রুবাইদের কাছে হেরে যায়…যাবে মহাসেন…

রুবাই কালো আকাশের দিকে ভ্রু কুচঁকে তাকিয়ে আছে। চারিদকি অন্ধকার, প্রচন্ড বাতাস বইছে। বঙ্গোপসাগরের বুকে ছোট্ট একটা দ্বীপে তার জন্ম। এ দ্বীপে তার আপন বলতে এক দূর সম্পর্কের নানা ছাড়া আর কেউ নাই। অনেক বছর আগে বাবা মাছ ধরতে ট্রলার নিয়ে বেরিয়েছিলো, মাঝপথে তুফান ওঠে ট্রলারশুদ্ধ নিখোজঁ। তার কয়েকবছর পর মাও ওলাওঠায় মারা গেলো। এরপর রুবাই একা। জন্মের পর থেকেই ঝড়, জলচ্ছ্বাস আর পাহাড় সমান ঢেউয়ের সাথে সে লড়াই করে এসেছে।

রেডিওতে ১০ নম্বর বিপদ সংকেত দেখাতে বলেছে। সবাই কাল থেকে ঘটিবাটি নিয়ে ডার যার মতো করে রওনা দিয়েছে মূল শহরের আশ্রয়কেন্দ্রে। গতবার সিডরের সময় সেই আশ্রয়কেন্দ্রের চালেও আঘাত হেনেছিলো ঝড়। রুবাইর বুকে অসীম সাহস। ঝড়ের ভয়ে সে তার ২২ বছরের জীবনে কখনো আশ্রয় কেন্দ্রে যায়নি।

রুবাইর নানার বেশ কয়েকটি দুধেল গাই আর ষাড়। সে এগুলো যক্ষের ধনের মতো আগলে রাখে। গতকাল দ্বীপ থেকে যখন শেষ পরিবারটিও চলে গেলো, তখন স্থানীয় প্রশাসন থেকে তাকে নিতে ট্রলার পাঠালো। রুবাইর নানা সাফ মানা করে দিলো গাই আর ষাড় রেখে সে কোথাও যাবে না। প্রায় প্রতিবছরই সে এই কাজটা করে। রুবাইর ধারনা, গবাদি পশুর মায়া ছাড়তে পারে না বলেই যায় না। কিন্তু রুবাইর কাহিনী ভিন্ন।

খুব কাছ থেকে ঝড় দেখা রুবাই ছোটবেলার নেশা। এই নেশার কারনেই সে ভিটেমাটি ছেড়ে আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে পারে না। এক একটা ঝড় দ্বীপের উপর দিয়ে বয়ে যায় আর রুবাই দক্ষ লড়াকু এবং আরও বেশী প্রশিক্ষিত হয়ে ওঠে। রুবাই একটা বট গাছের মোটা কান্ডের সাথে শক্ত পাকানো দড়ি দিয়ে নিজেকে বাধাঁর প্রস্তুতি নেয়। এই দড়ি রুবাই নিজের হাতে পাকিয়ে বানিয়েছে। এটা এমনই মজবুত আর টেকসই যে গত এক যুগ ধরে এই দড়িটা ঝড়ের সময় তাকে আর তার নানাকে আগলে রেখেছে। ঝড়ের তান্ডব যতই হোক না কেন, কখনই ছিড়েঁ যায়নি।

গতবার সিডরের সময় রুবাইর কঠোর ও অবিচল সংগ্রামে বেশ কয়েকজন দ্বীপের বেশ কয়েকজন লোক বেচেঁ ফিরেছিলো মৃত্যুর কবল থেকে। মাঝ দরিয়ায় মাছ ধরতে গিয়ে তার বাবার মতই ট্রলারসহ ডুবতে বসেছিলো। লোভে পড়ে তারা তীরে আসার কথা ভুলে যায় রেডিওতে সর্তক করে দেয়া সত্ত্বেও। সেবার দ্বীপ থেকে লোকজন চলে যাবার পর এই রুবাই একা একা ঝড়ের ভেতর সাঁতরে সাতঁরে একজন একজন করে সবাইকে ডাঙ্গায় নিয়ে আসে। ছোটবেলায় তার মা তাকে একটা দোয়া শিখিয়ে দিয়েছে। ঝড়ের সময় পড়লে রক্ষা পাওয়া যায়। ‘আল্লাহুম্মা ইন্নী আসআলুকা খইরাহা ওয়া আউযুবিকা মিন শাররিহা’ সে ঝড়ের সময় চিৎকার করে এই দোয়া পড়ে। প্রচন্ড শো শো আর তুফানের গর্জনের ভেতর এই দোয়ার চিৎকার শ্রোতার কলজে কাপিঁয়ে দেয়।

রুবাই মোবাইলের রেডিওটা শোনার জন্য হেডফোন কানে লাগালো। এখানে মোবাইলের নেটওয়ার্ক নাই কিন্তু রেডিও ঠিকই শোনা যায়। রেডিওতে শুনলো, এ বছরের ঝড়ের নাম দেয়া হয়েছে মহাসেন। রুবাই ভ্রু কুচকে আকাশের উপর থেকে দৃষ্টি সরিয়ে তার সামনের প্রায় ফুসেঁ ওঠা সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে থুথু ফেলল। মনে মনে ভাবলো, ঝড়ের নাম দিয়ে তার কিছু যায় আসে না, বরং একই ঝড় প্রিতিবারই আসে ভিন্ন ভিন্ন নাম নিয়ে। ঝড়ের নাম দিয়ে শহরের লোকের গালভরা কথা বলে, পত্র-পত্রিকায় গালভরা সংবাদ ছাপা হয়, রেডিওতে সারাদিনও ঝড়ের নাম শোনা যায় কিন্তু রুবাইর মতো উপকূলবর্তী বা দ্বীপের লোকজনদের কাছে ঝড়ের নামের কোন মাহাত্ন্য নাই। তারা শুধু বোঝে, এক একটি ঝড় মানে এক একটি সংগ্রাম। প্রকৃতির সাথে লড়াই করে টিকে থাকার সংগ্রাম। সে সংগ্রামে অবতীর্ণ হবার জন্য রুবাই রেডি হয়। সে কোমড়ে গামছা পেচিঁয়ে হাক ছাড়ে – ”নানা, দড়িডা নিয়া আহো। গাছের লগে বানমু। দেখি মহাসেনের কি শক্তি!” বাতাসের গর্জন ছাপিয়ে রুবাইর গলা স্পষ্ট শুনতে পাওয়া যায়। যেন সে নানাকে না, ঝড়কে লক্ষ করেই বলছে। মহাসেন জানে, দুনিয়ার সব কিছু লন্ড ভন্ড করে দিয়ে এলেও এই হাড় জিরজিরে ছেলেটার কাছে তাকে হার মানতে হবে। প্রতিবারই মানতে হয়।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৮ thoughts on “রুবাইদের কাছে হেরে যায়…যাবে মহাসেন…

  1. মহাসেন জানে, দুনিয়ার সব কিছু

    মহাসেন জানে, দুনিয়ার সব কিছু লন্ড ভন্ড করে দিয়ে এলেও এই হাড় জিরজিরে ছেলেটার কাছে তাকে হার মানতে হবে। প্রতিবারই মানতে হয়।

    :bow: :bow: :bow: :bow: চমৎকার একটি গল্প

  2. তারা শুধু বোঝে, এক একটি ঝড়

    তারা শুধু বোঝে, এক একটি ঝড় মানে এক একটি সংগ্রাম। প্রকৃতির সাথে লড়াই করে টিকে থাকার সংগ্রাম।

    :থাম্বসআপ:
    সত্যিই রুবাইদের কাছে হেরে যায়…যাবে মহাসেন…

  3. বঙ্গোপসাগরের বুকে ছোট্ট একটা

    বঙ্গোপসাগরের বুকে ছোট্ট একটা দ্বীপে তার জন্ম। এ দ্বীপে তার আপন বলতে এক দূর সম্পর্কের নানা ছাড়া আর কেউ নাই। অনেক বছর আগে বাবা মাছ ধরতে ট্রলার নিয়ে বেরিয়েছিলো, মাঝপথে তুফান ওঠে ট্রলারশুদ্ধ নিখোজঁ। তার কয়েকবছর পর মাও ওলাওঠায় মারা গেলো। এরপর রুবাই একা। জন্মের পর থেকেই ঝড়, জলচ্ছ্বাস আর পাহাড় সমান ঢেউয়ের সাথে সে লড়াই করে এসেছে।

    কথাগুলো একবারে হুবহু একটানে বলে না দিয়ে ধীরে ধীরে গল্পের মধ্য দিয়ে ফুঁটিয়ে তুললে ভাল হত।

    মনে মনে ভাবলো, ঝড়ের নাম দিয়ে তার কিছু যায় আসে না, বরং একই ঝড় প্রিতিবারই আসে ভিন্ন ভিন্ন নাম নিয়ে। ঝড়ের নাম দিয়ে শহরের লোকের গালভরা কথা বলে, পত্র-পত্রিকায় গালভরা সংবাদ ছাপা হয়, রেডিওতে সারাদিনও ঝড়ের নাম শোনা যায় কিন্তু রুবাইর মতো উপকূলবর্তী বা দ্বীপের লোকজনদের কাছে ঝড়ের নামের কোন মাহাত্ন্য নাই। তারা শুধু বোঝে, এক একটি ঝড় মানে এক একটি সংগ্রাম। প্রকৃতির সাথে লড়াই করে টিকে থাকার সংগ্রাম।

    ভাল করে খেয়াল করে দেখুন, রুবাই ই কথাগুলো কল্পনা করছে। আবার বলছেন রুবাইর মত। নিজের কল্পনায় কেউ কি নিজেকে দিয়ে “এভাবে” উদাহরণ দেয়?

    যাই হোক, ভাল লিখেছেন…

    1. হুম ঠিক বলেছেন এই জায়গাটা
      হুম ঠিক বলেছেন এই জায়গাটা খেয়াল করিনি। সময় পেলে এডিট করে দিবো। আসলে তাগাহুড়োর লেখা তো। ঘুমুতে যাবার আগে আগে লিখেছিলাম।

    2. হুম ঠিক বলেছেন এই জায়গাটা
      হুম ঠিক বলেছেন এই জায়গাটা খেয়াল করিনি। সময় পেলে এডিট করে দিবো। আসলে তাগাহুড়োর লেখা তো। ঘুমুতে যাবার আগে আগে লিখেছিলাম।

  4. চমৎকার গল্প! আমার ভালই
    চমৎকার গল্প! আমার ভালই লেগেছে…
    কষ্ট করে একটু এই বালকটির সাথে মিলিয়ে দেখবেন?
    আমার দেখায় ভয়াল কালো রাত্রি ২৯ এপ্রিল ১৯৯১!

    :ধইন্যাপাতা: :ধইন্যাপাতা: :ধইন্যাপাতা:

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

33 − 28 =