আমি যেভাবে ভূতের কবলে পড়লাম

ঘটনা ঘটে রাত ঠিক একটায়।
আমার বন্ধু মিজান। গিয়েছিলাম মিজানের দাদা বাড়ি বেড়াতে। ছয় বছর আগের ঘটনা। গ্রামের নাম কালা মৃধা। ফরিদপুরের একটি গ্রাম। বাংলাদেশের প্রতিটা গ্রাম আমার কাছে একই রকম লাগে। একসম সহজ সরল সুন্দর। অনেক গাছপালা, নদী, মাটির রাস্তা, পুকুর, বিশাল ধানক্ষেত। গ্রাম দেশের বাজার গুলো আমার খুব বেশি ভাল লাগে। সময় সুযোগ পেলেই আমি মাছ ধরতে নেমে যাই। বৈঠা হাতে নিয়ে নৌকা চালাই। একবার তো একজন কৃষকের সাথে জমিতে সেচ দিয়েছি। যে ক’টা দিন গ্রামে থাকি অনেক আনন্দ নিয়েই থাকি।

গ্রামের মানুষ আদর যত্নের চুড়ান্ত করে। তাদের রান্নার হাতও অনেক ভালও। তরকারি খেতে এত মজা হয় যে, তিন প্লেট ভাত খেয়ে ফেলি। ঘটনার দিন রাতে অনেক খেলাম। খুব খেলাম। মাছের মধ্যে ছিল দেশী কৈ মাছ, বাইল্লা মাছ, গলদা চিড়িং মাছ, টাকি মাছের ভর্তা, ইলিশ মাছের ভর্তা আরও কি কি যেন মাছ ছিল। দেশী মুরগী ভূনা, গরুর মাংস কালা ভূনা আর ডাহুক পাখি। পোলাও আর সাদা ভাত। চালের আটার রুটি ইত্যাদি। তাদেরকে খুশি করার জন্য খুব খেলাম। পেটে আর জায়গা নেই। কিন্তু খাওয়ার পর দেখি আরও খাবার আসছে। পায়েস, দই মিষ্টি। তাদের কথা একটু করে হলেও সব আইটেম খেতে হবে। যাই হোক রাতে খেয়ে ঘুমাতে এলাম, তখন সময় রাত সাড়ে দশটা। খুব হাঁসফাঁস লাগছিল।

এখন আমি মুল গল্পে প্রবেশ করবো। তার আগে একটা ঘটনা জানিয়ে নিই। বাস থেকে নেমে বিকেলে যখন ভ্যানে করে গ্রামে ভেতর ঢুকছিলাম, তখন এক পলক দেখলাম- একটা পাগলী মেয়ে, সতের আঠারো বয়স হবে। মাথার চুল লম্বা আছে তবে এলোমেলো। ম্যাক্সি টাইপ একটা জামা পড়া। হাতে একটা বাঁকা লাঠি। লাঠিটা আমার দিকে উঁচু করে এক গাল হাসলো। বিকট হাসি। এটা কোনো মানুষের হাসি হতে পারে না। হাসিটা দেখে আমি খুব ভয় পেলাম। আমার সারা শরীর কেঁপে উঠলো। আমি নিজেকে বুঝালাম, বাংলাদেশের প্রতিটা গ্রামে একজন করে পাগল থাকে। থাকেই।

বিশাল একটা ঘরে আমাকে একা থাকতে দেওয়া হয়েছে। ঘুম আসছিল না। সাথে করে অনেক গুলো বই নিয়ে গিয়েছি কিন্তু পড়তে ইচ্ছা করছে না। রাত বারোটায় চলে গেল বিদ্যুৎ। খাটেরর নিচে একটা হারিকেন জ্বলছে। তবুও ঘুটঘুটে অন্ধকার। এদিকে আবার আমার বাথরুম পেয়েছে। ছোটটা। গ্রামের বাড়ি গুলোর বাথরুম মুল বাড়ি থেকে অনেক দূরে হয়। এত রাতে কাউকে ডাকার প্রশ্ন’ই আশে না। তাহলে তারা ভাববে শহরের ছেলেটা ভীতু। শীতকাল ছিল। কাছের পাতা বেয়ে কুয়াশা টিনের চালের পড়ছে। টপ টপ শব্দ হচ্ছে। কোনো কারন নেই তবুও এই টপ টপ শব্দটাকেই খুব ভয়ঙ্কর মনে হচ্ছে। ঝিঝি পোকা ক্রমাগত ডেকে যাচ্ছে। শব্দটার মধ্যে আনন্দের কিছু নেই, বরং ভয় ধরা একটা ব্যাপার আছে। কিন্তু আমাদের সাহিত্যিকরা ঝিঝি পোকার ডাক নিয়ে কত রোমান্টিক কথা বলেছেন। যাই হোক, একবার ইচ্ছা করলো- খাটের পাশ দিয়ে সিসু করে দেই। কিন্তু সেটা সম্ভব না। এর আগে একবার মুন্সিগঞ্জ গিয়ে এমন কাজ করে খুব লজ্জায় পড়েছিলাম।

অনেক সাহস সঞ্চয় করে, আল্লাহ খোদার নাম নিয়ে রাত একটায় দরজা খুললাম। ফকফকা জোছনা। ঘর থেকে দুই পা বের হতেই একটা অদ্ভুত ব্যাপার দেখলাম! যার জন্য আমি মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না। সেই পাগলী মেয়েটা। হাতে বাঁকানো লাঠি। লাঠিটা আমার দিকে তাক করে সেই ভয়ানক হাসিটা দিল। এই হাসি যে কেউ দেখলে তার কলিজা উড়ে যাবে। আমি প্রচন্ড ভয় পেলাম। চিৎকার করতে গিয়ে দেখি গলা দিয়ে কোনো শব্দ বের হচ্ছে না। দৌড় দিয়ে যে পালিয়ে যাব সে উপায়ও নেই, আমার সারা শরীর পাথরের মতো শক্ত হয়ে গেছে। ঠিক এই সময় আমাকে সাহায্য করার জন্য পাঁচ টা কুকুর এলো। কুকুর গুলো পাগল মেয়েটার চারদিক থেকে ঘিরে ঘেউ ঘেউ করছে। কিন্তু মেয়েটির সেদিকে কোনো খেয়াল নেই। সে আমার দিকে তাকিয়ে বিকটভাবে হাসছে।

কুকুরের ঘেউ ঘেউ শুনে বাড়ির সবাই জেগে উঠেছে। তারা সবাই হাতে লাঠি, দা নিয়ে দৌড়ে এসেছে। আমার বন্ধুর বাবা আমাকে জড়িয়ে ধরে রেখেছেন। তাতে আমার অনেকখানি ভয় কেটে গেল। একজন বৃদ্ধা সেই পাগল মেয়েটির কাছে গিয়ে বলল- এই তুই কে? বাড়ির ভিতর ডুকলি কি করে? বাড়ির মেইন গেট তো লাগানো। তোকে তো কখনও আগে এই গ্রামে দেখি নাই। বল তুই কোথা থেকে এলি? পাগলিটা হাত উঁচু করে পুকুর পার দেখালো। যদি পাগলিটা সত্যি সত্যি পুকুর থেকে আশে তাহলে তার শরীর থাকবে ভেজা। কিন্তু তার শরীর শুকনা। তখনও কুকুর গুলো ঘেউ ঘেউ করেই যাচ্ছে। বৃদ্ধা তখন তার হাতের লাঠি দিয়ে পাগলিকে খোঁচা দিতে-দিতে বাড়ি থেকে বের করে দিল।

ঘটনা এইখানেই শেষ না আর একটু বাকি আছে।
প্রচন্ড জ্বর এলো আমার। সাথে বমি। ডাক্তার এসে ওষুধ দিয়ে গেল। পরের দিন বিকেলে আমি কারো কোনো কথা না শুনে আমার ব্যাগ-ট্যাগ গুছিয়ে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। বাজারের কাছ থেকে ভ্যানে উঠেছি, বাস স্টেশন যাব। ভ্যান চলছে। হঠাত দেখলাম সেই পাগলী মেয়েটা বসে আছে। হাতের লাঠিটা আমার দিকে তাক করা। সাথে সেই বিকট হাসি।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 51 = 61