গল্পঃ একটি কবিতার জন্য


১।
নীরবতা ভেঙে উঠে পড়লাম আমি। মানিব্যাগ খুলে ভিজিট দিতে চাইলাম। ডাঃ হিরণ্ময় হাসি মুখে বলে – ‘আজকে আর ভিজিট লাগবে না’। আমি অনিচ্ছা সত্বেও কৃতজ্ঞতার হাসি দিয়ে মানিব্যাগে টাকাটা ঢুকিয়ে ফেললাম। মেডিক্যাল রিপোর্টসগুলো হাতে নিয়ে বেরুতে বেরুতে বললাম – ‘স্যার, আমার ফ্যামিলির কাউকে আপাতত বলবেন না। উনারা খুবই ভেঙে পড়বেন’। ডাঃ হিরণ্ময় বিস্মিত হয়ে খানিকক্ষণ তাকিয়ে থাকলেন তারপর বললেন – ‘আচ্ছা…ঠিকাছে। তবে মনে হয় কি তোমার বাবাকে অন্ততপক্ষে জানানো উচিত’। আমি বললাম – ‘চিন্তা করবেন না স্যার, আমি নিজে থেকেই জানাবো। কিন্তু তাদের মানসিক অবস্থাটা একটু শক্ত করি তারপর’


১।
নীরবতা ভেঙে উঠে পড়লাম আমি। মানিব্যাগ খুলে ভিজিট দিতে চাইলাম। ডাঃ হিরণ্ময় হাসি মুখে বলে – ‘আজকে আর ভিজিট লাগবে না’। আমি অনিচ্ছা সত্বেও কৃতজ্ঞতার হাসি দিয়ে মানিব্যাগে টাকাটা ঢুকিয়ে ফেললাম। মেডিক্যাল রিপোর্টসগুলো হাতে নিয়ে বেরুতে বেরুতে বললাম – ‘স্যার, আমার ফ্যামিলির কাউকে আপাতত বলবেন না। উনারা খুবই ভেঙে পড়বেন’। ডাঃ হিরণ্ময় বিস্মিত হয়ে খানিকক্ষণ তাকিয়ে থাকলেন তারপর বললেন – ‘আচ্ছা…ঠিকাছে। তবে মনে হয় কি তোমার বাবাকে অন্ততপক্ষে জানানো উচিত’। আমি বললাম – ‘চিন্তা করবেন না স্যার, আমি নিজে থেকেই জানাবো। কিন্তু তাদের মানসিক অবস্থাটা একটু শক্ত করি তারপর’

চেম্বার থেকে বের হয়েই আমার খুব হাসি পেল। সবাই করুণা করা শুরু করেছে। ডাক্তার সাহেব করুণা করে ভিজিটটা পর্যন্ত রাখেননি। বিগত ৩০ মিনিটের ঘটনাপ্রবাহগুলো একে একে আমার মাথায় ভেসে উঠতে লাগল, হিরণ্ময় স্যারের অনুশোচনা আর দুঃখ মিশানো কথাগুলো আমার কানে একে একে রেকর্ড প্লেয়ারের মত বাজতে শুরু করল। আমার যে অনুভূতিগুলো হচ্ছিল এই অনুভূতিগুলো আমি কখনোই অনুভব করিনি। খুবই জ্যান্ত, হৃদয়বিদারক, নৈরাশ্যপূর্ণ এক অনুভূতি। বাইরে এসে একটা রিক্সায় উঠলাম। ড্রাইভার জিজ্ঞেস করলেন – ‘মামা, কই যাবেন?’ আমি বললাম – ‘সারা সিলেট শহর ঘুরবো মামা। প্রথম বন্দর, তারপর নাইওরপুল তারপর উপশহর তারপর শিবগঞ্জ তারপর এম সি কলেজ, টিলাগড় তারপর এম সি কলেজ হোস্টেল, বালুচর তারপর আম্বরখানা মদিনা মার্কেট হয়ে আমার ক্যাম্পাস তারপর সুরমা’। ড্রাইভার বেচারা খুব বোঝার ভান করে বলল – ‘আচ্ছা’। আমি বুঝতে পারছি উনি মনে মনে ভাবছেন – কোন পাগলের পাল্লায় পড়লাম রে ভাই! রিক্সা চলতে শুরু করেছে আর আমি প্রচণ্ড ভাবাতুর ও স্মৃতিকাতর হয়ে যাচ্ছি। আমার মস্তিষ্কের সেলুলয়েডে ভেসে উঠছে সেই শৈশব থেকে আজ অবধি ঘটে যাওয়া চমৎকার ঘটনাগুলো। মানুষ বড়ই স্মৃতিকাতর। হাতে খড়কুটো না পেলেও স্মৃতি নিয়ে বেঁচে থাকতে চায়।

রাত ১২ টা। সুরমা পয়েন্টে নামলাম। হিরণ্ময় স্যার যে ভিজিটটা নেননি সেই টাকাটা ড্রাইভারের হাতে তুলে দিলাম আর ভালো থাকবেন বলে মুখ ফিরিয়ে চলে আসলাম। আমি জানি ড্রাইভার বেচারা আমার পথের দিকে হা করে তাকিয়ে থাকবেন কিছুক্ষণ। আমি দ্রুত পায়ে হেঁটে যাচ্ছি। রাস্তায় কারো সাথে কথা বলার ইচ্ছে আমার নেই। সুরমার গলিতে রবিন মামার দোকানে প্রায় সবাই বসে থাকে। রুমে গিয়ে রিপোর্টগুলো ব্যাগে ঢুকিয়ে রাখলাম যাতে কেউ দেখতে না পারে। আর যাই হোক মানুষের করুণা নিয়ে বাঁচতে চাই না। লাইটটা অফ করে অন্ধকার করে শুয়ে পড়ি। আমার মনে পড়ে একদিন কাকে যেন বলেছিলাম যে দেশে এত এত ফান্ড রেইজিং হয় আমার যদি কিছু হয় তাহলে তোরা কখনো আমার জন্য ফান্ড রেইজিং করবি না। আমার অবাক লাগে কয়েকদিন আগেও মৃত্যুর প্রতি আদৌ ভয় ছিল না। প্রত্যেকদিনই মনে হত আজকেই শেষ দিন কিন্তু আজকে রিপোর্টগুলো হাতে আসার পর এক ধরনের খারাপ লাগা কাজ করছে। বার বার প্রিয় মুখগুলোর কথা ভেসে উঠছে, আমার চারপাশে যে একদল পাগল আছে তাদের কথা মনে পড়ছে, মাসুক মামার টং, খালেক মামার টং, লাল টং…। কিছু হাসি মুখ কিছু অভিমানী মুখ কিছু ভালোবাসার আর কিছু আত্মার। একে একে সবকিছু ননস্টপ ভেসে আসতে শুরু করল। আমার মাথা ঝিম ঝিম করতে শুরু করেছে। প্রচণ্ড মাথা ব্যথা শুরু হয়েছে। এতদিনে খোঁজে পেলাম আমার এই মাথা ব্যথার কারণ। ‘দুঃখজনক হলেও সত্য যে আপনি সর্বোচ্চ ৩ মাস সময় পাবেন আরো। সরি।’ ডাক্তারের কন্ঠস্বর কানে বেজে উঠল আবার ‘আমরা চেষ্টা করতে পারি কিন্তু আপনাকে আশা দেখিয়ে লাভ নেই। আপনি বরঞ্চ এই কিছুদিন ফ্যামিলির সাথে সময় কাটান আর আমি কিছু ড্রাগস দিচ্ছি এইগুলো পেইনকিলার, আপনার ব্যথাগুলো হ্রাস করবে। আর তাতেও যদি না কমে তাহলে আমি সাজেস্ট করব আমাদের এইখানে ভর্তি হয়ে যাবার জন্য। দে উইল লুক আফটার ইউ’।

সকাল ৭ টা। গতকাল কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম খেয়াল নেই। বিছানায় শুয়ে শুয়ে ভাবলাম – কোন দরকার আছে এই ক’টা দিন ক্যাম্পাসে যাবার? বোরিং ক্লাসগুলো করার? তারপর আবার ভাবলাম – না। যাওয়া দরকার। সবকিছু স্বাভাবিকভাবে চালিয়ে যেতে হবে নাহলে সবাই সন্দেহ করবে। শুরু হল নতুন এক নাটকের। সেই নাটকে আমি প্রধান চরিত্র। একজন দক্ষ অভিনেতা হয়ে সবাইকে ভ্রমে রাখার প্রাণপণ চেষ্টা। এইভাবেই চলতে থাকল আর আমি দিন দিন ঝানু অভিনেতা হতে থাকলাম। যে আমি কখনো মিথ্যে বলতে অনেকবার ভেবেছি সেই আমিই চট করে মিথ্যের পর মিথ্যে বলে অদ্ভুত এক নাটকে ঘোর লাগিয়ে রেখেছি। বিন্দুমাত্রও খারাপ লাগেনি, অপরাধবোধ জাগেনি একটিবারের জন্যেও। প্রস্থানের আগে কিছু কাজ হাতে নিয়েছিলাম। অভিমান বাড়ানোর কাজ। যাদের সাথে খারাপ সম্পর্ক ছিল তাদেরকে আমি প্রভাবিত করেছি আমাকে আরো অপছন্দ করতে, যাদের সাথে খুবই অন্তরঙ্গ সম্পর্ক ছিল তাদেরকে একপ্রকার অবহেলা করে দূরে রেখেছি। আসলে মানুষ অদ্ভুত প্রাণি। মানুষের সহ্য ক্ষমতা অনেক কিন্তু বারবার একই জিনিসের পুনরাবৃত্তি তাকে ভাবিয়ে তুলে, নিজেকে হেয় প্রতিপন্ন বোধকরে তখনই নাটাই থেকে ছিঁড়ে যেতে থাকে রশ্মিগুলো এবং উড়ে যেতে থাকে সম্পর্কের ঘুড়িগুলো- দূর তারপর একটু দূর তারপর বহুদূর! এই পরিণতিগুলি আমি সচেতনভাবে লক্ষ্য করি আর মনে মনে ভাবি – মানুষ কত রহস্যজনক প্রাণি। তাকে বুঝে উঠা বড্ড কঠিন। এভাবেই চলতে থাকে নাটকের রঙ্গমঞ্চে আমার বীরদর্পে হাঁটাচলা।

তারপর একদিন। তখনও আমার হাতে অনেক সময় ছিল ডাক্তারের হিসেব অনুসারে। গুণে গুণে দেখলাম প্রায় দেড় মাসের মত। কিন্তু আমার অভিনয় জীবনের আপাতত অন্ত হল। মাথা ঘুরে নাকি পড়ে গিয়েছিলাম, যখন হুঁশ হল তখন হসপিটালের বেডে। গত ৬ ঘন্টা যাবত নাকি আমি প্রচণ্ড ঘুমে ছিলাম। শুনেছি মানুষের যখন ভালো ঘুম হয় তখন নাকি মানুষ ভালো ভালো স্বপ্ন দেখে। কিন্তু আমি কী স্বপ্ন দেখেছিলাম সেদিন সেইটা আমার মনে নেই। যারা নাকি স্বপ্নের কথা হুবহু বলতে পারে তারা নাকি উর্বর মস্তিষ্কের হয় কিন্তু আমার মস্তিষ্ক এতটা উর্বর সেখানে যা চাষ করা হয় সেটাই মরে যায়। সুতরাং দেখে থাকলেও মনে থাকার কোন সম্ভাবনাই দেখি না। সবাই চলে গেলে বাবা-মা আমকে জড়িয়ে ধরে কান্নাকাটি শুরু করলেন। আমি বুঝতে পারলাম তারা সবই জেনে গেছে। সুতরাং প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত সবই খুলে বললাম। তারা চুপচাপ শুনে গেল। যেন তারা মুগ্ধ শ্রোতা, খুব মুগ্ধ হয়ে কোন রোমাঞ্চকর গল্প শুনছে। অবশ্য বন্ধু মহলে সুনাম ছিল গল্প কথক হিসেবে। আমি বলেছি আর তারা মুখ হা করে গিলেনি এমনটা কখনো হয়নি। একদিন এক বন্ধু কে গোলচত্বর থেকে গেইট পর্যন্ত আমার এক রোমাঞ্চকর প্রেমকাহিনি শুনালাম আর সেও আমার জন্য দুঃখ প্রকাশ করল। তারপর যখন বললাম গল্পটা বানিয়ে বলেছি তখন তার মুখটা দেখার মত ছিল।

যাই হোক, আমার দিন কাটতে লাগল একটা রুমে আবদ্ধ হয়ে। সবাই জেনে গিয়েছিল আমি অসুস্থ তাই বাবা-মা কে আগেই বলে দিয়েছিলাম যে আমার আসলে কী হয়েছে সেটা না বলে যাতে বলে লো প্রেশার ছিল তাই…। অবশ্য লো প্রেশারের কথা শুনলে কেউ অবিশ্বাস করবে না তার কারণ আমার দৈহিক অবস্থা। বড্ড শুকিয়ে গিয়েছিলাম। মানসিক আর শারীরিকভাবে অসুস্থ হয়ে যাচ্ছিলাম দিন দিন। আমার ছোট দুই বোন সারাক্ষণ আমাকে হাসানোর দায়িত্ব নিয়েছে। যখনই একটু হাসছি তারা মুখ ফিরিয়ে চোখ মুছছে। আমার পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা খারাপ না সুতরাং আমি সবই দেখি। যখনই এইরকম অবস্থার সম্মুখীন হই তখনই তাদের রুম থেকে বের করে দেই যাতে তারাও কাঁদতে পারে আর আমিও একটু নির্ভার হই। কয়েকদিন পরেই তারা আমার জন্মদিনে প্রতিযোগিতা করে উইশ করতে পারবে না আর জিজ্ঞেস করতে পারবে না যে কে আগে উইশ করেছে। আমার মত কেউ তাদের সবকিছুতে উৎসাহ যোগাবে না। প্রতিযোগিতা করে আমার জন্য গিফট কিনে দিতে পারবে না। তাদের মনের কথাগুলো খুলে বলার মত ভালো শ্রোতা পাবে না। আমার ছোট ভাইটা আমার দিকে নির্বাক তাকিয়ে থাকে। এমনিতেই ভাবুক মানুষ কম কথা বলে তার উপর ইদানিং আরো বেশি শান্ত হয়ে গেছে। আর আমার মা আমার পছন্দের সব খাবার রান্না করে আমাকে খুশি রাখার ব্যর্থ প্রয়াস করেই চলেছেন। আমিও খেয়ে তৃপ্তির ঢেঁকুর ফেলি কিন্তু আসলে কোনকিছুরই স্বাদ পাই না আজকাল। আমি ভাবি আমি ইদানিং বড় ইমোশনাল হয়ে গেছি। এমনটা আমি আগে ছিলাম না। এই অসুখটা আমার সবকিছুকেই ধ্বংস করে দিল। আমার আত্মবিশ্বাসকেও যা আমার জন্য এখন খুবই দরকার ছিল। এই সময় একটা প্রশ্ন মাথায় আসছে – আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলার মানেই কি মৃত্যু?

আজকের দিনটা একটু অদ্ভুত যাচ্ছে! সকাল থেকেই একের পর এক চমক। বাবাকে ঐ ডায়েরির কথা বলেছিলাম যেখানে রূপা কে নিয়ে লেখা ৪০ টির মতো কবিতা আছে। উনাকে বলেছিলাম আমি যখন পাড়ি দিব অসীমের দিকে পারলে যাতে আমার এই বইটি বের করে। আমার ধারণা ছিল বইটি কখনোই বের হবেনা। কবিতাগুলোকে কবিতা বলা যায় না, পবিত্র অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ বলতে হয়। কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার হচ্ছে আজ সকালে মোড়ক প্যাচানো কয়েকটি বই নিয়ে উনি হাজির। আমি কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। উনি এসেই বলল – ‘উঠ। মোড়ক উন্মোচন হবে’। আমার কিছু আত্মীয় স্বজনও এসেছে যাদের সাথে সাহিত্য, সংস্কৃতি নিয়ে কিছু কাজ করেছি। আমার একই সাথে আনন্দ এবং ভয় করছিল। মোড়কটা খোলার পর দেখতে পেলাম আমি যেমনটা চেয়েছিলাম ঠিক তেমনই হয়েছে প্রচ্ছদটা – নিয়ন আলোয় দাঁড়িয়ে আছে একটি নীল শাড়ি পরা মেয়ে, চুলগুলো খোপা করা, নিয়ন আলোর ছড়িয়ে পড়া হালকা হলদে আভার ভেতর নীল শাড়ি পরা মেয়েটা দারুণভাবে ফুটে উঠেছে। মুখটা ঠিক রূপার মত। আমি মনে মনে বাবাকে ধন্যবাদ দিলাম। প্রচ্ছদটা উল্টাতেই চোখে পড়ল উৎসর্গপত্রটা – ‘রূপা কে’। উৎসর্গপত্রটা দেখে একটা চাপা নিঃশ্বাস ছাড়লাম আর মনে মনে বললাম – ‘এইটাই শেষ উপহার’। এই বই প্রকাশের পর যা হবার কথা তা যদি হয়ে যায়? আমার মাথায় ঘুরপাক খায় প্রশ্নটা। আবার মনে হয় আমার চিন্তাগুলো সত্যি নাবালক। আমি ঠিক উদযাপন করতে পারছিলাম না আমার প্রথম কবিতার বইয়ের মোড়ক উন্মোচন। অবশ্য আমার বাবারও কোন দোষ নেই। উনি চেয়েছেন তার ছেলেকে যাবার আগে একটি আনন্দময় মুহূর্ত উপহার দিতে। আমার বাবা নিজেও একজন লেখক মানুষ। একসময় অসাধারণ কবিতা লিখতেন। কবিতাগুলো পড়ে আমি মুগ্ধ হতাম। ভালো একজন সাহিত্যিক হতে পারতেন উনি কিন্তু আমাদের সংসার দেখতে দেখতে সবকিছু প্রায় ছেড়ে দিয়েছেন। এখনো লেখার তাগাদা আসে কিন্তু উনি আর সময় করে উঠতে পারেন না।

২।
আমার দাদার ভাষ্যতে যা শুনেছেন তা তার ডায়েরি থেকে উদ্ধৃত ছিল কিন্তু তারপর আর লিখতে পারেননি। উনার অবস্থা আরো বেশি নাজুক হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু শেষের দিনগুলি কেমন ছিল সেটা সবাই জানেন না। ‘দ্বিতীয় বসন্ত’ বইটি বের হবার পর সবাই জেনে গিয়েছিল যে উনার ব্রেইন টিউমার ধরা পড়েছে। আর বেশিদিন বাঁচবেন না। বই প্রকাশের খবর এবং অসুস্থতার খবর উনার বন্ধু মহল, শুভাকাঙ্ক্ষী, শিক্ষকমণ্ডলী সবার কাছেই পৌঁছে গিয়েছিল। অনেকেই সাহায্যের জন্য এগিয়ে এসেছিল। অনেকেই অনেক পরামর্শ দিচ্ছিল। সে যাদেরকে পছন্দ করত না তারাও তার জন্য সমবেদনা জ্ঞাপন করে গেল। দাদা বিরক্ত হয়ে একদিন বললেন যে তার রুমে যাতে কাউকে ঢুকতে দেয়া না হয়। তবে রূপা নামে যদি কেউ আসে তাহলে যাতে বাধা না দেই। আমি অবাক হয়ে তার দিকে তাকালাম, জিজ্ঞেস করলাম – ‘রূপাটা কে?’ সে ক্ষীণস্বরে বলল – ‘ঐ যাকে নিয়ে কবিতাগুলো লিখেছি’। দাদা কথা বলতে পারছে না ইদানিং। একটু কথা বলতেই তার অনেক কষ্ট হচ্ছে। প্রায় সময় ঘুমিয়ে থাকে। তাকে দেখলে আমার অসহ্য যন্ত্রণা হয়। সে এমন ভেঙে কখনোই পড়েনি, আমি মনে মনে ভাবছিলাম ভগবান মানুষটাকে একটু তাড়াতাড়ি শান্তি দিয়ে দেন।

দাদাকে বললাম – ‘রূপার ঠিকানা দাও, নাম্বার টাম্বার থাকলে দাও। আমি ডেকে আনি তোমার যদি দেখা করার ইচ্ছে থাকে’।
সে না করল। বলল – ‘আসলে যাকে রূপা বলছি সে জানেই না যে সেই রূপা। সে বুঝতে পেরেছে অনেক কিছু কিন্তু নিশ্চিত হতে পারেনি সেটা সম্পর্কে’। আমি বিস্মিত হয়ে দাদার দিকে তাকিয়ে থাকলাম আর বিড়বিড় করে বললাম – ‘তাহলে…?’। দাদা ভাঙা চোয়ালে হাসির অভিব্যক্তি ফুটিয়ে বলল – ‘ঐ ৪০ টা কবিতার মধ্যে ১ টা কবিতা আছে যার মাধ্যমে সে নিশ্চিত হবে। সেই কবিতায় আমি কিছুই লুকায়নি। সুতরাং সে যদি পড়ে থাকে আর ধরতে পারে তাহলে আসবে হয়তো আর না আসলে তো আরো ভালো। শুধু শুধু একটা মানুষকে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলার কোন দরকার নেই।’ আমি আসলে বুঝতে পারছিলাম না তাকে কী বলব। আমি চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিলাম আর ভাবছিলাম মানুষটা যাবার সময়ও রহস্যময় থেকে গেল। আর আমার ভেতর একটু একটু করে আগ্রহ মাথা চাড়া দিতে লাগল রূপা কে সেটা জানার জন্য।

কিন্তু আমার অপেক্ষার প্রহরটা দীর্ঘ হয়নি। পরেরদিন সকালে এক মেয়ে এসে হাজির। উনাকে আমি আগেও দেখেছি, দাদা উনার কথা আমাকে বলেছে। রুমের সামনে আমাকে দেখেই জিজ্ঞেস করল – ‘কেমন আছো? তোমার দাদা কেমন আছে? তার সাথে একটু দেখা করব’। আমি খুবই অপ্রস্তুতভাবে তাকে বললাম – ‘আমি ভালো আছি কিন্তু দাদা রূপা নামের একজনকে ছাড়া কাউকে ভেতরে পাঠাতে মানা করেছেন। আমি সরি।’ বলেই জিহ্বায় কামড় দিলাম কেন যে রূপার নামটা বলতে গেলাম! কোনদিক দিয়ে যে আবার কি রটে যায়! আপুটা দীর্ঘশ্বাস চাপা দিয়ে বলল – ‘আমিই রূপা’‘কিন্তু আপনার নাম তো…’! আমার ভূত দেখার মত অবস্থা হল। উনার দিকে তাকাতেই লক্ষ্য করলাম উনার গায়ে নীল শাড়ি, কানে ঝুমকা, চুলগুলো খোঁপা করে বাঁধা ঠিক প্রচ্ছদের মেয়েটার মত। দাদা ভেতর থেকে আমাদের কথোপকথন শুনতে পাচ্ছিল। উনাকে রূপার কথা বলতেই ইশারায় ভেতরে পাঠাতে বলল।
রূপা ভেতরে ঢুকল। আমি বাইরে এসে দাঁড়ালাম। উনার সম্পর্কে শোনা কাহিনিগুলো যোগ করার চেষ্টা করলাম। রূপার কন্ঠ শোনা যাচ্ছে – কি অবস্থা?
– খুবই ভালো। কি অবস্থা?
– আমার? যেমনটা হবার কথা।
– মানে?
– মানে খুবই ভালো
– ও আচ্ছা। তারপর?
– তারপর আর কি? কিছু গল্প জমা ছিল। শ্রোতা পাচ্ছিলাম না তাই চলে আসলাম।
– ওয়াও। তাহলে দিনটা ভালোই কাটবে। অনেকদিন ধরে কেউ গল্প শোনায় না।
– হুম সেটাই। আচ্ছা আর কতদিন পাওয়া যাবে শ্রোতা হিসেবে? কি মনে হয়?
– ঠিক জানি না কিন্তু বেশিদিন নাই। সুতরাং যত গল্প আছে সবই শুনে ফেলতে হবে আজকেই। আগামীকালের কোন ভরসা নাই।
– হুম। তাও ঠিক। শেষপর্যন্ত ইনট্যুশন ঠিক হয়ে গেল?
– হা হা হা…। আমার ইনট্যুশন কখনো ভুল হয়নি আজ পর্যন্ত।
– হুম সেটাই। আমিও তাই ভাবছি। তাহলে গল্প শুরু করি?
– হুম অবশ্যই। সময় কম।
– মনে আছে আমাদের প্রথম কথোপকথনটা কীভাবে শুরু হয়েছিল?
– হুম আছে
– তাহলে গল্পটা বলি। সেইরকমভাবেই শুরু হয়েছিল দু’জন মানব-মানবীর প্রথম কথোপকথন। কিছুটা ভালোবাসা ছিল, কিছুটা মোহ ছিল, কিছু ভয় ছিল আবার কিছু আত্মবিশ্বাসও। সবকিছু ঠিকঠাকভাবেই চলছিল। দু’জনের ভেতর প্রচণ্ড বোঝাপড়া ছিল। তাদের ভেতর বিশ্বাস ছিল – একে অপরের প্রতি বিশ্বাস…।
– সবকিছুই যে ছিল ছিল! ঘটনা কি?
– না। আসলে কয়েকদিন পরই তাদের কাহিনি বিগত হয়ে যাবে তো তাই।
– ও আচ্ছা। তারপর?
– তারপর…

রূপা বেডের পাশে বসে গল্প বলেই যাচ্ছে আর দাদা ‘হুম’, ‘ও আচ্ছা’ বলে চুপচাপ শুনে যাচ্ছে। তারা দু’জন ছাড়া আরেকজন তাদের গল্পগুলো শুনেছিল সেদিন। সে আমি। কি নির্বিকারভাবে তাদের গল্পগুলো বলে যাচ্ছে কিন্তু কারো মুখে কোন উত্তেজনা নেই যেন গল্পটা আজই শুনছে, তাদের দেখে মনে হয় না কিছুদিন পরই সবকিছুই উলটপালট হয়ে যাবে। তাদের দেখে মনে হচ্ছিল যেন মৃত্যু কোন ব্যাপারই না। কি দক্ষ অভিনেতা-অভিনেত্রী হয়ে উঠেছিল দু’জন! একবারের জন্যেও চোখ মুছতে দেখিনি দু’জনকে। ঐ দুই মানব-মানবীর গল্পটা ঠিক আমার দাদা আর রূপার মতোই ছিল। এমনকি সমাপ্তিটাও। কি অদ্ভুত মিল!

সেদিন অনেক রাত করেই ফিরেছিল রূপা। বলেছিল – ‘কাল আবার আসব। খেয়াল রাখো দাদার’। রূপা যাবার পর দাদা আমাকে বলছিল – ‘শিট! শুধু একটা কবিতার জন্য মেয়েটা আমৃত্যু অশান্তিতে ভুগবে। ঐ কবিতাটা বইটাতে দেয়াই উচিত হয়নি’।

রূপা এসেছিল পরেরদিন। কথা রেখেছিল কিন্তু দাদা কথা রাখেনি। রুমের বাইরে দাঁড়িয়ে যখন খবরটা দিলাম তখন রূপা বিড় বিড় করে বলল – ‘গর্দভটা শেষবেলায়ও আমার কথা রাখল না’। আমি তাকে ভেতরে যেতে বললাম। সে বলল – ‘না যাব না’। আমি নির্বাক হয়ে তাকিয়ে আছি তার দিকে। সে মিষ্টি করে হেসে বলল – ‘যাই। দেখা হবে আবার আর তোমার দাদাকে একটা হলুদ পাঞ্জাবী পরিয়ে দিও। বেচারার হিমু হবার খুব শখ ছিল। আমাকে তো রূপা বানিয়েছেই কিন্তু …।’ বলে দ্রুত পায়ে চলে গেল। আমি তিনতলার জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে দেখলাম রূপা রিক্সায় উঠেছে। সে আজ আর দক্ষ অভিনেত্রী নয়। তাকে দেখলাম নীল শাড়িতে চোখ মুখ ঢেকে কান্না আটকানোর ব্যর্থ প্রয়াস করে যাচ্ছে। দেখেই বুঝা যাচ্ছে মেয়েটা কি পরিমাণ কান্না নিজের ভেতর জমা করে রেখেছিল।

দাদা এই দৃশ্য দেখলে একটুক্ষণ চুপ থেকে বলতো – আসলে রূপাকে কান্নাতে মানায় না!

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

5 + 3 =