যেকোন প্রতিরোধ ধ্বংস করবে এবং তালিকাভুক্ত রাজনীতিবিদদের বাড়িতে অভিযান চালাবে।‘

সেই সাথে এটাও পরিকল্পনা করা হয় যে, ২৫ মার্চ রাত ১টায় অপারেশন শুরু হবে এবং ঢাকায় এর নেতৃত্ব দিবেন জেনারেল রাও ফরমান আলী। দেশের অন্যান্য অঞ্চলে নেতৃত্ব দিবেন জেনারেল খাদিম রাজা এবং, লে. জেনারেল টিক্কা খান পুরো অপারেশনের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করবেন।

২১ মার্চ ঢাকা এসে উপস্থিত হন ভুট্টো; উদ্দেশ্য সেই প্রহসনের আলোচনায় অংশ নেয়া। ২৩ মার্চ ছিল অসহযোগ আন্দোলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিন। সেদিন সম্পর্কে ডঃ কামাল হোসেন বলেন, ‘অন্যান্য বছর দিনটি পাকিস্তান দিবস রূপে পালিত হতো। কিন্তু ১৯৭১ এর ২৩ মার্চ হাজার হাজার বাংলাদেশের পতাকা বিক্রি হলো’। আসগর খান লিখেছেন, ‘এ দিনই বলতে গেলে পূর্ব পাকিস্তান বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল। সর্বত্র বাংলাদেশের পতাকা উড়ছে, কোথাও পাকিস্তানি পতাকার চিহ্ন নেই’।

একদিকে চলছিল আলোচনার অভিনয়, যদিও ২৪ মার্চের মুজিব-ইয়াহিয়া বৈঠক বাতিল করে দেয়া হয়, অন্যদিকে ঢাকায় কিংবা পূর্ব পাকিস্তানে অবস্থানরত সকল পশ্চিম পাকিস্তানিরা ধীরে ধীরে ঢাকা ছেড়ে করাচির উদ্দেশ্যে চলে যাওয়া শুরু করেন, যাকে সিদ্দিক সালিকের ভাষায়, as wise birds flee to their nests before the coming storm। রাও ফারমান আলী এবং খাদিম হোসেন রাজা হেলিকপ্টারে করে ঢাকার বাইরে বিভিন্ন স্থানে অপারেশন সম্পর্কে শেষ মুহূর্তের মতো নির্দেশনা দিয়ে যাচ্ছিলেন। ঢাকার ৫৭ ব্রিগেড ছদ্মবেশে সিভিলিয়ান পোশাক ও গাড়িতে করে বিভিন্ন target area পরিদর্শন করেন।

২৫ মার্চ সকাল ১১ টায় টিক্কা খান ফোন দিয়ে খাদিম হোসেন রাজাকে বলেন, ‘Khadim, it is tonight’। সন্ধ্যায় অনেকটা গোপনে ঢাকা ত্যাগ করেন ইয়াহিয়া খান। তার ঢাকা ত্যাগ করাকে গোপন করে রাখতে এক বিশাল নাটকের আশ্রয় নিলেও গোপন করে রাখা সম্ভব হয় নাই। ইয়াহিয়া খান যখন এয়ারপোর্ট থেকে রওয়ানা দিচ্ছেন সেটা দেখে ফেলেন পাকিস্তান বিমান বাহিনীর তৎকালীন উইং কমান্ডার এ কে খন্দকার এবং সেটা জানিয়ে দেন শেখ মুজিবকে। অবশ্য অনেকের কাছ থেকেই শেখ মুজিব শুনেছিলেন যে, ফৌজি হামলা হতে পারে। রাত আটটায় তাঁর কাছে একটা চিরকুট এসে পৌঁছায়, যাতে লেখা ছিল, ‘আজ আপনার বাড়িতে হামলা হবে’।

অপারেশন সার্চলাইটের মূল পরিকল্পনা অনুযায়ী রাত ১ টায় আক্রমন শুরু করার কথা, কিন্তু সে আক্রমণ শুরু হয়ে যায় সাড়ে এগারোটায়। অবশ্য, বীর উত্তম রফিকুল ইসলামের মতে সাড়ে নয়টার দিকে আক্রমণ শুরু হয়; রেহমান সোবহানের মতে সাড়ে নয়টা-দশটার দিকেই তিনি গোলাগুলির আওয়াজ শুনতে পান। সে যাই হোক, এই আক্রমন সম্পর্কে সিদ্দিক সালিকের মন্তব্য করেন, ‘The gates of hell had been cast open’।

পরিকল্পনার অংশ অনুযায়ী, শেখ মুজিবকে গ্রেফতার করা হয় রাত ১.৩০ মিনিটে এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, পিলখানা, রাজারবাগ সহ দেশের বিভিন্ন স্থানে শুরু হয় যায় আক্রমন। সে রাতের এই আক্রমনের মাধ্যমেই রচিত হয় ইতিহাসের ভয়াবহতম এক গণহত্যার সূচনা।

ভূট্টো আলোচনার নাম করে ঢাকা এসেছিলেন ২১ মার্চে; কিন্তু তার মূল উদ্দেশ্য ছিল স্বচক্ষে বাঙালি নিধন দেখা। তাই যখন সবাই একে একে চলে যাচ্ছিলেন ঢাকা ছেড়ে তিনি যান নি; বরং পরদিন সকালে তিনি চলে যাওয়ার প্রাক্কালে বিমানবন্দরে আল্লাহকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, ‘Thank God, Pakistan has been saved’. করাচিতে নেমেও তিনি একই কথা বলেন। আরেক পাকিস্তানি ক্যাপ্টেন সে রাতের পর বলেন, ‘The Bengalis have been sorted out well and proper-at least for a generation।

সূত্রঃ
১) দ্যা রেইপ অফ বাংলাদেশ- অ্যান্থনী মাসকারেনহাস
২) Witness to Surrender – Siddiq Salik
৩) মুক্তিযুদ্ধ ও তারপর – গোলাম মুরশিদ
৪) চল্লিশ থেকে একাত্তর – এম আর আখতার মুকুল
৫) পাকিস্তানি জেনারেলদের মন – মুনতাসীর মামুন
৬) মুক্তিযুদ্ধ কেন অনিবার্য ছিল – ডঃ কামাল হোসেন
৭) ৭১ এর দশমাস – রবীন্দ্রনাথ ত্রিবেদী
৮) বাংলাপিডিয়া

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 6 = 1