সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি

টিভিতে বহুদিন পর একটা ভালো বিজ্ঞাপন দেখলাম।
ফ্রেশ পানির বিজ্ঞাপন।

ট্রেনে করে যাচ্ছে দুটি পরিবার। একটা মুসলিম পরিবার ও একটা হিন্দু পরিবার। যেহেতু রমযান, সেহেতু মুসলিম পরিবারটি রোযাদার ছিল এবং ইফতারের সময় ঘনিয়ে আসতেই তারা চলন্ত ট্রেনেই ইফতারের আয়োজন করতে ছিল। ইফতারির আইটেমে জিলেপি দেখে হিন্দু পরিবারের একটা বাচ্চা ছেলে একটু আকাঙ্খিত হলো, কিন্তু পরিবারের বাধা সত্ত্বে যে চুপ হয়ে গেল। ওদিকে মুসলিম পরিবারটি ইফতারের আয়োজন আনন্দে মত্ত, এদিকে হিন্দু পরিবারটি চুপচাপ নীরবে বসে রইলো।
ইফতারের ঠিক আগে মূহুর্তে মুসলিম পরিবারটির এক মহিলা সদস্য হিন্দু পরিবারটিকে ইফতারে যোগ দিতে আমন্ত্রন জানিয়েছিল এবং খুব আনন্দ ও উদ্দীপনার সাথে হিন্দু পরিবারটি যোগ দিল। বিজ্ঞাপনের শেষ মূহুর্তে দু সেকেন্ডে হিন্দু ছেলেটির জিলেপি হাতে সেই দৃশ্যটি এতো ভালো লাগল প্রকাশ করার ভাষা জানা নেই। বৈষম্য ও রক্তারক্তির সমাজে যেখানে ধর্মের অপতৎপরতা ও সাম্প্রদায়িকতার শিকড় শক্ত,সেখানে দেড় মিনিটের বিজ্ঞাপনটি মনে করিয়ে দেয় মানবতা, ভালোবাসা, অসাম্প্রদায়িকতা, সম্প্রীতির কথা। আমরা চাইলে ধর্মবৈষম্যের ব্যাপারটি ভুলে একজন মানুষ হিসেবে সবার সাথে সবকিছু ভাগাভাগি করে নিতে পারি। মানব সভ্যতার বিকাশে পারস্পরিক সম্পর্কের সুদৃঢ় মনোভাব খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।

যে সমাজে কিংবা সংস্কৃতিতে পারস্পরিক সৌহার্দ্য সম্প্রীতর মেলবন্ধন ঘটাতে পারে সেটা মানবিক মূল্যবোধ সম্পন্ন মানুষের সমাজ হতে পারে না, সেটা হতে পারে পাশবিক একটা ক্ষেত্র।
আজকাল সভ্যতার বিকাশের সাথে সাথে মূল্যবোধ যেমন মুছে যাচ্ছে ঠিক তেমনি ঘুচে যাচ্ছে সব বিভেদের বেড়াজাল ভেঙে গড়ে তোলা অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক।
আমরা আগের চেয়েও সম্প্রীতি ও ভালোবাসার বন্ধনে নড়বড়ে আছি।
বৈষম্য যেন আমাদের উপজীব্য।
বৃটিশদের শিখিয়ে দেওয়া হিন্দু মুসলমানদের বিভেদের কায়দাকানুন আমরা মুখস্থ করে চর্চা করছি।
র‍্যাডক্লিফ সাহেবের সীমানা ভাগের মধ্যে ভাগ হয়ে গেছে অন্তর।
একভাগে রয়েছে স্বজাতির প্রতি মেকি কান্না, আর অন্যভাগে অন্য ধর্ম বা জাতিগোষ্ঠীর প্রতি চরম ঘৃণা।
যার ধর্ম সে পালন করবে, যার মত সে প্রকাশ করবে, তবে কারো প্রতি কেউ বিদ্বেষ ছড়িয়ে নয়, দ্বন্দ্ব বাড়িয়ে নয়।
পত্রিকার পাতা খুললেই এপার বাংলায় সংখ্যালঘুর প্রতি অনাচার ও অনলাইনে দেখি গোরক্ষকদের সংখ্যালঘু মুসলিমদের প্রতি অনাচার ও ব্রাক্ষ্মণ সমাজ কর্তৃক দলিত হিন্দুদের সামাজিক ও গোঁড়ামিপূর্ণ নিষ্পেষণ।
এসব দেখে দেখে আমাদের মধ্যে একটা বিশাল বিদ্বেষ সৃষ্টি হচ্ছে।
কোন ধর্মই বলে নাই যে ও ঐরকম, ওকে জোকের মত চুষে খাও।
যদিও কোন বিড়াল তপস্বী সেটা ব্যাখ্যা দিয়ে থাকে তবে সেটা নিজের স্বার্থে অপব্যাখ্যা।
আমরা দেড় মিনিটের বিজ্ঞাপন থেকে অনেক কিছু শিখতে পারি ও বাস্তব জীবনে কাজে লাগাতে পারি।
সুন্দরীদের নজরকাড়া বিজ্ঞাপনের রোশনাই ভুলে আসুন দীক্ষিত হই মানবতার অনুশীলনে, স্বপ্ন দেখি বৈষম্যহীন সমাজের।
আমরা আরো দশ বছর পাঁচ বছর আগে যে ভালোটা দেখেছিলাম, তাও আজ ফুরিয়ে গেছে।
আমরা অতীতও নয়, বর্তমানও নয়, নতুন করে ভালো একটা পরিবেশ গড়তে চাই।
হিন্দু মুসলিম বৌদ্ধ খ্রিষ্টান কিংবা অভিজাত নিম্মজাত, শিক্ষিত অশিক্ষিত, কালো ধলো, পুঁজিপতি শ্রমিকশ্রেণীর বৈষম্যের বাঁধ ভেঙে ভালোবাসার জোয়ারে প্লাবন হোক প্রতিটি জনপদ।
অতি ধার্মিক কেউ ভুল বুঝবেন না,
আমরা একদিকে যেমন ধর্মানুসারী আরেকদিকে মানবতাবাদী।
ধর্মের আরেক নাম মানবতা ও মানবকল্যাণ।
শুভকামনা।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

27 + = 30