হিন্দু সংখ্যালঘু ধন্যরাম হত্যাঃ রাষ্ট্র তার দায় কতটুকু নিতে চায়?

?oh=8c92cce36c87c41c8a58a21cb0cd78b2&oe=59CBAAF9″ width=”500″ />
ধন্যচন্দ্র রায় একজন ১৬ বছরের কিশোর। ডাকনাম ধন্যরাম। ধন্যরাম এখন শুধুই লাশ। যেই কয়েকদিন আগেও দিনাজপুরের কাহারোল উপজেলার তারাপুর গ্রামে ছিল এক জীবন্ত কিশোর। হয়তো ক্ষেতের কাজে যোগান দিয়ে মাকে সাহায্য করতো। ধন্যরামের বাবা মৃত, নন্দি রায়। মাতা পারনি বালার একমাত্র সন্তানই ছিল ধন্যরাম। বাবা নেই, হত দরিদ্র পরিবার। ক্ষেত খামারি করে সংসার চলে। বিপত্তিটা ঘটল এই মাসের শুরুর দিকে গত ২ই জুন।

একই গ্রামের খুনি আসামী শাহাজান। একজন খুনী আসামী হিসেবে গ্রামে শাহাজানের খুব প্রভাব! শাহাজানের চাচা শশুর সেই ৪ং ইউনিয়নের ইউপি চেয়ারম্যান। গত ২ই জুন খুনি আসামী শাহাজানের গরু পারনি বালার ক্ষেতে গিয়ে উৎপাত শুরু করে ক্ষেত ক্ষেতি নষ্ট করতে থাকে। হত দরিদ্র পারনি বালা নিজের ক্ষেত নষ্ট হচ্ছে দেখে শাহাজানের গরুটিকে এক জায়গায় বেঁধে রাখে। এবার পারনি বালা যায় কোথায়? একজন মালাউন রমনী হয়ে সেই কোন সাহসে এদেশের ৯০% মুসলমানের গরুকে আটকে রাখার সাহস দেখায়? এই দুঃসাহস হেঁদু পারনি বালার হলো কি করে? তাই খুনি শাহাজান দল বল নিয়ে পারনি বালার কাছে যায়। পারনি বালার কাছ থেকে গরুকে ছাড়িয়ে নিয়ে যাবার পরও শাহাজান সন্তুষ্ট হয়না। শাহাজানের লোভ যায় পারনি বালার শরীরের দিকে। পারনি বালা একে তো স্বামী হারা বিধবা, তার উপর সংখ্যালঘু হিন্দু। এদের যাচ্ছেতাই যৌন হেনস্থা করলে এই রাষ্ট কিইবা করবে? আগেও তো এদেশে অনেক হিন্দুদের বাড়ি-ঘর দখল করা হয়েছে, তাদের দেশ ত্যাগে বাধ্য করা হয়েছে, হিন্দু মেয়েদের প্রকাশ্যে খোলা আকাশের নিচে গনধর্ষন করা হয়েছে। কই রাষ্ট্র তো তার কোনো বিচারই করেনি। আপনাদের মনে আছে ২০০১ সালে এক হিন্দু সংখ্যালঘু বাবার করুন আর্জির কথা? আওয়ামীলীগকে ভোট দেয়ার অপরাধে ১০ বছরের পুর্নিমাকে যখন প্রকাশ্য দিবালোকে একে একে বিএনপি জামাতের ক্যাডাররা গনধর্ষন করার জন্য উদ্ধত হয়েছিলেন, তখন তার বাবা মিনতি করে বলেছিলেন, -“বাবারা তোমরা একজন একজন কইরা আসো, আমার মাইয়া এখনো ছোট, তার এখনো রক্ত দেহা যায় নাই”। সেই সময় পুর্নিমা চিৎকার করে কি বলেছিল জানেন? -“তোমরা আমাকে ছাইড়া দাও, আমি আর এদেশে থাকুম না!” শাহাজানেরও জানা আছে এই সংখ্যালঘু হত বিহ্বল দরিদ্র রমনীর একটু গায়ে হাত, একটু যৌন আক্রমন করলেও এই রাষ্ট্রযন্ত্র তাকে কিছুই বলবে না। যা আর দুষ্টুমি করবি না বলে তাকে পিঠে হাত বুলিয়ে ছেড়ে দেবে।

পৃথিবীর কোনো সন্তানই বোধকরি তার মায়ের অসম্মান সহ্য করতে পারেনা। সেদিন (গত ২ই জুন) ধন্যরামও পারেনি নিজের চোখের সামনে মাকে যৌন আক্রমন করার ঘটনাকে মেনে নিতে। তাই ধন্যরাম মায়ের প্রতি যৌন-হেনস্থা দেখে দৌঁড়ে এসে বাধা দেয়। মাকে লোলুপ দৃষ্টির একদল হায়েনাদের কাছ থেকে ছাড়িয়ে নেবার চেষ্টা করে। তা দেখে খুনী ও নরপশু হায়েনাদের প্রধান শাহাজানের বোধকরি ইগোতে লাগে। ৯০% মুসলমানের দেশে এক হিন্দু সংখ্যালঘুর বিধবা স্ত্রীকে যৌন হেনস্থা করায়, আবার সেই স্ত্রীর ১৬ বছরের সন্তান একটা ছোট্ট ছোকরা কেমন করে প্রতিবাদ করতে আসছে দেখ দেখ! শাহাজান আর দেরি করেনি, তারা ৬ জনে মিলে যৌন নির্যাতনের শিকার সেই স্ত্রীটির একমাত্র সন্তান, ১৬ বছরের কিশোর ধন্যরামের হাত পা বেঁধে ফেলে। ধন্যরামকে নিয়ে যায় ভুট্টাক্ষেতে। ২ই জুন দিনাজপুরের কাহারোল উপজেলা তারাপুর গ্রামে শাহাজানরা হাত পা বাধা অবস্থায় ১৬ বছরের ছোট্ট কিশোর ধন্যরামকে সবচেয়ে বর্বর ও নৃশংস পন্তায় হত্যা করে। শুধু তায় নয়, হত্যার পর খুব পৈচাশিক উল্লাস করে ১৬ বছরের কিশোর ধন্যরামের অণ্ডকোষ থেঁতলে দেয়। কি নির্মম হত্যাকাণ্ড! একটা দেশের মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ট সম্প্রদায়, একটা হিন্দু সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ১৬ বছরের একটা ছোট্ট কিশোরকে কতোটা দুর্বল আর অসহায় ভাবলে তার সামান্য প্রতিবাদ দেখে হত্যা পর্যন্ত করতে পারে? তাকে মেরে পৈশাচিকভাবে তার বিচি পর্যন্ত থেঁতলে দিতে পারে???

এদেশের শাহাজানদের হিন্দু সংখ্যালঘুদের অনায়াসে মেরে ফেলার সাহস কিন্তু একদিনে গড়ে উঠেনি, গড়ে উঠেছে ধীরে ধীরে, রাষ্ট্রচালক আর রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রশয়ে। ব্রাম্মনবাড়িয়া নাসির নগরে কাবার উপর শিবের ফটোশপকে কেন্দ্র করে গোটা তিনশটি হিন্দু পরিবারকে জ্বালিয়ে দিয়ে শন্মান বানিয়ে দিল মুসলমানরা, রাষ্ট্র তার বিচার করেনি। অপরাধীদের গ্রেপ্তার করে শাস্তি দেয়নি। যশোরে মালো পাড়ায় মুসুলমানরা মিলেমিশে একযোগে শত শত হিন্দুদের অত্যাচার-নির্যাতন করা হল, তাদের বাড়ি ঘর মন্দির জ্বালিয়ে দেয়া হল রাষ্ট্র তারো বিচার করেনি। প্রতি বছর সারা দেশে শয়ে শয়ে হিন্দুদের আক্রমণ করা হয়, তাদের বাড়ি ঘর লুটপাট করা হয়, তাদের ভুমি জোরপূর্বক দখল করা হয়, এর বিচারও করেনা রাষ্ট্র।

আমি জানি না ধন্যরামের মা পারনি বালার এখন কি অবস্থা। চোখের সামনে সন্তান হত্যা হতে দেখা একজন মায়ের শোক ঠিক কতখানি, তা পরিমাপ করার দুসাহস আমার নেই। তার সন্তান খুনী মুসলিম শাহাজানের হাতে হত্যার শিকার হয়েছে। আজ যদি উলটো গরু বেঁধে রাখার একই অভিযোগে ধন্যরাম শাহাজানকে হত্যা করে বিঁচি থেঁতলে দিতো, এতোক্ষনে মুসলমান সমাজের প্রতিবাদ সারা দেশে ফেটে পড়ত। প্রশাসন সোচ্চার হতো। পুলিশ রাতের আঁধারে খুনিকে টর্চের আলো দিয়ে খুঁজতো। কিন্তু ধন্যরামের হত্যার বেলায় এদেশের মুসলমানরা প্রতিবাদের ভাষা হারায়। তাদের প্রতিবাদ মিনসে বেড়ালের মতো চুপসে যায়। পুলিশ প্রশাসনও নিশ্চিন্তে ঘুমায়। মরেছে সংখ্যালঘু মালাউনের বাচ্চা মরেছে! রাষ্ট্র আর কতুটুকু দায় নিতে চায়?

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

26 − = 19