বুদ্ধিজীবীর ক্ষীনদৃষ্টি

আমাদের প্রথম জাতীয় অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক, যদিও তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক পদে কোনদিন পদোন্নতি পাননি;যোগ্যতার অভাবে নয়, যোগ্যতার প্রাচুর্যের কারনেই পাননি। আকাশচুম্বী বুদ্ধিজীবী তিনি । হুমায়ুন আজাদ তাঁকে বাংলার সক্রেটিস বলে অভিহিত করেছেন। আজকের বাংলাদেশে যে প্রবীণ বুদ্ধিজীবী সমাজ তাদের প্রায় সকলেই আব্দুর রাজ্জাকের পায়ের কাছে বসে থাকা ছাত্র এবং অনুগ্রাহী। বছর তিনেক আগে আব্দুর রাজ্জাক স্মারক গ্রন্থ বের হয়েছিল। হেন কোন বিখ্যাত বাঙালি বুদ্ধিজীবী নেই যিনি আব্দুর রাজ্জাকের বন্দনা করে সেখানে লেখেননি। তিনি এক কিংবদন্তী!

এই কিংবদন্তীর দুজন বিখ্যাত অনুচর বা গুনগ্রাহী হলেন সরদার ফজলুল করিম এবং আহমদ ছফা। এঁরা দুজনেই আব্দুর রাজ্জাককে নিয়ে পৃথকভাবে একটি করে ছোট অথচ গুরুত্বপূর্ণ বই লিখেছেন। কিংবদন্তীতুল্য রাজ্জাক সম্পর্কে আমাদের জানাশোনার উৎস মূলত ওই বই দুটো : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও পূর্ববঙ্গীয় সমাজ এবং যদ্যপি আমার গুরু। ইংল্যান্ড থেকে পিএইচডি ডিগ্রি না নিয়েই যে থিসিসটি বগলদাবা করে তিনি দেশে ফিরে এসেছিলেন, সেই থিসিস সম্পাদনা করছেন সলিমুল্লাহ খান – এই কথা সলিমুল্লাহ খান জানিয়েছেন। সম্ভবত এখনো সেটা বই আকারে প্রকাশিত হয়নি। হলে পড়ার ইচ্ছা আছে।

সলিমুল্লাহ খান আবার আহমদ ছফার স্বঘোষিত শিষ্য। এই শিষ্য তাঁর গুরু এবং গুরুর গুরু সম্পর্কে দু চারটে কথা না বলে কোন বক্তব্য শেষ করতে পারেন না। আব্দুর রাজ্জাক কেন মুসলিম লীগের পাকিস্তান দাবীর সমর্থক ছিলেন এই বিষয়ে একটা কথা প্রায়শই বলেন সলিমুল্লাহ খান। সমপ্রতি আহমদ ছফার প্রবন্ধ সমগ্রের তৃতীয় খণ্ড পড়তে গিয়ে দেখলাম কথাটা এখানেও আছে।সেটা এরকম :একজন প্রাগ্রসর চিন্তার মানুষ হওয়া সত্ত্বেও কেন তিনি পাকিস্তান দাবী সমর্থন করেছিলেন এই প্রশ্নটা কেউ একজন আব্দুর রাজ্জাককে জিজ্ঞেস করেছিলেন। তিনি উত্তরে বলেছিলেন যে আধুনিক বাংলা উপন্যাসে যতগুলো চরিত্র আছে তার মধ্যে মুসলমান চরিত্রের সংখ্যা পাঁচ শতাংশেরও কম। এর দ্বারা প্রমাণিত হয় যে পঞ্চাশ শতাংশ মুসলমানের দেশে তারা নিজেরাই সাহিত্যে উপেক্ষিত হচ্ছে। আর উপেক্ষিত থেকে যাওয়া মানে সংস্কৃতিতে অধিকার অর্জন করা থেকে বাদ পড়া।বলেছিলেন যে এই একটি কারনেই আমি পাকিস্তান সমর্থন করি।

কি বুঝলেন? পাকিস্তান সৃষ্টির পর বাংলা ভাষায় গুরুত্ব ও তাৎপর্যপূর্ণ মুসলমান উপন্যাসিক এবং মুসলমান চরিত্র সৃষ্টি হয়েছে সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। কিন্তুু তাতে পাকিস্তানের অবদান কতটুকু?পাকিস্তান আমলে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির বিকাশে কী ভয়ানক প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়েছিল আব্দুর রাজ্জাক সেটা জীবদ্দশায় প্রত্যক্ষ করেছিলেন। কিন্তুু তিনি এতো বড়ো বুদ্ধিজীবী হয়েও কেন প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা লাভের আগেই ধর্মভিত্তিক এবং জোড়াতালিমারা পাকিস্তান রাষ্ট্রের ভিত্তিহীনতা এবং ভবিষ্যৎ উপলব্ধি করতে পারেননি?সাহিত্যে কিছু মুসলমান চরিত্র সৃষ্টির জন্য যে বুদ্ধিজীবী পাকিস্তান দাবী সমর্থন করতে পারেন, তিনি কত বড় মুসলিমপ্রেমী নাকি তারচেয়ে বেশী সাহিত্যপ্রেমী সেটা গবেষণার বিষয় বলে গন্য হওয়া উচিত।

বাংলাভাগের জন্য সলিমুল্লাহ খান পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন বুদ্ধিজীবীদের দোষের সাতকাহন পাঠ করে শোনান যখন তখন। স্যার যদুনাথ সরকার, আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায় এই জাতীয় বুদ্ধিজীবীদের নিন্দা করেন তিনি।সৌভাগ্যবশত রবীন্দ্রনাথ কিছু বছর আগেই গত হয়েছিলেন।সেজন্য বাংলাভাগের দায় সলিমুল্লাহ খান সরাসরি রবীন্দ্রনাথের উপর দিতে পারেন না। তিনি বাক্যবাগীশ। কৌশলে কিন্তুু দোষের ভাগী রবীন্দ্রনাথকেও করেন। যেমন বলেন যে যদুনাথ সরকারের গুরু হচ্ছেন রবীন্দ্রনাথ। সলিমুল্লাহ খান তার নিজের পরমগুরুকে পাকিস্তান দাবী সমর্থনের জন্য কোন সমালোচনা করেছেন কি? তার বই এবং বিভিন্ন বক্তব্যের কোথাও তেমনটা চোখে পড়েনি, কানেও শুনিনি। শুনবোও না কোনদিন। কারন তিনি যে গুরুর যোগ্য শিষ্য! দুজনেই একই রোগে আক্রান্ত হয়ে অন্ধত্ব বরণ করেছেন। ইহাই আব্দুর রাজ্জাকের পাকিস্তান রাষ্ট্রের একমাত্র সফল ট্র্যাজেডি।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

১ thought on “বুদ্ধিজীবীর ক্ষীনদৃষ্টি

  1. সুন্দর লেখা। ভাল লাগলো।
    সুন্দর লেখা। ভাল লাগলো।

    ইস্টিশনে আমার গল্প/প্রবন্ধ পড়ার ও ফেসবুকে আমার “বন্ধু” হওয়ার আমন্ত্রণ রইল। আগের আইডি ছাগলের পেটে।এটা নতুন লিংক :
    https://web.facebook.com/JahangirHossainDhaka

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

65 + = 70