মানুষ ছাড়া ক্ষ্যাপা রে তুই মূল হারাবি

রাজা মশাই, রাজা মশাই বলতে বলতে হন্তদন্ত হয়ে প্রধানমন্ত্রী দৌড় দিয়ে ঢুকে গেলেন রাজা তর্কপটুনীর আরাম কক্ষে। শ্যামদেশীয় রাজা তখন লালনগীতি শুনে মস্তক দুলাচ্ছিলেন আরামকেদারায় শুয়ে।

রাজা হাত নেড়ে চুপ থাকতে ইশারা করেন। পায়ের কাছে রাখা রাজকীয় মোড়ায় দেখিয়ে দেন। মন্ত্রী বসে পরে। কিন্তু গান শেষ না হওয়া অবধি চুপ করে বসে থাকতে হবে। আরো মিনিট দুয়েক লাগবে গান শেষ হতে। মন্ত্রীর উস্খুস করে চলেছে। রাজা এরই মধ্যে বার তিনেক রক্তচক্ষু দেখিয়েছে প্রধানমন্ত্রী চুলবুল হায়দারকে। মন্ত্রীর তবু উস্খুস কমে না।

দু মিনিট পার হয়ে গেল। রাজার ইশারায় খাস পেয়াদা আসফারুল হোম থিয়েটারের সুইচ অফ করে ঘর থেকে বের হয়ে যায়। মন্ত্রী মখ খোলার আগেই রাজা দুই লাইন গুনগুন করে ওঠেন “মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি। মানুষ ছাড়া ক্ষ্যাপা রে তুই মূল হারাবি’’

রাজা চোখ মুদে বার তিনেক মানুষ ভজ মানুষ ভজ বিরবির করে। মন্ত্রী আর পারেনা চুপ থাকতে, মৃদুভাবে গলা খাঁকারি দেয়। রাজা বিরক্তি নিয়ে চোখ খুলেন। গলায় উষ্মা নিয়ে জিগেসা করে, কি হয়েছে মন্ত্রী, কেন এতো তড়পানি?
মন্ত্রী হাত কচলে বলেনঃ গুস্তাকি মাফি রাজা মশাই, আপনার সঙ্গীত শ্রবনক্ষণে উপস্থিতির জন্য। কিন্তু নিরুপায় আমি।

আঃ মেলা ভাটবকো না, পয়েন্টে এসো।
হুজুর আবারো ভূমিধ্বস হয়েছে, মারা গেছে প্রায় ৫০।
বলকি? আবার। রাজার কন্ঠে উৎকণ্ঠার বদলে বিরক্তি প্রকাশ পায়। পাহাড় ধ্বসলো কেন?

পাহাড় কেটে নেড়া বানিয়ে ফেলেছে হুজুর, পাহাড়গুলির গাছ কেতে ফেলেছে, বাড়িঘর, হোটেল রিসোর্ট, পিকনিক স্পট কত কিছু হচ্ছে, কিন্তু গাছ কেটে বিক্রি করে দিচ্ছে, পাহাড়গুলি বিরান হয়ে গেছে।

কারা কাটছে গাছ?
ইয়ে যাদের কাছে পাহাড় লিজ দিয়েছি, বিক্রি করেছি। আর দলীয় ব্যবসায়ী, নেতা, মন্ত্রী, প্রতিরক্ষা বাহিনীকে নেয় এই পাহাড় দখলে। প্রকৃতি প্রতিশোধ নিচ্ছে জনাব।
আবারো ফালতু কথা বলছো? যারা পাহাড়ে ব্যবসা করছে ঠিক মত মালকড়ি ঢালছে তো?

জী মহারাজ, তা ঢালছে।
তাহলে এক কাজ কর, জলপাই বাহিনীকে বল, উদ্ধার কাজ করতে।
ওরা তো কাজ শুরু করেছে রাজন। ওদের সদস্যও মারা গেছে।

তাহলে আর কি যা করার ওরা করুক, তুমি দেখো আমার সুটকেস গুলা ঠিকমত গুছানো হল কিনা? ও হ্যা জলপাই বাহিনীর যতজন মারা গেছে মাথা পিছু ৫ থেকে দশ লাখ করে দিয়ে দিও র‍্যাঙ্ক অনুযায়ী।
আর যেসব আম-নাগরিক প্রান হারালো, তাদের কত করে দেব?

তোমাকে মন্ত্রীকে কে বানিয়েছে? তোমার অবসরে যাওয়ার সময় হয়ে গেছে। আম-নাগরিককে কেন টাকা দেবে আলাদা করে? কিছু ত্রাণ পাঠাও, কিছু ঘর তুলে দাও, মিডিয়ার সামনে করবা। মিডিয়া সরে গেলে না করলেও চলবে। মিডিয়া আমাদের হাতের মুঠোয় মুখ খুলবে না তেমন, কেমন দিলাম সেদিন, কোন বড় মিডিয়া মুখ খুলতে সাহস করেনি। সো ডু দ্যাট অ্যাজ আই সে।

ঠিক আছে জনাব বলে মন্ত্রী মাথা চুলকায়। ইয়ে মান্যবর, এতোগুলা মানুষ মারা গেলো, পরিস্থিতি ভালো না আরো বাড়ছে লাশের সংখ্যা। এ পরিস্থিতিতে নাই গেলেন বৈঠকে।
রিয়েলি, রাজা আশ্চর্য হয়ে জিগেসা করে মন্ত্রীকে। কিছু মানুষ যারা পাহাড়ের পাদদেশে বাস করে, তারা মারা তো পরবেই, এদের জন্য রাষ্ট্রীয় কাজ বন্ধ রাখবো?
না মানে রাজা মশাই, রাষ্ট্রীয় কাজ বন্ধ না রেখে জরুরী অবস্থাজারি করি? আর এ অবস্থায় আপনি দেশ ছাড়বেন, লোকে কি বলবে?
তোমার মাথায় বুদ্ধি নাই একফোঁটা, ও হে মন্ত্রী আমি শ্যামদেশীয় রাজা, যে প্রথম রাজা হিসাবে কোন দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে অংশ নেবে। আমার ভাবমূর্তি কত উজ্জ্বল হবে তুমি বুঝ না, গাধামন্ত্রী। তোমার তো ঘটে বুদ্ধি নেই। এ সফরে চমকের আশা করিনা। কিন্তু ভাবের যে উন্নতি হবে তার পাল্লা সেটা হিসেব করেছো? মিডিয়া বারবার বলবে আমিই প্রথম আমিই প্রথম। আগের রাজারা এসব দেশে কি দ্বিপক্ষীয় কিছু করতে পেরেছে? আমি করছি।
তা ঠিক রাজা মশাই আপনার জ্ঞানের কোন তুলনা নাই। কিন্তু……

কিন্তু কি হে অসংরক্ষিত আসনের মন্ত্রী?
না দেশের এমন বিপদকালে আপনি যদি যাওয়া ক্যান্সেল করেন তাহলে কিন্তু আপনার ভাব আরো উজ্জ্বল হবে। দেশের মানুষ ধন্য ধন্য করবে। এর আগে কোন শ্যামদেশীয় রাজা এই কাজ করেনি। আপনি না গেলে আপনার ধন্যি ধন্যি পরে যাবে। আর অচিরেই ইলেকশন, মানুষের মনে আমাদের প্রতি জায়গা তো হেলে গেছে। আপনার বিদেশ যাত্রা ক্যান্সেল করলে, এদের মনে আবার জায়গা পেতে অসুবিধা হবে না।

আসলেই তুমি গাধা মন্ত্রী, না হলে পৃথিবীর কথা না ভেবে তুমি এই হাভাতের গুলার কথা ভাবছো। আগে পৃথিবীর সব দেশের কাছে নিজের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করি তারপর না হয় এই শ্যামদেশের কথা ভাববো।
কিন্তু রাজন, আপনার পিতা বেঁচে থাকলে তো উনি এই যাত্রা ক্যান্সেল করে দিতেন।

তাতে উনার কি লাভ হয়েছে, এদেশের মানুষ উনাকে আজো ভালবেসে মনের মাঝে রেখেছে। তাতে কি উনার অকাল মৃত্যু রোধ করা গেছে। বাপরা যা করে সন্তান্দের জন্য করে। আমার বাপের কর্মের সুফল আমি ভোগ করছি। কিন্তু তাই বলে আমি তার মত এই কীটাণু তুল্য মানুষের কথা ভেবে নিজের সাফল্য থেকে দূরে সরে যাব ভাবাই বাতুলতা। শোন হে, মন্ত্রী নিজে বাঁচলে বাপের নাম। আর কিছু বলার আছে? না থাকলে বিদেয় হও। আর দেখ ভ্রমন প্রস্তুতি ঠিকঠাক হচ্ছে কিনা?

তখনি টুটটুট করে ওঠে মন্ত্রীর সেলফোন, ম্যাসেজ এসেছে। ম্যাসেজ পরে করুন চোখে তাকায় মন্ত্রী রাজার দিকে। আমতা আমতা করে বলে, প্রভু এখন মৃত্যের সংখ্যা ৯০।
তো? রাজা ভ্রু নাচিয়ে জিগেসা করে।

না মানে পরিস্থিতি ভাল না, আরো নাকি বাড়বে, এই অবস্থায় কি আপনি যাবেই? পৃথিবীর অনেক রাজা তাদের দেশের ৫/১০ জন নাগরিক মারা গেলে অনেক ইম্পরট্যান্ট মিটিং কান্সেল করে, নিজেই অবস্থা মনিটর করে। কি ভোটের চিন্তাও করছেন না রাজন?

পৃথিবীর অনেক দেশের প্রধান করে বলে কি আমাকেও করতে হবে? ধ্যাত মিয়া, সবাই যা করেছে তা করে মজা নাই। আর ভোটের কথা বলছো, জনগণ ভোট না দিলেও কি করে ইলেকশনে জিততে হয় তা নিশ্চয় ভুলে যাওনি। তাই জঙ্গনের কথা না ভাবলেও চলবে।

এদেশে প্রায় ১০০ থেকে ১০০০ লোক বিভিন্ন দুর্ঘটনায় বিভিন্ন সময়ে মারা যায়। বিল্ডিং ধ্বসে, পাহাড় ধ্বসে, রোড-অ্যাকসিডেন্টে, কি লঞ্চডুবে, বন্যায়-ঝড়ে। শতাধিক মানুষের মরণ প্রতিনয়ত স্বাভাবিক ঘটনা সে দেশের প্রধানকে কি এক দেড়শ মানুষের মৃত্যুতে মিটিং ফেলে দেশে বসে থাকা কি মানায় বা কতটুকু যুক্তসংগত?

তুমি যাও এখন। মন্ত্রী জী জনাব বলে বের হয়ে যায়। রাজা মশাই আবার গুনগুন করতে থাকেন “মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি। মানুষ ছাড়া ক্ষ্যাপা রে তুই মূল হারাবি’’

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

84 − = 75