যেখানে কাঁদে দেশ হারলে পাকিস্তান আর হাসে দেশ হারলে হিন্দুস্তান

ক্রিকেট খেলাকে ভদ্রলোকের খেলা বলা হয়। কিন্তু বাংলাদেশের দিকে তাকালে এটি আর ভদ্র লোকের খেলা থাকে না। অসভ্যতায়, নির্লজ্জতায় আমরা বর্তমানে এমন পর্যায়ে নেমে গেছি যা ৬০০ -৭০০ সালের অসভ্য আরবদেরকেও হার মানিয়ে দিচ্ছি। আমাদের এই নিচুতার কারণটা আসলে কি ? দিন দিন কেন আমাদের অধপতনের মাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে ? আমরা কি অনুধাবন করছি বহির বিশ্বে আমাদের অবস্থান কোন পর্যায়ে নেমে যাচ্ছে ?

একটি দেশের সুশিক্ষিত সমাজ যাদেরকে বুদ্ধিজীবী বলা হয়। সেই বুদ্ধিজীবীদের চিন্তা চেতনার বহিঃপ্রকাশ ঘটে সেই দেশের জনগণের মধ্যে। আর একটি দেশের গণমাধ্যম সেই সু চিন্তাধারা কে সকলের মাঝে ছড়িয়ে দিতে সহায়তা করে। কিন্তু দুঃখের বিষয় বাংলাদেশের গণমাধ্যম এর দিকে তাকালে দেখা যাই তারা সুচিন্তা ধারা কে বাদ দিয়ে কুচিন্তাধারা কে জনগণের মাঝে ছড়িয়ে দিতে বেশি তৎপর। এই কুচিন্তাধারার প্রভাবেই আমরা আজ সভ্য ও অসভ্য এর পার্থক্য ভুলে যাচ্ছি।কয়েকটি উদাহরণ দিই

২০১৫ সাল বিশ্বকাপ ক্রিকেট বাংলাদেশ বনাম ভারত ম্যাচ। উঁচু হয়ে আসা একটি বলে ব্যাট চালিয়ে ভারতের ব্যাটসম্যান ক্যাচ আউট হয়ে গেলেন। কিন্তু আম্পিয়ার বলটিকে নো বল ডেকে দিলেন। শুরু হলো বিতর্ক। বিতর্কের আগুনে ঘি ঢেলে বাংলাদেশের সাবেক খেলোয়াড় পাইলট মন্তব্য করলেন ” ভারতের আই পি এল এ জায়গা পাবার জন্য উনি এই আউটটি দিয়েছেন”।একধাপ এগিয়ে রেডিও ভূমিতে সুবর্ণা মুস্তফা বললেন “এইসব আগেথেকেই টাকাদিয়ে সেটিং করে রাখা ওরা (ভারত) মাঠে ১৪ জন নিয়ে খেলবে”। বলা বাহুল্য এই দুটি মন্তব্য তখন এতই জনপ্রিয় হয় যে তা অন্তত কয়েক লক্ষ্য কোটিবার কপিপেস্ট হয়। যার রেশ এখনো আছে। যদিও আম্পিয়ারটি ছিল তাদেরই জাতভাই।

সময়ের কণ্ঠস্বর অনলাইন একটি পত্রিকা। বাংলাদেশে লাইক এবং কমেন্টের সংখ্যাই এটি সবার আগে। এর কারণ হিন্দুদের বিরুদ্ধে উস্কানি দিয়ে মুসলিমদের খেপিয়ে তুলতে এটি সিদ্ধহস্ত। কয়েকদিন আগে ফরিদপুরের একটি এলাকার মন্দিরে একজন পুরোহিত নাকি কোরান শরীফ রেখেছিলো। সেই খবরটাকে সময়ের কণ্ঠস্বর দিলো এভাবে। “লোকনাথ মূর্তির পায়ের নিচে পবিত্র কোরান শরীফ রেখে ধর্ম অবমাননা করলো হিন্দু পুরোহিত”। “পুরোহিতের ফাঁসির দাবিতে রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করছে এলাকার ধর্মপ্রাণ মানুষ “। বলার অপেক্ষা রাখে না এই কথাগুলো কতবড় উস্কানি। স্বাভাবিক ভাবেই এই ধরণের পোস্টে লাইক কমেন্টের মাত্রা ছিল ইতিহাস কাঁপানো। আর কমেন্টের ভাষাগুলো যা ছিল তা সভ্য কেউ মুখে আনতে পারবে না।

ইংল্যান্ডে চলছে চ্যাম্পিয়ন ট্রফি ক্রিকেট। বাংলাদেশ ক্রিকেট টিম ও এই ট্রুনামেন্টের গর্বিত অংশীদার। ইতিমধ্যে বাংলাদেশ মূলপর্বে একটি ম্যাচ এ অংশ গ্রহণ করেছে। উক্ত খেলায় জয় -পরাজয় নাহলেও বৃষ্টির কল্যানে বাংলাদেশ পরাজয় এর হাত থেকে বেঁচে যাই। এর আগে প্রস্তুতি পর্বের একটি ম্যাচ এ বাংলাদেশ বর্তমানের চির শত্রু ও চির প্রতিদ্বন্দ্বী ভারতের কাছে লজ্জা জনক ভাবে হেরে যাই। এখানে একটি বিষয় লক্ষণীয় যে চির প্রতিদ্বন্দ্বী একটি দলকে এভাবে লজ্জা জনক ভাবে হারিয়েও ভারত বাসীকে কিংবা তাদের মিডিয়াকে পৈশাচিক আনন্দ করতে দেখা যাই নি। কলকাতার কয়েকটি অনলাইন পত্রিকা ছাড়া লিডিং কোনো পত্রিকাতে এই খবর আশেই নি। যেখানে বাংলাদেশের লিডিং পত্রিকা গুলোও এ নিয়ে আলোচনা করেছে বিস্তর।

“চির প্রতিদ্বন্দ্বী ভারত” এ কারণেই বললাম আমরা আফগানিস্তানের সাথে খেলায় সহজেই হেরে যেতে পারি কিন্তু ভারতের সাথে খেলা হলেই সেখানে আমাদের জয় এর পাল্লা থাকে ৯৯ %। কিন্তু সেই খেলায় ভারত আম্পিয়ার দিয়েই হোক, বল-মাঠ দিয়েই হোক, কিংবা আইসিসি দিয়েই হোক দুর্নীতি করে সেই ম্যাচ জিতে যাই।সত্যিতো প্রতিটা জেতা ম্যাচ যারা দুর্নীতি করে আমাদের হারিয়ে দেবে তারা তো আমাদের বন্ধু হতে পারে না। তারা অবশ্যই আমাদের চির শত্রু। কিন্তু কথা হচ্ছে পাকিস্তান কিংবা অন্য কোনো দেশের সাথে ভারতের হার হলে সেখানে আমরা এতটা পৈশাচিক আনন্দ করি কেন ? একটু ভাবলেই এটা পরিষ্কার হয়ে যাই।আমরা সবকিছুতেই ধর্মকে টেনে নিয়ে আসি।তাই ভারতের সঙ্গে হারকে আমরা জাস্ট একটি হার হিসেবে দেখি না।আমরা ভাবি আমরা হিন্দুদের কাছে হেরে গেলাম।

ভারত পাকিস্তান ম্যাচ শেষে আমি একটি মন্তব্য করেছিলাম। “আজ হারছে পাকিস্তান কিন্তু কাঁদছে বাংলাদেশ “।এই মন্তব্যের উত্তরে আমার এক মুসলিম বন্ধু দুর্দান্ত এক ইয়র্কার মেরে আমাকে বোল্ড করে দেয়। সে বলেছিলো “গুটি কয়েক পাকি সাপোর্টার দিয়ে গোটা বাংলাদেশকে বিচার করা ঠিক নয়” ।মন্তব্যটি পেয়ে আমি অভিভূত হয়েছিলাম। মনে মনে ভাবছিলাম সত্যিতো আমার বাংলাদেশ এরকম হতেই পারে না। আমার ধারণাই ভুল। কিন্তু বড় দুঃখের দুদিন পেরোতেও পারলোনা। আমার মন্তব্যটা সঠিক প্রমান করে দিলো। গতকাল ভারত হেরেছে আর এতে বাংলাদেশে বইছে ঈদের আনন্দ। এই আনন্দের মশলাও জুগিয়েছে এই দেশের একটি লিডিং পত্রিকা। লিংটি এখানে..https://www.facebook.com/DailyProthomAlo/posts/1637121489654264

ভাবুনতো একটি লিডিং পত্রিকার হেডিং যদি এই হয় তাহলে একজন সভ্য মানুষের পক্ষেও কি এখানে অসভ্য ভাষা ব্যবহার নাকরে মন্তব্য করতে পারবে?এই লেখাটি পোস্ট করার পূর্ব পর্যন্ত যেখানে লাইক পড়েছে ৯৪ হাজার।কমেন্ট পড়েছে ২২০০। শেয়ার হয়েছে ১৫১৬ বার।সবথেকে এখানে মজার বিষয়টি হলো বাংলাদেশে ভারত বিদ্বেষী আর পাকি সাপোর্টার ছাড়া মনে হয় না কেউ ফেসবুক ব্যবহার করে ? কারণ এই ২২০০ কমেন্টের মধ্যে যেখানে ভারতের থেকেও হিন্দুদের ধর্ম টেনে এনে খিস্তি করা হচ্ছে । সেখানে একটিও বাংলাদেশী মুসলিম এর কমেন্ট খুঁজে পেলাম না যেখানে কেউ এই অসভ্যতার প্রতিবাদ করছে।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

7 + 1 =