কার্গো কাল্টঃ আমাদের চোখের সামনেই সৃষ্টি হচ্ছে নতুন নতুন ধর্ম

কার্গো কাল্ট (Cargo Cult):
জনপ্রিয় চিত্রপরিচালক ডেভিড অ্যাটেনবরো পঞ্চাশের দশকে একটি তথ্যচিত্র তৈরির জন্য একটি দ্বীপে যান। সেখানে গিয়ে তিনি দেখেন, একদল মানুষ জটলা পাকিয়ে রিচুয়াল টাইপ কিছু একটা করছে। জটলার মাঝখানে কোমরে লতাপাতা,তার জড়ানো এক বৃদ্ধা মাঝে মাঝেই অজ্ঞান হয়ে যাচ্ছে এবং অস্ফুটস্বরে কিছু বলছে। পাশে থাকা এক স্বঘোষিত পুরোহিত যাকে নাম্বাস ডাকা হয়, সেটা সবাইকে তরজমা করে শুনিয়ে দিচ্ছে। এসব দেখে তো এটেনবরো ও তার দলবল বেশ অবাক। ঘটনা কী?

অ স্ট্রেলিয়া ও ফিজির প্রায় মাঝমাঝি অবস্থিত ভানুয়াতু দ্বীপপুঞ্জ। দক্ষিণ-পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরে সারিবদ্ধভাবে প্রায় ৮০/৯০টা ছোট ছোট দ্বীপ নিয়ে গঠিত এই দ্বীপমালা যার আকার ইংরেজি Y অক্ষরের মতো। ১৬০৬ সালে সর্বপ্রথম ফ্রেঞ্চ ও পরবর্তীতে অন্যান্য ইউরোপীয় আবিষ্কারকরা ভানুয়াতুতে এসেছিলেন। দ্বীপপুঞ্জে তখন বিভিন্ন হিংস্র নরখাদক উপজাতি বাস করত। তবে সেখানকার বনে ছিল প্রচুর পরিমাণে সুবাসিত চন্দনকাঠ, যা এশিয়াতে ধর্মীয় কারনে খুবই মূল্যবান বলে মনে করা হতো। প্রচুর লাভের আশায় এই ইউরোপীয় বণিকরা তখন মহা সমারোহে গাছ কাটতে শুরু করে দেয়। কিন্তু প্রতিনিয়তই প্রাণ দিতে হয়েছে কাউকে না কাউকে ঐ নরখাদকদের হাতে।

এরপর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় প্রায় ৫,০০,০০০ মার্কিন সৈন্য প্রশান্ত মহাসাগরের যুদ্ধক্ষেত্রগুলোতে যাওয়া আসা করত। তাদের যুদ্ধবিমান, গাড়ী, সঙ্গে থাকা বড় বড় খাবার দাবারের কার্গো ইত্যাদি দেখে দ্বীপের অধিবাসীরা এতই বিস্মিত হয়ে গিয়েছিল যে এরা মনে করত এরা আসলে স্বর্গীয় দূত, ঈশ্বর কর্তৃক প্রেরিত। জাহাজের ইউরোপিয় বা আমেরিকান নাবিক তথা ঈশ্বরের দূতরা কিভাবে রেডিও শোনে, কিভাবে রাতে আলো জ্বালায় – সবই ছিল এই আদিবাসীদের বিস্ময়ের বিষয়। সেই সময় ভানুয়াতুরর তান্না দ্বীপের আদিবাসীরা নাবিকদেরকে রীতিমত পূজো করতে শুরু করে। তান্নার সেসব কাল্টদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি কাল্ট এর নাম ফ্রাঁ – যার কেন্দ্রে আছে জন ফ্রাম নামে এক ইয়োরোপীয় নাবিক। সরকারি রেকর্ড আনুসারে, ফ্রাম দ্বীপে এসেছিলেন ১৯৪০ সালে।

আদিবাসীদের মতে তিনি নাকি অনেকগুলো ভবিষ্যতবাণী করে গিয়েছিলেন। তার বক্তব্য আনুসারে, তিনি আবার দ্বীপে ফিরে আসবেন জাহাজ ভর্তি সামগ্রী নিয়ে, আর উপনিবেশকারী সাদা আমেরিকান ও ভিন্ন ধর্ম প্রচারকারী মিশনারীদেরকে দ্বীপ থেকে তাড়িয়ে দেবেন। এমনকি, তার পুনরাগমনের সময় তিনি প্রচলিত ঔপনিবেশিক মুদ্রার পরিবর্তে নতুন ধরণের মুদ্রারও প্রচলন করবেন। এ কথায় বিশ্বাস এনে ১৯৪১ সালে ফ্রাঁ আদিবাসীরা সমস্ত কাজ কারবার বন্ধ করে দিল। দ্বীপের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হল।

তার কিছুদিন পরে, যখন আমেরিকান বাহিনী দ্বীপে পদার্পণ করল, আদিবাসীরা মনে করল সময় এসে গেছে, ফ্রাম এবার আসবেই। ফ্রামের বিমান যাতে দ্বীপে নামতে পারে, সেজন্য দ্বীপে রানওয়ে তৈরি হল। তৈরি হল, বাঁশের কন্ট্রোল টাওয়ার, হেডফোন, রেডিও এন্টেনা। তারপর থেকে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলছে আহবান আর অপেক্ষা। যাদের ছাড়া এইসব আহবান সম্ভব না তারাই নাম্বাস। এই নাম্বাসরাই বর্তমান নবগঠিত কাল্টের দায়িত্বে আছেন। নাম্বাস নাকি তাদের ঈশ্বর জনের সাথে নিয়মিত ‘যোগাযোগ’ রেখে চলেন রেডিও-র মাধ্যমে। আর যোগাযোগের পন্থাটা তো দেখলেনই । স্বাভাবিকভাবেই, তাদের সমাজে নাম্বাসের কদরই অন্যরকম। নাম্বাসের বক্তব্য অনুসারে কোনো এক দিন ১৫ই ফেব্রুয়ারী জন ফ্রাম ফিরে আসবে। তাই, ঐ দিনটিতে তাদের সবচে বড় ধর্মীয় উৎসব পালিত হয়। সেদিন সবাই একটা খোলা জায়গায় একত্রিত হয়ে প্রতীকী বিমান, টাওয়ার ইত্যাদি বানিয়ে জনের উদ্দেশ্যে প্রার্থনা করে। এমন কি ২০২০ সালের দ্বারপ্রান্তে এসেও বর্তমান কার্গো কাল্ট প্রজন্ম এখনও দাবি করে যে, একদিন তিনি (জন ফ্রাম) ফিরে আসবেন এবং আবার তাদের জন্য জাহাজে করে প্রচুর মালপত্র খাবার দাবার আনবেন।

এসব দেখে ও শুনে অ্যাটেনবরো তখন তার বন্ধু স্যামকে জিজ্ঞেস করলেন, “কেন তারা জনের পুনরাগমনের প্রতিশ্রুতিতে এত বছর পরেও এরা একইভাবে জনের অপেক্ষায় বসে থাকে?”
স্যামের উত্তর, “হা হা, এদের তো মাত্র ঊনিশ বছর। অন্যদিকে সভ্য নামধারী কয়েক মিলিয়ন মানুষ তো দুহাজার বছর ধরেও কারো পুনরাগমনের প্রতীক্ষা করে যাচ্ছে।

শুধু Cargo Cult লিখে গুগল করলেই আরও বিস্তারিত দেখতে পাবেন।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৩ thoughts on “কার্গো কাল্টঃ আমাদের চোখের সামনেই সৃষ্টি হচ্ছে নতুন নতুন ধর্ম

  1. ভাল লেখা বলতে হবে!
    ভাল লেখা বলতে হবে!

    আমার লেখা পড়ার ও ফেসবুকে আমার “বন্ধু” হওয়ার আমন্ত্রণ রইল। আগের আইডি ছাগলের পেটে।এটা নতুন লিংক :
    https://web.facebook.com/JahangirHossainDhaka

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

9 + 1 =