মর্মান্তিক কৌতুক

হন্যে হয়ে লেখার বিষয় খুজছিলাম। কি নিয়ে লেখা যায়? হরতাল? বিরোধীদলের বেহাল অবস্থা? হেফাজতে ইসলামের উত্থান? গণজাগরণ মঞ্চের দুর্দশা? কোনটাই মনঃপুত হছে না। কোনটাতেই যেন তরতাজা টাটকা ভাব নাই। এমন সময় সাভারে ঘটনাটা ঘটলো। খবর হিসেবে নিঃসন্দেহে ‘ব্রেকিং নিউজ’। সব টিভি চ্যানেল হামলে পড়বে। উদ্ধার কার্যের সরাসরি সম্প্রচার, ইন্টারভিউ, এনাম মেডিকেলের চিকিৎসকদের বক্তব্য। সঙ্গে আরও থাকবে, কিছু প্রত্যক্ষদর্শীর মর্মস্পর্শী বর্ণনা, কিভাবে ঘটলো, তখন তিনি কি করছিলেন, এইসব। এসব দিয়ে প্রায় সব মিডিয়ার আগামী কিছুদিনের খোরাক চলবে।
আমরা কি করব? টিভি পর্দার সামনে বসে আমরা ঘটনাগুলো গিলবো। কিছুক্ষণ ‘আহা’ ‘উহু’ করবো। ‘ইস’ বলে চোখ বন্ধ করে ফেলবো। দুর্বল প্রাণ কোন পারিবারিক সদস্যের অনুরধে চ্যানেল পরিবর্তন করবো। একঘেয়েমি কাটানোর জন্য কোন চ্যানেল হয়তো দেখাবে, অলৌকিক ভাবে বেঁচে যাওয়া কোন মানুষের কাহিনী, মুগ্ধ হয়ে সেগুলো শুনবো। কিছুদিনের জন্য হরতাল, তত্ত্বাবধায়ক সরকার আর বিরোধীদলের নেতাদের গ্রেফতার এসব আলোচনা বন্ধ রেখে সাভার নিয়ে গল্প করবো।
এই ঘটনা নিয়ে রাজনীতি কি হবে না? তাই কি হয়? সেটাও হবে। কেমন ধাঁচের রাজনীতি হবে তা নির্ভর করবে মালিকের গায়ে কোন রাজনৈতিক দলের সুবাস আছে, তাঁর ওপর। যতদূর জানা যাচ্ছে, ‘রানা’ সাহেব সরকারী দলের সুগন্ধ যুক্ত পারফিউম ব্যবহার করেন। ফলে কিঞ্চিৎ রাজনীতি, অবশ্যম্ভাবী। অচিরেই তাঁকে বাঁচানো আর ফাঁসানো (সরকারী দলের এমন ভাষ্য হবে) দুটি দল তৈরি হতে যাচ্ছে। একদল তাঁর গ্রেফতার চাইবে অন্য পক্ষ তদন্তের নামে কাল ক্ষেপণ করতে। ভেতরে ভেতরে হয়তো(?) কিছু অর্থের লেনদেন। এরপর? এরপরের অংশটিই সবচেয়ে মজার। আমাদের স্মৃতি ভ্রংশ হবে।
এই ধরণের ট্র্যাজেডি কি এই প্রথম? ভবন ধস, ভবনে আগুন, বসতি তে আগুন, ওভারব্রিজ ভেঙ্গে মানুষ নিহত? আসলে এই ঘটনাগুলোর একটা টিপিক্যাল পরিণতি দেখতে দেখতে এতোটাই অভ্যস্থ যে পরবর্তীতে কি হবে আর এখন বলে দিতে হয় না এবং তা ঘটার পরে এমন কোন প্রতিক্রিয়াও হয় না। তাঁর পরও কেন জানি আমরা টিভি পর্দার সামনে বসি। গালি গালাজ করি, ‘হারামজাদা’ কে গুলি করে মারা উচিৎ, এসব বলে রাগ প্রকাশ করি। একসময় আবেগ থিতিয়ে আসে, তারপরও দেখি। হয়তো সহানুভুতির টানে, হয়তো সাধারণ জ্ঞান বাড়ানোর জন্য কিংবা হয়তো কিছু একটা দেখতে হবে তাই দেখা।
আমাদের কারো ভেতরে কি আদৌ ইচ্ছে জাগে এধরনের ঘটনার অবসান হউক। হয়তো জাগে, তবে সেই ‘জাগা’ যে আদৌতে কোন কাজে দেবে না, সে ব্যাপারেও আমরা নিশ্চিত। তাই এই নিয়ে খুব একটা উচ্চবাচ্য কখনই করি না। ‘খুবই প্যাথেটিক ব্যাপার’ এই বলে কিছুক্ষণের জন্য চা এর আড্ডার বিষয় বানাই। কতিপয় সংগঠন আর সুশীল সমাজের মানুষের ‘মালিকের গ্রেফতার চাই’ জাতীয় কিছু বক্তব্য, আর ‘তদন্ত করে দেখা হবে’ এমন উত্তর দেখতে দেখতে একসময় আমাদের সেই ‘ইচ্ছে’র অকাল মৃত্যু ঘটে।
এমনটা কতকাল চলবে? উত্তর? ‘হয়তো অনন্ত কাল’। যদি একটা বিল্ডিং তৈরিতে প্রয়োজনীয় উপাদান ‘মানসম্পন্ন’ আর ‘নিম্নমানের’ দুরকমই পাওয়া যায়, এবং তাঁদের দামের বিশাল তারতম্য থাকে, তবে একটা চেষ্টা হবেই কম মুল্যের উপাদান দিয়ে বিল্ডিং তৈরি করার, বিশেষ করে সেখানে যদি মালিক নিজে বসবাস না করেন। এসব ব্যাপার ঘটতে পারে দেখেই, এর প্রতিরোধের জন্য, দেখাশোনার জন্য কিছু সংস্থা তৈরি করা হয়েছে। তবে এঁরা ঠিকমত কাজ করছে কি না তা দেখার জন্য কেউ নেই। যা আছে, তা হচ্ছে এদের বিত্ত-সম্পদের পরিমাণ যাচাই করার জন্য কিংবা বলা যায় যাচাই না করার জন্য (উৎকোচের বিনিময়ে) কিছু সংস্থা।
এই ধরণের ঘটনার পরে যিনি বেশ ভালভাবেই পরিত্রাণ পান তিনি হচ্ছেন সেই যাচাই কর্তৃপক্ষ। তাঁর দিকে খুব একটা অঙ্গুলি নির্দেশ হয় না। ভবনের অনুমোদন থেকে শুরু করে যাবতীয় যাচাই যাদের করবার কথা তাঁরা এমন একটি ভবনকে কিভাবে অনুমুতি দিলেন তা নিয়ে খুব একটা আলোচনা হবে না। ওভারব্রিজ ভেঙ্গে পড়লে যেমন কন্ট্রাক্টারের গ্রেফতার নিয়ে আলোচনা হয় কিন্তু যিনি সেই কন্ট্রাক্টারের কাজ মান সম্মত হয়েছে বলে কাজের বিলে স্বাক্ষর দিয়ে দিলেন, তাঁকে নিয়ে খুব একটা উচ্চবাচ্য হয় না।
এবারের ঘটনায়ও তেমন কিছু হবে না। বিভিন্ন সামাজিক সংস্থা কিছু কাজ করবে। রক্তদান, মেডিকেল টিম তৈরি, উদ্ধার কাজে সহায়তা এসব। কিছু চাঁদা আহরণ কিছু রাজনীতি, হরতাল প্রত্যাহার এসব হবে। কিছু খবরের উপাদান পাওয়া যাবে। কিছু কলাম লেখা, কিছু ব্লগ, কিছু ফেসবুক স্ট্যাটাস। এসব আসলে করতে হয় তাই করা। এই সময় উদ্ধার কাজ না দেখে হিন্দি সিরিয়াল দেখলে একটু বিবেকে লাগতে পারে, তাই মাঝে মাঝে চ্যানেল বদলানো।
একটা মর্মান্তিক কৌতুক বলে লেখা শেষ করবো। একবার এক মহিলার স্বামী সাপের কামড়ে মারা গেলে, তাঁকে দেখতে পাড়া পরশি সবাই ভিড় করলেন। সবাই সেই ক্রন্দনরতা কে জিজ্ঞেস করলেন, কিভাবে ঘটলো? মহিলা কাদতে কাদতে যা বললেন তাঁর সারাংশ এই, যে তিনি ভাত খেতে বসে বলেছিলেন একটু মরিচ হলে ভালো লাগতো। তাই শুনে স্বামী দেবতা বাড়ীর পেছনের মরিচ গাছ থেকে মরিচ আনতে যান। এমন সময় তাঁকে সাপে কামড় দেয়।
উদ্বিগ্ন পড়শিরা পরবর্তী প্রশ্ন করল, তারপর?
‘তারপর আর কি? আমি মরিচ ছাড়াই ভাত খেলাম।‘
খুব মর্মান্তিক লাগলো না? হাসিও পেল না? বেশ আরও একটা মর্মান্তিক কৌতুক বলি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহিউদ্দিন খান আলমগীর বিবিসিকে বলেছেন, আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে ইমারত নির্মাণের নিয়ম কানুন যথাযথ অনুসরণ করা হয়নি বলেই এই দুর্ঘটনা ঘটেছে।
তবে একইসাথে মন্ত্রী বলেন, কিছু হরতাল সমর্থক ভবনটির ফাটল ধরা দেয়ালের বিভিন্ন স্তম্ভ এবং গেট ধরে নাড়াচাড়া করেছে বলে তিনি জানতে পেরেছেন।
তিনি বলেন, ভবনটি ধসে পড়ার পেছনে সেটাও একটি সাম্ভাব্য কারণ হতে পারে।
মন্ত্রী জানান, তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তারপরই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৪ thoughts on “মর্মান্তিক কৌতুক

  1. আপনার লেখা সবসময়েই অসাধারণ,
    আপনার লেখা সবসময়েই অসাধারণ, তবে এই লেখাটাকে কেমন যেন একটু থিতিয়ে পড়া মনে হল।

    আর গোল্ডফিশ মেমরি, আমাদের জাতিগত ঐতিহ্য। এর খুব একটা হেরফের এত দ্রুত হবে বলে মনে হয় না। তবে হলেই আমরা স্বপ্ন দেখতে পারব- ‘পরিবর্তন’ এর।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

3 + 2 =