পাকি প্রেম ও ভারত ভক্তি : উপেক্ষিত বাংলাদেশ

বাংলাদেশী হয়েও পাকিপ্রেমী এবং ভারতভক্ত দাদাদের আস্ফালনে এখন ফেসবুক আর ব্লগ এলাকা ভরে উঠেছে কিন্তু এই বাংলাদেশীদের দেশের প্রতি কোনো ভালোবাসা নেই, যদি থাকেও তা সীমান্তে ফেলানী হত্যা আর তিস্তা চুক্তিতেই সীমাবদ্ধ। কিন্তু এটাকি হওয়া উচিৎ?

প্রথমেই আসি পাকি প্রেমীদের কথায়, বাংলাদেশে সাধারণত ক্রিকেট খেলাকে কেন্দ্র করেই পাকিপ্রেম প্রকাশ পায়। “খেলার সাথে রাজনীতি মেশানো ঠিক না কিংবা বহু বছর আগের শত্রুতা এখনো পুষে রেখে কি লাভ, আন্তর্জাতিক সম্পর্কে স্থায়ী শত্রু মিত্র বলতে কিছু নেই” বলে গলা ফাটানো পাবলিকরাই পাকিস্তানকে মনে প্রাণে ভালোবাসে। এই ভালোবাসার পিছনে সবচেয়ে বড়যে কারণ সেটি হলো ধর্ম। পাকিপ্রেমীদের যুক্তি পাকিস্তান মুসলিম দেশ, বাংলাদেশও মুসলিম দেশ, মুসলিম মুসলিম ভাই ভাই!

এবার দেখা যাক ভাইয়ের প্রতি ভাইয়ের টান কেমন :
> ২০০৯ সালের কথা, বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্র তাদের দেশে বিভিন্ন দ্রব্যের কোটা মুক্ত প্রবেশাধিকারের সুবিধা দেয়ার প্রক্রিয়া গ্রহন করেছিলো, বিশেষ করে গার্মেন্টস শিল্প। কিন্তু প্রবল প্রতিদ্বন্দী দেশের লবিং এর কারণে আমরা সেই সুবিধা পাই নি। বলতে পারেন প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বী দেশ কোনটি? উত্তরটি হলো পাকিস্তান। আমাদের পাকি ভাইয়েরা আমাদের বাঁশ দিলেও এতে অবশ্য আমাদের মন খারাপ করার কিছু নেই, ভাই ভাই তো!

> যুদ্ধ অপরাধীদের বিচারের কথা মনে আছে? একাত্তরের পরাজিত পাক বাহিনীর বন্ধু যারা দেশে ছিলো বহাল তবিয়তে, তাদের যখন বিচার শুরু হয় তখন পাকিস্তান অযাচিতভাবে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ইস্যুতে হস্তক্ষেপ করতে শুরু করে। ২০০৯ সালে বাংলাদেশ সরকার যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু করার উদ্যোগ গ্রহণ করলে সেই বছরের ১৯ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানের বিশেষ প্রতিনিধি জিয়া ইস্পাহানি বাংলাদেশ সফর আসেন।সেসময় জিয়া ইস্পাহানির বক্তব্য ছিলো “আমরা অবশ্যই যুদ্ধাপরাধী বিচারের ইস্যুতে যাব না, আমাদের সামনের দিকে তাকানোর সময়, পিছনের দিকে নয়”।

২০০৯ সালের মে মাসে ১৩ তারিখ পাকিস্তান পররাষ্ট্র মন্ত্রনালয় ১৯৭১ এর সংঘটিত যুদ্ধাপরাধ সর্ম্পকে বিবৃতিতে বলে, “ঢাকা অতীতের ঘটনা ভুলে যাবে ও আমাদেরকেও ভুলতে দিবে এবং বাংলাদেশের দাবীকৃত হত্যা সম্পর্কে পাকিস্তান কিছু জানেনা। বাংলাদেশের দাবিকৃত ত্রিশ লক্ষ শহীদের সংখ্যাটি অযৌক্তিক। একটি দেশের প্রায় ০৫% জনগনকে নয় মাসে হত্যা করা অসম্ভব।”

তবুও মনে হচ্ছে পাকিস্তান বাংলাদেশ ভাই ভাই? তাহলে আরেকটা খবর শুনেন; ১৯৭৫ এ রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর বাংলাদেশের পাকিস্তানপ্রেমী সরকারগুলোর সম্মতিতে ভারতের ‘সেভেন সিস্টার্স’
রাজ্যগুলোর সশস্ত্র বিদ্রোহী গ্রুপগুলোকে অস্ত্র ও ট্রেনিং দেওয়ার জন্য পাকিস্তান যে তাদের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইকে লেলিয়ে দিয়েছে এবং ওই গ্রুপগুলোর অস্ত্রশস্ত্র পরিবহনের জন্য বাংলাদেশের সমুদ্র উপকূলকে ব্যবহার করেছে এবং করছে, সেটা ১০ ট্রাক অস্ত্র মামলার রায় থেকে প্রমাণিত হয়েছে। (সূত্র : প্রথম আলো ১৬-১২-২০১৫)। তো এতে দেশের ক্ষতি হচ্ছে না?

এবার আসেন ভারতভক্তদের কথায়, ভারত ভক্তদের প্রধান যুক্তি ভারত আমাদের যুদ্ধে সহায়তা করেছিলো। হ্যা অবশ্যই কথাটা সত্য। আমরা তাদের প্রতি কৃতজ্ঞ। কিন্তু তাই বলে ভারতের অবশ্যই উচিৎ নয় বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ইস্যুতে তাদের নাগ গলানো।

> ফারাক্কা থেকে টিপাইমুখ বাধ সবজায়গায় ভারত আমাদের প্রবঞ্চনা করছে। বাংলাদেশের ন্যায্য যে পানির অধিকার ভারত তা দিচ্ছেনা। আমাদের পরিবেশের ক্ষতি হচ্ছে। হেলসিংকি রুলের ২৯(২) ধারা এবং জাতিসংঘের রিভার কনভেনশনের ১২ ধারা অনুসারে কিন্তু এই বাধ নির্মান অবৈধ।

> সীমান্তে বাংলাদেশিরা বিএসএফ কর্তৃক হত্যার স্বীকার হচ্ছে। সীমান্ত পারাপারে অনেক বাংলাদেশি গুলিবিদ্ধ হচ্ছে, যদিও অধিকাংশ অবৈধ পারাপারকারী তবুও কোনোভাবেই এই হত্যা মেনে নেওয়া যায় না। তবুও কি ভারত আমাদের বন্ধু রাষ্ট্র হবে? ভারতের সাথে কি দর কষাকষি করা উচিৎ নয়?

এইযে পাকিপ্রেম কিংবা ভারত ভক্তি, এই সমস্যাটা হচ্ছে আমাদের নিজেদের। সমস্যাটা হলো আমাদের দেশপ্রেম নেই জাত্যাভিমান নেই। আমরা বাংলাদেশীরা প্রত্যেকটা ইস্যুতে সর্বদা মানুষের পশ্চাৎদেশের মতো দুখন্ডে বিভক্ত, এমনকি দেশপ্রেমের মতো মৌলিক ব্যাপারেও আমরা ঐক্যবদ্ধ নই।

কিন্তু লক্ষ্য করে দেখুন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে প্রায় ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পরও জাপান খুব কম সময় দ্রুত মাথা উঁচু করে দাঁড়াল এবং বর্তমানে বিশ্বের তৃতীয় অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছে। তার অন্যতম কারণ হলো নিজেদের জাতীয়তার প্রতি জাপানিদের প্রবল ঐক্যবদ্ধতা ও দেশপ্রেম।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আরেক পরাজিত শক্তি জার্মানির দেশপ্রেমও অনন্য। হিটলার যতই নৃশংস হোক না কেন, এ কথা কেউ অস্বীকার করতে পারে না যে তার দেশপ্রেমে কোন খাদ ছিল না। আর তাই বিশ্বযুদ্ধের পর বিশাল অঙ্কের ক্ষতিপূরণ দিয়েও জার্মানি আজ বিশ্বের অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক শক্তি।ফরাসী বিপ্লবের পর মুখ থুবড়ে পড়া ফ্রান্সকে নেপোলিয়ন আবার সগৌরবে মাথা উঁচু করাতে
পেরেছিলেন তাদের অনন্য ঐক্যবদ্ধতা আর দেশপ্রেমের কারনে।

কিন্তু আমাদের দেশে দেশপ্রেম ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা দ্বারা খন্ডিত। যে পাকিস্তান আমাদের রক্ত চুষে আমাদের উপর বর্বর অত্যাচার করেছিলো, আমাদের ত্রিশ লক্ষ মানুষকে হত্যা করেছিলো সেই পাকিস্তানকে বাংলাদেশীরা ভালোবাসে, যে ভারত আমাদের ন্যায্য পানির অধিকার দেয় না, সীমান্তে হত্যাযজ্ঞ চালায় সেই ভারতীকে বাংলাদেশীরা ভালোবাসে। কিন্তু যে বাংলাদেশে তারা বাস করে, নি:শ্বাস নেয়, যে বাংলাদেশ রক্ত দিয়ে কেনা সেই বাংলাদেশকে তারা ভালোবাসতে পারেনা। বাংলাদেশীরা ভালোবাসে তাদের শোষণকারীকে। কবির ভাষায় পাকিপ্রেমী এবং এই ভারত ভক্তদের যদি জিজ্ঞেস করা হয় যে,
“যাহারা তোমার বিষাইছে বায়ু, নিভাইছে তব আলো,
তুমি কি তাদের ক্ষমা করিয়াছ, তুমি কি বেসেছ ভালো?”

তবে নি:সন্দেহে উত্তর হবে “হ্যা”।নিজের মাকে গালি দিয়ে প্রতিবেশীর মাকে ভালোবাসলে যে কোনো লাভ হয়না তেমনি নিজের দেশকে ভালো না বেসে অন্যদেশকে ভালোবাসলে দেশেরও কোনো উন্নয়ন হবেনা।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

99 − 92 =