এক্সকিউজ মি শানু, আপনি কেমন আছেন ?

কর্দমাক্ত রাজপথটাকে ফর্মুলা ওয়ানের ট্র্যাক মনে করে কেউ একজন সবেগে গাড়ি চালিয়ে গেলেন সামনে দিয়ে । রাস্তায় জমে থাকা নোংরা কাদাপানি ছিটকে এসে লাগল আমার গায়ে । রেগে গিয়ে খ-বর্গীয় গালি দেয়ার আগেই মাইকেল শুমাখার সাহেব লাপাত্তা ।

কোর্ট বিল্ডিংয়ের কোনো এক লাল দালানের বারান্দায় উঠে বসলাম । ‘এখানে দলিল লেখা হয়’ সাইনবোর্ডওয়ালা টেবিলের পিছনে । প্রায় সাথে সাথেই একজন তরুণী এসে কিছু কাগজ আমার হাতে ধরিয়ে দিয়ে জানতে চাইলেন এখানে ঠিক কি কি লেখা আছে, বুঝিয়ে বলতে । আমি বিনয়ে বিগলিত হয়ে কাঁচুমাচু করে দাঁড়িয়ে যাই । সুন্দরী রমণীদের যেকোনো অনুরোধ রাখতে আমি বদ্ধ-পরিকর, তাই মনোযোগ দিয়ে দেখতে থাকি কাগজগুলো; যদিও এ বিষয়ে বিন্দুমাত্র জ্ঞানও আমার নেই । চোরাদৃষ্টিতে তাকাই রমণীটির দিকে । মাথায় ঘোমটা, চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা । নাকের ওপাশটায় একটা তিল আছে কি নেই, ঠিক বোঝা যাচ্ছে না । আমি দীর্ঘশ্বাস ফেলি ।

কাগজগুলো ফেরত দিয়ে দেই । রমণী অবাক হন তবে খুব একটা আহত হন না । ভালো দিক । আজকালকার মেয়েরা অল্পতেই আঘাত পেয়ে যায়, শক্ত হওয়া উচিত । পেছন থেকে অচেনা কোনো নারীকণ্ঠের ডাক শুনে রমণী চলে যায় । আমার দীর্ঘশ্বাস দীর্ঘতর হয় ।

ছোটবেলায় সাঁতার কাটতে জানতাম না, একটু বড় হয়ে দেখি সাইকেলও চালাতে জানি না । এই রমণীটির দেয়া আদালতি কাগজগুলোর গূঢ় অর্থ কী ছিল তাও জানি না । তবে আমি এই তরুণীর নাম চুরি করেছি, আরেকটু কাছে ঘেঁষে দাঁড়ালে খানিকটা ঘ্রাণও চুরি করা যেত । তরুণীর নাম শাহানা । সুন্দর নাম । খুব ইচ্ছে করছে শাহানাকে ডেকে জিজ্ঞেস করি, তিনি কেমন আছেন । শাহানা নামটাকে ছোট করে ডাকবো ‘শানু’, ঘনিষ্ঠতা দেখায় যাতে । শাহানা দ্বিধায় ভুগবেন আমি তার পূর্ব-পরিচিত কিনা তা ভেবে । আমি অমায়িক হাসি হেসে সেই দ্বিধা বাড়িয়ে দিবো আরো ।

কিন্তু শেষমেশ হারে মন । উচ্চ আদালতে রায় হয়, কৌতূহলী মন বিকারগ্রস্ত । আমি বরং কোর্ট প্রাঙ্গনে থাকা ময়লা পুকুরটাতে গিয়ে পঙ্কমুক্ত হই । চাঁদের জ্যোৎস্না আছে সুতরাং কলংক থাকতে পারে । আমার গায়ে থাকা যাবে না । আমি চাঁদ নই, আমার জ্যোৎস্না নেই । বড়জোর আমার ভাগ্যে চন্দ্রের প্রভাব থাকতে পারে । পার্কে বসা জ্যোতিষীকাকু হারানাথ এমনটাই বলেছিলেন । তবে হারানাথ কাকু অনেক ভুলভাল গণনা করেন । বলেছিলেন রিয়া আমাকে কখনো ছেড়ে যাবে না । তাঁর ভবিষ্যদ্বাণীর পরদিনই রিয়া আমাকে ছেড়ে চলে গেল । পাখি উড়ে গেছে । The bird has flown away.

আজ আবার হারানাথ কাকুর সাথে দেখা করতে ইচ্ছে হচ্ছে । টিয়া পাখিকে দিয়ে উত্তর খুঁজবো, শাহানা মেয়েটার কোনো ভালোবাসার মানুষ আছে কিনা । টিয়াপাখিটা ‘না’ লেখা খামটা টকটকে লাল ঠোঁট দিয়ে তুলে ধরবে । এভাবেই দিনটা বেশ ভালো লাগা শুরু হবে । মেসে একবেলার মিল না খেয়ে দামী কোনো সিগারেটের ধোঁয়ায় সেই ভালো লাগাটা উদযাপন করবো না হয় । সৌরভের কাছ থেকে ধার করা রোদচশমাটা চোখে লাগিয়ে ঘুরবো সারা বিকাল, হেঁটে বেড়াবো লেকের পাড় ধরে । রাতে রুমমেটদের সাথে বসে তাস খেলার বদলে একলা ছাদে বসে গায়ে হাওয়া লাগিয়ে রোমান্টিক হিন্দী গান শুনবো । একটাদিন এতোটা সুখে থাকা কম কথা নয় । এটাই দরকার আমার । এটাই অনেক কিছু ।

পরদিন সকালে উঠেই নেমে যাব চাকরী খোঁজার অভিনয়ে । পকেট-কাটার সুনিপুণ প্র্যাক্টিক্যাল ক্লাস চালাবো শহরের ভীড় করে থাকা জায়গাগুলোতে । শাহানার বাম কানের দুলটা খুলে নিয়ে এসেছি । কাল এটা ফেরত দেয়ার বাহানায় যখন আবার আসবো, তখন জিজ্ঞেস করতে পারবো, “এক্সকিউজ মি শানু, কেমন আছেন আপনি ?”

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৩ thoughts on “এক্সকিউজ মি শানু, আপনি কেমন আছেন ?

  1. ভালো লাগল। লেখায় একটু হুমায়ূন
    ভালো লাগল। লেখায় একটু হুমায়ূন আহমেদের ধাঁচ চলে এসেছে।

    পাখি উড়ে গেছে । The bird has flown away.

    আসতেই পারে, ওটা বড় কোন অপরাধ না। বাই দ্যা ওয়ে, হুমায়ূন কি আপনার প্রিয় লেখক? :ভেংচি:

    লেখা চালিয়ে যান। আপনার লেখনির শক্তি আপনি ইতিমধ্যেই দেখিয়ে দিয়েছেন। :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ:

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 6 = 2