উৎসবে লাশের গন্ধ

বাংলাদেশী বাঙালী জীবনের প্রত্যাশা ঘিরে রয়েছে শহর। চাকরি,ব্যবসা, শিক্ষা, এবং নাগরিক জীবনের সকল সুযোগ সুবিধা শহরকেন্দ্রিক। বিশেষ করে রাজধানী ঢাকা শহরকেন্দ্রিক। এ ছাড়াও দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর চট্টগ্রাম তো আছেই। অভাবের সংসারে অপ্রাপ্তবয়স্ক ছেলে কিংবা মেয়ে ঢাকায় পারি জমায় রুজিরোজগারের আশায়। স্কুল কিংবা কলেজ পাস করে ঢাকার কোনো নামজাদা কলেজ কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে ভারী সার্টিফিকেট অর্জনের আশায়। কিংবা নাগরিক জীবনের প্রাত্যহিক সুযোগসুবিধা যেমন, বিলাসবহুল এপার্টমেন্ট, হাতের কাছে সুপারসপ, দামী মার্কেট, নিজের কেনা গাড়ি নিয়ে রাস্তায় শো-ডাউন করা সহ সকল নাগরিক বিলাসিতা পাবার আশায় জাতি আজ বড্ড শহরকেন্দ্রিক।

কিন্তু যতই অপরিকল্পিত হোক এই নগরায়ন। আমাদের জায়গা ঐ অপরিকল্পিত নগরেই। আমাদের যে যাওয়ার আর যায়গা নেই। তাই আমরা ভিড় করি এই শহরে। চাকরি, শিক্ষা, ব্যবসা, নগর জীবনের সুবিধা ভোগ আমাদের এই শহর কেন্দ্রিক করেছে। সেটা আমাদের চোখে পড়ে শুধু তখনি। যখন আমাদের নাড়ীর টান পড়ে। ঈদ,পূজা-পার্বনে যখন আমরা চাই গ্রামের প্রিয়জনের সাথে আনন্দটুকু ভাগাভাগি করে নিতে। এইসব উৎসব ছাড়া আমাদের দীর্ঘদিন ছুটি মেলা ভার। কিন্তু সবার ছুটি যখন একই দিনে। সবার আবার ছুটি শেষ একই দিনে। তখন এই চাপটা বড্ডো বেশী হয়ে যায়। ঢাকার জনসংখ্যা প্রায় ১ কোটি ৫০ লক্ষ। যার প্রায় ৮০% লোক দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে স্থায়ী অথবা অস্থায়ী ভাবে এসে বাসবাস করছেন। বাকিরা ঢাকার স্থানীয় বাসিন্দা। ঈদে যখন নাড়ীর টানে বাড়ি ফেরার সুযোগ আসে অন্ততপক্ষে কিছুদিনের জন্য সেটা কেউই বাদ দিতে পারেন না। পরিবার, আত্মীয়দের সাথে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বাড়ি ফেরেন ছাত্র,কর্মজীবী,ব্যবসায়ীরা।

ঢাকা থেকে নৌপথে, সড়ক পথে কিংবা বিলাশ বহুল লোকেরা আকাশ পথে। কিন্তু, প্রতিবছর এই সময়ে অতিরিক্ত যাত্রীর চাপে ঘটে বিভিন্ন দুর্ঘটনা। যার মাঝে সড়ক দুর্ঘটনা অন্যতম। আর এর প্রথানতম কারণ অতিরিক্ত যাত্রী হয়ে ভ্রমন করা, ত্রুটিপূর্ণ সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা ও অদক্ষ চালক। পরিসংখ্যান অনুযায়ী ২০১৬ সালে ২ হাজার ৫৬৬টি দুর্ঘটনায় ২ হাজার ৪৬৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছে ২ হাজার ১৩৪ জন। ২০০৯ সালের হিসাবে ৩ হাজার ৩৮১টি দুর্ঘটনায় ২ হাজার ৯৫৮ জন নিহত ও ২ হাজার ৬৮৬ জন আহত হয়। প্রতিবছর এভাবেই আমাদের চলতে হয় লাশের মিছিলে,রক্তের স্রোত ঠেলে। ঢাকায় প্রায় ৩৫ লক্ষ পোশাক শ্রমীকের অস্থায়ী বসবাস। যারা দুটো পয়সা গাঁটে রেখে চান বাড়িতে পৌঁছে প্রিয় জনের সাথে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করে নিতে। চাঁদা তুলে বাস কিংবা ট্রাক ভাড়া করে গন্তব্যে পৌঁছাতে। কিন্তু এই ভোগান্তি ভোগ করে তারা কেউ কেউ দিচ্ছে অকালে প্রান।

গত ২৩ জুন ২০১৭ তারিখে এমনি এক ট্রাকে গ্রামে ফিরছিলেন কিছু পোশাক শ্রমীক। পথে ঘটে সড়ক দুর্ঘটনা। ১৭ জন ঘটনাস্থলেই মারা যান। এভাবেই প্রতিবছর ঈদের সময় অতিরিক্ত যাত্রি হয়ে, ত্রুটিপূর্ণ সড়ক যোগাযোগ ও অধক্ষ চালকের জন্য জীবন দিতে হয় এই শহরকেন্দ্রিক জনমানুষের। সবার আগে দায়ী এখানে শহরকেন্দ্রিক নাগরিক সুযোগসুবিধা, যার ফলে লম্বা ছুটিতে গ্রামমুখী লোকেদের বার্তি চাপ পড়তে হয়। এর পরে যোগাযোগব্যবস্থা এবং চালকদের দক্ষতা। এবং জনআচেতনতাকে দায়ি করতে পারি। এমন লাশের মিছিল কারো কাম্য নয়।

পরিশেষে আপনাকে বলতে চাই,
★অতিরিক্ত যাত্রি হয়ে ভ্রমন থেকে বিরত থাকুন।
★লঞ্চে, বাসে, ট্রেনে ছাদে ভ্রমন করবেন না।
★ সম্ভব হলে চালকের বৈধতা আছে কিনা তা নিশ্চিত হয়ে সড়ক পথে ভ্রমন করুন।
★ যাত্রাপথে অপরিচয় লোকের দেয়া খাবার খাবেন না।
★ সর্বোপরি যাত্রি হিসেবে আপনার ট্রাফিক আইনি মেনে চলুন।
★রাস্তায় বোতল, বা পলিথিন জাতিয় কিছু ফেলবেন না।
★এবং নিজের নিরাপত্তা বজায় রেখে ভ্রমন করুন।
সকলের ঈদ ভ্রমন শুভ হোক। ☺

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 1 = 3