ছবির গল্প: ‘ভোপাল গ্যাস ট্রাজেডি’র মৃত শিশুটি

?oh=352f7c6f6a4e6ca3dd2118bb747324ea&oe=5A0E7501″ width=”500″ />
ছবিটায় একটা মৃত শিশুকে কবর দিচ্ছেন বাবা, আর শেষবারের মতো দেখছেন আদরের মেয়েকে। কবরটায় মাটি চাপা দেওয়ার শেষ পর্যায়ে কাঁদতে কাঁদতে ছবিটা তুলেছিলেন সাংবাদিক। এমনকি মৃত শিশুটির বাবার কাছে জানতেও চাননি নাম-ধাম।

ছবিটা তোলা হয়েছিল ভারতের ভোপালে, ১৯৮৪ সালের ডিসেম্বরের ৪ তারিখে। ভারতের ফটো সাংবাদিক পাবলো বার্থোলোমেও এই ছবির জন্য ‘ওয়ার্ল্ড প্রেস ফটো অব দি ইয়ার ১৯৮৫’ পুরস্কার জিতেছিলেন।

শিশুটি মারা গিয়েছিল ভারতের মধ্য প্রদেশের ভোপালে ঘটে যাওয়া পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়াবহ শিল্প দুর্ঘটনায়। ১৯৮৪ সালের ২-৩ তারিখ পর্যন্ত চলা ‘ইউনিয়ন কার্বাইড ইন্ডিয়া লিমিটেড’-এর কীটনাশক কারখানায় বিষাক্ত ‘মিথাইল আইসো সায়ানেট (এমআইসি)’ গ্যাস ও অন্যান্য রাসায়নিক গ্যাসের নির্গমনে ঘটে ইতিহাসখ্যাত ‘ভোপাল গ্যাস ট্রাজেডি’।

মধ্য প্রদেশের ভোপালে ঘটে যাওয়া এ দুর্ঘটনায় রাজ্য সরকারের হিসাব অনুযায়ী মারা যায় ৩ হাজার ৭৮৭ জন মানুষ। তবে অন্যান্য অনেক সূত্র বলছে, গ্যাসের বিষক্রিয়ায় ধীরে ধীরে মারা গেছে প্রায় ২৫ হাজার মানুষ। সরকারি হিসাবে আহতের সংখ্যা ছিল ৫ লাখ ৫৮ হাজার ১২৫ জন।

দুর্ঘটনার পেছনে অভিযোগ উঠেছিলো কারখানা কর্তৃপক্ষের অবহেলার। বলা হয়, দুর্ঘটনার রাতে একটি এমআইসি ট্যাঙ্কে পানি ঢুকে বিষাক্ত এসব গ্যাস নির্গত হয়ে কারখানার আশেপাশের বস্তিগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে।

আহতদের দেখতে হাসপাতালে ছুটে গিয়েছিলেন মাদার তেরেসা। বড় মাপের এই বিপর্যয়ের বিপক্ষে হাসপাতালগুলোরও পর্যাপ্ত প্রস্তুতি ছিল না। ফলে দুর্ভোগ ও মৃতের সংখ্যাটাও বেড়েছে লাফিয়ে।

ক্ষতিপূরণ নিয়ে চলেছে দীর্ঘ প্রহসন। দীর্ঘমেয়াদী আইনি প্রক্রিয়ার কারণে ক্ষতিপূরণ নিয়ে চলে টালবাহানা। আর তাতে জড়িত ছিলো কারখানার মালিকপক্ষ ও ভারত সরকার। কারখানাটির ছিল যুক্তরাষ্ট্রের মালিকানায় পরিচালিত একটি প্রতিষ্ঠান।

অনেক গড়িমসির পর ১৯৮৯ সালে ইউনিয়ন কার্বাইড ৪৭ কোটি ডলার ক্ষতিপূরণ দেয় কিন্তু সেই অর্থ ক্ষতিগ্রস্তদের কাছে কতোটুকু পৌছেছে, তা নিয়ে এখনো বিতর্ক আছে। তার ওপর সরকারি হিসাবেও আহত-নিহতের সংখ্যাও প্রকৃত সংখ্যার চেয়ে কম।

দোষীদের শাস্তি, সেটাও আরেক দীর্ঘ প্রহসন। ওই সময় কারখানার সিইও ওয়ারেন অ্যান্ডারসনসহ আরও ৭ কর্মকর্তাকে অবহেলার দায়ে ২০১০ সালে মাত্র দুই বছরের জেল ও ২ হাজার ডলার জরিমানা করে ভারতের আদালত।অথচ এখনো এই দুর্ঘটনার পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া ভুগছে সেখানকার অসংখ্য মানুষ। স্বাস্থ্যহানি, বিভিন্ন রোগের প্রকোপ, ভূগর্ভস্থ পানিতে দূষণের মাত্রা, মাটিতে বিষাক্ত রাসায়নিকের প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্থ কৃষি- সব মিলিয়ে মানুষের হাহাকার আজও রয়ে গেছে।

এই দুর্ঘটনা নিয়ে ১৯৯৯ সালে একটা চলচ্চিত্রও নির্মিত হয়েছে ভারতে, ‘ভোপাল এক্সপ্রেস’।রচিত হয়েছে বেশ কয়েকটি সাহিত্য, যার মধ্যে ইন্দ্রা সিনহা নামে এক লেখক ২০০৭ সালে ‘Animal’s People’ নামে উপন্যাস লিখে ‘ম্যান বুকার প্রাইজ’ জিতেছিলেন।

পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় শ্রমিকের জীবনের দাম কতোখানি, ‘ভোপাল গ্যাস ট্রাজেডি’ তার একটি নিদর্শন। একই কথা প্রযোজ্য আমাদের দেশে ‘রানা প্লাজা ট্রাজেডি’র ক্ষেত্রেও। আমরা দেখেছি, ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকদের জন্য জনগণের দেওয়া কোটি কোটি টাকা কোথায় গেলে, সেই হিসাব আজও মেলেনি। চার বছর পেরিয়ে গেলেও আজও বিচার হয়নি অভিযুক্ত রানার। আমরা কি এমন বিশ্ব চাই?

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 79 = 85