গাজীপুরের যৌনকর্মী :: শখ নয়, পেশা ছিল

নারী পাচার বলতে কী বোঝেন আপনি?

দরিদ্র নারীদেরকে প্রলোভন দেখিয়ে দেশের বর্ডারটি পার করে দিয়ে অনেক ভাল একটি চাকরির সু-ব্যবস্থা করে দেয়া?

জী না।

নারী পাচার মানে একটাই, নারীকে বিক্রি করে দেয়া। বিক্রি করে দেয়া নারীকে দিয়ে আপনি কী কী করতে পারেন? অথবা, যেসব দেশের নাগরিক আমার দেশের নারীকে টাকা দিয়ে কিনে রাখছে, তারা নারীদেরকে দিয়ে কী করে? বাসার শো-কেজে সাজিয়ে রাখে? শপিংমলের ডল্ বানিয়ে ব্যবসা বাড়ায়?

কিছু তথ্য আগে জেনে নিই:

১.প্রেরানার সহ-প্রতিষ্ঠাতা প্রীতি পাটকর বলেন, কামাথিপুরায় প্রেরানার নাইট কেয়ার সেন্টারে ২০১০ থেকে ২০১৫ সালে যৌনকর্মীদের ২১৩ সন্তান নিবন্ধন করে। এদের মধ্যে ১২৮ জনই বাংলাভাষী মায়ের সন্তান। এছাড়া উত্তর প্রদেশ, মহারাষ্ট্র, কর্ণাটক ও অন্ধপ্রদেশসহ অন্যান্য এলাকায়ও এদের সংখ্যা সমপরিমাণে বাড়ছে।

ভারতের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত অন্তত ৩০ লাখ মানুষ রয়েছে। প্রতিদিন শত শত মানুষ অবৈধভাবে ভারতে পৌঁছায়। ভাল চাকরি ও সুন্দর জীবনের প্রলোভনে পড়ে প্রত্যন্ত অঞ্চলের গরীব নারীরা অনেক সময় ৪ হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে পাচারকারী অথবা অ্যাজেন্টের মাধ্যমে ভারতের বিভিন্ন পতিতালয়ে গিয়ে ঠাঁই পাচ্ছে।
তথ্য সূত্র: দৈনিক আজকের সংবাদ, ২ জুলাই, ২০১৭

২. ২০১৫ সালের হিসেবে মাত্র ২০ হাজার ৯শ ৫২ জন নারী সৌদি আরবে গিয়েছে। সৌদি সরকার সম্প্রতি বাংলাদেশকে জানিয়েছে তাদের পক্ষে এখন দুই লাখ নারীর জন্য ভিসা প্রস্তুত রয়েছে। কিন্তু গৃহকর্মী হিসেবে বাংলাদেশী নারীদের সৌদি আরবে যাওয়ার আগ্রহ খুবই কম। চুক্তির এক বছরে চাহিদার দশ ভাগের একভাগ নারী বাংলাদেশ থেকে সৌদি আরবে গেছেন।
বাংলাদেশ থেকে পুরুষ কর্মীরা যেখানে টাকা খরচ করে সৌদি যাবার জন্য উদগ্রীব সেখানে বিনা খরচে নারীকর্মীরা কেন আরবে যেতে চাননা?
তথ্যসূত্র: বি.বি.সি. ৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৬

আমি দেখেছি, ভারতে আমার দেশের কোন নারীকে পতিতালয়ে নির্যাতিত হতে দেখে সারা বাংলা হুহু করে কেঁদে ওঠেছিল, ”আহা, আমার দেশের মা-বোন”। এ ধরণের, হাহাকার থাকা ভাল, মানবিকও বটে।

সামান্য কয়টা কাগজের নোটের জন্যে সৌদিতে যেয়ে গৃহকর্মী হিসেবে নারী যখন শারীরিক নির্যাতনের স্বীকার হয়, তখন নারীর প্রতি বাঙালি-দরদ উথলে ‍ওঠে। সমর্থন করি আপনার মানবিকবোধকে।

কিন্তু গাজীপুরের হোটেলে যে মেয়েগুলি দেহব্যবসায় জড়িয়ে পড়ার ”অপরাধে” ভ্রাম্যমান আদালত যখন কারাদন্ড দিয়ে বাংলাদেশকে উদ্ধার করল, তখন আপনার মানবিকবোধ কি বালিশের নিচে ঘুমিয়ে আছে?

কোথায় আপনার মানবিক হাহাকার, যখন দরিদ্র নারীদের জন্যে আপনার দেশের ”নারী ও শিশু মন্ত্রনালয়” দরিদ্র নারীদের কর্মসংস্থানে এগিয়ে অাসল না? ”দারিদ্র্য বিমোচনের” নামে কীসের অশ্ব ডিম্বের প্রকল্প চালায় দিনের পর দিন এসব প্রকল্পের পরিচালকেরা? “কর্মসংস্থান মন্ত্রনালয়” সংশ্লিষ্টরা উঁচু বিল্ডিং বসে কী করেন?

গাজীপুরবাসী মন দিয়ে শুনুন, আপনার ছেলে যখন গাজীপুরের হোটেলের মেয়েগুলির বুকে আশ্রয় নিয়েছিল, তার অর্থ দাঁড়ায় একটাই, আপনার ছেলে দ্বারা স্বাভাবিক সমাজ জীবনের যে কোন নারীর ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার তীব্র আশংকা ছিল! সেটা ঐ মেয়েগুলি হতে দেয় নি! আপনার বিগড়ে ওঠা ছেলের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারত কোন এক বাবার মেয়ে, ভাইয়ের বোন অথবা পথেঘাটের কোন একলা নারী।

ধন্যবাদ দিন! মেয়েগুলিকে!

কীসের যুক্তিতে ভ্রাম্যমান আদালত কারাদণ্ড দিল মেয়েগুলিকে? (বাংলা ট্রিবিউন নিউজ: সন্ধ্যা ৭টা, ২জুলাই, ২০১৭) রাষ্ট্র কোথায় ছিল, যখন এই মেয়েগুলি নিরুপায় পথটি বেছে নিতে বাধ্য হয়েছিল?

”জেলা প্রশাসক রাসেল মিয়া’”রা কি তখন সমাজ সেবায় ব্যস্ত ছিল? হোটেল মালিককে আটক করলেন না কেন? কীভাবে পালায় হোটেল মালিক? পালিয়েছে ভাল কথা, কী শাস্তি দিলেন হোটেল মালিককে? শুধুই সিলগালা?

তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছি!

পাঠক, আপনিও পাশে দাঁড়াতে পারেন, আপনার ইজ্জত তাতে ম্লান হবে না। সমস্বরের প্রতিবাদ যদি মেয়েগুলির সুন্দর একটি পথের দিশা করে দেয়, ক্ষতি কি তাতে!

গলা ছেড়ে বলুন, মেয়েগুলিকে ছেড়ে দিয়ে ওদেরকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনা হোক।

[আপডেট: ব্লগটি লিখেছিলাম কিছু মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্যে। তো কাজের চেয়ে অকাজের পেছনেই বোধহয় বেশি ছোটে বাঙালি। একটি সংবাদ মাধ্যম থেকে হুবহু নিয়েছিলাম তথ্যটা, সময় তারিখও লিখে দিয়েছিলাম। কী আর করা! লিংকটি নিচে দিয়ে দিলাম।

মুম্বাই থেকে সিলেটের সোজাপথে ড্রাইভিং দূরত্ব প্রায় আড়াই হাজার কিলোমিটার। নিশ্চয়ই পাচারকারীরা রোভারে করে বুক ফুলিয়ে সোজা রুটে পাচার করে না। সংবাদ মাধ্যমটি ”অনেক সময় ৪ হাজার কি.মি” কথা দিয়ে হয়তো বোঝাতে চেয়েছিল সোজা পথে নয়, বরং সীমান্ত পাহারাকে ফাঁকি দিতে গিয়ে ঘুরা পথে দূরত্ব বাড়ায় এবং তাতেও মানুষ কষ্ট করে সে পথে যায়।]

মুম্বাইয়ের পতিতালয়ে বেশি পাচার হচ্ছে বাংলাদেশি নারী

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

২ thoughts on “গাজীপুরের যৌনকর্মী :: শখ নয়, পেশা ছিল

  1. বাহ, সুন্দর লেখা
    বাহ, সুন্দর লেখা

    আমার লেখা পড়ার ও ফেসবুকে আমার “বন্ধু” হওয়ার আমন্ত্রণ রইল। আগের আইডি ছাগলের পেটে।এটা নতুন লিংক :
    https://web.facebook.com/JahangirHossainDhaka

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 1 = 3