শেষ রাতের স্বপ্ন…

হালিমা বেগম-কেমন আছিস বাবা?তোর কথা মনে পড়ে ভীষণ…

রায়হান-ভালো মা।তোমার কথাও মনে পড়ে মা ভীষণ।তুমি কেমন আছো মা ভালো তো?

হালিমা বেগম-আমার আর ভালো থাকা সেই যে তুই চলে গেলি যুদ্ধে তখন থেকেই আমার ঘুম নাই দুই চোখে তোর চিন্তায়।কেন তুই চলে গেলি বাবা।জানিস তোর চলে যাবার পর তোকে আমরা অনেক খুজেছি।তন্ন তন্ন করে কত জায়গায় কিন্তু কথাও তোকে পাই নি এমন কি তোর লাশটাও।

রায়হান-আমিও চাইনি মা তোমাকে ছেরে যেতে কিন্তু কি করবো মা ঐ হায়েনারা যে আমার দেশটাকে আমার সামনে ধ্বংস করতে ছিল আমি কেমনে তা সহ্য করি মা বল?আর মা তুমি না বলতে দেশটা আমাদের মা আর আমরা তার সন্তান তাহলে মায়ের বিপদে সন্তান চুপ থাকতে পারে মা।মায়ের বিপদে যদি সন্তান না আসে তাহলে কে আসবে মা?মা তুমি কি আমার উপর রাগ করেছো মা?

হালিমা বেগম-নারে বোকা মা তার ছেলের উপর রাগ করে কখনো?তোদের জন্যই তো আজকে আমরা স্বাধীন বাংলাদেশের নাগরিক তোদের জন্যই তো আজকে আমরা এই বিশ্বে একটি গৌরবময় জাতি বাঙালী জাতি।তোদের মতো সূর্য সন্তানদের উপর কোন মা রাগ করতে পারে কখনো।

রায়হান-জানো মা পাকিস্তানি আর্মিরা যখন আমাদের চোখ বেধে নদীর ধারে নিয়ে আসলো গুলি করে মারবে বলে তখন তোমার মুখ তা বার বার চখের সামনে ভাসছিল তোমাকে দেখার জন্য মনটা খুব ছটফট করছিল।

হালিমা বেগম-ক্ষণিকের চুপ…(নীরবে চোখের জল ফেলে আবার) বাবা তোর বেধা লাগেনিতো?

রায়হান-না মা গুলিটা ৫ সেকেন্ডেই আমার কপালের এফোঁড়-ওফোঁড় হয়ে চলে যায় কিছু বোঝার আগেই।
(কিছুক্ষনের নীরবতা) মা আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিবে যেমনটা ছোট থাকতে দিতে।

হালিমা বেগম-আয় …

রায়হান-মা আমার কথা যখন তোমার খুব মনে পড়বে তখন তুমি তোমার চারিদিকে তাকিয়ে দেখো।এই দেশের আকাশ,বাতাশ এ পাবে ঐ পাখির ডাকে আমাকে খুঁজে পাবে আমি আছি সারা বাংলার দিগন্ত জুড়ে…মা.মা..মা…(শিউলির ডাকে ঘুম ভাঙ্গে হালিমা বেগমের)

শিউলি-মা উঠো মা সকাল হয়ে গেছে সেই কখন নামাজ পরবে না?
(হালিমা বেগম অজু করে নামাজ পরতে যান)

(রায়হান ১৯৭১ সালের এপ্রিলের ৭ তারিখ দেশের ডাকে যুদ্ধে চলে যায় তারপর আর ফিরে আসে নি।ঘরে রেখে যায় তার মা,পাঁচ বছরের ছোট বোন শিউলিকে।২৫ মার্চ রাতেই হানাদার বাহিনীর হাতে রায়হান হারায় তার কলেজ প্রফেসর বাবা আর হালিমা বেগম হারান তার স্বামীকে।রায়হান যুদ্ধে যাবার পর থেকেই হালিমা বেগমের চোখ থেকে ঘুম উবে গিয়েছিলো সারাক্ষন কেবল রায়হানের খোজ করতেন।পাকিস্তানী আর্মি আর তাদের দোসরদের ভয়ে এক শহর থেকে আরেক শহরে ঘুরে বেরাতেন কারণ তারা জানত যে রায়হান একজন মুক্তিযোদ্ধা যদি পাকিস্তানীরা রায়হানের পরিবারকে পায় তাহলে তাদেরকে স্বপরিবারে গুলি করে মারবে।যুদ্ধ শেষ হল একদিন আর বাংলাদেশ হল স্বাধীন সর্বভৌম রাষ্ট্র।অনেকেই তার প্রিয়জনের লাশ পায় আর অনেকেই তাদের ফিরে পাবার আশায় দিন গুনে যায় হালিমা বেগমও তার ছেলে রায়হানের আশায় একদিন দুইদিন করে একে একে বেস কয়েকটি বছর পার করেদেন কিন্তু আজও রায়হানের লাশ পাননি শিউলি দেখে নি তার ভাইটিকে।শিউলি মাঝে মাঝে ভাবে এখন যদি রায়হান বেঁচে থাকতো তাহলে তার বয়স কত হতো?তার বউ থাকতো ছোট ছোট বাবু থাকতো তাকে ফুপু ফুপু বলে ডাকতো…)

-হালিমা বেগমের নামাজ শেষ।তিনি এসে বারান্দায় দাঁড়ান বাইরে তখন সবে রাতের আলো ভেদ করে সকাল হই হই।পাখিদের কিচির-মিচির আউয়াজে ব্যস্ত শহর সজাগ হচ্ছে আবার।হালিমা বেগম শেষ রাতের রায়হান কে নিয়ে দেখা স্বপ্নটার কথা মনে করলেন।আজকাল রায়হান কে নিয়ে তিনি প্রায় এরকম স্বপ্ন দেখেন প্রথমে প্রথমে কেমন জানি লাগতো মনে হতো রায়হান এখনো বেঁচে আছে কিন্তু এখন স্বপ্নকে স্বপ্ন ছাড়া আর কিছুই মনে হয় না।তিনি কিছুক্ষন বাইরের দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন তার পর জোরে জোরে শ্বাস টানতে লাগলেন ঘ্রান নিতে লাগলেন বাইরের প্রকৃতির।খুজতে লাগলেন তার ছেলেকে তার রায়হান তো আছে এই বাংলার আকাশ,বাতাশে হাজারো রায়হান আছে সারা বাংলা জুড়ে যাদের রক্তর বিনিময়ে অর্জিত হল এই বাংলা তারা আছে সারা বাংলা জুড়ে….

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৭ thoughts on “শেষ রাতের স্বপ্ন…

  1. এমন অনেক ইতিহাস আমাদের
    এমন অনেক ইতিহাস আমাদের অজানা!
    সরকারের মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রনালয়ের একটা আর্কাইভ করা উচিৎ…
    যেইখানে সব ইতিহাস সংরক্ষিত থাকবে আগামী প্রজন্মের জন্যে!!

    আপনি একাদিক বার পোস্ট করছেন কেন?
    ফ্লাডিং হবেতো! এমনিতেই বাংলা মহাসেনে আক্রান্ত…

    1. একের উপর দুইবার টিপ মারসিলাম
      একের উপর দুইবার টিপ মারসিলাম তার কারণে দুই বার আসছে।আর সরকারের কথা কয়েন না মন্ত্রানআলয় বানায় ফায়দা নাই কামের কাম এরা কিছুই করে না…।

  2. তোদের জন্যই তো আজকে আমরা

    তোদের জন্যই তো আজকে আমরা স্বাধীন বাংলাদেশের নাগরিক তোদের জন্যই তো আজকে আমরা এই বিশ্বে একটি গৌরবময় জাতি বাঙালী জাতি।তোদের মতো সূর্য সন্তানদের উপর কোন মা রাগ করতে পারে কখনো।

    মা আর ছেলের কথোপোকথনে এত বড় বড় কথা আসবে না বলেই ধারণা। যাই হোক। ভাল লিখেছেন…

    1. জীবনের প্রথম একখান গল্প
      জীবনের প্রথম একখান গল্প লেখলাম তাও আবার মুক্তিযোদ্ধা নিয়ে যা আমি চোখে দেখি নাই শুধু গল্পে আর ভিডিও তে দেখসি ও শুনসি তাই ভুল হইতে পারে পরবর্তীতে খেয়াল রাখবো…।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 59 = 66