সমতল বুকের বেশ্যা ও একটি মৃত্যু

গাজীপুর সড়ক ভবনের সামনে দাড়িয়ে রুমি আনমনা হয়ে পার্লারের মেয়েদের কাজ করা দেখছিল। পার্লারের লাইট-বক্সে বিয়ের সাজে পূর্ণিমার ছবির তাকিয়ে মনে মনে ভাবল ‘যেদিন আমার বিয়ে হবে সেদিন ঠিক পূর্ণিমার মত করে সাজব’ ভেবেই তার বিচিত্র অনুভূতি হল একটু লজ্জা পেল। সুখের সংসার হবে,স্বামীর জীবন সুখ-শান্তিতে ভরিয়ে রাখব।আমাদের প্রথম ছেলে হলে নাম রাখব হাসান আর মেয়ে হলে হেনা ।স্বপ্নের আবেশে ভাঙল একটা লোকের হাত ধরায়। বিরক্তি নিয়ে নাক-চোখ কুচকে লোকটার দিয়ে তাকাল।

রিক্সায় ওঠ,
কই যামু?
আমার সাথে যাবি।
আমি বাসায় কাজ করি না চাপা স্বরে বলল রুমি
টাকা বাড়াইয়া দিবুনে।
না যাওয়া যাবে না রাগত-স্বরে বলল রুমি
যদি না যাস তবে কিন্তু পুলিশে ধরিয়ে দিব বলেই রাস্তায় অপর দিকে বসা পুলিশদের হাতে ইশারা করল।

নিতান্ত অনিচ্ছায় ভয়ে বাধ্য মেয়ের মত রিক্সায় উঠে বসল। লোকটা হুডটা টেনে দিয়ে কাঁধের উপর হাত দিয়ে পাশে টানল।রুমি হাতটা সরিয়ে দিয়ে এক পাশে আড়ষ্ট হয়ে রইল। তার খুব ভয় হচ্ছে, সে সালাম ভাইকে ফোন দিবে কিনা বুঝতে পারছে না। তিনি শুনলেও রাগ করবেন।বাসায় কাজ করা নিষেধ।নির্ধারিত হোটেলের বাইরে কোথাও কাজ করা যাবে না। জানতে পারলে একদিনের টাকা কাটা যাবে, থাক্। ঈস তখন যদি দৌড় দিয়ে দূরে সরে যেতাম তবে এই ঝামেলায় পড়তে হত না। লোকটা একটা সিগারেট ধরিয়ে লম্বা টান দিয়ে নাক দিয়ে গলগল করে ধোয়া ছাড়ল।রুমী নাক চেপে ক্রু দৃষ্টিতে দেখছে লোকটা কীভাবে সিগারেট টানছে।গাল চুপসে যাচ্ছে আবার ফুলছে।মাছের মত লাগছে। হাসি পেল রুমির
কি দেবে নাকি একটান? নিজের রসিকতায় হো-হো করতে হাসতে থাকল।পায়ের উপর পা তুলে দিয়ে সিগারেট টানছে শব্দ করে গান গাইছে।‘তুমি কি দেখছ কভু জীবনের পরাজয়….’

সিগারেট খাইলে যক্ষ্মা হয় সরলভাবে রুমি বলল
তাই নাকি, আমি তো জানতাম না। ছেড়ে দিবে হবে, কি বল?

রুমি চুপ করে স্থির চোখে সামনে তাকিয়ে আছে। চোখদুটো তার পানিতে ঝাপসা হয়ে আসে। রুমীর আসল নাম হাসনাহেনা বেগম। রুমী নামটি দেয় তার সীমা আপু। তার বাবা সখ করে নামটি রেখেছিলেন।রুমী সবেমাত্র বারোতে পা দিয়েছে।এ লাইনে আজ প্রায় এক বছর। দেখতে খুব ফর্সা, লম্বা নাক, টানা টানা বড় চোখ, নাকের ডানদিকে কাল তিল আর কোমর পর্যন্ত লম্বা ঘন চুল।গড়পড়তা বাঙালী মেয়ের মত উচ্চতা, ছিপছিপে পাতলা শরীরের গড়ন। চুলগুলোকে রুমী খুব পছন্দ করে, প্রসাধনের সিংহভাগ খরচ করে চুলের পিছনে। নারীদেহের স্পষ্ট চিহ্ন সবে পুস্পফুটিত হতে শুরু করেছে।যৌবনের আবেশ তার উঠানে কালবৈশাখীর মত হু হু করে ঢুকছে।প্রকৃতি প্রতিরাতে লাবন্যতা লেপে দিচ্ছে সর্বাঙ্গে।প্রতি সকালবেলা নিজেকে অবাক হয়ে দেখে রুমী।আয়না দেখা তার অবসরের পছন্দের কাজ।ছোট দুই ভাই ও মায়ের সাথে মাটির ঘরে থাকত গাজীপুরের নলজানিতে। তদের মা পোষাক কারখানায় পরিচ্ছন্নতা কর্মীর কাজ করে তাদের বড় করেছে। রুমীর বাবা একবার ঈদে দেশে গিয়েছিল আর ফেরেনি। কত খোজ করেও তার কোন হদিস পাইনি রুমীর মা।এখন রুমী এপার্টমেন্টে সীমা আপুর সাথে থাকে। সপ্তাহে একদিন পরিবারের সাথে কাটায়, তার মা না করলে কিছু টাকা টেবিলের ড্রয়ারে রেখে আসে।

চাবি ঘুরিয়ে বেশ কসরত করে বাসায় ঢুকলেন। চকচকে বসার ঘরে রুমিকে বসিয়ে ভিতরে গেল। ড্রইং রুমে ছোফায় বসে চুপচাপ চারদিক দেখছিল। রিমোট টিপে দিতেই টং করে বিশাল সাইজের টিভিটা চলা শুরু করল।পর্দায় ভেসে উঠল টমের মাথার টকটকে লাল শিং।সি এন চ্যানেলে টম এন্ড জেরী চলছে। টম ও জেরীর দুষ্টমী খুব মজা লাগে। তবে টমের জন্য তার মাঝে মাঝে খারাপ লাগে। টম শুধু মার খেয়েই যায়। মুখে ওড়না দিয়ে হাসতে হাসতে ভিতরে তাকায়। লোকটা অনেকক্ষণ হল ভিতরে গেল। আসার কোন নাম-গন্ধ নেই। আধ-ঘন্টা পর ট্রেতে পেটমোটা বোতল ও গ্লাস এবং বাটিতে কিছু বরফ নিয়ে তার পাশে বসল। হাতে চকলেটের বারটা দিয়ে বলল নাম কী বাসা কই?

রুমি বাড়ি সৈয়দপুর। অহন থাহি নলজানিত।
রান্না করতে জান?
হু.
হু কি? যা পাকের ঘরে চাল আছে, দুজনের জন্য ভাত রান্না করবি। তারপর বাথরুমে গিয়ে গরম পানি ও সাবান দিয়ে গোসল করবি। মাথায় শ্যাম্পু দিবি।চুল শুকাইবি ও ভাল করে সাজবি তারপর সেন্ট মাখবি। এরপর আমাকে ডাক দিবি।
যে কামের জন্য আইছি হেইয়া করেন। আমারে বাসায় যাইতে হবে।

মো: লোকমান ডাকুয়া গত বিশ বছর মিডল-ইস্টে কাটিয়ে দেশে ফিরে গাজীপুর গ্রেটওয়াল সিটিতে পাঁচ কাঠা জমির উপর বাড়ি বানালেন। স্ত্রী ও দুই মেয়ে নিয়ে নতুন বাসায় সুখে শান্ততে মহানন্দে বসবাস করতে লাগলেন। দেশের বাড়ি নেত্রকোনায়। বাড়িতে বিশেষ কেউ থাকেন না। বড় মেয়ে ইনানী একটা পাইভেট ইউনিভার্সিটিতে ডাক্তারি পড়ছে ছোট মেয়ে গতবছর জেএসসি দিয়েছে। তিনমাস আগে স্ত্রীর বন্ধু নিয়ে লোকমান সাহেবের সাথে মনমালিন্য হয়। তিনি যা পছন্দ করেন না রেবেকা সেই কাজগুলো বেশী বেশী করে করে। তিনি ঠাণ্ডা মাথায় বুঝিয়ে বলেছেন ওসব তার ভাল লাগে না। তারপর ও স্ত্রী সেই কাজগুলোই করে মেয়ে দুটোরে তার মত বানিয়েছে ।ঝগড়া-ফ্যাসাদ বাড়তে বাড়তে চরমে পৌছায়। স্ত্রীর অতীত নিয়ে সব কথা বেফাঁস বলে ফেলেন। স্ত্রীও ছেড়ে কথা বলে নি। রাগে-অভিমানে স্ত্রী মেয়েদের নিয়ে গ্রামে ভাইয়ের বাড়িতে চলে গেছে। যাওয়ার সময় শাসিয়ে গেছে জীবনে ফিরবে না।‘তোর মত কুত্তী বেশ্যার মুখ আমি দেখতে চাই না’ মেয়েদের সামনেই বললেন লোকমান ডাকুয়া। এই রেবেকাকেই তিনি কত ভালবাসতেন। মাঘ মাসের শীতের রাতে বাসায় না গিয়ে গাজীপুর চলে আসতেন নিয়মিত। শ্বশুর-বাড়ীর লোকের টিপ্পনী মেনে নিতেন সহজভাবে। একদিন তো শাশুড়ি বলে ফেললেন তুমি বাসা ভাড়া করে রেবেকাকা নিয়ে যাও। বাসা ভাড়া আমি দিয়ে দিব।

ছয়তলার ছাদের রুমে সংসার পাতলেন দুজনে। জমানো টাকা সব শেষ করে ঘরের এটা-সেটা কিনলেন। তখন রেবেকা কত সংকল্প আশা স্বপ্নের কথা বলত।রেবেকার চোখ জুড়ে কত স্বপ্ন খেলা করত ।সারারাত স্বপ্নের কথা বলে যেত আরি-রাম। তারপর উন্নত জীবনের আশায় একদিন উড়াল দিলাম টাকার দেশে। এয়ারপোর্টে সেই মুখ এত যাতনা দিল যে একমাস পরেই ফিরে এলাম। না জানিয়ে চলে গেলাম গাজীপুর।দরজা খুলে রেবেকা সে কি খুশী, সেই মুখটা আজ তার চোখে ভাসে । রেবেকার উপর ছিল তার ছিল অগাধ বিশ্বাস। দেশ থেকে কত জনে কতকিছু বলেছে।বিশ্বাস করেনি দেশে ফিরলে রেবেকার অন্য পুরুষের সাথে ছবি-ভিডিও দেখে মনটা খুব খারাপ হল তবুও তাকে মন থেকে মাফ করে দিল। জিঙ্গেসও করল না। যা গেছে যাক নতুন করে শুরু করেছিল। কিন্তু হল না। তার কাছে এখন এই অর্থ-বাড়ি গাড়ী সব তুচ্ছ মনে হল। বিদেশ যাওয়াই মনে হল জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল। নিজেকে নর্দমার কীট মনে হতে থাকল। মেয়ে জাতীর উপর তীব্র ঘৃণা সৃষ্টি হল। বিশ্বাসঘাতক জাত ওরা ওদের জন্য যত কিছু কর না কেন সুযোগ পেলেই বিশ্বাসঘাতকরা করবেই। একাকীত্বে ঘৃণা পরিণত হল প্রতিশোধে। ফোনে রেবেকারে সম্পর্ক ছিন্ন করার হুমকি দিয়ে দারুন লাগে। নরম স্বরে তার আর্তসমর্পন শুনতে ভাল লাগে।হৃদয় দারুন শান্তি লাগে।আবার মাঝে মাঝে বলে তোমাদের আসার আর কোন দরকার নেই।আমি নতুন বিবাহ করছি। মেয়ের নাম জয়নব বেগম। মদের নেশায় সারাদিন বুদ হয়ে থাকেন। সন্ধ্যায় বের হয়ে একটা বাজারের মেয়ে নিয়ে আসেন। তারপর তাদের গোসল করিয়ে স্ত্রী-মেয়েদের পোশাক-গহনা পরতে দেন প্রয়োজন মত। তাদের প্রসাধনে মেয়েটা অপরূপী সাজিয়ে তিনি মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে থাকেন। স্ত্রী-মেয়েদের নামে ডেকে পাশে বসান। হাত বুলিয়ে আদর করেন।

মেয়েগুলো তখন ভয়ার্ত চোখে তাকিয়ে থাকে, কি করা উচিত বুজতে পারে না। ধর-ধর করে কাঁদতে কাঁদতে আপন কষ্টের কথাগুলো বলতে থাকেন । আদর করে মেয়েটিকে মদের সাথে চরম যৌন-উত্তেজক ট্যাবলেট মিশিয়ে দিতেন। ডিভিডিতে ব্লু ফিল্ম ছেড়ে দিতেন।বড় টিভিতে চকচকে ছেলে-মেয়েদের মিথুন-ক্রিয়ার শীৎকারে ঘরময় অসহ্য সুখের পরিবেশ তৈরি হত। মেয়েটির অবস্থা যখন চরমে পৌঁছালে একটু আধটু ছুঁয়ে দিতেন। অসহনীয় যাতনায় ছটফট করতে থাকত মেয়েগুলো। ধীরে ধীরে খসে পড়ত অতুলনীয় সাধের অপরূপ সাজ। নেশা-তুর চোখের তাকিয়ে দারুন প্রমোদ পেত। হাতের কারসাজিতে মেয়েগুলোর পাগল করে তুলতেন। প্রশান্তির হাসি হেসে কাছে টেনে নিতেন।কামড়ে কামড়ে দাগ বসিয়ে দিতেন স্পর্শকাতর অঙ্গগুলোতে।চুল কেটে দিতেন। মেয়েটিকে তীব্র নেশার ঘোরলাগা অবস্থায় অতৃপ্ত রেখে গভীর রাতে জোর করে রাস্তায় বের করে দিতেন। মেয়েটির চলে যাওয়া দেখত আর পরম তৃপ্তিতে পেত মিনমিন করে বললেন যা এবার কুত্তার কাছে যা, হৃদয়ে পরম শান্তি নিয়ে ঘুমিয়ে যেতেন।

দেখতে দেখতে কখন দশ প্যাগ গিলে ফেললেন বুঝতে পারলেন না।হঠাৎ মেয়েটার কথা মনে হল।জমিদারে জীর গোসল কি এখনও শেষ হয়নি। টলমল করতে করতে বের হয়ে দেখল খাবার টেবিলে ধোয়া উঠা ভাত, ডিম ভাজি, আর চিংড়ি মাছের দোপেয়াজা। দৃশ্যটা স্বপ্নের মত লাগল। টলতে টলতে তার ঘরের দিকে গেল। পর্দা ফাঁক করতেই মনে হল একটা লাল পরী বসে আছে আয়নার সামনে। পর্দাটা টেনে দিলেন। বেসিনে মুখে পানি দিয়ে আবার দেখলেন। পা টিপে টিপে ভিতরে ঢুকলেন।মেয়েটা ঘুরে তাকিয়ে বলল ‘ আমাকে ক্যামন লাগছে’? লোকমান সাহেব নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছে। চোখ কচলে অস্ফুট স্বরে বলল সোয়াশিনী তুই কখন আসছ।সোয়াশিনী লোকমান সাহেবের ছোট মেয়ে। ডান হাতের তর্জনী ধরে বলল আমি চিংড়ি রানছি, খাবেন চলেন। যন্ত্রের মত রুমির পিছনে টেবিলে চলে গেলেন। খুব তৃপ্তি করে অনেকদিন বাদে রাতের খাবার খেলেন। রুমি সামনে বসে দেখল লোকটা কত মজা করে এই সামান্য খাবার খাচ্ছে। আহারে কতদিন ভাল খাবার খান নি। লোকটার জন্য মায়া লাগে। হঠাৎ মনে হল লোকটা তার আপনজন কেউ ।কোন কথা না বলে নীরবে খেয়ে গেলেন। সোয়াশিনী চল মা অনেকদিন তোর সাথে গল্প করি না। আজ সারা রাত গল্প করব।কাঁধে ভর দিয়ে তার রুমে চলে গেলেন। রুমি রেবেকার বিয়ের লাল শাড়িটা পড়েছে।বিছানায় হেলান দিয়ে লোকমান সাহেবের মাথা ইলিবিলি করে দিচ্ছে।লোকমান সাহেব অনবরত আবোল-তাবোল বলে যাচ্ছে। ঘুম থেকে উঠে রুমী দেখে ঘর খালি, এঘর-ওঘর কোথাও পেল না।শাড়ি-গহনা চেঞ্জ করে তার কাপড় পড়ল, ওড়না আনতে বাথরুম গেল।দরজা খুলেই চিৎকার করে উঠল। রক্তে ভেসে গেছে বাথরুমের ফ্লোর। আ মুখ করে পড়ে আছেন লোকমান সাহেব। পাশের বাসায় খবর দিলে হাসপাতালে নিয়ে গেল। ডাক্তার মৃত ঘোষণা করল, পুলিশ এসে লাশের সাথে রুমীকে নিয়ে গেল

শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published.