পাকিস্তান বনাম ভারত : বাংলাদেশর সার্বভৌমত্ব

বাংলাদেশ ১৯৭১ সালে ৩০ লক্ষ শহীদের প্রাণের দামে পাকিস্তান থেকে ছিনিয়ে এনেছিলো স্বাধীনতা, অর্জন করেছিলো শহীদের রক্তে লেখা সংবিধান। এই সংবিধানের প্রথম অনুচ্ছেদেই বলা হয়েছে “বাংলাদেশ একটি একক, স্বাধীন ও সার্বভৌম প্রজাতন্ত্র, যাহা “গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ” নামে পরিচিত হইবে৷

সেই সার্বভোম দেশের মধ্যে যদি তারই স্বাধীনতা বিরোধীদেশ পাকিস্তানের পক্ষাবলম্বন করে শ্লোগান উঠে, “পাকিস্তান জিন্দাবাদ” তখন সবচেয়ে বেশি অপমানিত হয় আমাদের মুক্তিযোদ্ধারা, যারা আমাদের স্বাধীনতা দিতে গিয়ে নিজেদের সর্বস্ব হারিয়েছিলেন। আর শ্লোগান দিচ্ছে ক্রিকেটফোবিয়ায় আক্রান্ত কিছু বাংলাদেশীয় জনতা। এই ক্রিকেটফোবিয়া যখন বাংলাদেশের মূলভিত্তি মুক্তিযুদ্ধের মুখোমুখি প্রতিপক্ষ হয়ে যায় তখন তা কিন্তু দেশের জন্যই ভয়ংকর বার্তা বয়ে আনে।

গতকাল যারা বাংলাদেশের নাগরিক হয়েও পাকিস্তানকে, পাকিস্তান ক্রিকেট টিমকে সমর্থন করেছিলেন তাদের কয়েকটি আবেগময় যুক্তি আছে :

*যুক্তি ১. খেলা তো খেলাই, এর সাথে রাজনীতি কেনো মিশাতে হবে!

*যুক্তি খন্ডন : ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের রাজিনৈতিক এবং সামাজিক শোষনের স্বীকার হয়ে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যেমে সূচনা হয়েছিলো স্বাধীন বাংলাদেশের পথচলা। এই যুদ্ধে আমরা হারিয়েছিলাম ৩০ লক্ষ মানুষকে, আমাদের দেশের বুদ্ধিজীবীদের, হারিয়েছিলাম অগনিত নারীর সম্ভ্রম। তবুও আপনি বলছেন যুদ্ধের এতোবছর পর খেলার সাথে রাজনীতি মিশানো ঠিক না। তাহলে এবার খেলাকেন্দ্রিক একটা উদাহরণ দেওয়া যাক, বাংলাদেশ পাকিস্তান যুদ্ধের এতো বছর পরেও পাকিস্তানি ক্রিকেট বোর্ডের জাকা আশরাফ বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করেছিলো! পাকিস্থানের এই সম্পর্কচ্ছেদ কি রাজনৈতিক কারনে নয়?

*যুক্তি ২. ভারত সীমান্তে হত্যাযজ্ঞ চালায়, ফেলানীকে সীমান্তে কাটাতারে ঝুলিয়ে রাখে, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করে। ভারতকে ঘৃণা জানাতেই পাকিস্তানকে সমর্থন।

*যুক্তিখণ্ডন : ভারতের সাথে বাংলাদেশের ৪০৯৫ কিঃমিঃ সীমান্ত এলাকা আছে, সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে দারিদ্রতার প্রভাব দেশের অন্যান্য অংশগুলো থেকে বেশি। সাধারণত এই কারনে সেসব এলাকার মানুষ ভারতে যায়
সাময়িক ও নিন্ম আয়ের কাজের খোঁজে কিংবা টুকটাক ব্যবসা তথা কালোবাজারির উদ্দেশ্যে। আচ্ছা সরাসরি ফেলানী ইস্যুতে চলে আসি:

ভারতের আসামে ক্ষুদ্র ব্যবসা করেন ফেলানী খাতুনের বাবা নুরুল ইসলাম। সেখানেই নুরুল ইসলাম তাঁর স্ত্রী- সন্তানদের নিয়ে বসবাস করতেন। ভারতীয় দালালের সহায়তায় অনন্ততপুর সীমান্তের ৯৪৭ নম্বর মূল পিলারের কাছে ৩ ও ৪ এস পিলারের মধ্যবর্তী স্থান দিয়ে তাঁরা দেশে ফিরছিলেন। দালালরা মই দিয়ে তাদের দেশে ফিরতে সহায়তা করছে। সময়টা তখন ঘনকুয়াশায় ঘেরা ভোর। ফেলানীর বাবা নূরুল ইসলাম মই বেয়ে পার হতে পারলেও ফেলানী খাতুন আটকে পড়ে কাটা তারের নির্মম থাবায়। যে থাবার ভয়ে আতকে ওঠে ফেলানী। চিৎকার করে ওঠে উদ্ধার হওয়ার জন্য। আর এ চিৎকার কে চিরতরে থামিয়ে দিতে গুলি করে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)। গুলিবিদ্ধ অবস্থায় ওখানেই ঝুলতে থাকে ফেলানী। অবশ্যই ঘটনাটি ন্যাক্কারজনক এবং মানবাধিকার পরিপন্থী। কোনো সভ্যদেশের উচিৎ নয় এভাবে সীমান্তে গুলি চালানো।

কিন্তু আপনি যেমন বাস্তববাদী হয়েছেন রাজনীতি আর ক্রিকেটের মুখোমুখি অবস্থানের বিতর্কে তেমন করে এই ঘটনাটার ক্ষেত্রে একটু বাস্তববাদী হতে পারবেন? ভাবেনতো,কেউ একজন কেন অন্যায়ভাবে সীমান্ত পাড় হবে?এটা কি অন্যায় নয়? সীমান্তে সেনা মোতায়নের আর প্রয়োজন কি তাহলে? প্রত্যেকটা দেশই চায় সার্বভৌমত্ব বজায় রাখতে। সেই অনুসারে যেকোন দেশ চাইলেই অনুপ্রবেশ ঠেকাতে পারে। সিরিয়া শরণার্থী নিয়ে ইউরোপের দেশগুলোর সাথে টানাপোড়নের কতজন মারা গেছে মনে আছে? আইলানের কথা মনে আছে?

বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভারত হস্তক্ষেপ করে এটা মোটামুটি সাধারণ একটা ব্যাপার। এটা কি ভারতের দোষ নাকি আমাদের রাজনৈতিক দেশগুলোর দোষ? তারা কেনো ভারতের প্রতি দায়বদ্ধ? তারা তাদের স্বার্থেই ভারতের সহায়তা নেয়। কিন্তু তাই বলে আপনি রাজনৈতিক দলের উপর অভিমান করে নিজ দেশের সার্বভৌমত্বকেই প্রশ্নবিদ্ধ করবেন? আরো একটা তথ্য দিয়ে রাখি, সামরিক কৌশলে ‘কন্টিঞ্জেন্সি প্ল্যান’ বলে একটি কথা রয়েছে। অর্থাৎ যুদ্ধে পরাজয়ের পরও প্রতিপক্ষের ক্ষতিসাধনের পরিকল্পনা।

এখন বাংলাদেশের বিরুদ্ধে এই ‘কন্টিঞ্জেন্সি প্ল্যান’ই পরিচালনা করে পাকিস্তান। এর অংশ হিসেবে তারা বাংলাদেশে অন্তর্ঘাতমূলক তৎপরতা চালাচ্ছে। গড়ে তুলছে জঙ্গি ও সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক। অব্যাহতভাবে মদদ দিচ্ছে সন্ত্রাসী ও নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডে। এসবের সঙ্গে পাকিস্তানী গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই এর সম্পৃক্ততার খবর বিভিন্ন সময় গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে এবং আইন
প্রয়োগকারী সংস্থার পক্ষ থেকেও এসব খবরের সত্যতা নিশ্চিত করা হয়েছে (আপনি গতকয়েক বছরের মূলধারার খবরগুলো খুঁজে দেখলেই বুঝতে পারবেন)।

এখনও কি পাকিস্তানকে সমর্থন করবেন? যদি করে থাকেন যুক্তিটা কি? ধর্ম? পাকিস্তানিরা কিন্তু যুদ্ধের সময় মুসলিম মহিলাদেরও ধর্ষণ করেছিলো। আপনি পাকিস্তানকে সমর্থন করবেন নাকি বাংলাদেশকে গালি দিবেন সেটা আপনার একান্ত ব্যক্তিগত ব্যাপার। কিন্তু সমর্থন যেনো অবশ্যই দেশের সার্বভৌমত্বকে চ্যালেঞ্জ না করে সেটা মাথায় রাখা উচিৎ। মাথায় রাখা উচিৎ আপনার হিপোক্রেসি তথা ডাবল ষ্ট্যাণ্ডার্ডকে। হিপোক্রেসির কথা এইকারনেই আসছে যে, বাংলাদেশ থেকে শুধুমাত্র বৈধ পথে প্রতিবছর দশ লক্ষাধিক (১০,০০,০০০) মানুষ ভারত যায়। ভারতকে গালি দেওয়া অনেক গালিবাজ পাবলিকও নিশ্চয় এই দশ লাখের ভিতর আছে।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 1 = 3