অ্যাডাম-ইভের মঙ্গল যাত্রা এবং বিবর্তনবাদ-১

আপনার দাদার দাদার অনেক-অনেক-অনেক পেছনের দাদারা ’বানর’ ছিলেন— একথা শোনার পর উন্নত শ্রেণীর প্রাণী তথা ‘মানুষ’ হিসেবে বিষয়টা মেনে নেয়াটা সত্যিই খুব কষ্টের, কেউ কেউ আবার যথেষ্ঠ অপমানবোধও করেন। এই অপমানবোধ শুধু মানুষের নয়, “বাড়ির পোষা কুকুরটারও অপমানবোধ আছে।” পার্থক্য, মানুষ অপমানিত হলে যুক্তি খোঁজে, আর কুকুর মাত্রই ঘেউ ঘেউ করে। কামড় দিতে আসে।

শুরুতেই বলে রাখি, আমাদের আদি বংশে কোনো বানর ছিলনা এবং তা আমি পরে বুঝিয়ে বলব। কিন্তু তার আগে কিছু গল্পের অবতারণা করতে চাই।

ধরা যাক, মঙ্গল গ্রহে ৭৮% নাইট্রোজেন, ২১% অক্সিজেন, ০.৪% কার্বন ডাই অক্সাইড আছে, আছে বনভূমি, পৃথিবীর মতোই চারপায়ের পশু, সাদু পানি আর লবণাক্ত সমুদ্র। ধরে নিচ্ছি গ্রাভিটিও পৃথিবীর মতোই। শুধু যা নেই তা হল মানব বসতি। আরো ধরা যাক, নাসার পক্ষ থেকে অ্যামেরিকান একজন পুরুষ এবং একজন নারী নভোচারীকে মঙ্গলে পাঠানো হল, যারা নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ রক্ষা করেন কেবল নিজেদের জানা মাতৃভাষা ইংরেজিতে, তাছাড়া নাসার সমস্ত ডিরেকশনও দেয়া আছে ইংরেজিতে।

মঙ্গলে কেবল নিজেদের জীবনটা নিয়ে তারা কোনরকমে অবতরণ করলেন। সঙ্গে নেই কোন খাবার। অবতরণের সময় ছিঁড়ে গেছে পোশাক- করুণ সে দৃশ্য! মঙ্গলে বসতি স্থাপনের শুরুর যাত্রাটা অনেক কঠিন ছিল ওদের জন্যে। বস্ত্রের বিকল্প খোঁজা, গৃহ নির্মাণ, শিকার ধরার অস্ত্র তৈরি, খাবারের ব্যবস্থাকরণ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলা, অভ্যস্ত হওয়া, অভিযোজিত হওয়া- এমন অনেক কঠিন কাজগুলো করতে করতে ওদের প্রথম বছরটা চলে গেল। যা হোক, দ্বিতীয় এবং তৃতীয় বছরে নভচারীযুগলের দুটি সন্তান হল। প্রথমটি ছেলে শিশু, দ্বিতীয়টি মেয়ে শিশু।

বাবা সারাদিন বন-জঙ্গল থেকে খাবার সংগ্রহ করেন। মা, বাসায় ছেলেমেয়েদের দেখাশোনা করেন হিংস্র জন্তু-জানোয়ার সংক্রান্ত নিরাপত্তাজনিত কারণে। যেহেতু কোন কিন্ডারগার্টেন নেই মঙ্গলে, তাই মায়ের হাতেই শুরু হয় হাতেখড়ি। দিন যায়, মাস যায়, বছর ঘুরে ছেলে-মেয়েরা বড় হয়। মা ওদেরকে এ, বি, সি, ডি— লিখতে শেখান। কিন্তু যথেষ্ঠ উপকরণের অভাব আর বহুদিন ধরে পড়াশোনার বাইরে থাকা— এই অজুহাতে মা তাঁর সন্তানদেরকে ফিজিক্স-ক্যামিস্ট্রি-কম্পিউটার সায়েন্স-বায়ো ট্যাকনোলজি-ভূগোল-অ্যাসট্রোনমি-ম্যাথ-জেনিটিক্যাল সায়েন্স-ইনফরমেশন ট্যাকনোলজি ইত্যাদি বিষয়গুলির বেসিক আইডিয়াটাও সন্তানদেরকে দিতে সমর্থ হলেন না। তবে, ছেলেমেয়েদেরকে তিনি শেখালেন কীভাবে ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করতে হয়, প্রার্থনা মন দিয়ে না করলে কী ভয়ংকর শাস্তি মৃত্যুর পরে অপেক্ষা করছে ইত্যাদি।

প্রাথমিক শিক্ষা আর ধর্মীয় শিক্ষার ফাঁকে ফাঁকে প্রথম জোড়া এই সন্তানেরা সারাদিন ছুটোছুটি করে, পাহাড়-পর্বতের গুহায় খেলতে যায়, গুহার দেয়ালে মায়ের শেখান লিপিগুলি আনমনে আঁচড় কেটে লিখতে শুরু করে, বাবা কীভাবে হরিণ শিকার করে, মা কীভাবে হরিণের মাংসগুলি রান্না করে ইত্যাদি। ওদের মা, অ্যামেরিকায় থাকতে পাথর ঠুকে আগুন জ্বালানো শিখে এসেছিলেন। আর তাইতো মঙ্গলের বুকে প্রতিদিন চলে বারবিকিউ পার্টি। মেয়েটা সেইসব ঘটনাগুলির স্মরণীয় করে রাখতে গিয়ে গুহার দেয়ালে ছবি এঁকে রাখে। আনন্দ-উৎসবে দিন কাটে ওদের। তারপর ছেলে-মেয়েদের একদিন বয়:সন্ধি আসে। খেলতে খেলতে ওরা নিজেদের মধ্যে জৈবিক আকর্ষণ অনুভব করে। এদিকে বাবা-মায়ের হাতে আর কোন অপশনও নেই এই জনশূণ্য মঙ্গলে। তাই ঘটা করে প্রথম জোড়া ছেলেমেয়েদের মধ্যেই বিয়ে দিলেন তারা।

কিছুবছর পরে, বাবা-মায়েরা আরো দু-তিন জোড়া সন্তানের জন্ম দিলেন। তাদের ক্ষেত্রেও বড় হওয়ার পর একইভাবে বিয়ে দিলেন। মঙ্গলের বুকে সেই নভচারী বাবা-মায়েরা বয়সজনিত কারণে মৃত্যুবরণ করলেন। মারা যাওয়ার আগে বাবা বলে দিলেন, তোরা সবাই আমার প্রথম ছেলে সন্তানটির কথামত চলিস, তাকে অনুসরণ করিস, সে তোদের মধ্যে সবচেয়ে অভিজ্ঞ। তাকে আমি তোদের রাজা ঘোষণা করে গেলাম। বাবা-মায়েরা মারা যাবার পর তাঁদেরকে সমাহিত করা হল।

সেকেণ্ড জেনারেশনে এসে মঙ্গল গ্রহের প্রথম রাজার আবির্ভাব ঘটল। তিনি একদিন মিটিং ডাকলেন। সবাই পাহাড়ের সবুজ পাদদেশে এসে হাজির হল। মায়ের-শেখান পরিষ্কার ইংরেজিতে তিনি বললেন, এখন থেকে তোমরা নিজ পরিবারের মধ্যে বিয়ে করবে না। রুচির একটা ব্যাপার আছে। বাস্তবিক অর্থে তাই হল। ছেলেরা পাশের বাসার মেয়েটাকে গাছের বাকলে আঁচড় কেটে প্রেম-পত্র লিখতে শুরু করল। কারণ, অজানাতেই মানুষের অনুভূত হয় সবচেয়ে বেশি আকর্ষণ।

পাশের বাসার জোছনা-কিডম্যান নামের মেয়েটার সাথে প্রণয় জনিত কারণে টমটম-ক্রজ নামের ছেলেটার বিয়ে হয়ে গেল। কিন্তু জোছনা-কিডম্যানকে পছন্দ করত জলিল-আরবান নামের আরেক ছেলে। তাই একদিন, গভীর রাতে টমটম-ক্রজকে একা পেয়ে তাকে হত্যা করল মি.আরবান। নিজ বংশে এমন ঘটনা এটাই প্রথম। সাত-পাঁচ ভেবে বাবা-মাকে সমাহিত করার মতোই লাশটা গুম করার উপায় বের করল মি.আরবান। গর্ত খুঁড়ে মাটির নিচে চাপা দিয়ে দিল টমটম-ক্রজকে। একটা মানুষ বেমালুম গায়েব হয়ে গেল! জোছনা-কিডম্যান বিরহ কাটিয়ে একদিন ঘাতক জলিল-আরবানকেই বিয়ে করল।

এভাবে শুরু হয়ে গেল তৃতীয় জেনারেশনের সংসার। যেহেতু জন্মনিয়ন্ত্রণের ভাল কোন ব্যবস্থা নেই, তাই জন্মহার বাড়তে থাকল খাড়া গ্রাফের মত। ঊনপঞ্চাশতম জেনারশনে এসে কিছু বিপত্তি ঘটতে শুরু করল। খাবার সংকট দেখা দিল। ঘর থেকে খাবার দাবার চুরি হতে থাকল। মানুষেরা পেটের দায়ে অন্যের সংগ্রহের খাবার চুরি করে আরো একটি পাপ কাজের অবতারণা করল।

অবস্থা বেগতিক দেখে উনপঞ্চাশতম জেনারেশনের রাজা জরুরী মিটিং ডাকলেন। দল-বেঁধে সবাই হাজির হল রাজ্যের বিশাল সবুজ মাঠে। মাইক নেই, তাই রাজা চেঁচিয়ে পরিষ্কার ইংরেজিতে ভাষণ দিতে শুরু করলেন। ভাষণের সারকথা মোটামুটি এরকম, আমাদেরকে এখন ছোট ছোট গোত্রে ভাগ হয়ে সমস্ত মঙ্গল গ্রহে ছড়িয়ে পড়তে হবে। নতুন নতুন খাবারের খোঁজ করতে হবে।

রাজার কথামত চারটি গোত্রে ভাগ হয়ে গেল সবাই। প্রথম গোত্রটি পূবদিকে হাঁটা দিল, দ্বিতীয়টি পশ্চিমে, তৃতীয়টি উত্তরে, চতুর্থটি দক্ষিণে।

প্রথম গোত্রটি পাহাড়-পর্বত জঙ্গল পেরিয়ে উঁচু মালভূমিতে(সমতল উঁচু স্থানে) আশ্রয় নিল। এখানে ভালোই সরীসৃপ থাকে। খেতেও বেশ সুস্বাদু!

দ্বিতীয় গোত্রটি যেখানে গেল, সেখানে উত্তপ্ত মরুভূমি, পায়ে ফোসকা পড়ে যায়, পানির তেষ্টায় বুক ফাটে। তবুও খাবারের সন্ধান ঠিকই বের করে নিল ওরা।

তৃতীয় গোত্রটি যেখানে গেল সেখানে মাথার উপর থেকে বরফ পড়ে, হাত-পা জমে যাওয়ার উপক্রম। নিজ গোত্রের অর্ধেক মারা গেল তীব্র ঠাণ্ডায়। বহু-কষ্টে তারা একটি বড় গুহা আবিষ্কার করল, পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে শেখা পাথর ঠুকে আগুন জ্বালানোর শিক্ষাটা খুব কাজে দিল।

চতুর্থ গোত্রটি সমুদ্র-তীরবর্তী একটি অঞ্চলে বসতি স্থাপন করল। ম্যাগ্রোভব বনটা ওদের কাছে আশীর্বাদ। সমুদ্রের মাছ, বনের ফলমূল আর পশু শিকার করে ভালই কেটে যাচ্ছে ওদের দিন।
এভাবে সবাই একদিন ছড়িয়ে গেল সমস্ত মঙ্গল গ্রহে। সবাই সুখে শান্তিতে বসবাস করতে লাগল।

সারা মঙ্গলজুড়ে কম-বেশি সবাই মন দিয়ে পূর্বপুরুষদের দেখানো পথে ঈশ্বরের কাছে মন দিয়ে প্রার্থনা করে। সঙ্গত কারণেই সমগ্র মঙ্গলে দ্বিতীয় কোন ধর্ম নেই। কারণ, ধর্ম মানতে গেলে অপশন একটাই আর না মানলে দ্বিতীয় কিছু নেই। ফলে, নেই কোন হানাহানি, নেই নিজেদেরকে শ্রেষ্ঠতর প্রমাণ করার কোন আস্ফালন। ধর্মগ্রন্থও একটাই এবং তা ইংরেজিতে লিখা। ফলে ধর্মীয় বিদ্বেষ থেকে কেউ কাউকে হত্যার জন্যে তেড়ে আসছে না, ধর্মীয়ভাবে সংখ্যালঘু- শব্দটা সমগ্র মঙ্গলে অনুপস্থিত। চারদিকে শান্তির এক মঙ্গলময় সুবাতাস।

ছেলে-মেয়েরা মন দিয়ে ইংরেজি ভাষায় পড়াশোনা করে, গবেষণা করে, নিত্যনতুন আবিষ্কার করে। ধর্মগ্রন্থ ইংরেজিতে হওয়ায় তারা সহজেই তা নিয়ে গবেষণা করে ঈশ্বরের ইঙ্গিতগুলি অনুধাবন করতে পারে। মন দিয়ে ভাবতে ভাবতে একের পর এক নতুন নতুন ’তত্ত্ব’ তারা প্রকাশ করতে থাকে। ফলে বিশাল মঙ্গল-পৃষ্ঠে মানব সভ্যতা চূড়ান্ত শিখড়ে পৌঁছে যায়।

দূরত্ব কোন অন্তরায় হয়ে থাকল না, সমগ্র মঙ্গল অধিবাসী নিজেদের মধ্যে সেই শুরুর নভোচারী বাবা-মায়ের থেকে শেখা ইংরেজিতে যোগাযোগ রক্ষা করে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় নিয়ে সুখে শান্তিতে বসবাস করতে থাকল মঙ্গল-পৃষ্ঠে।

এদিকে, পৃথিবী নামের গ্রহটায় শান্তির আর দেখা মেলা না। প্রায় ৪২০০ (চার হাজার দুইশত) ধর্মের প্রায় ৭.৩ বিলিয়নের বেশি মানুষ প্রায় ৬৯০৯ টি ভাষায় গলা-বাজি, হুমকি-ধামকি, চিৎকার চেঁচামেঁচি, খিস্তি-খেউড় দিয়ে পৃথিবীর বাতাসকে প্রতিদিন ভারী করে তোলে নিজেকে শ্রেষ্ঠতম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার শ্বাসরুদ্ধকর প্রচেষ্টায়!

আর পৃথিবীর প্রাচীনতম অ্যাডাম-ইভরা মনের সুখে ঘুরে ফিরে এক ধর্মগ্রন্থ থেকে আরেক ধর্মগ্রন্থে, কিন্তু তাঁদের ফিজিক্যাল উপস্থিতির যৌক্তিকতা খুঁজে পাই কোনখানে? ”নাকি বিশ্বাসে মেলায় বস্তু, তর্কে বহুদূর” এর মতো অচল প্রবাদের সাথে প্রেম করে কাটিয়ে দিবে পৃথিবীর মানুষেরা? পৃথিবীর মানুষদের ইভ মায়ের ভাষাটি কেন সবার মুখে মুখে আর থাকল না? যদি উচ্চারণগত ত্রুটি থেকে এমন হয় তবে তার পরিবর্তন বড় জোর জ্যোৎস্না থেকে জোছনা হতে পারে; কিন্তু ’মুন-শাইন’ হয় কী করে? অ্যাডাম-ইভের রেখে যাওয়া ধর্মটির বিবর্তন চার-হাজারকে ছাড়িয়ে গেল কোন ‍যুক্তিতে?
(চলবে)

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

১ thought on “অ্যাডাম-ইভের মঙ্গল যাত্রা এবং বিবর্তনবাদ-১

  1. ঈভ মায়ের মুখে কোন নির্দিষ্ট
    ঈভ মায়ের মুখে কোন নির্দিষ্ট ভাষা ছিল এটি আপনি কোন গ্রন্থে পেয়েছেন,নাকি মনের মাধুরী মিশিয়ে কল্পনার জাল বুনেছেন?!!

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 3 = 6