বাস্তবতা বুঝতে পারা সহজ কিন্তু মেনে নেওয়া কঠিন……

২ বছর আগের একদিনের ঘটনা ঃ আমি অফিস শেষ করে বাসার উদ্দেশ্য রওনা দিলাম যথারীতি বাস এ করে । আমাদের দেশের সিটি সার্ভিস বাস গুলোতে সিট পাওয়া আর সাত আসমানের চান হাতে পাওয়ার সামিল ।। সেদিনও খুব ভীড় ছিল কিন্তু আমি বাস এর দরজায় সবার সামনে ছিলাম বলে তাড়াহুড়ো করে বাসে উঠে পরতে পড়লাম এবংএকটা ছেলের পাশে গিয়ে বসলাম ।। আমার একটা বদঅভ্যাস আছে আমি বাস কিংবা কোনো যানবাহনে উঠলেই মোবাইলে ফেইসবুক কিংবা ইন্টারনেটে কিছু না কিছু করি ।। তো সেইদিনও আমি বাসে বসেই আমার মোবাইল বের করে ফেইসবুকে লগিন দিলাম সাথে বাংলাদেশের খেলার আপডেট দেখতে লাগলাম । আমার পাশে ছেলেটাও দেখলাম মোবাইল নিয়ে ব্যস্ত ।। বাস চলতে লাগলো তারমন্থর গতিতে ৫ মিনিট গেলে ১০ মিনিট থেমে থাকে !! একটু পর ছেলেটার মোবাইলে কল আসলো এবং অদ্ভুত ভাবে খুব উচ্চস্বরে হিন্দি কোনো গানের রিংটোন বেজে উঠলো !! গানের কথা গুলো মনে হয় এমনি ছিলো “সাথী তেরা পেয়ার পুজা হেই, তেরে সিভা কোন মেরা দুজা হে ইয়ার” !! আমার পরের সিটের ২ টা লোককে দেখলাম ভুরু কুচকালো ওর রিংটনের শব্দ শুনে !! এতক্ষন ছেলেটাকে ভালো করে খেয়াল করিনাই আমি কিন্তু এইবার তাকে ভালোমতো দেখলাম ।। হালকাপাতলা দেহের গড়ন গায়ের রঙ কালো বলা যায় আমার মতো !! খুব টাইট জিন্স প্যান্ট পড়ে আছে এবং একটা লাল টি-শার্ট পড়ে আছে ।। বয়স ১৯/২০ হবে মাথার চুল অনেকটাই এলোমেলো করে আছে !! দেখেই যা বুঝার বুজে নিলাম তারপরও সিওর হওয়ার জন্য ওর কথা গুলো একটু খেয়াল করার চেষ্টা করলাম কথা বলার স্টাইলটা অনেকটাই পরিচিত মনে হল !! যাই হোক অনেক কষ্টে ওর কথা খেয়াল করে যা বুঝলাম তার সারমর্ম হল “ আমি চিটাগাং চলে আসছি এবং এখানে একটা গার্মেন্টস এ চাকরী করছি বেতন পেলে তোমার জন্য শাড়ি এবং কিছু টাকা পাঠাবো মা ।। তুমিভালো থেকো বাবাকে আমার সালাম দিও আর মুন্নিকে ভালো করে পরতে বলো না হলে ওর জন্য পুতুল কিনে আনবো না ”।। বুঝতে এতটুকু কষ্ট হলোনা যে ছেলেটা অন্য কোনো বিভাগ এর শুধুমাত্র নিজের ফ্যামিলিকে সাহায্য করার জন্য এবং মা বাবার মুখে একটু হাসি ফোটাবার জন্য সে ওর নিজের বিভাগ ছেড়ে অন্য জাইগায় এসেছে ।। কিছুক্ষন পর বাস এসে গন্তব্য থামলো এবং আমি আমার মতো করে বাস থেকে নেমে গেলাম দেখলাম ছেলেটাও আমার পিছে পিছে নেমে গেলো এবং নামার সাথে সাথে মোবাইলে আবার খুব জোরে গান ছেড়ে তার মতো করে হেটে চলে যাচ্ছে …………………

২৬.০৪.২০১৩ রানাপ্লাজা ধ্বসের ৩ দিন !!! টেলিভিশনে রানা প্লাজা ধ্বসের খবর দেখতে দেখতে এতটা কষ্ট লাগছিলো আমার চোখ দিয়ে পানি চলে আসছিলো ।। কিন্তু নিজেকে অনেক শক্ত করে রেখেছিলাম এবং কিছু একটা করার জন্য চেষ্টা করে যাচ্ছিলাম কিন্তু আমি চিটাগাং এ থাকি তাই ঢাকাতে গিয়ে কিছু করার মত সাধ্য আমার নেই তাই ফেসবুকে বিভিন্ন খবর শেয়ার করছি এবং ফোন দিয়ে বন্ধুদের সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেছি ।। কিন্তু ধ্বসের ৩ দিন একটা লাশ দেখে আর নিজেকে স্থির রাখতে পারলাম না !! সেই ছেলেটির লাশ যার সাথে আমার বাসে দেখা হয়েছিলো !! চেহারা হুবুহু আগের মতোই আছে শুধু স্পন্দনহীন দেহ !! দেখে আর কান্না আটকে রাখতে পারলাম না অঝর ধারায় জল গড়িয়ে পরতে লাগল ।। আমি জানিনা তার নামকি ?? আমি জানিনা সে কোথাই থাকে ?? আমি জানিনা সে তার মাকে শাড়ী কিনে দিতে পেরেছিলো কিনা ?? আমি জানিনা সে তার বোনকে পুতুল দিয়ে তার মুখে হাসি ফুটাতে পেরেছিলো কিনা ?? শুধু জানি তার মোবাইলে আর কখনও সেই অদ্ভুত রিংটোন বেজে উঠবে নাযার আওয়াজে কেউ বিরক্ত হবে না !! রাস্তায় চলার সময় আর মনের কষ্ট চাপা দেয়ার জন্য মোবাইলে গান বাজিয়ে নিজ গন্তব্যর উদ্দেশ্য যাবেনা !! সবকিছুকে পিছনে ফেলে সে চলে গেছে না ফিরার দেশে যেখানে গেলে আর ফেরা যায়না !! খুব বেশি কষ্ট লাগলো ওর লাশটা দেখে সেইদিনের ঘটানাটা মনে পড়ে গেলো ।।

আমরা অনেক সময় রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময়কিছু ছেলেকে দেখি মোবাইল হাতে নিয়ে রাস্তা দিয়ে উচ্চস্বরে গান বাজিয়ে হেটে চলে যাচ্ছে ।। আমরা অনেকেই আড়চোখে দেখি তাদেরকে এবং নিজের মনে মনে ঘৃণাও করি !! কিন্তু একটি বারের জন্য চিন্তা করিনা ওই ছেলেগুলো এতদুর থেকে আসে শুধুমাত্র তার ফ্যামিলিকে একটু সাহায্য করার জন্য, বাবা মার মুখে একটু হাসি ফোটানোর জন্য ।। ওরা হয়তো রাস্তাদিয়ে হেটে যাওয়ার সময় গান বাজিয়ে গেলে তাদের ফেলে আসা সুখকে একটু হলেও ফিরে পায় অথবা উচ্চস্বরে মোবাইলে রিংটোন দিয়ে আপন জনের মুখখানি কল্পনা করে ।। অনেক সময় ওদের এই রকম কাজের কারনে আমরা বিরক্ত হয় কিন্তু আমি মনে করি এইটা ওদের দোষ না আমরা যদি নিজেদেরকে ওদের জায়গাই নিয়ে একটু গভীরভাবে চিন্তা করি তাহলে উত্তরটা পেয়ে যাবো আশা করি !! …………………ধন্যবাদ ।। :আমারকুনোদোষনাই:

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৮ thoughts on “বাস্তবতা বুঝতে পারা সহজ কিন্তু মেনে নেওয়া কঠিন……

  1. কেন জানি না আপনার লিখাটা পড়ে
    কেন জানি না আপনার লিখাটা পড়ে চুখে জল চলে আসল।।বাস্তবতা খুবই কঠিন।।যা মেনে নেওয়া কষ্টকর।।।

    1. ধন্যবাদ আমার লিখাটি পড়ার জন্য
      ধন্যবাদ আমার লিখাটি পড়ার জন্য এবং আমি দুঃখিত আপনার চোখে পানি আনার জন্য কিন্তু আমি মনে করছি আমার লিখাটি সার্থক………… :ফুল:

  2. আমি জানিনা তার নামকি ?? আমি

    আমি জানিনা তার নামকি ?? আমি জানিনা সে কোথাই থাকে ?? আমি জানিনা সে তার মাকে শাড়ী কিনে দিতে পেরেছিলো কিনা ?? আমি জানিনা সে তার বোনকে পুতুল দিয়ে তার মুখে হাসি ফুটাতে পেরেছিলো কিনা ?? শুধু জানি তার মোবাইলে আর কখনও সেই অদ্ভুত রিংটোন বেজে উঠবে নাযার আওয়াজে কেউ বিরক্ত হবে !!

    :মনখারাপ: :মনখারাপ: :মনখারাপ:

    1. দুঃখিত “না” টা পরে নাই এখন
      দুঃখিত “না” টা পরে নাই এখন দিয়ে দিলাম এবং ধন্যবাদ আপনাকে ভুলটা ধরিয়ে দেওয়ার জন্য………… :তালিয়া:

  3. হৃদয়স্পর্শী লিখা! সহজেই যে
    হৃদয়স্পর্শী লিখা! সহজেই যে কারো চোখে পানি আসতে বাধ্য…
    কিন্তু বর্তমান সমাজের বাস্তবতায় আমরা অসহায়, ব্লগে-ফেবুতে বঞ্চিতদের জন্যে কিছু লিখেই আমরা ক্ষান্ত, দেখি কতদিনে জাতির ঘুম ভাঙ্গে…
    ভাল লাগল!! :ভাঙামন: :ভাঙামন:

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

2 + 6 =