লজ্জা বলতে কী বোঝায়? প্রকৃত লজ্জা কী?

লজ্জা প্রধাণত: দু’প্রকার:
এক (প্রকৃত বা অর্থপূর্ণ লজ্জা): আত্ম সম্মানবোধের লজ্জা।ভিক্ষা বৃত্তি করতে লজ্জা লাগে। হীন কাজে লজ্জা, ইত্যাদি। মিথ্যাচার করতে লজ্জা।সুন্দর ও মার্জিত ব্যবহার ও কথা বলতে না পারার লজ্জা। শ্রেষ্ঠ মানবীয় গুনাবলী অর্জন করতে ব্যর্থ হওয়ার লজ্জা। জ্ঞান,বিজ্ঞান ও গবেষণা পিছিয়ে থাকার লজ্জা। এ প্রকারের লজ্জাবোধ ভাল, এটা সার্বজনীনভাবে স্বীকৃত। এটাই প্রকৃত লজ্জা। যার বা যাদের এ লজ্জাবোধ নেই তারাই প্রকৃতার্থে নির্লজ্জ। কিন্তু ধর্ম যাদেরকে অন্ধ বানিয়ে রেখেছে তারা এ লজ্জাবোধ নিয়ে খুব একটা চিন্তিত নয় যতটা না চিন্তিত ও উদ্বিগ্ন পোশাকি লজ্জা নিয়ে।

দ্বিতীয় (অর্থহীন লজ্জা-রীতিগত ও মানসিক লজ্জা): কাপড় না পরে উলঙ্গ থাকার লজ্জা।এ প্রকারের লজ্জা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনার দাবি রাখে।
লজ্জা অনেকের জীবনে আত্ম-হত্যার কারন হয়েছে। কারন তার সেক্স ভিডিও বের হয়েছে। লোকে তাকে ছি ছি বলছে। সমাজে মানুষ আবিস্কৃত তথাকথিত লজ্জা না থাকলে, তাকে হয়ত এত অপমান ও কষ্ট সইতে হতো না।
মানব দেহের কোন অঙ্গই নিষিদ্ধ বা খারাপ নয়। আমরাই কোন কোন অঙ্গকে খারাপ বানিয়েছি।

লোক সম্মুখে উলঙ্গ হওয়া খারাপ কেন?
জবাবে বলবে-
এটা অশালীন, অশ্লীলতা,নির্লজ্জতা, অসভ্যতা, দেখতে অসুন্দর (পোশাক মানুষের শোভা) পশুত্ব বা পশুর মত আচারণ, ইত্যাদি।

পর্যালোচনা: অশালীন, অশ্লীলতা,নির্লজ্জতা শব্দগুলো আপেক্ষিক। এটা আমাদের মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ।এটা সার্বজনীন নয়,রক্ষনশীল সমাজের মানুষের মানসিকতা। এক সমাজে বৃদ্ধাঙ্গুল প্রদর্শন করলে পছন্দ/সমর্থন প্রকাশ বুঝায় আরেক সমাজে উহা ক্রোধের প্রকাশ বুঝায়।কোন গোষ্ঠি যদি মনে করে মেয়ে বিবাহ পূর্ব ঠাকুরের সাথে যৌণ মিলন করাকে উক্ত মেয়ের পবিত্র হওয়া মাধ্যম- তাই বলে উহাই চরম পবিত্র, শ্লীল কাজ বলে গন্য হবে না আর না তা গন্য হবে অপবিত্র, অশ্লীল কাজের মানদন্ড হিসাবে।কোন সমাজে নগ্ন হওয়া স্বাভাবিক ব্যপার, কোন সমাজ এটার নাম দিয়েছে অশ্লীলতা।এটাকে আপনি স্বাভাবিকভাবে দেখতে শেখেন, মানসিকতাকে পরিবর্তন করেন, এটা স্বাভাবিক মনে হবে। একটি পরিবেশে বড় হওয়ায় আপনার মানসিকতায় উহা খারাপ লাগতে পারে, তাই বলে আপনি আপনার মানসিকতাকে অন্যের উপর চাপিয়ে দিতে পারেন না, অন্যকে সমালোচনা করতে পারেন না।

নগ্ন হলে দেখতে অসুন্দর লাগে কথাটি ঠিক আছে। মানুষ যখন পোশাক পরে, তখন তাকে দেখতে সুন্দর দেখায়। যত সুন্দর পোশাক পরে তত সুন্দর দেখায়।যা অসুন্দর দেখায় তা তো নিষিদ্ধ নয়। আপনি যখন লুঙ্গি পরিধান করেন, গেঞ্জি গায়ে থাকেন বা খালি গায়ে থাকেন সেটাও তো আপনার অফিসিয়াল পোশাকের সাপেক্ষে অসুন্দর দেখায়।পুরো নগ্ন হওয়া আরো বেশি অসুন্দর দেখায় কথা ঠিক,তাই বলে এ নিয়ে হৈ চৈ করার কিছু নেই। আমি আপনার সামনে নগ্ন হয়ে স্নান করতে পারবো না কেন? স্নান করার সময়ও কি দেখতে সুন্দর হতে হবে?যখন আনুষ্ঠানিক কোন পরিবেশে যাব তখন সেখানে আনুষ্ঠানিক পোশাক পরে যাব, অনানুষ্ঠানিক পরিবেশে এত সুন্দর/অসুন্দর দেখানোর কোন প্রয়োজন নেই।

পশুত্ব বা পশুর মত কিছু হলেই তা খারাপ নয়। পশু খাবার খায়, আপনিও খাবার খান। এটাও তো পশুর মত হল, তাই বলে কি খাবার খাওয়া খারাপ? কোন কাজ পশুর মত কিনা বড় কথা নয়, কোন কাজ তা মানবতার জন্য কত বড় ক্ষতিকর তা মূল বিবেচ্য।
পোশাকের ব্যপারে কঠোরতা মানবতাকে কি দিয়েছে?

এ প্রশ্নের উত্তরে তারা একটি উপকারিতাও দেখাতে পারবে না। যুক্তি হিসাবে যা দাড় করাবে তা তাদের রক্ষণশীল পরিবেশে বড় হওয়াই যে মানসিকতা গড়ে উঠেছে সে মানসিকতা প্রকাশক কয়েকটি শব্দ ছাড়া কিছু নয়। বাস্তবার্থে কোন ক্ষতি তারা প্রমান করতে পারবে না।

যদি বলা হয় পোশাকের ব্যপারে কঠোরতা কি মানবতার জন্য ক্ষতিকর?
হ্য, খুব বড় ধরনের ক্ষতির কিছু না থাকলেও ছোট ছোট বেশ কিছু ক্ষতি আছে। প্রচন্ড গরমে কাতরাচ্ছেন। আপনার ঘরে এসি নেই। বাড়ীতে আপনি পোশাক খুলে কিছুটা রিলাক্স করবেন যা একান্তই নিরপরাধ কাজ, তা করতে আপনাকে বাধা দেয়।নদীতে বা সমুদ্রে গোসল করলেন, গোসল শেষে আপনাকে কাপড় পরিবর্তনের স্বাথে একগুচ্ছ কাপড় সাথে নেয়া বাধ্যতামুলক,কারন আপনি গোসল শেষে পোশাকবিহিন বাসায় আশার পারমিশন নেই। প্রচন্ড গরমে, বিশেষত: মেয়েদের, ব্লাউজ, তার উপর আরেকটি কাপড়, তার উপর ওড়না সহ গা ঢেকে গরম সহ্য করতে হয়। ছেলেদের মত খালি গায়ে থাকা নিষিদ্ধ।অথচ প্রচন্ড গরমেও মেয়েদেরকে একইসাথে দু’তিনটি কাপড় পরে দূর্বিসহ কষ্টে সময় কাটাতে হয়। এডেপটেশন আর কারনে তারা এ কষ্টকে সয়ে নিয়েছি,যেভাবে একজন রিক্সা চালক প্রচন্ড গরমে রিক্সা চালাতে অভ্যস্ত হয়ে যায়, একজন কৃষক প্রচন্ড রৌদ্রে পূড়ে কাজ করতে করতে সে যন্ত্রণা তার কাছে স্বাভাবিক হযে যায়, ঠিক একইভাবে একজন নারীও প্রচন্ড গরমে একসাথে কয়েকটি কাপড় পড়ে থেকে অভ্যস্ত হয়ে যায়। অভ্যস্ত হয়ে যাওয়া মনে এ নয় যে কষ্ট হয় না। অর্থহীনভাবে তাদেরকে অসহণীয় কষ্ট সহ্য করতে হয়।একটি নির্দোষ,ক্ষতিহীন,সাধারণ বিষয়কে এতো কঠোর করা মূর্খতার অনুশীলনই বটে।পোশাকহীন কিছু সময় যদি আপনি খোলাস্থানে কিছু সময় কাটান এটা আপনার স্বাস্থের জন্য উপকারী।

প্রতিবাদকারী বলবে- তাহলে তো মানুষ আর পশুর মধ্যে কোন পার্থক্য থাকল না? মানুষ তো পশুর ন্যয় অবৈধ যৌনাচারও করবে।

জবাব: মূল যুক্তিটি হল- পশুর ন্যয়। পশুর মত কিছু হলেই কি খারাপ। ভাল-খারাপের মানদন্ড হবে কোন কর্ম মানব জাতীর জন্য কতটুকু উপকারী বা ক্ষতিকর তার উপর ভিত্তি করে। যা মানুষের জন্য উপকারী তা পশুর মধ্যে থাকলেও আমরা সে কাজকে গুরুত্ব দিব এবং লালন করবো। যেমন- কুকুর মানুষের বাড়ী পাহারা দেয় অতি দায়িত্বশীলতার সহিত। আপনি কি দায়িত্বশীলতাকে খারাপ গুন বলবেন- কারন দায়িত্বশীলতা কুকুরের স্বভাব। আপনি দায়িত্বশীল ব্যক্তি হলে যদি বলি- লোকটি খুব খারাপ,কুকুরের মত দায়িত্বশীল- এরুপ ঘৃণাত্মক ভাষা ব্যবহার করলেই কি দায়িত্বশীলতা নামক গুণটি খারাপ হয়ে যাবে?পিপড়া ও শুকরের মধ্যে দলবদ্ধভাবে থাকা ও কাজ করার প্রকৃতি আছে। দলবদ্ধভাবে মিলেমিশে কাজ করলে যদি বলি শুকরের মত ওভাবে দলবদ্ধভাবে কাজ করেন কেন?-এটা খুব যৌক্তিক প্রশ্ন হবে, তাই না। আপনি কোন কাজের সমালোচনা করলে সুনির্দিষ্টভাবে বলুন তাতে কি কি ক্ষতি আছে- তাহলে সেটা গ্রহণযোগ্য হবে।’পশুর মত’ শব্দটির সাথে মানুষের অনুভূতি জড়িত, আর আবেগ-অনুভূতি গড়ে উঠে অভ্যাসগত ও পরিবেশগত কারনে।’পশুর মত’ শব্দটির সাথে মানুষের নেতিবাচক অনুভূতি জড়ি, কারন মানুষ শব্দটিকে নেতিবাচকভাবে ব্যবহার করে অভ্যস্ত, রক্ষণশীল সমাজে মানুষ কঠোরভাবে পোশাক পরে অভ্যস্ত, অপরের সামনে পোশাক খোলা এ সমাজের মানুষের অভ্যাস ও পরিবেশগত কারনে যে অনুভূতি তৈরি হয়েছে সে অনুভূতি জড়িত, অপরের সামনে পোশাক খুলতে গেলে সেই অনুভূতিকে নাড়া দেয়। আবেগ-অনুভূতি কোন কিছুর ভাল-খারাপ নির্ধারণ করে না, বুদ্ধিমান লোকেরা ভাল খারাপ নির্ধারণ করে সুস্থ বিচার-বুদ্ধি দ্বারা, আবেগ-অনূভূতি দ্বারা নয়। আবেগ-অনুভূতি সৃষ্টি হয় একটি সমাজে দীর্ঘদিন লালিত আচার-আচারণ ও কৃষ্টি-কালচার দ্বারা। এ জগতে হাজার হাজার জাতী-গোষ্ঠি আছে-তাই হাজার হাজর কৃষ্টি কালচার আছে যার বেশিরভাগ কুসংস্কারে আচ্ছন্ন। মূর্খরা পেত্রিক সুত্রে পাওয়া কালচার অন্ধভাবে পালন করে থাকে এবং নিজ কালচারের গর্ব করে থাকে। পৈত্রিক সুত্রে পাওয়া সবকিছু ভাল হয় না, মূর্খ শ্রেণীর মানুষ তা বোঝে না।পৃথিবীতে যা কিছু ভাল ও কল্যাণকর সেটিই আমার কালচার।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

89 − 82 =