সেদায় লেকা বেতাবেতেৎ ঞাম রুয়ৗড় লৗগিৎ তবে দেবন হুল গেয়া হো

সাঁওতাল বিদ্রোহ বা সান্তাল হুল এর সূচনা হয় ১৮৫৫ সালে পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ ও বিহারের ভাগলপুর জেলায়। ইংরেজ আমলে স্থানীয় জমিদার, মহাজন ও ইংরেজ কর্মচারীদের অন্যায় অত্যাচারের শিকার হয়ে সাঁওতালরা ঐক্যবদ্ধভাবে তাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তোলে।এটি ছিল তাদের বিরুদ্ধে প্রথম সশস্ত্র গণসংগ্রাম। তাদের এই আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয় সিধু, কানু, চাঁদ প্রমুখ।
সাঁওতাল জাতির ইতিহাসে সিধো-কানুর নেতৃত্বে সাঁওতাল যুদ্ধই ছিলো সর্বাধিক বৃহত্তম এবং গৌরবের বিষয়। তাদের এই বিদ্রোহই মূলত ভারতবর্ষে স্বাধীনতার বীজ বপন করে গিয়েছিল।

আমরা গরীব মানুষ,
আপনাদের ভাষায় নীচু জাত
চাষ বাস করে পেটে দুটো ভাত জোগাই
না না, জমি নিয়ে আমাদের
মাথা ব্যথা ছিলোনা কখনোই
চানু যতটুকু চাষ করে পারে নেক না
ওতো ওরই অধিকারের ফসল
তবে ভাইবেন না আমরা দুর্বল ছিলাম
এক টানে ধনুকে ছিলা পরিয়ে
নিমিষে বুনো শুয়োরের কলজেটা গেঁথে দিতে পারতাম
এমনেই পেটে ভাতে দিন কাটছিলো সুখে
এমনসময় সাদা চামড়ার ফিরিঙ্গিদের চরেরা এলো
বললো, “তোমাদের ভাতের ক্ষুধা আর থাকবে না
এই যে আমাদের মত বাহারি জামা দেবা গায়ে”
আর সুখ কে না চায় বলুন।
কেন ফেরাবো তাদের!

টাকা দিলো টিপসই নিলো
কিন্তু ভাত আর এলো না পেটে
মানুষ রূপি শুয়োরের লোভ পরলো মেয়েদের দিকে
বলেন তো আপনার পরিবারের মেয়েদের দিকে
লোভ দিলে মাথা ঠিক থাকে?
কানু দা – সিধু দা কইলো আর না
দ্যাশ থেকে শুয়ার তাড়াইতেই হইবো
আর এক তীরে শুয়োর মারাতো আমাগো ডালভাত
অরাও যেন কি নিয়া আইলো,
বন্ধুক না কি জানি নাম
তীরের চাইতেও জোরে যায়
আনুক, মরতে ডরাই নাকি?
আর আমাগো মাইয়ারা, সেকি ত্যাজ
লাঠি বল্লম দিয়া সেকি যুদ্ধ!

কামার, কুমোর, গোয়ালা, তেলি, চামার, বাগদি, হাড়ি, ডোম
তারাই আইলো, শুয়ার তাড়াবোই।
তাড়াইছিলামও! আমাগো মাটি আমাগোই হইছিলো।
কিন্তু কিন্তু
অই যে ওগো বন্দুক
শেষতক পারলাম না।
কানু দা- সিধু দারে ঝুলাইয়া মারলো
আমি অবশ্য ততদিনে তা দেখার জন্য ছিলাম না।
৩৬টা গ্রাম পোড়াইলো, কত মারলো।
হাইরা গেছিলাম তখন
পরে আরো যুদ্ধ করছেন আপনারা
ফিরিঙ্গি-মছুয়াগো লগে
জিতেছেনও নাকি
জিতছেন তো??
ভাইবা দেইখেন তো …
আর যদি মনে হয় হারতেছেন
সিধু কানুরে খুঁজেন
তয় তার আগে সিধু কানুর বোনদের খোঁজেন
যারা বল্লমের এক খোঁচায়
শুয়ারের চোখ উপড়াইয়া নিবে
দেখেন আমাগো মত শিরদাঁড়া বানাইতে পারবেন কিনা ………
[লেখাটা সাঁওতালি ভাষায় লিখতে পারলে ভালো হতো। কিন্তু সেই যোগ্যতা আমার নাই। তাই সাঁওতাল বিদ্রোহের সময়কার একটা গান দিলাম। যাতে সাঁওতালি ভাষার ফ্লেভারটা পান ]
গানটি ভাগলপুর ডিভিশন এবং তৎকালীন বীরভূম জেলার প্রতিটি সাঁওতাল গ্রামে বিদ্রোহের উত্তাল ঢেউ তৈরি করেছিল।

“নেরা নিয়ৗ নুরু নিয়ৗ
ডিঁডৗ নিয়ৗ ভিটৗ নিয়ৗ
হায়রে হায়রে ! মাপাক্ গপচ্ দ।
নুরিচ নাঁরাড় গৗই-কাডা,
নাচেল লৗগিৎ পাচেল লৗগিৎ
সেদায় লেকা বেতাবেতেৎ ঞাম রুয়ৗড় লৗগিৎ
তবে দেবন হুল গেয়া হো।”

অর্থাৎ-
স্ত্রী পুত্রের জন্য
জমি জায়গা বাস্তু ভিটার জন্য
হায় হায় এ মারামারি, এ কাটাকাটি।
গো-মহিষ, লাঙ্গল,
ধন সম্পত্তির জন্য
পূর্বের মত সব আবার ফিরে পাবার জন্য
আমরা অবশ্যই বিদ্রোহ করব।
‘সিধু-কানু হুল দয়
মাঁয়াম গাডা অৗতুয়েন
ইংরাজ সরকার আবো দিশৗম
মেতাঃবোনকো সাঁওতাল বিদিন’

অর্থাৎ-
সিধু-কানু বিদ্রোহ করেছে
রক্তের নদী বয়ে গেল
ইংরাজ সরকার বলে আমাদের দেশ
আমাদের বলে সাঁওতাল নাস্তিক।

তথ্যসূত্র : ১. সুপ্রকাশ রায়, সাঁওতাল বিদ্রোহ (গানটা)
২. পাভেল পার্থ: সাঁওতাল বিদ্রোহ ও ঝলসানো আদিবাসী গ্রাম, দৈনিক সমকাল, ৩০ জুন ২০০৯
৩. মুহম্মদ আবদুল্লাহ্ রসুল: সাঁওতাল বিদ্রোহের অমর কাহিনী
৪. ছবি কৃতজ্ঞতা -উইকিপিডিয়া এবং অদিতি আদৃতা সৃষ্টি

লেখার সময়: #৩০ই_জুন_২০১৭
#সাঁওতাল_বিদ্রোহ_দিবস

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 4 = 2