কী-বোর্ড থেকে রাজপথ, রক্ত, মৃত্যু, ভালবাসা।

জীবনের আসল স্বাদ পাওয়া যায় বোধহয় মৃত্যু কে কাছ থেকে উপলব্ধি করলে। মৃত্যু, যা গত কয়েকদিন থেকে বাংলাদেশের সবাই খুব কাছ থেকে দেখলাম। শুধু দেখেই আমরা ক্ষান্ত হইনি। আমরা রীতিমত এর সাথে লড়াই করেছি। লড়াই আসলে কি আমাদের বিজয় এনে দিয়েছে? আসলে জয়ের সমস্ত তৃপ্তি সাহিনার মৃত্যু এক নিমিষে অনেকখানি কমিয়ে দিয়েছে। সাহিনা বোন আমার তোমার মৃত্যু আমাকে অপরাধী করে, বাচাতে পারিনি বোন তোমাকে, অনেক ইচ্ছা ছিল বোন। কিন্তু পারিনি। পারিনি তোমার অবুঝ বাচ্চাটাকে পুরোপুরি এতিম হওয়া থেকে আটকাতে।

যুদ্ধ বলি আর লড়াই বলি, এই লড়াই ছিল অন্যরকম লড়াই, জীবন বাচাবার লড়াই। আমাদের তরুনরাই এই লড়াইয়ে নেতৃত্ব দিয়েছে। ৬ মাস আগেও এই লড়াই বোধকরি সম্ভব ছিল না। ৬ মাশে এমন কি ঘটল যে পুর দৃশ্যপট পাল্টে গেল? লড়াই করার এই শক্তি আসলে কোথা থেকে আমরা পেলাম? আসলে লড়াই করার অনুপ্রেরনা আমাদের মধ্যে সম্ভবত আগে থেকেই ছিল।

অনেকে বলে যে বাঙালি জাতিটার যোদ্ধা না হওয়াটাই তাঁর সবথেকে বড় দুর্বলতা। আমাদের বছরের পর বছর ধরে বিদেশি জাতিরা আক্রমন করেছে, শাসন, সসন করে গেছে, আর আমরা গাড়ল এর মত মেরুদণ্ডহীনতার চরম স্বাক্ষর রেখে সেটা মুখ বুজে সহ্য করেছি। আসলে ব্যাপার টা কিন্তু সেরকম না। পাঠান আমলে কিন্ত বিদেশী শাসকরা পুরো ভারতবর্ষ শাসন করলেও বাংলা অঞ্চল কিন্তু তাদের রাজত্ব নামক পশার মুক্তই ছিল। অনেকেই বলবেন বখতিয়ার খিলজির কথা, তিনি নাকি মাত্র ১৭ জন অশ্বারোহী নিয়ে লক্ষনৌতি আক্রমন করেছিলেন, আর রাজা লক্ষন সেন নাকি মধ্যাহ্ন ভোজনরত অবস্থাতেই হাত না ধুয়েই পিছন দরজা দিয়ে পালিয়েছিলেন। জানি না কথাটি কতটুকু সত্যি, কারন আমি তো আর লক্ষন সেনের ডাইনিং রুম এ উপস্থিত ছিলাম না। আর যারা বলে খিলজি বীরের (!) মত ঘোড়াওয়ালা সেজে নগর ফটক পার হয়েছিলেন, আমি আর কথা বাড়িয়ে তাদের বীরানুভুতিতে আঘাত হানতে চাইনা। তখন আবার……………………

এটা মানতেই হবে যে খিলজি কাপুরুষের মতন মিথ্যা বলে নগরে প্রবেশ করে মানুষ হত্যাতে মেতে উঠেছিলেন। যাক সে সব কথা, কিন্তু একটা কথা বলতেই হচ্ছে, আমরা কেন শশাঙ্কের কথা ভুলে যাই, যিনি নিজ নামে মুদ্রার পাশাপাশি শকাব্দ চালু করেছিলেন?

সুলতানি আমলে বাংলাতো স্বাধীন হয়েই পড়ে। সুলতানরা মনে প্রানে বাঙ্গালিই ছিলেন। তাদের তো শ্রীচৈতন্যদেব কে পৃষ্ঠপোষকতা দেবার নজিরো আছে।

যাক গা সে সব কথা। আমরা মুঘলদের মেরুদণ্ডহীনতার কারনে সত্যিকারের পরাধিন হই। ব্রিটিশরা আমাদের সত্যই কেঁচো বানিয়ে রাখে। কিন্তু তাদের তৈরি কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ই তাদের জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়। বিপ্লবের যে আগুন পুরো ভারত জুড়ে জ্বলল তার স্ফুলিঙ্গ কিন্তু জ্বলেছিল এই বাংলাতেই। কংগ্রেস এর শুরু থেকেই জানকিলাল এর মত মানুষ গুলোই কিন্তু একে একটা কাঠামতে দাড় করিয়েছিলেন। সুরেন্দ্রনাথ কিন্তু ছিলেন বাঙালি। সুবাস বসুর মত সত্যিকারের বিপ্লবীর জন্মও কিন্তু এখানেই। মুসলিম লিগের জন্মও কিন্তু ঢাকাতে, ইসলামপুরে। বাঙালির রাজনৈতিক সচেতনতা কিন্তু ভূভারতের অন্য অঞ্চলের মানুষের চাইতে বেশিই ছিল।

দেশ ভাগ হল আমরা হাঙ্গর ভরতি সাগর থেকে পিরানহা ভরতি নদীতে এসে পড়ল, বায়ান্ন এলো, বাঙালি জানালো সে তার চেতনার সাথে আপস করে না। বাষট্টিতে রাজপথ ছাড়ি নাই, উনসত্তুরে ছাড়ি নাই। একাত্তরে তৈরি করেছি ইতিহাস। তারপরেও নাকি আমরা বীরের জাতি নই!

আসলেই নই। কাপুরুষের মতন আমরা নিজেদের স্বাধীনটার সপ্নপুরুষ কে হত্যা করেছি। পুনর্বাসন করেছি সেই সব হায়নাদের যারা আমাদের ছিব্রে খেয়ে ফেলতে চেয়েছিল। আমরা ঠাণ্ডা মাথাতে খুন করেছি। যেই সাম্যবাদী সংবিধানের জন্য লাল সবুজের পতাকা ছিনিয়ে আনলাম, তাকে বারেবারে ক্ষতবিক্ষত করেছি।

প্রায় ১৫ বছর মেন্দা মারে পড়ে ছিলাম। তারপর আবার জেগে উঠলাম। ঝাঁকিয়ে দিলাম স্বৈরাচারের মসনদ। তারপর কত গুলি বছর চলে গেল, বুড়িগঙ্গার স্বচ্ছ জল বিসাক্ত হয়ে কালো হয়ে গেলো, আমরা আবার মেন্দা মেরে গেলাম। নতুন একটা প্রজন্ম তৈরি হল যাদের নাকি দেশের ব্যাপারে কোন মাথা বেথা নেই। যাদের চিন্তা কোন রকমে এ লেভেল বা গ্রাজুয়েশন শেষ করে উত্তর আমেরিকা বা ইউরোপ চলে যাওয়া। যারা মাঠে কখনও ফুটবল খেলেনি, কিন্তু ই এ স্পোর্টস এর ফিফাতে চ্যাম্পিয়ন। বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগের কোন খবর রাখে না, কিন্তু সিরি আর প্রতি সেকেন্ড এর খবর রাখে। দেশের কোন দুর্যোগে তাদের পাবার বিন্দুমাত্র সম্ভাবানা নেই বললেই চলে, কিন্তু আমেরিকার মিসিসিপিতে সাইক্লোন হলেই তারা কান্না কাট করে। কে মন্ত্রি কে প্রতিমন্ত্রি তা নিয়ে তাদের কোন মাথা ব্যাথা নেই। তবে মার্কিন মুলুকের সব খবর রাখে।

নাহ এদের দ্বারা অন্য দেশের উপকার হতে পারে কিন্তু বাংলাদেশের উপকারের বিন্দুমাত্র সম্ভবনা নেই! তবে এত সবের ভেতর এক প্রমিথিউস তার দেশলাইয়ের কাঠি নিয়ে বসেছিলেন। তিনি নীরবে এই ছেলে মেয়ে গুলর মনে বিপ্লবের আগুন জেলে দিচ্ছিলেন। দেশ শব্দটার সাথে পরিচয় করাচ্ছিলেন। কেউ আসলে বুঝেনি, তিনিও না যে তিনি কি করেছেন, নাহলে হয়ত তার দেশলাইয়ের কাঠিটা জ্বালতেন না। তিনি বলেই ফেললেন এদের দ্বারা কিচ্ছু হবে না,এরা শুধু ঘরে বসে কী বোর্ড ফাটাতে পারে। স্যার, আমি জানি আপনি এই কাজটা ইচ্ছা করেই করেছিলেন, আপনি স্ফুলিঙ্গ জ্বালতে চেয়েছিলেন টা আজ মশাল থেকে অসান্ত ভিসুভিয়াসে পরিনত হয়েছে। ভালবাসা ছাড়া আপনাকে এই মুহূর্তে আর কিছুই দিতে পারছিনা ডক্টর মোহাম্মদ জাফর ইকবাল স্যার।

৫ ফেব্রুয়ারি একজন রাজাকারের ৭১ সালে সংঘটিত অপরাধের সাজা দেয়া হল যাবজ্জীবন, তার ফাঁসীর দাবিতে ফেস বুকে ১ টা ইভেন্ট খোলা হল, কি আর হবে এমন এইসব করে। ৫ তারিখের সেই ছোট্ট ঘতনাতা বাংলাদেশের ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দেবার জন্য যথেষ্ট ছিল। প্রিথিবি দেখল এবং শিখল এক অহিংস এবং দারুন এক প্রতিবাদ। শাহবাগ আসলে অনেক কিছু দেখেছে, স্লগান, চিৎকার, আবেগ, উচ্ছাস, আননন্দ, রক্ত, অশ্রু, ঘৃণা, ক্রোধ- আবেগের সবটুকু রঙ। আহবাগ সবাইকে দেখিয়েছে এই প্রজন্ম ঘরে বসে শুধু কী – বোর্ড ফাটায় না, এরা এখন রাজপথে বসে অনেক কিছু ফাটায়। এরা জিরন মতবাদ ফাটায়। একবার যখন এরা ঘর থেকে বের হতে পেরেছে, তখন আর ঘরে এ সি রুমের কারাগারে ফিরছে না। এরা মিছিল করতে জানে, শ্লোগান দিতে জানে। জানে পথের বন্ধুদের অসম্ভব ভালবাসতে, পারে রাস্তাতে ঘুমাতে, পারে সারাদি না খেয়ে থাকতে, পারে ১ কাপ চা ভাগাভাগি করতে, পারে ১ টা সিগারেট কাড়াকাড়ি করে খেতে। শহিদ জননির শুধু ১ টা চিঠি তাদের চোখ ভেজাতে পারে। এরা জাতিও পতাকার জন্য জিবন বিপন্ন কতে পারে। এক কথাতে বললে, ওদের এখনও মিছিল টানে, জয় বাংলা শ্লোগানে।

নাহ এই ছেলে গুলা শুধু শ্লোগানই দিতে পারে, আর কিছু না। ২৪ এপ্রিল সাভারে একটি ভবন ধ্বসে পড়ল, হতাহত কত তা কেউ জানে না। লাশের গন্ধে টেকা দায় । এই বখে যাওয়া ছেলে গুলো আগিএ আসলো পানি নিয়ে, খাবার নিয়ে, অক্সিজেন নিয়ে। টাকার জন্য ভিক্ষুকের মত রাস্তাতে নেমে পড়লো। কেউ খুশি মনে সাহায্য করলো, কেউ অবহেলা কেউবা অপমান। তাতে তাদের কিছু আসে যায় না। তাদের যে মানুষ বাচানর নেশা পেয়ে বসেছে। তারাই আবার ঝুঁকি নিয়ে নেমে গেলো সেই ভবনে। খালি হাতে হেস্ক ব্লেড দিয়ে তারা উদ্ধার করলো প্রায় ২৫০০ জীবিত মানুষ। কিন্তু না তারা তৃপ্ত নয়, এক সাহিনা কে বাচাতে না পেরে তারে অতৃপ্ত। এই তারাই যারা জীবনে লাশ দেখেনি পচা গলা লাশ নিয়ে কাজ করছে, ডোমের কাজ।

নাহ আমার ওইরকম বা** সুশিল হবার দরকার নাই, যারা টক শোর টেবিলে আর ফেসবুকে বসে বড় বড় বানী কপচায়। আমি এই মাথামোটা বখে যাওয়া নষ্ট ছেলেদের দলে।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৭ thoughts on “কী-বোর্ড থেকে রাজপথ, রক্ত, মৃত্যু, ভালবাসা।

  1. এই আন্দোলন আমাদের ভিতর জাগিয়ে
    এই আন্দোলন আমাদের ভিতর জাগিয়ে তুলেছে সেই বীরের রূপ। প্রমাণ করেছে আমরা বীর ছিলাম, আছি থাকবো………

    1. বীরত্ব আসলে একটা সংজ্ঞাহীন
      বীরত্ব আসলে একটা সংজ্ঞাহীন ব্যাপার, তা আমরা ৫ ফেব্রুয়ারির পর থেকে প্রতিমুহূর্তে প্রমান রেখে চলেছি।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 38 = 47