মুমিনের পাঠশালা – মাদ্রাসা

বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার মাঝে সুস্পষ্ট যে বিভেদ বর্তমান তার রাজনৈতিক কারণ থাকলেও সামাজিক স্তর বিন্যাস এবং এর সাথে ধর্মবিশ্বাস সরাসরি জড়িত। নানা তাত্ত্বিক এবং শিক্ষাবিদেরা নানা আলোচনায় এই স্তর বিন্যাসের সবচেয়ে নিচে স্থান দেন মাদ্রাসা শিক্ষাকে। এই অংশের শিক্ষার্থীদের চিহ্নিত করেন সবচেয়ে অনগ্রসর অংশ হিসেবে। সত্যিকারের শিক্ষা এরা পায়না, কেবল ধর্মকেন্দ্রিক শিক্ষাকে ঘিরে এদের জানাশোনা এসব নানা অভিযোগ স্বীকার করেই বলা যায় আগামী বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শ্রেণী হতে যাচ্ছেন এইসকল চেনা-অচেনা কওমী বা আলিয়া মাদ্রাসার লক্ষ লক্ষ ছাত্রছাত্রীরা। যেখানে বাংলা বা ইংরেজী মাধ্যমের শিক্ষার গুরুত্ব কেবল পরস্পরের ভেতরের নানা চাহিদা এবং অপকৃষ্টতার বৃত্তে বন্দী হয়ে যাচ্ছে।

প্রথমত, বাংলাদেশে যে শ্রেণীর জন্য বাংলা মাধ্যমের শিক্ষা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিবেচিত সেই মধ্যবিত্ত স্বয়ং আজ এই শিক্ষার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। তাদের লক্ষ্য নির্ধারিত হচ্ছে ইংরেজী, যেখানে একদল সুবিধাবাদী গোষ্ঠী ইতমধ্যেই জাঁকিয়ে বসে আছে। তো মধ্যবিত্তের অপরিসীম আকাঙ্খার সবটুকু জুড়ে সেইখানে প্রতিষ্ঠিত হবার লড়াই। আর সেই শিক্ষার সবটুকুই যে বাংলাদেশের জন্য অপ্রয়োজনীয় তা বলাই বাহুল্য। ব্যক্তি হিসেবে বিশ্বজুড়ে জানানোর, বিদেশে বড় চাকরি কিংবা কোন মাল্টি ন্যাশনাল কোম্পানির চাকর হবার জন্য এই অংশের মধ্যবিত্তের লড়াই এখন চলমান। এই অংশের বড়লোকেরা কেবল মর্যাদার জন্যই এখানে থাকেন। তাদের ছেলেমেয়েরা বিদেশেই সুপ্রতিষ্ঠিত হন। সুতারাং এই শিক্ষাব্যবস্থার শিক্ষার্থীরা দেশের আভ্যন্তরীণ কোন লড়াইয়ের সাথে নিজেকে সপৃক্ত মনে করা দূরে থাক কোনভাবে এই দেশের নাগরিক এই পরিচয়টায় মুছে ফেলতে পারলে বাঁচেন। সেখানের শিক্ষাক্রমও কোন বাঙালি চেতনার জন্ম দেয় না। তারা সমস্ত শিক্ষাক্রম শেষ করবার পর বাঙালি পরিচয় মুছে অধিকাংশ সময়ই হয়ে উঠছেন সাম্প্রদায়িক মডারেট মুসলমান। তাদের সাম্প্রদায়িক হয়ে ওঠার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ কারণটি হচ্ছে ব্যক্তিগত জীবনের হতাশা আর সংকীণতা। সবচেয়ে নিরাপদ এবং ক্ষমতার সাথে যুক্ত যৌথতার কারণে তারা শেষমেষ ধার্মিকই হয়ে ওঠেন। মদ খান, নারীরা টাইট লেগিংস, টি-শার্টের সাথে মাথায় স্কার্ফও জড়ান। এই অংশ কোনভাবেই বাংলাদেশের অস্বিত্বের সাথে নিজেদের সম্পৃক্ত মনে করেন না।

দ্বিতীয়ত, অর্থনৈতিক বাস্তবতায় বাংলা মাধ্যমের শিক্ষার প্রয়োজন আজ ফুরিয়ে গেছে। এখানের জগাখিচুরি শিক্ষাক্রম কেবল জন্মদিচ্ছে অসংখ্য বেকারত্বের। তারা কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে হলে জানতে হয় ভালো ইংরেজী, চাকরির জন্য ইংরেজী, এমনকি উচ্চশিক্ষার পাঠক্রম আজ ইংরেজীরই দখলে। একইসাথে সরকারি শিক্ষার সংকট প্রকট হওয়া, টাকা যার শিক্ষা তার এই নীতি জারি থাকা, অসংখ্য বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করা তুলনামূলক খারাপ ছাত্রের ভালো মানের সার্টিফিকেটের সহজলভ্যতা এই মাধ্যমের পুরো ব্যবস্থাকেই ধ্বংস করে দিচ্ছে। এখান শিক্ষা হয়ে পড়ছে কেবল সার্টিফিকেট সর্বস্ব। নতুন চিন্তা বা চেতনার উন্মেষ আর এখানে সম্ভব হচ্ছে না। এখানকার একটা অংশ ব্যস্ত হয়ে পড়ঠে স্যাট, জিম্যাট, জিআরইতে আর আরেক অংশ ক্ষমতার অপরাজনীতির গুণ্ডামিতে। বাংলা মাধ্যমের পুরো শিক্ষাক্রম জুড়ে এখন কেবল হতাশার জয়গান। তাই এই জায়গা বাঙালির ভরসার জায়গা থেকে ধীরে ধীরে নির্বাসিত হয়ে যাচ্ছে। রাষ্ট্র ব্যবস্থার মাঝে এই অংশ হয়ে পড়ছে স্বার্থপর, সংকীর্ণ আত্মভোলা এক জনগোষ্ঠী। এরা পরস্পর অসুস্থ প্রতিযোগী হয়ে নিজেদেরকে গিলছে আবার উগড়ে দিচ্ছে। রাষ্ট্রব্যবস্থার সবচেয়ে নিকৃষ্ট অংশ হয়ে পড়ছে এই শ্রেণী।

তৃতীয়ত, রাজনীতিতে বাংলা মাধ্যমের শিক্ষার্থীদের অবস্থান কেবল নোংরায় পরিণত হয়ে পড়ছে। বাম ছাত্র সংগঠন এই অংশে সক্রিয় থাকলেও সমস্ত রাজনীতিকে সে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনা। বরং অধিকাংশ সময় তারাই সেই নোংরা বৃত্তে আবদ্ধ থাকে। দখল আর অস্ত্রে ক্যাম্পাস কাপানো আদর্শ বর্জিত রাজনীতির চর্চা আমাদেরকে কোন শুভ কিছুর ইঙ্গিত দেয় না, আর এই প্রক্রিয়ার ভেতর তা ঘটারও কথা নয়। ফলে এই অংশের প্রকৃত রাজনীতি চর্চার উপর সমাজের বৃহৎ অংশই অসন্তুষ্ট। যেহেতু তারা কেবল ক্ষমতার উচ্ছিট খেয়ে টিকে থাকে তাই ক্ষমতার পালাবদলে তারও বদলে যায়। জাতীয় রাজনীতিতে তার নতুন কোন সম্ভবনা আনা তো দূরে থাক প্রতিনিয়ত তারা যেকোন নতুন সম্ভবনাকে হত্যা করে চলে। সুতরাং এই মাধ্যমের সকল ছাত্র সংগঠন ধীরে ধীরে যে অকেজো হয়ে পড়ছে একইসাথে তারা ভবিষ্যত বাংলাদেশের জন্যও হয়ে পড়ছে গন্ধময় আর্বজনা বিশেষ। জাতীয় এবং সামষ্টিক সমাজ ব্যবস্থায় তাদের রাজনীতি কেবল ভোগ-দখলের রাজনীতি, তাই প্রতিনিয়ত এই অংশের রাজনীতি সমাজ ও ভবিষ্যত বাংলাদেশের সকল সম্ভবনা থেকে কেবল দূরেই সরে যাচ্ছে। একসময় বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্মের পিছনে যে অংশ রাজনৈতিক ভাবে সবচেয়ে সক্রিয় ছিল তারাই আজ রাজনৈতিক ভাবে হয়ে পড়ছে সবচেয়ে অনগ্রসর। দেশের ভবিষ্যত রাজনীতিতে এদের গুরুত্ব কেবল হ্রাস পাচ্ছে। জনগণের সাথে সামাজিক, রাজনৈতিক ভাবে এই অংশ প্রতিনিয়ত হেয় হয়ে পড়ছে।

অন্যদিকে দানে-খয়রাতে গড়ে ওঠা দেশের আনাচে-কানাচে গড়ে ওঠা মাদ্রাসাগুলোই আজ জাতীয় রাজনীতির সবচেয়ে বড় নিয়ামক, গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে পরিণত হচ্ছে। মূলত ক্ষমতার রাজনীতির সক্রিয় পৃষ্ঠপোষকতায় স্বাধীনতার পর থেকেই সাংগঠনিক ভাবে তাদের উত্থান পর্ব শুরু। যে আওয়ামী লীগ সরকার মুক্তিযুদ্ধের চেতনার একমাত্র ধারক দল হিসেবে নিজেদেরকে জাহির করে চলে অবিরত, যারা সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতার রাজনীতি করে, সমাজতন্ত্রের বুলি আউড়ে জনগণকে ধোঁকা দেবার সফল রাজনীতি চালায়, যাদের নেতা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু তিনি সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতার অন্তরালে ১৯৭১ সালে পাকিস্তান রাষ্ট্রের ইসলাম শিক্ষার ব্যয় ২৫ লক্ষ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৯৭৩ সালে করেন ৭২ লক্ষ টাকা। সুস্পষ্টভাবে রাষ্ট্রের অন্যসকল ধর্মকে এখানে প্রথমবারের মত রাষ্ট্রীয়ভাবে উপেক্ষা করা হয়। বেঈমানি করা হয় জনগণের সকল আকাঙ্খার সাথে। সংবিধান, সরকার সমস্তই পাকিস্তান রাষ্ট্রের আলোকে পরিচালনের নীতি থেকে বের হতে পারে না। এমনকি জনগণের চেতনার বিপরীতে দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক মহলে বেছে নেয় পুরোনো পাকিস্তানের খোলসকেই। বাংলাদেশ যোগ দেয় ওআইসি (OIC) তে এর পূর্ব শর্তানুসারে পাকিস্তানের স্বীকৃতির জন্য ভুট্টোকে বাংলাদেশে লালগালিচা সংবর্ধনা দেন বঙ্গবন্ধু। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ইসলামি চেতনার অনুসারে জারি করা হয় ইসলামি ব্যাংক অধ্যাদেশ-১৯৭৫। পাকিস্তানের মৌলবাদি খোলস একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে যতখানি ভাঙা হয়েছিল শাসক শ্রেণীর বেইমানি জনগণকে ফিরিয়ে নিয়ে যায় সেই পুরোনো খাঁচাতেই। মূলত ক্ষমতার রাজনীতিকে পোক্ত করার জন্যই বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার পর যে হাত মিলিয়েছিলেন প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির সাথে। সেই হাত মিলানো আজ বুকে এসে মিলেছে। শেখ মুজিব পরবর্তী রাষ্ট্র ক্ষমতার চড়া সকল সরকার জিয়া, এরশাদ, খালেদা, হাসিনা সকলেই একই চর্চা অব্যহত রাখছেন। মূলত স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে জনগণের চেতনাকে অস্বীকার করার মধ্য দিয়ে মূলত পাকিস্তানের পুরোনো চেতনাকেই রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকার করে নেয়া হয়। মুক্তিযুদ্ধ তথা বাংলাদেশ রাষ্ট্রের বিরোধিতাকারিরা এই সুযোগকে হাতছাড়া করে না। টিকে থাকার একমাত্র অবলম্বন হিসেবে এই ধর্ম ব্যাবসায়ীরা ধর্ম শিক্ষাকেই আকড়ে ধরে সর্বশক্তিতে।

২.

মাদ্রসা শব্দটি আরবি ‘দারসুন’ থেকে এসেছে। যার অর্থ পাঠ। খোদ আরবেই এই পাঠের ব্যাপি কেবল ধর্মীয় শিক্ষার মধ্যে আবদ্ধ ছিল না। আরব দেশগুলোর মাদ্রাসাগুলোর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রন সরকারের হাতেই। সবচেয়ে আশ্চর্য বিষয় হচ্ছে আরব দেশগুলোর মধ্যে একমাত্র শতভাগ ইসলাম ধর্মের লোক বাস করে যে সৌদি আরবে সেখানেও কেবলমাত্র ধর্মীয় শিক্ষা দেবার জন্য আলাদা কোনো মাদ্রাসা বা ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নেই। আমাদের দেশের মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থার ধারকেরা কথায় কথায় যে কোরানের কথা থেকে উদ্ধৃতি টেনে আনেন সেই পবিত্র ধর্মগ্রন্থেও কেবল মাত্র ধর্মীয় শিক্ষার জন্য কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কথা বলা হয়নি। কোরান বলেছে ‘ফারিদাতুন আলা কুল্লে মুসলিমিন’ যার অর্থ দাঁড়ায় প্রত্যেক মুসলিমের জন্য জ্ঞান অর্জন বাধ্যতামূলক। এখানে কোন ধর্মীয় জ্ঞান নয় বরং সার্বজনীন জ্ঞানের কথায় বলা হয়েছে। আবার মোহাম্মদ (স:) নিজে বলেছেন ‘জ্ঞান অর্জন করো, জ্ঞান অর্জনের জন্য প্রয়োজনে সূদুর চীন দেশে যাও। এখানে নিশ্চয়ই ইসলাম ধর্মের জ্ঞান অর্জনের কথা নবী বলেননি? যেখানে খোদ ইসলাম প্রবর্তক ধর্মীয় জ্ঞান অর্জনের জন্য কোন আলাদা প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন আছে বলে মনে করেননি সেইখানে বাংলাদেশের মত রাষ্ট্রে ইসলামী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের এত আধিক্য কেন? এই প্রশ্নের উত্তরের আগে এই উপমহাদেশে মাদ্রাসা শিক্ষা চালুর দিকে নজর ফেরালেই বিষয়টা সহজে বোঝা যাবে। উপমহাদেশে ইসলাম শিক্ষার জন্য আলাদা প্রতিষ্ঠান বিকশিত হয় অমুসলিম খ্রিস্টান লর্ড ‍ওয়ারেন হেস্টিংস এর আনুকুল্যে। মোগলদের শাসনামলে বন্ধ হয়ে যাওয়া মাদ্রাসাগুলোকে নতুনভাবে তিনি প্রাণ দেন ১৭৮০ সালে কলকাতা আলিয়া মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করার মধ্য দিয়ে। তবে সবচেয়ে মজার ব্যাপার হচ্ছে এই মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠার পেছনে অর্থ সাহায্য দেন একজন হিন্দু নবাব রাজা নবকৃষ্ণ দেব। মাতৃশ্রাদ্ধ উপলক্ষে রাজা নবকৃষ্ণ নয় লক্ষ টাকা ব্যয় করার উদ্যেগী হলে লর্ড ওয়ারেন তাকে ছয় লাখ টাকা ব্যয় করার অনুরোধ করেন আর বাকি তিন লাখ টাকা দিয়ে মুসুলমানদের জন্য একটি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠার জন্য বলেন। রাজা সে অনুরোধ রাখলে ওয়ারেন মৌলভি নাজির উদ্দীনের আলেমের মাধ্যমে কলকাতা মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠা করেন। ইংরেজ শাসনের পতন হলে এই মাদ্রাসাও গতি হারায়। তবে এর আগে ১৮৫৭ সালে ইংরজী শিক্ষায় শিক্ষিত স্যার সৈয়দ আহমদ খান আলিগড়ে ‘মাদ্রাসাতুল উলম’ তৈরী করলে তা মুসুলমানদের মধ্যে অধিক জনপ্রিয় হয়। এবং ১৯২০ সালে এটিই আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের রূপ লাভ করে। তবে কলকাতা মাদ্রাসার উল্লেখযোগ্য দিকটি হলো এখানের পাঠক্রমে ইসলামি শাসন ও বিচার ব্যবস্থাকে প্রাধান্য দান করা হতো। এই মাদ্রাসার প্রধান মৌলভি বাহারুল উলুম মোল্লা মজদুদ্দীন দরসে নিজামি’র পাঠক্রম দ্বারা প্রভাবিত হয়ে এবং ওয়ারেন হেস্টিংস এর প্ররোচনায় এই শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করেন যা ১৯৭০ সাল পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। বর্তমানে বাংলাদেশে প্রচলিত মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থাকে তিন ভাগে ভাগ করা যেতে পারে। ১. প্রাচীন কাঠামো ভিত্তিক দরসে নিজামী, ২. পরিবর্তিত ও পরিবর্ধিত পাঠক্রম ভিত্তিক দরসে নিজামী, ৩. আলিয়া নেসাব। সহজ ভাষায় প্রথম দুই শ্রেণীর মাদ্রাসা কওমী মাদ্রাসা এবং তৃতীয়টিকে আলিয়া মাদ্রাসা বলা হয়।

সূচনাতেই বলা হয়েছে মাদ্রাসা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বর্তমানে বাংলাদেশে রাজনীতিতে যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে উঠছে তা ধীরে ধীরে যেমন আমাদের সামনে স্পষ্ট হয়ে উঠছে তেমনি এর প্রভাবও আমরা শীঘ্রই উপলব্ধি করতে পারব। বাংলাদেশে মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে উঠার রাজনৈতিক মদদই এর অন্যতম কারন। রাজনীতি এবং ক্ষমতার নীল নকশায় ধর্মপ্রাণ মানুষদেরকে ব্যবহারের জন্য এর চেয়ে সহজলভ্য আর কিছু বাংলাদেশে যে নেই তা যেমন স্পষ্ট তেমনি এর অন্তরালে লুকিয়ে থাকা অন্ধত্বও যে ছড়িয়ে পড়ছে তা দৃশ্যমান। মাদ্রাসা মূলত পরিচালিত হয় দ্বীন শিক্ষার জন্য সেখানে ইহকালের চেয়ে পরকালের মূল্যই বেশি। তারপরেও কেন পারলৌকিক নানা ঘটনায় মাদ্রাসার মাওলানা এবং শিক্ষার্থীদের সহিংসভাবে উপস্থিত হতে দেখা যায়? কারন এর অন্তরালের অপরাজনীতি। এখানে যারা লেখাপড়া করে তারা অধিকাংশই নিম্ন এবং নিন্মমধ্যবিত্ত শ্রেণীর। সামাজিক স্তর বিন্যাসে তারা সবচেয়ে বঞ্চিত অংশ। সমাজের সবচেয়ে বঞ্চিত অংশকে ধর্ম দিয়ে ভুলানোর কৌশলে বাংলাদেশে বিকশিত হয়েছে মাদ্রাসা শিক্ষা। তাদের ইহলৌকিক বঞ্চনার নানা উপদ্রব বা বিপদ হতে রক্ষা পাবার জন্যই শাসকশ্রেনী পরম্পরায় এই কৌশল অব্যাহত রাখে। এখানে উল্লেখ্য যে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে এই মাদ্রাসা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বৃদ্ধি হচ্ছে সর্বোচ্চ। ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশে মাদ্রাসা ছিল ১৯৭০টি (প্রায়) যেখানে ২০১০ সালের হিসাব অনুযায়ী কেবল দাখিল, ফাজিল, আলিম এবং কামিল মাদ্রাসার সংখ্যাই ৯৩৬১ টি। এর সাথে ১৪, ৯৮৭ টি ইবতেদায়ি মাদ্রাসা এবং ৩০০০ কওমী মাদ্রাসা যোগ করলে মোট মাদ্রাসার পরিমান দাঁড়ায় ২৭ হাজার ৩৮৪। উল্লেখ্য যে এই হিসাবের বাইরে আরও বহুসংখ্যক ব্যক্তিমালিকানাধীন মাদ্রাসা রয়েছে। এই বিশাল পরিমাণ মাদ্রাসা আর তার একমুখী মুখস্ত শিক্ষার ফলাফল কি? আনুগত্যময়, সুশৃঙ্খল, বিশ্বাসী একদল মানুষ। যারা দুনিয়ার সকল প্রগতির বিপক্ষে থাকে এবং অন্ধ আবেগে প্রাণ পর্যন্ত উৎসর্গে পিছপা হয় না। তারা মাদ্রাসায় জাগতিক কোন শিক্ষা পায় না। ফলে বড় হুজুরের বানীই তাদের কাছে অভ্রান্ত এবং অবশ্য পালনীয়। আর রাজনৈতিক প্রয়োজনে কেবল ‘বড় হুজুরকে’ ব্যবহার করতে পারলেই ক্ষমতার চর্চা সুগম হয়ে ওঠে। বাংলাদেশের শাসকশ্রেণীর নির্মম অপরাজনীতির প্রকৃষ্ট উদাহারণ আজকের মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থা। সুবোধ ধর্মপ্রাণ জনগণকে ঠকানোর এই মহান কৌশল তাদের সবচেয়ে প্রিয় হয়ে এখনো বর্তমান। যে কারণে মুফতী ফজলুল হক আমিনী, আল্লামা শাহ আহমদ শফী, কিংবা চরমোনাই পীরদের মত নানা হুজুরের নানাভাবে ক্ষমতাবান হয়ে ওঠেন।

বাংলাদেশে মাদ্রাসা শিক্ষার সবচেয়ে প্রয়োজন দেশের শাসকগোষ্ঠীর কারণ তারা নিজেদের সুযোগ সুবিধামত এই বিশাল সংঘবদ্ধ শ্রেণীটিকে ব্যবহার করতে পারেন। আজকের হেফাজত বা আগের খেলাফত মজলিস সবই একই ধারায় বিকশিত হয়। বাংলাদেশের রাজনীতিতে ইসলামি দলগুলোর মধ্যে সবচেয়ে নবীন দল আজকের হেফাজতে ইসলাম। যদিও দলটি বারবার বলছে তারা একটি অরাজনৈতিক সংগঠন। জাতীয় নারী নীতি ও শিক্ষানীতিকে ইসলাম বিরোধী আখ্যায়িত করে দু’টি নীতি বাতিলের দাবিকে সামনে রেখে ২০১০ সালের ১৯ জানুয়ারি হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হয়। এর পর থেকে ধর্মীয় বিভিন্ন ইস্যুতে কর্মসূচি হিসেবে বিবৃতি দেয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল হেফাজতে ইসলাম। কিন্তু শাহবাগ আন্দোলন নাস্তিকদের এই প্রচারণা অপরদিকে সরকারের হাত থেকে শাহবাগ হাতছাড়া হয়ে যাবার মুহুর্তেই আমরা দেখতে পেলাম হেফাজতের হুংকার। বিশাল মহাসমোবেশ আর তাদের ১৩ দফা দাবি নিয়ে রাষ্ট্র ক্ষমতার প্রতি আদেশ, ‘ক্ষমতায় আসতে বা থাকতে হলে এই ১৩ দফা দাবি মেনেই যেতে হবে।’

এই ১৩ দফা দাবিতে কি আছে? ১৩ দফার মধ্যে রয়েছে সংবিধানে রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতিতে ‘মহান আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস’ পুনঃস্থাপন; ইসলাম বিদ্বেষের গুরুতর অপরাধে শাহবাগ আন্দোলনের সংগঠক ও নেতৃত্বদানকারী চিহ্নিত নাস্তিক মুরতাদদের সবাইকে গ্রেপ্তার করে কঠোর শাস্তিদান; আল্লাহ, রাসুল, কোরআন ও ইসলাম ধর্মের অবমাননা এবং মুসলমানদের বিরুদ্ধে কুৎসা প্রচার রোধে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে জাতীয় সংসদে আইন প্রণয়ন; চলমান আন্দোলনে সরকারের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সরকারের পক্ষের সন্ত্রাসী ও দুষ্কৃতকারীদের গুলিবর্ষণ, নির্যাতন, নিপীড়ন ও হত্যাকাণ্ডের কঠোর বিচার; ইসলাম অবমাননার বিরুদ্ধে সংঘটিত আন্দোলন-বিক্ষোভে গ্রেপ্তারকৃত সব আলেম-ওলামা, মাদ্রাসার ছাত্র ও তৌহিদি জনতার মুক্তিদান এবং তাঁদের বিরুদ্ধে দায়ের করা সব মামলা প্রত্যাহার; মসজিদের নগর ঢাকাকে মূর্তির নগরে রূপান্তর এবং দেশব্যাপী রাস্তার মোড়ে ও কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে ভাস্কর্যের নামে মূর্তি স্থাপন বন্ধ করা; ধর্মহীন শিক্ষানীতি ও ইসলামবিরোধী নারীনীতি বাতিলের পাশাপাশি শিক্ষার প্রাথমিক স্তর থেকে উচ্চমাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত ইসলামি শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করা ইত্যাদি। এই গুলো কোন নতুন দাবি নয়। এগুলো বহু ইসলামি দল গুলোর বহু প্রাচীন দাবির সাথে বেশ সাযুজ্যপুর্ণ। তবে লক্ষনীয় যে, ইসলাম বিদ্বেষের গুরুতর অপরাধে শাহবাগ আন্দোলনের সংগঠক ও নেতৃত্বদানকারী চিহ্নিত নাস্তিক মুরতাদদের সবাইকে গ্রেপ্তার করে কঠোর শাস্তিদান; এই দাবি এই সময়ে শাসকশ্রেণীর জন্য স্বস্তির কারণ শাহবাগের আন্দোলনকারীরা মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের মত অন্ধ নয়। ইহলৌকিক নানা বিষয়েই তাদের সচেতন চিন্তা বিদ্যমান। আর প্রধান বিরোধী দল তো এই আন্দোলন নিয়ে প্রথম থেকেই বিরোধী। নাস্তিক অপপ্রচার তারাই প্রথম শুরু করেছিল। শাহবাগ আন্দোলন প্রথম থেকেই ছিল ক্ষমতাসীন দুই গোষ্ঠীর জন্য ভীতির, তাই এই আন্দোলনের জনসম্পৃক্ততা তাদের আরও ভয় বাড়িয়ে দিয়েছিল। তাই যেকোন ভাবে এই আন্দোলনে জনসম্পৃক্তা কমানোই হয়ে ওঠে তাদের প্রধান লক্ষ্য। সেই লক্ষ্য পুরোনো তারা যে শতভাগ সফল তা এই হুজুর, মাওলানাদের কল্যানেই। এই কারণেই রাষ্ট্র মাদ্রাসা শিক্ষা চালু রাখে, বিকশিত করে যাতে জনগণ রাষ্ট্রসত্য থেকে দুরে থাকে। শাহবাগ আন্দোলন চোখের সামনে যে নতুন প্রদীপ হয়ে জ্বলছিল তা নেভাতে রাষ্ট্র আবার এই প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠীকেই ব্যবহার করল। এদের ব্যবহারের সবচেয়ে বড় সুবিধা হচ্ছে এদের বিরাট অংশই টের পায় না যে তারা ব্যবহৃত হচ্ছে আর তাদের গলা টিপে ধরা রাষ্ট্রের জন্য সহজ।

৩.

আসলে কি শেখানো হয় বাংলাদেশের বর্তমান মাদ্রাসাগুলোতে? ইতিহাসে তাকালে দেখা যায় সুলতানী আমলে মাদ্রাসার পাঠক্রমে ছিল আরবি, নাহু (বাগবিধি), সরফ (রূপতত্ব), বালাগাত (অলঙ্কারশাস্ত্র), মানতিক (যুক্তিবিদ্যা), কালাম (জ্ঞানতত্ব), তাসাউফ (অতীন্দ্রিয়বাদ), সাহিত্য, ফিকহ (আইনশাস্ত্র), এবং দর্শন। আরবে ইসলাম ধর্মের যাত্রারম্ভে যে মাদ্রাসার সন্ধান পাওয়া যায় তা ছিল সাফা পর্বতের পাদদেশে যায়েদ-বিন-আরকামের বাড়ি। যেখানে স্বয়ং রসুল (স:) ছিলেন শিক্ষক এবং শিক্ষার্থী ছিলেন তাঁর কয়েকজন অনুসারী। হিজরতের পর মদিনায় মসজিদে নববি-র পূর্বপাশে স্থাপিত হয় মাদ্রাসা আহলে সুফ্‌ফা। এই মাদ্রাসার পাঠ্যসূচিতে ছিল, কোরান-হাদিস, প্রাথমিক চিকিৎসা, বংশ শাস্ত্র, তাজবিদ, অশ্ব চালনা, যুদ্ধবিদ্যা, হস্তলিপি বিদ্যা, শরীর চর্চা ইত্যাদি। অথচ বাংলাদেশে বর্তমানের মাদ্রাসাগুলোই যা শেখানো হয় তা কোনক্রমেই শিক্ষার বা প্রকৃত ধর্মশিক্ষার মধ্যে পড়ে না। কোরআন-হাদীসের জ্ঞান নিয়ে তাদের চর্চা এক ক্লাসে গুরুত্বপূর্ণ ৪০ টি হাদীস আর ৪০ টি কোরানের আয়াত। এই পড়লেই এক ক্লাস পার হওয়া যায়। মুখস্তই পাশ করার মাধ্যম। আলিয়া মাদ্রাসার শিক্ষাব্যবস্থার আধুনিকতার অন্তরালে সত্যিকার অর্থে সংগঠিত হয়েছে শিবির। জামায়াত ইসলাম শক্তিশালী হবার পিছনে সরকারি আলিয়া মাদ্রাসার ভূমিকা অগ্রগন্য। একই সাথে ধর্মের অন্ধবিশ্বাস আবার বিজ্ঞানের গান শোনানোর ফলাফল যে কি হতে পারে তা আলিয়া মাদ্রাসাগুলো শিবিরের উত্থান দিয়ে প্রমাণ করে দিয়েছে। অল্পবিদ্যা সবসময় ভয়ঙ্কর, যার ফলে এখন বাংলাদেশে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, সরকারি কর্মকর্তা, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থীসহ নানা উচ্চস্থানেই একদল মানুষ গড়ে উঠছে কূপমণ্ডুক, অন্ধ আর যুক্তিহীন সংকীর্ণতায়।

সামাজিকভাবে তারা কি চায়? সংবিধানে ‘আল্লাহর উপর পূর্ণ আস্থা আর বিশ্বাস স্থাপন’ এই দাবি নিয়ে তারা একটি মুসুলমান রাষ্ট্রের দাবি জানায়। তাদের যেকোন আন্দোলনের সময় দাবি হিসেবে বারবার এটিই প্রথমে থাকে। বারবার তারা এই ইস্যুকে সামনে রেখে নানা কায়দায় আন্দোলনে আসে। এদের আন্দোলন যতখানি না ধর্মবোধের জায়গা থেকে পরিচালিত হয় তারও চেয়ে বেশি পরিচালিত হয় রাজনৈতিক নির্দেশনায়। একই ইস্যুতে বারবার তাদের রাস্তায় নামানো হয় রাষ্ট্র ক্ষমতায় থাকা সুবিধাবাজদের লুটপাট, দুর্নীতি আড়াল করার জন্য। এখন হেফাজত ইসলামের দাবি সংসদে ইসলাম অবমাননাকারীদের শাস্তি দিতে কঠোর আইন পাশ করতে হবে। এই একই দাবিতে খালেদা জিয়ার ১৯৯১-৯৬ সালের ক্ষমতায় থাকার সময় তসলিমা নাসরিনকে নিয়ে আন্দোলনের সময় আলেম-ওলামারা একই দাবি পেশ করেছিল। খালেদা সে দাবি মানেননি। অথচ আজকে খালেদার দল এই বিষয়ে নাস্তিকতার কথা বলে জামাত নেতাদের বাঁচানোর জন্য মাদ্রাসার সর্বোচ্চ ব্যবহার করছেন। আর ধর্মপ্রাণ মুসুলমানেরা সাত পাঁচ না ভেবেই এই রাজনীতির ছকে নেমে আসা পারলৌকিক জীবনে সবচেয়ে নিগৃহীত মানুষদের পাশে দলে দলে জড়ো হচ্ছেন। যেন সংবিধানে আল্লাহর উপর আস্থা-বিশ্বাস যোগ করলে আর ইসলাম অবমানার জন্য শাস্তি নির্ধারণ করলে বাংলাদেশ বেহেশত হয়ে যাবে।

বাঙালি মুসুলমানের কোমল ধর্মানূভুতি লালন এই কারণের সবচেয়ে লাভজনক যে, তারে হালকা একটু আওয়াজ দিলেই সে ব্যাঘ্র বিক্রমে ছুটে আসে। তাই মোমিনের পাঠশালা হিসেবে মাদ্রাসা শিক্ষা জারি রাখা প্রয়োজন হয়ে থাকে। শিক্ষিত-অশিক্ষিত উচ্চশিক্ষিত সকল মুসুলমান মাদ্রাসার টুপি পাঞ্জাবি পড়া হুজুরদের দাবির সাথে মাঠে নেমে পড়েন আল্লাহ আর ঈমানের ডাকে সাড়া দিয়ে। তারা একবারও বিবেচনা করেন না সংবিধানের শুকনো পাতায় আল্লাহর উপর আস্থা স্থাপন করলেই সব বদলে যাবে না। এ প্রসঙ্গে বলা যায় রাষ্ট্রধর্মের কথা, বাংলাদেশের সংবিধানে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম। তাহলে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলা যায় রাষ্ট্রের ধর্ম ইসলাম। পোষাকশ্রমিকদের পুড়িয়ে মারা এই ধর্ম অনুসারেই হয়, যেহেতু ধর্মপ্রাণ মানুষেরা এ বিষয়ে আঘাতপ্রাপ্ত হন না। আবার বিধর্মীর মন্দির ভেঙে দেওয়াও রাষ্ট্রের ধর্ম অনুসারেই চলে। ধর্ষণ, খুন, দুর্নীতি, লুটপাট বা কিছুদিন আগে যে সৎবাবা তার ছোট্ট ছেলের দু হাত কেটে নিয়েছে তা রাষ্ট্রধর্ম মেনেই। কারণ এসব কর্ম কোন উচ্চবাচ্য করেনি, ধর্মও আহতও হয়নি। রাষ্ট্রধর্ম অনুসারেই রাষ্ট্র এসব কর্ম সম্পাদন করে। কারণ কর্মই ধর্ম।

সুতরাং ধর্মের নামে যে অজ্ঞানতার চাষাবাদ সমাজে জারি রাখা হয় তার পেছনে খুবই জাগতিক স্বার্থ জড়িত। এই কারণে বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থীও ইসলাম রক্ষার নামে শুরু হওয়া যেকোন আন্দোলনের প্রথম দাবি ‘আল্লাহর উপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস স্থাপন’ এর সাথে একাত্ম হয়। তাদের সাথে ঐক্য অনুভব করে। ধর্মশিক্ষার নামে হাজার হাজার মাদ্রাসা যখন বাংলাদেশে চালু হওয়া শুরু করে এই ছড়াটা তখন আমরা আমাদের চারপাশে শুনতাম। ‘মান্দার গাছে কোকিলের বাসা/কোকিল করে সাঁ সাঁ/ মাদ্রাসা, মাদ্রাসা।’ একটা ননসেন্স রাইম হিসেবেই তখন আবৃত্তি করতাম ছড়াটা। কিন্তু এখন এর সত্যিকার ভেতরের অর্থটা যেন নতুন করে উপলব্ধি করছি। কেবল ধর্মশিক্ষার নামে গরীবের একালের সম্পদ প্রশ্নহীনভাবে লুটে নেবার যে কৌশল হিসেবে মাদ্রাসার উদ্ভব তার সাথে যোগ ছিল ধর্মকে ব্যবহার করে একাত্তরে পারাজিত শক্তির নতুন উত্থানের চেষ্টা। এই দুই অপশক্তি মিলে একের পর এক গড়ে তুলতে থাকে মাদ্রসা। আরেকদিকে চুরি, লুটপাট করে ফুলেফেপে ওঠা আরেক শ্রেণী সওয়াবের আশায় নিজ উদ্যেগেই বানাতে থাকেন এই প্রতিষ্ঠান। কিন্তু এই প্রতিষ্ঠান কখনোই এখানে যে শ্রেণী সরাসরি জড়িত তার স্বার্থ রক্ষা করতে পারে না। বারবার তারা ব্যবহৃত হয়। ধর্মের মোড়কে এটে তাদেরকে বারবার জনগণের সামনে পুতুলের মত হাজির করা হয়। কিন্তু যে কথা প্রথমে বলেছিলাম মাদ্রাসা শিক্ষার্থীরা দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শ্রেণী হতে যাচ্ছেন তা এই কারণেই মাঝেই নিহিত। কারণ তারা এখন অংশে বিশাল, ঐক্যের জায়গায় সুসংহত এবং বারবার ব্যবহৃত, পরাজিত। উপাদান হিসেবে এই শ্রেণীকে বারবার একই পদ্ধতিতে ব্যবহার করলে তারও যে ব্যবহার করা শিখবে তা নিশ্চিত। তখন তাদের সাথে আস্তে আস্তে ক্ষমতাকে কিছু আপোষ করতেই হবে। যেহেতু তার ক্ষমতাকে ছায় দেবে। ধর্মদণ্ড নিয়ন্ত্রন করবে। সেই কালের সূচনা এখন দেখা দিয়েছে। এখন সচেতন না হলে জনগণ এখন থেকেই পাকিস্তান বা আফগানিস্তানের মত কোন উচ্চপ্রযুক্তি নির্মিত বোমার আঘাত খাবার জন্য তৈরি হন। মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের ক্ষমতাবান শাসকশ্রেণী সেই পথই নির্মান করছে। আর আমার ধর্মপ্রাণ, ধর্মানূভূতি সম্পন্ন ভাইয়েরা নাসারাদের বানানো অস্ত্র দিয়ে মানুষ মারতে আপনাদের ধর্মানূভূতি নিশ্চয়ই আঘাতপ্রাপ্ত হবে না?

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

২৩ thoughts on “মুমিনের পাঠশালা – মাদ্রাসা

  1. আর আমার ধর্মপ্রাণ,

    আর আমার ধর্মপ্রাণ, ধর্মানূভূতি সম্পন্ন ভাইয়েরা নাসারাদের বানানো অস্ত্র দিয়ে মানুষ মারতে আপনাদের ধর্মানূভূতি নিশ্চয়ই আঘাতপ্রাপ্ত হবে না?

  2. প্রধান বিরোধী দল তো এই

    প্রধান বিরোধী দল তো এই আন্দোলন নিয়ে প্রথম থেকেই বিরোধী। নাস্তিক অপপ্রচার তারাই প্রথম শুরু করেছিল। শাহবাগ আন্দোলন প্রথম থেকেই ছিল ক্ষমতাসীন দুই গোষ্ঠীর জন্য ভীতির, তাই এই আন্দোলনের জনসম্পৃক্ততা তাদের আরও ভয় বাড়িয়ে দিয়েছিল। তাই যেকোন ভাবে এই আন্দোলনে জনসম্পৃক্তা কমানোই হয়ে ওঠে তাদের প্রধান লক্ষ্য। সেই লক্ষ্য পুরোনো তারা যে শতভাগ সফল তা এই হুজুর, মাওলানাদের কল্যানেই।

    মনোযোগ দিয়ে প্রতিটি লাইন পড়লাম। যথেষ্ট যুক্তি নির্ভর লেখা…ভাল লাগলো.. ধন্যবাদ পোস্টের জন্য..

  3. দারুন তথ্যসম্বলিত জ্ঞানগর্ভ
    দারুন তথ্যসম্বলিত জ্ঞানগর্ভ একটি পোস্ট দেবার জন্য ধন্যবাদ। :গোলাপ: :গোলাপ: :গোলাপ:

  4. মূলধারায় শিক্ষিত বেশীর ভাগ
    মূলধারায় শিক্ষিত বেশীর ভাগ মানুষের মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থা এবং তাদের জীবন যাপন, মানসিক গড়ন ইত্যাদি সম্পর্কে ধারণা খুব অস্পষ্ট। আপনার এই লেখা সবার জন্য একটা রেফারেন্স হতে পারে। চমৎকার লিখেছেন। সাথে সমসাময়িক প্রাসঙ্গিক বিষয়াদি সংযুক্ত করায় লেখাটি পূর্ণতা পেয়েছে। দিনে ব্লগে ঢুকে সময় তেমন দিতে পারি না। তাই লেখাটি দ্বিতীয় পাতায় চলে যাওয়াতে চোখে পড়ে নি। ইস্টিশন মাস্টারের প্রতি কৃওজ্ঞতা লেখাটি স্টিকি করে নজরে আনার জন্য। এতো চমৎকার একটা লেখা মাত্র ৩০ বার পঠিত, শেয়ার সংখ্যা-০। দুঃখজনক। ভালো লেখার পাঠক কি কমে যাচ্ছে?

    লেখককে আন্তরিক ধন্যবাদ এতো সুন্দর তথ্যবহুল একটা লেখা পড়ার সুযোগ করে দেওয়ার জন্য। সবার প্রতি বিনীত অনুরোধ লেখাটি সবখানে শেয়ার করুন। এই বিষয়গুলো আমাদের জানাটা খুব জরুরী।

  5. চমৎকার, এক কথায় অসাধারন
    চমৎকার, এক কথায় অসাধারন তথ্যনির্ভর সামগ্রিক বিশ্লেষন with objective empathy। নির্দ্বিধায় এযাবত পর্যন্ত আমার দেখা শ্রেষ্ঠ ব্লগ পোষ্ট।

    আপনি এই লেখা জাতিয় পত্রিকা ও সাময়িকিগুলিতেও প্রকাশ করার চেষ্টা করবেন এবং সফল হবেন আশা করি। এই তথ্য ও বিশ্লেষন যত বেশি নাগরিকের নজরে আসে ততোই ভাল – জাতিয় পর্য্যায়ে এই আলোচনা ও সামগ্রিক শিক্ষা ব্যাবস্থার আমূল সংস্কার অতন্ত জরুরি।

    আবারো ধন্যবাদ আপনাকে।

  6. অনেক কিছু জানতে পারলাম এই
    অনেক কিছু জানতে পারলাম এই পোস্ট পড়ে। ধন্যবাদ আপনাকে।
    মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থার ভয়াবহতার অনেক উদাহরণ আমরা ের মধ্যেই দেখে ফেলেছি। নিম্ন শ্রেণীর মানুষের দুর্বলতার সুযোগ খুব ভাল করে কাজে লাগায় এই ক্ষমতা লোভীরা।
    কিন্তু একটা জিনিশ কোনমতেই মাথায় ঢুকে না, সব অনুভূতির চেয়ে ধর্মানূভূতিই কেন এতো তীব্রও??????!!!! :মাথাঠুকি: :মাথাঠুকি: :মাথাঠুকি: :মাথাঠুকি: :মাথাঠুকি: :মাথাঠুকি:

  7. অসাধারণ একটা লেখা। মাদ্রাসার
    :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ:
    অসাধারণ একটা লেখা। মাদ্রাসার শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে বাংলাব্লগে এত সমৃদ্ধ লেখা আমার এর আগে চোখে পড়ে নাই। সবাইকে অনুরোধ করব লেখাটি শেয়ার করার জন্য। পোস্টদাতাকে অসংখ্য ধন্যবাদ, তথ্যসমৃদ্ধ এই পোস্টটির জন্য।

  8. মানুষ আগ্রহ নিয়ে পড়তে চায়
    মানুষ আগ্রহ নিয়ে পড়তে চায় রংচং মাখানো কিন্চিৎ টকঝাল ছিটানো চটকদার পোষ্ট অথবা হাস্যরসাত্মক প্রবন্ধ । তথ্যবহুল আলোচনাধর্মী যে কোনো লেখাকেই পাঠক পরীক্ষার পাঠ হিসাবে বিবেচনা করে এবং পরীক্ষার পড়া পছন্দের সাথে পড়েছে এমন ছাত্র আমি পাইনি । তাই বলে পরীক্ষা পাঠের বিষয়স্তর গুরুত্ব যেমন ক্ষুন্ন হয়না তেমনিভাবে মৌলিক ও গবেষনাধর্মী লেখার পাঠক কম হওয়াটাও লেখার গুরুত্ব ও মান কে খাটো করে না । তথ্যবহুল লেখাটি ভাল লেগেছে ।ধন্যবাদ ।
    ————————————————————–

  9. তথ্য সমৃদ্ধ, সাবলীল একটি
    তথ্য সমৃদ্ধ, সাবলীল একটি লেখার জন্য ধন্যবাদ লেখককে।এ সময়ে খুবই প্রয়েজনীয় একটি লেখা।

  10. অসাধারন বিশ্লেষণ মূলক একটি
    অসাধারন বিশ্লেষণ মূলক একটি লেখা। মুগ্ধ হয়ে পড়লাম, লেখাতিতে অসাধারণ শব্দের গাঁথুনি।
    ধন্যবাদ লেখককে।

  11. (No subject)
    :গোলাপ: :গোলাপ: :গোলাপ: :গোলাপ: :গোলাপ: :গোলাপ: :গোলাপ: :গোলাপ: :গোলাপ: :গোলাপ: :গোলাপ: :গোলাপ: :গোলাপ: :গোলাপ: :গোলাপ: :গোলাপ: :গোলাপ: :গোলাপ: :গোলাপ: :গোলাপ: :গোলাপ: :গোলাপ: :গোলাপ: :গোলাপ: :গোলাপ: :গোলাপ: :গোলাপ: :গোলাপ: :গোলাপ: :গোলাপ: :গোলাপ: :বুখেআয়বাবুল: :বুখেআয়বাবুল: :বুখেআয়বাবুল: :বুখেআয়বাবুল: :বুখেআয়বাবুল: :বুখেআয়বাবুল: :বুখেআয়বাবুল: :বুখেআয়বাবুল: :বুখেআয়বাবুল: :বুখেআয়বাবুল: :বুখেআয়বাবুল: :বুখেআয়বাবুল:

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

54 − = 53