….এবং পুরুষ

‘ধ্যাত বোকা, ছেলেদের কাঁদতে আছে নাকি ?’ পুরুষকে তার মা বলে । তারপর থেকে পুরুষ কাঁদে না । ভীষন কান্না পেলেও কাঁদে না। ‘কাঁদতেই যদি হয় তো কাঁদবে মেয়েরা । ছেলেরা নয়’এটাও পুরুষকে বলে তার মা । পুরুষ তাই আরোও কাঁদেনা । মেয়েদের জামা গলায় না গায়ে । পাছে ‘লেডিস’ মার্কা বলে রাগায় কেউ হাতে মেহেদিও লাগায় না কোনো দিন । পুরুষরা মেয়ে হতে পারেনা । তারা আলাদা হবে একে অপরের থেকে । সারা দিন এই বাস এই ট্রেন অটো চেঞ্জ করে করে চাকরি খুজে বেড়াবে পুরুষ । ‘দাদা চাকরির ব্যাপারটা একটু দেখবেন । মায়ের শরীরটা খারাপ । ছেলেটা এক ক্লাশ বদল করে আর এক ক্লাশে উঠল । ভেবেছিলাম পড়াব না । হাতে টাকা নেই । গরবীর বাচ্চা কী আর পড়বে । কিন্তু ওর মা জেদ ধরল । ছেলেকে পড়াবেই । এমনিতেও ছেলেটার পড়াশোনাতে মাথা ভালো দাদা । প্লীজ একটু চাকরি দেখবেন ‘ ধরনের হাজারো পায়ে-হাতে ধরা আবেদন করবে পুরুষ ।কেরানির চাকরি পাবে বেসরকারি স্কুলের। নতুন স্কুল । ঘন্টা মারা, ঠিক ঠিক সময়ের চাবি দিয়ে ঘর খুলে দেওয়া , চা বানানো , চা দেওয়া , স্কুলে পরীক্ষা শুরু হলে ঘরে ঘরে খাতা বিলিয়ে দেওয়ার কাজ করবে । দিতে দেরি হলে উপরি পাওনা গালি খাবে । গালি খায় পুরুষ । কিন্তু মাখে না । পুরুষদের ওসব মাখতে নেই । মাখলেই বেকার খোস পাচড়া হবে । চুলকানি হবে । ঝামেলা বাড়বে । তার চেয়ে বরং কিছুই হয়নি ভাব নিয়ে সব হজম করা । তাহলেই চাকরি টিকে থাকবে । রাখেও টিকিয়ে । মাসের পর মাস । বছরের পর বছর । বেকার পুরুষ একটা কাজ পেলেই গাছের মত হয়ে যায় । স্থির । ধারাবাহিক । নিজের সমস্থ ইচ্ছে মালিকের কাছে বিকিয়ে দিয়ে পুরুষই একমাত্র গাছ হতে পারে । পুরুষ জানে গুতোগুতি আর ঘামের গন্ধে অস্থির হয়ে যাওয়া বাসে ‘লেডিস’দের তার কোনো স্পেশাল সিট নেই, ব্যাঙ্কে-রেশনের দোকানে-চাকরির পরিক্ষার ফর্ম তোলার লাইনে তার জন্য স্পেশাল কোনো লাইন নেই, ‘মাতৃ ভূমি লোকাল’এর মত স্পেশাল কোনো ট্রেন নেয় । পুরুষদের জন্য কিচ্ছু থাকে না । হাতে চাকরি না থাকা বেকার পুরুষের কাছে প্রেমিকা থাকে না এমনি যৌথ পরিবারে বয়স্ক মা-বাবারাও থাকে না । পুরুষ কাঁদে না । কান্না তো মেয়েদের জন্য । তিন চার তলা সিড়ি ভাঙতে ভাঙতে এই বিল্ডিং থেকে সেই বিল্ডিং করে চাকরির ইন্টারভিউ দেওয়া পুরুষ জানে সকাল সাতটায় দোকান খুলে রাত এগারোটা পর্যন্ত বসে থাকতে । পুরুষই পারে । পারে বলেই হয়তো পুরুষের দিকে কেউ দেখে না । এমনকি তারই মত ভুক্তভুগী পুরুষও নয় । তার পরেও পুরুষ শক্ত থাকে । কথা বলে না । কথা বললেই নারী নির্যাতন কেসের ঝক্কি । অ্যাসিড হামলার মামলা । শ্লীলতাহানীর খাড়া । পুরুষ ভয় পায় । প্রচন্ড ভয়ে ভয়ে থাকে । অবশ্য পুরুষকে ভয় মানায় না । অকুতোভয়ী । তারপরেও পুরুষ অভদ্রতামী করা মেয়ের সাথে ঝামেলা করতে পারবে না । করলেই, ‘কেমন পুরুষ হয়েছ হ্যা, মেয়েদের সঙ্গে ঝামেলা কর ?’ পুরুষ চুপ করে যায় । কথা বলে না । তার পুরুষত্বতে লাগে । পুরুষদের কোনো মান সম্মান থাকতে নেই । ফোটোশপে তার নগ্ন ছবি চার দিকে ছড়িয়ে যাবার ভয় থাকতে নেই । কারণ ভয় শুধু মেয়েদের । মান সম্মানের ভয় । বিয়ে না হওয়ার ভয় । ছেলেদের সে সব কিছু থাকে না । সমাজ থাকে না । সম্মান থাকে না । তারপরেও নাকি বিয়ে না হবার ভয়ও থাকতে নেই । হায় ইশ্বর ! সবাই যে বলে এক মাটি দিয়েই নাকি তুমি সব বানিয়েছ । তারপরেও ফারাক কেন ? পুরুষদের কেন ‘স্পেশাল চ্যাপ্টার’ থাকবে না ? মাঝরাতে সংসার চালানোর জন্য যে পুরুষ এটিএম গার্ড দিতে গিয়ে ডাকাতদের গুলিতে মারা যায় তার খবর মেয়েদের মত কেন ফলাও করে লেখা হবে না ? পুরুষ তা জানে না । জানতেও চায় না । চাকরি না করা মেয়েকে বাড়িতে নিয়ে আসতে পুরুষের কোনো আপত্তি থাকে না । তারপরেও চাকরি করা স্ত্রী কে পুরুষ ভীষণ ভয় পায় । এই হয়তো মুখ ফসকে বলল কেউ, ‘উমুকের বউ তো উমুককে বিড়ি খাবার টাকা পর্যন্ত দেয়… ।’ অথচ পুরুষ কখনো প্রশ্ন করে না, ‘অত দামী ফেসওয়াস এই বার না নিলে হত না ? ‘ পুরুষ চুপ থাকে । বাবা চুপ থাকে । বরং তার ওভার টাইম করে । আগামী পুজোয় বউকে বেনারসী কিনে দেবার জন্য ওভার টাইম করে । শেষ বয়সে মা-বাবাকে তীর্থ যাত্রায় পাঠানোর জন্য ওভার টাইম করে । একটু দূরের স্কুলে ছেলেকে পড়তে পাঠাতে সাইকেল কিনে দেওয়ার জন্য ওভারটাইম করে পুরুষ । রাত তিনটে অবধি ফলের দোকানে বসে, শেষ রাতে রিক্সা চালিয়ে কিংবা প্লাটফর্মে দাঁড়িয়ে ২০টাকার ঘুষ খেয়ে পুরুষ বাড়তি উপার্যন করে । তারপরেও পুরুষরা নিজেদের সম্পর্কে বলতে শুরু করলেই পুরুষদের বলা হবে ‘নারী বিদ্ধেষী’ । কিংবা আরো অনেক কিছু । তারপরেও পুরুষ চুপ থাকে । পুরুষ চুপ থাকবে । কারণ তারা জানে স্বাধীনতা মানে একটা ভীষণ দায়িত্ব । সংসারের দায়িত্ব । সমাজের দায়িত্ব । সম্মান বাঁচানোর দায়িত্ব । সম্মান বাঁচাতে পুরুষ জানে মেয়ের বিয়ের আগের রাতেই কিভাবে পাত্রপক্ষকে দেওয়ার জন্য যৌতুক জোগাড় করতে হবে । আর পুরুষ জানে বলেই পুরুষক নিজেকে নিয়ে কোনো ইজম বানায় না । বরং অন্যরা পুরুষ সমন্ধীয় বিকৃত ‘ইজম’ বানায় । সেই ‘ইজম’এ চোখ বুলিয়ে নেয় পুরুষ। তারপর আবার বাড়ির মেঝে মোজায়েক করার জন্য, রাতে ঘুমানোর আগে পুরো বাড়ি যেন দুমুঠো খেয়ে ঘুমায় তার ব্যবস্থা করার জন্য এ জায়গা সে জায়গা ঘুরে বেড়ায় । রাত ফুরোয়, দিন ফুরোয়, নটে গাছ মুড়োয় কিন্তু পুরুষ দিন দিন পুরুষ হয়ে ওঠে । পুরুষ দিন দিন গাছ থেকে বৃক্ষ হয়ে ওঠে । তারপরেও পুরুষের জন্য কেউ কখনো কবিতা লেখে না , গল্প লেখে না । লিখবেও না । কারণ সে পুরুষ । তার কোনো অনুভূতি নেই । তাকে নিয়ে সাহিত্য-শিল্পে আদিখ্যেতা করা যায় না ।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

84 − 81 =