নেহা চরিত


“কি রে হিরোইন? মন খারাপ”
মুহুলের স্বর শুনে ঘুরে তাকাল নেহা। আস্তে করে বলল “তুই?”
“বাহ! কেন? সারাদিন পাশেপাশে ঘুরি,মাথার চুল ধরে টানি,চুলের গন্ধ শুকি। দারুন গন্ধ ” বলে হাসতে লাগল মুহুল ঘর ফাটিয়ে।
নেহা চোখ ছোট করে ফেলল,খুব মনোযোগ দিয়ে দেখল। আজকে হালকা নীল টি শার্ট আর জিন্স পড়া। এটা নেহার খুব প্রিয় কম্বিনেশন। মুহুলকেই বেশি মানায়। রাইয়ান একবার পড়েছিল তবে সেটা ছিল নীল শার্ট আর জিন্স। মোটামুটি লেগেছিল। নেহার মতে সব মানুষেরই আলাদা রং আছে, যেমন: রাইয়ানকে লাল রং এ মানাতো,আকাশকে সাদায়,মুহুলকে নীলে।
এভাবে নেহাকে তাকায়ে থাকতে দেখে মুহুল ফোড়ন কাটে “কি রে! আবার মনে হয় আমার প্রেমে পড়লু? 😉 ”
“অসভ্যতা ছেড়ে ভাগ। তোর প্রেমে পড়ার মত কিছু হয় নাই। কলেজে থাকতেও পড়ি নাই,এখনো না” বলে ওর ব্যাগ গুছাচ্ছিল, কাল খুব ইম্পরট্যান্ট কাজ আছে- তাই টুকিটাকি প্রস্তুতি।
মুখ খিচিয়ে মুহুল বলল “ও আচ্ছা! তা আর প্রেমে পড়বা কেন? পড়বা তো রাইয়ান আর আকাশ দের প্রেমে।আর আমার মতো পোলারে মারবা, মেরে ফেলে দিবা”
“মুহুল! তুই আমাকে এভাবে বলতে পারলি? তোর মৃত্যুর জন্য আমি দায়ি?”
নেহা অবাক হয়ে গেছে।
হিস্টিরিয়ার পেশেন্ট এর মত চিতকার করে উঠল মুহুল “অবশ্যই! অবশ্যই! তুই দায়ী। আমাকে উঠতে বসতে ইগনোর করতি যখন ভালোবাসার কথা বলতাম। কি দোষ ছিল আমার? ভালবাসা কি অন্যায় ছিল? মাঝে মাঝে ইচ্ছা করে তোরে গলা টিপে মেরে ফেলি। একটা ডাইনি কথাকার!”
নেহা চুপচাপ শুনতে থাকে। পাথরের মত নিশ্চল হয়ে গেছে। হ্যা! সাতটা বছর আগে সে একটা ভুল করেছিল। অনেক বড় ভুল ছিল। এটা যে কি করে দিনের পর দিন কুড়ে কুড়ে খেয়ে যায় ওরে একমাত্র ওই ভালো জানে।
এদিকে মুহুল অবিরাম বলেই চলেছে “You know what! তুই কারো ভালবাসার যোগ্যই না। তোর মধ্যে নুন্যতম কৃতজ্ঞতা নেই। রাইয়ান যে কাজটা করে গেসে না তোর সাথে ঠিক করছে- ডাস্টবিন এ ছুড়ে ফেলায় দিয়ে গেসে। ভালো হইসিল যখন বলসিল তোর কোন যোগ্যতা নেই,তোর মত মেয়ের জন্য ওর পাচ মিনিট কেন পাচ সেকেন্ড ও সময় নাই। খুব খুশি হইসিলাম যেদিন ICU তেঁ ধুঁক……”
“ENOUGH” নেহা চিৎকার দিয়ে ওঠে। পাগলের মতো কাঁদতে থাকে আর বলতে থাকে “Go To the hell u son of bitch” হাতের কাছে যা পাচ্ছে তাই ছুড়ে মারছে,পুরা ঘর তছনছ। বাসায় বুয়া ছিল বলে রক্ষা, বহু কষ্ট করে সামাল দিয়েছে। জোর করে জড়ায়ে ধরেছিল “আম্মু! মাথা ঠান্ডা করেন। পাগলামি কইরেন না। স্যারে বাইরে থেকে আইসা জানতে পারলে সব্বেনাশ হয়া যাইবো। আল্লাহ! মাইয়াডারে ভালা কইরা দাও…কি বিপদ! কি বিপদ!”
আস্তে আস্তে নেহা ঠান্ডা হয়। বুয়া অত্যন্ত বুদ্ধিমতি চটপটে হাতে ঘর গুছায়ে দেয়। কোন প্রমাণ রাখে না। নেহা সিলিং এর দিকে তাকিয়ে আছে আর ভাবছে। ভাবছে আর কাঁদছে। শুধু একসময় বুয়া এসে জিজ্ঞেস করে
:আম্মু! চশমাডা তোঁ ভাইংগা গেসে।এখন?
:টেবিলে রেখে দাও খালা
: স্যারে টের পাইব
:পেলে পাক।
:আপনারে তো বকব
: বকলে বকুক।
: আবার অশান্তি….
:খালা! প্লিজ। ভালো লাগছে না। যাও
: (দীর্ঘশ্বাস ফেলে) নিজেরই পেডের দুইটা আছে। এই জন্য তোর লাইগ্যা মায়া লাগে রে মা!
: মায়া করো না প্লিজ। আমার মতো খারাপ মেয়ের জন্য কারো মায়া থাকা উচিত না :'(
——— ———
এমন সময় নিচে গাড়ির হর্ন বেজে উঠল। গেট খুলার আওয়াজ। নেহার বাবা মা ফিরেছেন। আস্তে করে রুমের লাইট নিভিয়ে, দরজা লাগিয়ে চলে গেল বুয়া। নেহা চুপচাপ সিলিং এর দিকে তাকিয়ে শুয়ে আছে। আজকে ওর পুরা দুনিয়াটাই এলোমেলো হয়ে গিয়েছে। এমন সময়-
: স্যরি রে
: গেট আউট
: প্লিজ আই এম স্যরি
: প্লিজ মুহুল! চলে যা
: তখন মাথা ঠিক ছিল না।খুব রাগ লাগছিল
: এভাবে আমাকে hurt না করলেও পারতি।
: আই এম স্যরি।
: রাইয়ানের ব্যাপারটা এভাবে তুই বলবি আমি ভাবতেই পারি নাই
: আমাকে মাফ করে দে।
: একটা গ্লাস ভেংগে সেই ভাংগা টুকরার কাছে মাফ চা! দেখতো জোড়া লাগে কি না!
: নেহা!
: প্লিজ যা মুহুল। আমাকে একা করে দে প্লিজ।
: আমি তোকে ছাড়া থাকতে পারব না। অনেক ভালবাসি
: গুডবাই মুহুল।
: নেহা শোন….
: আর শোনার ইচ্ছা নাই। যেটুকু বাচার ইচ্ছা ছিল তাও শেষ।
: আই এম স্যরি।
: সাত বছর এত ক্ষোভ তোর মনে ছিল আমি বুঝি নাই। বুঝি নাই আজ আমাকে এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে। please,Leave me alone…
—————————-
নেহা বালিশে মুখ গুজে কাঁদতে থাকে। অবিরাম ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেদেই চলেছে। আচ্ছা। কেন এমন হয়? কেন?বড় বিচিত্র এই সম্পর্কের বেড়াজাল। যা একবার শূন্য হয়ে যায় তা শুণ্যই রয়ে যায়,পূর্ণ আর হয় না….
(সত্য ঘটনা অবলম্বনে)

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

74 − = 69