ভারতে যখন মুসলমানের উপর হামলা হয় তখন আপনারা কোথায় থাকেন?

অনেকেই মনে করেন বাংলাদেশের সংখ্যালঘু নিপীড়নের প্রতিবাদ করতে হলে আমাকে অতি অবশ্যই ভারতের মুসলিমদের নিপীড়নের প্রতিবাদ করতে হবে। একবার দুইবার করলে হবে না। প্রতিবার করতে হবে। যতবারই আমি নাসিরনগর বা চট্টগ্রামের কিংবা ফরিদপুরের হিন্দুদের উপর নিপীড়নের কথা বলব ততবারই আমাকে সবার প্রথমে ভারতের সংখ্যালঘু নিপীড়নের ফিরিস্তি দিতে হবে তারপর আমার দেশের কথা বলতে পারি। অনেকটা কোন শুভ কাজ শুরু করার পূর্বে গায়ত্রী মন্ত্র উচ্চারণের মত আর কি। কিন্তু আমার মাথায় ঢুকে না আমি কেন প্রতিটি কথায় ভারতের সমস্যার কথা তুলে ধরব? ভারত কি আমার দেশ? আমি কি ভারতের নাগরিক? আমার কাছে আমার দেশের সমস্যা আগে না ভারতের সমস্যা আগে? বাংলাদেশের সংখ্যালঘুদের সমস্যা নিয়ে কিছু একটা লিখলেই খুব কমন একটা প্রশ্ন এসে যায়

– এতো যে বাংলাদেশের সংখ্যালঘুদের উপর নির্যাতনের কথা বলছেন, ভারতের মুসলমানের উপর নির্যাতনের সময় আপনার এই প্রতিবাদী কন্ঠস্বর কোথায় যায়?

আমি বুঝেই উঠতে পারি না, ভারতের প্রতিটি সমস্যা নিয়ে আমি কেন এতো মাথা ঘামাতে যাব? আমি কি ভারতের খাই না পড়ি? তবে এই চিন্তা যেহেতু একটা বড় অংশের মানুষের মাথায় আছে তাই তাদের সমীপে বলতে চাই, ভারতের প্রতিটি ঘটনার প্রতিবাদ আমি করি না কারণ

প্রথমত, আমি নিজেকে বাংলাদেশের নাগরিক মনে করি, ভারতের না। আমার কাছে ইংল্যান্ড যেমন বিদেশ, ইন্ডিয়াও তেমনই বিদেশ। ইংল্যান্ড বেশ দূরের বিদেশ আর ইন্ডিয়া একটু কাছের বিদেশ। পার্থক্য এতোটুকুই, আর কিছু না। তাই আমি যেমন ইংল্যান্ডের প্রতিটা ঘটনায় নিজের মতামত ব্যক্ত করি না, তেমনই ভারতের প্রতিটি ঘটনায়ও আমার কথা বলার প্রয়োজন মনে করি না।

আর দ্বিতীয়ত, ভারতের সংখ্যালঘুদের উপর নির্যাতনের প্রতিবাদে ভারতেই প্রচুর পরিমাণে বিক্ষোভ সমাবেশ হয়। ভারতের শিল্পী-বুদ্ধিজীবী সমাজ এর প্রতিবাদে রাস্তায় নেমে আসেন। পুলিশের সাথে ধাক্কাধাক্কি হয়, প্রশাসনের উপর চাপ প্রয়োগ করা হয়। শুধু সেলিব্রেটিরা না, সে দেশের একেবারে সাধারণ মানুষও নির্যাতিতের পাশে দাঁড়ান, প্রতিবাদে শামিল হোন। সে দেশের সাধারণ মানুষেরা বর্তমানে “NotInMyName” নামে একটি আন্দোলন শুরু করেছেন। যার মোদ্দা কথা হল ভারতের উগ্র ধর্মবিদ্বেষীদের উগ্রতার দায় তারা নেবেন না, এই বদমাশগুলো তাদের কেউ না, এবং তারা এইসব ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানান, অত্যাচারীর শাস্তি দাবী করেন। এই সকল দাবী নিয়ে তারা ভারতের বড় বড় শহরের প্রাণকেন্দ্রে জড়ো হচ্ছেন, প্রতিবাদ করছেন। এখানে আমি চারটি ছবি দিলাম, প্রথম ছবিটি বর্তমানের আন্দোলনের ছবি। যেখানে কলেজ পড়ুয়া এক সাধারণ শিক্ষার্থী বলছে,

“জুনায়েদ আমার ভাই ছিল, আমার দেশের প্রিয় ভাই। আমি ভারত মা কে তার মায়ের চোখ দিয়ে কাঁদতে দেখছি। ”

দ্বিতীয় ছবিটি হচ্ছে, কেন্দ্রীয় সরকার কর্তৃক গোমাংস নিষিদ্ধ হওয়ার প্রতিবাদে কলকাতার রাস্তায় প্রতিবাদের ছবি। সেখানে রাস্তায় দাঁড়িয়ে সবার সামনে গরুর মাংস খেয়ে প্রতিবাদ জানিয়েছেন কোলকাতার প্রথিতযশা বুদ্ধিজীবিরা।

তৃতীয় ছবিটি হচ্ছে, কেরালার এক কলেজের ছাত্রছাত্রীদের প্রতিবাদের ছবি। সেই কলেজের ছাত্ররা তাদের কলেজ প্রাঙ্গনে গরুর মাংস রান্না করে ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে প্রকাশ্যে মাংস খেয়ে প্রতিবাদ করেছেন। এভাবে রাজ্যের তিনশটি স্পটে প্রতিবাদ সমাবেশের আয়োজন করা হয়েছিলো, যেখানে গরুর মাংস রান্না করে সবাইকে ফ্রি খাওয়ানো হয়েছিলো।

চতুর্থ ছবিটি হচ্ছে, বলিউডের এক সময়কার সুপার হিরো ঋষি কাপুরের তিনি তার টুইটার একাউন্টে সগর্বে লিখেছিলেন,

“এ ঘটনায় আমি ক্ষুব্ধ। তোমরা কেন খাবার দিয়ে ধর্মের তুলনা করো! আমি গরুর মাংস গ্রহণকারী হিন্দু। তার মানে এই নয় যে, গরুর মাংস না খাওয়া মানুষটির চেয়ে আমি কম ধার্মিক।”

শুধু কি ঋষি কাপুর? রভিনা ট্যান্ডন, ইশা দেওল, উদয় চোপড়া, আনুশকা শর্মা, ভিশাল দাদলানি কে ছিলেন না এই মিছিলে?

এবার আসেন তো দেখি বাংলাদেশে। কয়টা প্রতিবাদ সমাবেশ হয় এ দেশে? কোন বাম রাজনৈতিক দলের সদস্য না কিংবা সাংস্কৃতিক সংগঠনের সাথে যুক্ত না এমন কতজন সাধারণ মানুষ রাস্তায় দাঁড়িয়েছেন? ফিলিস্তিনের জনগণের উপরে ইজরাইলের হামলার প্রতিবাদে জুম্মার নামাজের পরে বায়তুল মোকাররম এলাকায় বিরাট বিরাট মিছিল সমাবেশ প্রায়ই হয়। কিন্তু নিজের দেশের ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের উপর হামলার প্রতিবাদে কতজন মুসল্লি মিছিল বের করেছেন ঢাকার রাস্তায়? সধারণ মানুষের কথা বাদ দেন, বুদ্ধিজীবি-পেশাজীবি-সংস্কৃতিজীবি তারকাদের ভূমিকাই বা কি? কোথায় থাকে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট? কোথায় থাকেন নায়ক শাকিব খান? কোথায় থাকেন সংস্কৃতি মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর?

কেউ নাই বুঝলেন? এ দেশের হিন্দু, বৌদ্ধ, খৃষ্টান, আদিবাসীদের পক্ষে কোন সেলিব্রেটিই কথা বলবে না। সাধারণ মানুষও বলে না। ফেসবুকে বামপন্থী সামান্য কিছু মানুষ ছাড়া সাধারন মানুষের খুব একটা হেলদোল দেখা যায় না। কথায় কথায় #প্রে_ফর_গাজা, #সেইভ_দ্যা_রোহিঙ্গা হ্যাশট্যাগ মারনেওয়ালারা দেশের আভ্যন্তরীন নিপীড়নের ক্ষেত্রে শ্বাসও ফেলে না। বরং, এটা সেটা বলে আরও আজাইরা কুতর্ক সৃষ্টি করে। তাই বলে আমি সবাইকেই হামলাকারী হিসেবে সাব্যস্ত করছি না। কিন্তু কতিপয় দুষ্ট মুসলমানের প্রতিবাদে অধিকাংশ ভালো মুসলমান এগিয়ে আসে না। ইতা ভালা মানুষ নিয়া জাতি কি করিবে?

তাই আমাদের ঢোল আমরাই বাজাই, আমাদের উপর নিপীড়নের প্রতিবাদ আমরাই করি। ইন্ডিয়া, ইংল্যান্ডের চিন্তা বাদ দিয়া নিজের দেশের সমস্যা নিয়াই বেশি হাউকাউ করি। দেশের ভালো মুসলমানেরা যদি আমাদের পাশে এসে দাঁড়াতেন তাহলে আমরাও একটু ইন্ডিয়া, পাকিস্তান, ফিলিস্তিনের দিকে তাকানোর সুযোগ পেতাম। আছেন কি কেউ?

?oh=8452325485992ad6217215f78d87f765&oe=5A0DD023″ width=”500″ />

?oh=d35f170c28589d93fc004b2082daa63a&oe=59C757C0″ width=”500″ />

?oh=225676b0a691a6098b73a0ece9f23d72&oe=59D5DC50″ width=”500″ />

?oh=44a004dfeb7d23e53a25b8ad50980129&oe=5A0A48D6″ width=”500″ />

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 3 = 4