হরতাল অ্যানালাইসিস

হরতালটা কেমন ঢিলে ঢালা হল না? মিনমিনে ধাঁচের। তেমন কোন জ্বালাও পোড়াও নেই, লাশ নেই, গাড়ী ভাংচুর ও আগের তুলনায় কম। এমন হরতাল হলে রাজনৈতিক দলের সামর্থ্য নিয়েই প্রশ্ন দেখা দেয়। আসলে রাজনীতিতে জ্বালাও পোড়াও এর একটা মজার সমীকরণ আছে। কখনও জ্বালাও পোড়াও দিয়ে সমীহ আদায় করা যায় কখনও ধপাস করে আছাড় খেতে হয়। মঙ্গলবারের ঢিলে ঢালা হরতাল দেখে মনে হল সাম্প্রতিক হেফাজতের ‘ধপাস’ পারফর্মেন্স থেকে জামায়াত শিক্ষা নিয়েছে (?)। অনেকের ধারণা জাতিসংঘের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এর আগমন এর কারণে এই অভিযোজন।

আসলে জামায়াত তাঁর হরতালের একটা প্যাটার্ন তৈরি করে ফেলেছিল। জামায়াতের হরতাল মানেই সন্ধার পর থেকে টেলিভিশানের সামনে বসে দারুণ আকশান প্যাকড কিছু দেখতে পাওয়া। দারুণ নিবেদিতপ্রাণ কিছু কর্মীর দারুণ বিধ্বংসী কিছু কর্মকাণ্ড। আলাপ আলোচনায় থাকবে উৎকণ্ঠা, ‘কয়জন মরল?’ আহতের সংখ্যা নিয়ে আলাপচারিতা শুরু হত অনেক পরে। খুব বড় কিছুর অপেক্ষায় থাকতো দেশবাসী। ‘মাত্র দুএকটা গাড়ী ভাংচুর?’ এ কেমন হরতাল? কারোরই মন ভরতো না। ট্রেনে আগুন কিংবা ট্রেনের লাইন উপড়ে বগি লাইন চ্যুত না করলে আর কি নাশকতা করলো? এরপর আলোচনায় থাকবে, ‘ভাগ্যিস আগুন দেয়ার সময় ট্রেনে কেউ ছিল না’ কিংবা লাইন চ্যুত বগির হতাহতে লিস্টে মৃত কেউ আছে কি না।

এমন আগ্রাসী আর নাশকতায় ভরপুর হরতাল প্রথম দিকে দারুণ সফলতা এনে দিয়েছিল। কক্টেল আর হাতবোমার বিস্ফোরণ হেডলাইন হল। হরতালের ইফেক্ট হল মারাত্মক। যেমন ঢিলেঢালা একটা ভাব চলে এসেছিল ‘হরতাল’ এর প্রতি সেখানে একটা সমীহ চলে এলো। হরতাল সত্ত্বেও স্কুলে যাওয়া কিংবা রিক্সায় বেশী ভাড়া দিয়ে হলেও অফিসে যাওয়া, এই ব্যাপারগুলোয় একটা বিরাম দেখা গেল। আলাদা একটা স্ট্যাটাস পেল, ‘ওরে বাবা, জামায়াতের হরতাল’। বিএনপির দায়সারা গোছের হরতালের তুলনায় অনেক আগ্রাসী হত এসব হরতাল।

ব্যাপারটায় হয়তো বিএনপি লজ্জা পেল। কিংবা বলা যায় উৎসাহ পেল। এবার তাঁরাও নিজেদের হরতালে কক্টেল আর হাতবোমা নিয়ে মাঠে নামতে শুরু করলো। কিছু গাড়ীর কাঁচ ভাঙ্গা আর রিক্সার চাকার বাতাস বের করে দেয়ার মত নরম কাজকর্মে পথ থেকে স্বরে আসলো। রাস্তার ধারে রেখে দেয়া ভ্যান, অটোরিকশা, ট্রাক যা পাওয়া যায় তাতেই আগুন দেয়া শুরু হল। মিনমিনে হরতালের বদলে আবার প্রাণবন্ত(??) হরতাল শুরু হল। অফিস থেকে ফিরে গৃহকর্তা শিশুপুত্রের কাছ থেকে রিমোট ছিনিয়ে নেন, ‘দেখি কতজন মরল’।

আগে ঢাকা শহরের হরতাল নিয়েই বেশী মনোযোগ আর আলাপচারিতা হত। সবাই জানতে চাইতো ‘ঢাকায় কেমন হরতাল হচ্ছে?’ সেই ট্র্যাডিশানেও ফাটল ধরল। এলাকা ভিত্তিক দারুণ আগ্রাসী হরতাল করার একটা নতুন চল শুরু হল। ‘সাইদী স্পেশাল’ হরতাল গুলোতে বগুড়া কিংবা গাইবান্ধায় পুলিশ মেরে ফেলা কিংবা পুরো গ্রাম বাসী নিয়ে অ্যাকশানে যাওয়া, হরতালে নতুন এক মাত্রা এনে দিল। বেশ কিছুদিন ঢাকার হরতালের চেয়ে বগুড়ার হরতাল নিয়ে মানুষ বেশী আলাপ করতে শুরু করল। ‘বগুড়ায় তো শিবির খুবই স্ট্রং’ এমন কথা মুখে মুখে ফিরতে লাগলো।

হরতালে দুরপাল্লার বাস সাধারণতঃ কমই চলে। তবে নতুন এই ধাঁচের আগ্রাসী হরতালে আগের দিন থেকেই অনেক ক্ষেত্রে বাস বন্ধ করা শুরু হল। গাড়ী ভাংচুরের নীতিতেও প্রাক হরতাল ফর্মুলার আবির্ভাব হল। হরতালের আগের দিন থেকেই গাড়ী ভাংচুর একটা নিয়ম স্টাব্লিশড হয়ে গেল। জনগণও তাই আগের দিন গাড়ী বের করা বন্ধ করল। বিপত্তি দেখা দিত হঠাৎ ডাকা হরতালে। বিকেলে হরতালের ডাক দিয়েই সন্ধ্যা থেকে গাড়ী ভাংচুর শুরু হলে। সকালে গাড়ী নিয়ে অফিসে যাওয়া লোকটি অনেক সময় সুযোগ পান না গাড়ী বাঁচানোর।

লিয়াজো হরতালের চলনও শুরু হল। একজনের হরতালে আরেকজনের সমর্থন তো থাকতোই এখন শুরু হল বর্ধিত করণ লিয়াজো। মঙ্গলবারে একজন হরতাল ডাকলে বুধ বৃহস্পতি আরেকজন ডাকবে তা প্রায় অবধারিত ছিল। কখনও কর্মী খুনের প্রতিবাদে কখনও নেতা গ্রেফতারের প্রতিবাদে। পারস্পরিক নৈতিক সমর্থন ব্যাপারটায় প্রথম দিকে একটু রাখ ঢাক ছিল। পরে আর সেটা থাকলো না। সিঙ্গাপুর ফেরত নেত্রী যখন ‘পাখি’ ফর্মুলার আমদানী করলেন তখন থেকে পূর্ণ সমর্থন আসতে লাগলো।

এই জ্বালাও পোড়াও রাজনীতি প্রথম ধাক্কা খেল হেফাজতের সমাবেশে। বিশাল সমাবেশ করে হুলুস্থুল ফেলা দেয়া হেফাজতী বাহিনী যখন পল্টন জুড়ে দরিদ্র কাপড় ব্যবসায়ী আর বই বিক্রেতাদের সর্বস্ব জ্বালিয়ে আগ্রাসী রাজনীতিতে নতুনত্ব আনলেন তখন দেশবাসীর ধৈর্যের বাঁধ ভাঙল। অনেকটা গা সওয়া হয়ে যাওয়া হারতাল ঘটিত নৈরাজ্য তখন অসহনীয় লাগতে শুরু করল। হরতাল কারীদের ওপর পুলিশের লাঠির আঘাত টেলিভিশানে দেখলে যে সহানুভুতি তৈরি হত সেখানে বিশাল এক ক্ষত তৈরি হল।

দেশবাসীর সহানুভুতির এই ‘অ্যাবাউট টার্ন’ কে কাজে লাগাতে সরকার দেরী করলেন না। ‘ক্র্যাক ডাউন’ এ কতজন মারা গেছে কিংবা আদৌ মারা গেছে কি না’ এই নিয়ে আলোচনা কিছুটা হচ্ছে। তবে তাঁর চেয়েও বেশী কাজ করছে একটা স্বস্তি, ‘বিশাল ঝামেলা থেকে বাঁচা গেছে।‘ আরও বেশ কিছু আলোচনার বিষয় তৈরি হয়েছে। ‘আসলে জ্বালাও পোড়াও তো করেছে জামাত আর বিএনপির ক্যাডার রা’ কিংবা ‘হেফাজত তো বুঝে নাই ওদের ট্র্যাপে ফেলেছে জামাত’ এমন সব আলাপ বেশী শোনা যাচ্ছে। ‘আড়াই হাজার লাশ’ নিয়ে রাজনীতির চেষ্টা খুব বেশী কাজে দিচ্ছে বলে মনে হচ্ছে না।

‘ধীরে চলো নীতি’ নাকি ‘সমঝোতা’ কোন পথে এখন এদেশের রাজনীতি? তত্ত্বাবধায়ক, অন্তর্বর্তী, জরিপ, জাতিসংঘ অনেক সমীকরণ চলছে। রাজনীতির পাশা খেলা হয়তো কোনদিনই থামবে না। সব রাজনৈতিক দলই তাঁদের নিজেদের লাভের কথা ভেবেই রাজনীতি করবেন আর জনগণের দোহাই দেবেন। তবে মঙ্গলবারের হরতাল যদি বোধোদয়ের রাজনীতির সুচনা হয়ে থাকে তবে নিঃসন্দেহে তা আনন্দের সংবাদ।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

১১ thoughts on “হরতাল অ্যানালাইসিস

  1. বোধ থাকলেইতো তার উদয়ের
    বোধ থাকলেইতো তার উদয়ের সম্ভাবনা থাকে…
    বিম্পি আজ আদর্শিক ভাবে একটি দেওলিয়া দল!!

  2. আমার মাঝে মাঝে কেন যেন মনে
    আমার মাঝে মাঝে কেন যেন মনে হয়, আপনি যদি “একঘণ্টার বাথরুম সফর” শিরোনামে কখনও কোন পোস্ট দ্যান, আমি সেটাও মন্ত্রমুগ্ধের মত পড়ব…

    আর একটি অসাধারণ পোস্টের জন্য ধন্যবাদ…

  3. মানুষ যখন তার নিজের আদর্শ
    মানুষ যখন তার নিজের আদর্শ থেকে ছিটকে পরে তখন সে অন্ধকার গহ্বরে তলিয়ে যায়। বর্তমানে কিছু রাজনৈতিক দলের অবস্থা ঠিক তাই হয়েছে।
    ধন্যবাদ অনেক সুন্দর একটি লেখা লেখার জন্য।

  4. নিজ দেশের হরতাল নিয়ে একটিই
    নিজ দেশের হরতাল নিয়ে একটিই কথা এদেশে হরতাল দেয়া হয় ভাঙ্গাভাঙ্গি আর জ্বালাও-পোড়াও উৎসব পালনের জন্য। সে যে দলই হোক না কেন। মোদ্দা কথা হরতাল হলো দেশ জুড়ে জ্বালাও-পোড়াও, ভাঙ্গাভাঙ্গি করার উৎসব, কোন রাজনৈতিক দাবী হাসিল করা নয়।

  5. আপনারা যাই বলুন, আমাদের দেশের
    আপনারা যাই বলুন, আমাদের দেশের প্রচলিত হরতাল কোনক্রমেই গণতান্ত্রিক পদ্ধতির নয় ! সুতরাং যে দলেরই হোক, এদেশে আমি কোন হরতাল চাই না………….

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

78 − 70 =