ধর্মভিত্তিক রাজনীতি :রাজনীতির ধর্মহীনতা

ধর্মভিত্তিক দল বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পূর্বেও এই অঞ্চলে সক্রিয় ছিল। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে নতুন করে আরো কিছু ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলের আবির্ভাব ঘটেছে। তারপরও বাংলাদেশের সবগুলো ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলের মোট সমর্থকদের সংখ্যা আওয়ামীলীগ বা বিএনপি যে কারোর একক সমর্থকের সমান নয়। জামায়াতের সমর্থক সংখ্যা যতই কম হোক তাদের সংগঠন অত্যন্ত সুসংগঠিত,অর্থকড়ি প্রচুর এবং বিধ্বংসী ক্ষমতা মারাত্মক। সারা দেশের আনাচে কানাচে তাদের অল্পসংখ্যক হলেও সমর্থক এবং আকারে ক্ষুদ্র হলেও সংগঠন আছে। তবুও ভোটের হিসাবে তারা এখনো নগন্য। অন্যান্য ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলোর সমর্থন ও সংগঠন সম্পর্কে খুব একটা জানা যায়না। প্রশ্ন হচ্ছে সারা দেশে খুব সামান্য সংখ্যক মানুষ রাজনীতিতে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলের সমর্থক হওয়া সত্ত্বেও, কেন সাবেক বিএনপি এবং বর্তমান আওয়ামীলীগ ক্রমাগতভাবে ধর্মভিত্তিক দলগুলোর দিকে ঝুঁকছে? তারা শুধুই যে ভোটের হিসাব কষে ঝুঁকছে তাই নয়, (ভোটের রাজনীতিতে ভোটের হিসাব না করাটা খুব বিচক্ষণতার কাজ নয়। সুতরাং ভোট বাগানোর জন্য একটু এদিক ওদিক করাটা খুব দোষের না। ) ঝুঁকতে যেয়ে তারা নিজেদের রাজনৈতিক আদর্শকে একেবারে জলাঞ্জলি দিয়ে দিচ্ছে। দিতে দিতে এমন হয়ে যাচ্ছে যে আমরা এখন বিভ্রান্ত হয়ে যাচ্ছি কোনটা ধর্মভিত্তিক দল আর কোনটা ধর্মনিরপেক্ষ দল।ধর্মনিরপেক্ষতার ভিত্তিতে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ( সামরিক শাসনের সময়ের কথা বাদ দিচ্ছি) কেন গত বিশ পঁচিশ বছর ধরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে ধর্মের গুরুত্ব বাড়ছে? কেন হঠাৎ করে বর্তমান আওয়ামীলীগ এতোটা মরিয়া হয়ে ধর্মীয় রাজনীতির দিকে ঝুঁকছে?

আওয়ামীলীগ হয়তো ভাবছে যে যদি ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের ভোটগুলো, (যে ভোটাররা প্রকৃতপক্ষে কোন দলের রাজনীতি না করলেও এন্টি আওয়ামীলীগ পজিশন নেয় সবসময়ই।) যদি নিজেদের পকেটে আনা না যায় তাহলে সেগুলো বিএনপির পকেটে ঢুকে বিএনপি কে ক্ষমতায় বসিয়ে দিতে পারে। সেজন্যই আওয়ামীলীগ ওই এন্টি আওয়ামীলীগ সুইং ভোটগুলোকে নিজেদের ঝুলিতে আনার জন্য ধর্মীয় বিষয়গুলোতে মদদ দিচ্ছে। তাছাড়া আওয়ামীলীগের নামে অনেক আগে থেকেই “ইসলামবিরোধী” তকমা লেগে আছে। সেই কলঙ্ক মোচনেরও একটা চেষ্টা হয়তো করছে। কিন্তুু কেন এখন আওয়ামীলীগের এই তকমা মোচনের প্রয়োজন পড়ল? কেন তার মনে হল যে ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য এন্টি আওয়ামীলীগ সুইং ভোটগুলো আবশ্যক?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে আরেকটি প্রশ্ন সামনে এসে পড়ছে। জনগনের চাহিদা এবং জীবনদর্শনই রাজনৈতিক দলগুলোকে তাদের এজেন্ডা এবং দলীয় নীতিমালা নির্ধারণকে নিয়ন্ত্রণ করে নাকি জনগনের চিন্তা চেতনা এবং জীবনমানকে নিয়ন্ত্রণ এবং কোন নির্দিষ্ট লক্ষ্য অভিমুখে চালনা করার জন্য রাজনৈতিক দলগুলো তাদের এজেন্ডা ও নীতিমালা প্রণয়ন করে? আমাদের ইতিহাসে উনসত্তর থেকে একাত্তর পর্যন্ত আমরা লক্ষ্য করি যে জনগনই আওয়ামীলীগের কর্মসূচিকে নিয়ন্ত্রণ করেছে। বায়ান্নতেও ছাত্রদের কর্মসূচি সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদের সিদ্ধান্ত বদলাতে বাধ্য করেছে। একাত্তরে তো জনগণ এমন অবস্থা সৃষ্টি করেছিল যে আওয়ামীলীগের মনে ভিন্ন কোন চিন্তা থাকলেও জনগনের দাবীকে অগ্রাহ্য করার কোন উপায় ছিল না, শেখ মুজিব তা করেনওনি। অর্থাৎ ইতিহাস বলছে জনগন রাজনৈতিক দলের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে।তাহলে আজকে আওয়ামীলীগ যে ধর্মমুখী রাজনীতিতে নামার সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং সেই অনুযায়ী কাজ করছে সেটা কি জনগনের চিন্তাভাবনা বা তাদের পালস বুঝে? জনগন কি তাহলে দিন দিন ধর্মমুখী রাজনীতির দিকে ঝুঁকছে যেজন্য আওয়ামীলীগকেও ধর্ম নিয়ে রাজনীতি করতে হচ্ছে? এবং ধর্মীয় রাজনীতির সমর্থক সংখ্যা কি এতোই বেশি যে তারা ভোটের মাঠে বিরাট প্রভাবকের ভূমিকা নিতে পারে, যার জন্য আওয়ামীলীগ খোলামেলা ধর্মীয় রাজনীতিতে নেমে যাচ্ছে? তাই যদি হয় তাহলে প্রশ্ন করতে হবে কেন জনগন ক্রমান্বয়ে ধর্মীয় রাজনীতিতে ঝুঁকছে। সেই প্রশ্নের উত্তর অবশ্য আকাশপাতাল আলোচনার বিষয়। তবে এই পর্যায়ে এটুকু স্বীকার করে নিতে হবে যে দেশে ধর্মীয় রাজনীতির সমর্থক বেড়েছে বিশাল পরিমানে।

প্রশ্ন এবং আলোচনা এখানেই শেষ করে দেওয়া বা উপরোক্ত উপপাদ্যকে ধ্রুব ধরে আর কোন প্রশ্ন উত্থাপন না করাটা ঠিক হবেনা। সামাজিক বিজ্ঞানের যে কোন বিষয়ের আলোচনায় এতো সহজে স্থির সিদ্ধান্তে পৌছানো যায়না।তাই আমাদেরকে উল্টো দিকটাও আলোচনা করতে হবে। অর্থাৎ রাজনৈতিক দলগুলো তাদের কর্মপদ্ধতির মধ্য দিয়ে জনগনকে দিনদিন ধর্মীয় রাজনীতির অভিমুখে চালনা করছে কিনা সেটাও ভাবতে হবে। আমাদের সামরিক শাসকেরা তাদের শাসনামলে একদিকে যেমন জনগনের মৌলিক স্বাধীনতা অর্থাৎ রাজনৈতিক এবং বাক স্বাধীনতাকে ক্ষুন্ন করেছিল তেমনি আবার সংবিধান বদলিয়ে একটি রাষ্ট্রধর্ম প্রবর্তন করে। সেই রাষ্ট্রধর্মের স্বাদ এবং প্রথম শ্রেনীর নাগরিক হওয়া এবং ধর্মীয় কারনে বাড়তি সুবিধাপ্রাপ্ত হওয়ার আস্বাদেই কি দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ ধর্মীয় গোষ্ঠির লোকেরা ধর্মকে রাজনীতিতে টেনে আনতে উদ্যোগী হয়েছে সেটাও ভেবে দেখা দরকার।জনগনকে ধর্মের আফিম খাইয়ে অশিক্ষিত অর্ধশিক্ষিত এবং কুশিক্ষিত জনগনকে পরকালে লোভে মত্ত রেখে পার্থিব শুভাশুভ থেকে মুখ ফিরিয়ে রাখার ব্যবস্থা করে দেশটাকে ইচ্ছামত লুন্ঠন করে নিজেদের সম্পদের ঝুলি কানায় কানায় ভর্তি করার ফন্দি কিনা সেটাও বিচার্য। আমি প্রস্তাব রাখলাম। ভাবনার দায়িত্ব আপনার।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

10 + = 11