বাংলার রেনেসাঁ (দ্বিতীয় পর্ব)

রামমোহন রায় ১৮১৫খ্রিষ্টাব্দে স্থায়ীভাবে কলকাতায় বসবাস শুরু করেন। বাংলার রেনেসাঁর যাত্রারাম্ভও তখন থেকেই, অধ্যাপক সুশোভন সরকার এবং বিপিন পাল এমনই মনে করেন। কিন্তুু আমরা আরো একটু পেছনে ফিরে যেতে পারি। স্যার উইলিয়াম জোনস্ এর নেতৃত্বে ১৭৮৪ সালে কলকাতায় ‘এশিয়াটিক সোসাইটি’ প্রতিষ্ঠাকে রেনেসার পথে একটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এই প্রতিষ্ঠানে সমাবেশ ঘটেছিল তৎকালীন মেধাবী প্রাচ্যবিদ্যাবিশারদদের (Oriantalist)। এঁরা ভারতে এসেছিলেন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী সরকারের কর্মচারী হয়ে। তাদের মধ্যে কয়েকজন উল্লেখযোগ্য পণ্ডিত হলেন উইলিযা়ম জোনস, চার্লস উইলকিন্স, এইচ.টি. কোলব্রুক, বি.এইচ. হডসন, জেমস প্রিন্সেপ,আলেকজান্ডার কানিংহাম প্রভৃতি। তাঁরা অসামান্য প্রতিভা আর শ্রমনিষ্ঠা দিয়ে ক্রমে ক্রমে পুনরাবিষ্কার করেছিলেন প্রাচীন ভারতের ইতিহাস। জেমস প্রিন্সেপের আগে কেউ সম্রাট অশোকের অনুশাসন পাঠ করতে পারেনি। প্রিন্সেপ ছিলেন মুদ্রাবিদ্যা বিশারদ। প্রাচীন মুদ্রা নিয়ে কাজ করতে গিয়েই তিনি ব্রাহ্মী এবং খরোষ্ঠী লিপির পাঠোদ্ধার করেন। তাই দিয়েই পরবর্তীতে জানা যায় বিরাট বৌদ্ধ ঐতিহ্যের ইতিহাস। এশিয়াটিক সোসাইটির জার্নালে এসকল পণ্ডিতদের লেখাতে একে একে উন্মোচিত হতে থাকে প্রাচীন ভারত। আরো কয়েকবছর পরে আমরা পাই আরেকজন ভুবনবিখ্যাত ভারতত্ত্ববিদ ম্যাক্স মুলারকে। প্রাচীন ভারতের বৈদিক ধর্ম, সাহিত্য ও সংস্কৃতির জন্মদাতা আর্য ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীর সাথে পশ্চিমী হেলেনিক-লাতিন আর্য ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীর সম্পর্ক খুজেঁ পান ম্যাক্স মুলার। এর ফলেই ভারতীয়রা নিজেদেরকে আরো প্রাচীন এবং মহত্তর এক সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সাথে নিজেদেরকে সম্পৃক্ত দেখতে পায়। এশিয়াটিক সোসাইটির পরে রেনেসাঁর পথে আরেকটি অতি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের নাম “ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ”।

‌এশিয়াটিক সোসাইটি প্রতিষ্ঠার দু দশকেরও কম সময়ের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত হয় ফোর্ট উইলিয়াম(১৮০০) কলেজ। এবং এর দু দশকের আগেই স্থাপিত হয় হিন্দু কলেজ (১৮১৭)।গদ্যে এবং সাহিত্যে ও ব্যাকরণচর্চায় ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের ভূমিকা প্রণিধানযোগ্য।ডেভিড হেয়ার, হিন্দু কলেজ, ডিরোজিও আর ইংয় বেঙ্গলদের অবদান স্মরণযোগ্য। এই তিনটি প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা সম্পর্কে ইতিহাসবিদ অমলেশ ত্রিপাঠী সংক্ষেপে লিখেছেন :” এশিয়াটিক সোসাইটি লুপ্তপ্রায় প্রাচ্যবিদ্যাকে আবিষ্কার করল, ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ বাংলা গদ্য সাহিত্যের জন্ম দিল এবং হিন্দু কলেজ পশ্চিমের সাহিত্য (বিজ্ঞান বিশেষ নয়),ইতিহাস, দর্শনকে নতুন বাঙালি প্রজন্মের মুগ্ধ চোখের সামনে তুলে ধরল “।নাথানিয়েল ব্রাসি হ্যালহেড লিখলেন ইংরেজি আর খানিকটা বাংলা মিশিয়ে বাংলা ভাষার ব্যাকরণ। উইলকিনস্ করলেন গীতার অনুবাদ, উইলিয়াম জোন্স কালিদাসের শকুন্তলা ও কিছু বৈদিক সূক্তের অনুবাদ, আর কোলব্রুক গুপ্তযুগের গণিতবিদ আর্যভট্টের গণিত নিয়ে গবেষণা। ওদিকে শ্রীরামপুর প্রেস স্থাপিত হয়েছে। সেখান থেকেই উইলিয়াম কেরি বাইবেলের অনুবাদ বের করলেন। কিছুদিন পরে বাংলা কথ্য ভাষার নিদর্শনস্বরূপ “কথোপকথন”।মধ্যযুগের কৃত্তিবাস এবং কাশীরাম দাসের রামায়ন বের হল সেখান থেকে। রামরাম বসু, তারিণীচরণ মিত্র, মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কারেরা গদ্য লিখতে লাগলেন। শ্রীরামপুর প্রেস থেকে। সেই সাথে বাংলা ও ইংরেজি সংবাদপত্র প্রকাশ হতে থাকল। রামমোহন লিখলেন ‘বেদান্তগ্রন্থ’ সাথে সাথে চলল সংবাদপত্র প্রকাশনা। মধ্যযুগের আরবি ফারসি রোমান্টিক অনুবাদ সাহিত্য আর মঙ্গলকাব্যের জায়গা নিল অাঠারো শতকের যুক্তিবাদ, সংশয়বাদ, উপযোগিতাবাদ। অন্যদিকে হিন্দু ধর্মের প্রচলিত তত্ত্ব আচার অনুষ্ঠান নিয়ে প্রশ্ন, লুপ্তপ্রায় বেদ বেদান্ত নিয়ে আগ্রহ এবং এসবের আলোকে হিন্দু ধর্মের পুনর্ব্যাখ্যা ও যাবতীয় সংস্কার।

ইতিহাসের এই পর্বে রামমোহন রায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব বা বলা যেত পারে কেন্দ্রীয় চরিত্র। তাঁর কাজ সর্বত্রমুখী না হলেও বিচিত্রগামী। একেশ্বরবাদের প্রবক্তা ও প্রচারক তিনি। ইউরোপীয় রেনেসাঁর মূল দান যে Humanism,সেটাকে বাংলায় তথা ভারতবর্ষে তিনিই প্রথম প্রতিষ্ঠা দিয়েছেন। ধর্মসংস্কারের কাজ করতে গিয়ে পুরোদস্তুর সমাজসংস্কারকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন। বাংলার রেনেসাঁ মানবদের পরিচয় ও কাজ তুলে ধরা এখানে অসম্ভব।তবে বলা যায় যে তাঁদের কাজের মূলনীতি ছিলো যুক্তিবাদ, প্রগতি এবং বিজ্ঞানমনস্কতা। মহাকাব্যে মাইকেল, উপন্যাসে বঙ্কিমচন্দ্র আর কবিতায় রবীন্দ্রনাথ আছেন। মাইকেল কবি হবার জন্য গ্রীক, লাতিন প্রভৃতি ক্লাসিক্যাল ভাষা ও ইতালীয় ফরাসি প্রভৃতি বিদেশী ভাষা শিখেছিলেন। শেকসপীয়র, বাইরন, মিল্টন পড়েই মধুসূদন থেমে থাকেননি। পড়েছেন হোমার, ভার্জিল, দান্তে, পেত্রার্ক। রামমোহন রায় গ্রীক, লাতিনের সাথে শিখেছিলেন হিব্রু। এই হিব্রু ভাষা শিক্ষা করেই তিনি পড়েছিলেন ইহুদি আর খ্রিস্টান ধর্মতত্ত্ব। সেখান থেকে মন্থন করে এনেছিলেন একেশ্বরবাদের প্রেরণা। কিন্তুু এই গ্রীক লাতিন পাঠ আমাদের রেনেসাঁর চাবিকাঠি নয়। আমাদের নবজাগরণের সূত্র নিহিত রয়েছে গ্রীক লাতিনের বদলে সংস্কৃত ঐতিহ্যের পুনরুজ্জীবনের মধ্যে। সেই পুনরুজ্জীবন হয়েছিল অতীতে ফিরে যাবার রিভাইভালিস্ট প্রেরণা থেকে নয়, বরং জীবনের নতুন দর্শন, নতুন চর্চা আবিষ্কারের তাগিদে। বাঙালির সংস্কৃতির বিবর্তন ঘটেছে সেই পুনরুজ্জীবিত ঐতিহ্যের আধুনিকীকরনের মাধ্যমে। রামমোহন সংস্কৃত পড়েছিলেন তা বোঝা যায় তাঁর বেদান্ত চর্চা এবং “বেদান্ত গ্রন্থ ” রচনার মধ্য দিয়ে। মাইকেল মধুসূদন বাল্মীকির সংস্কৃত রামায়ণ পড়েছিলেন এবং নিজে মেঘনাদ বধ কাব্যে দিলেন সেই রামায়ণকে উল্টে। ঈশ্বরচন্দ্র মহাশয় কালিদাস ও ভবভূতির সংস্কৃতে রচিত সাহিত্য অবলম্বনে যথাক্রমে “শকুন্তলা” ও “সীতার বনবাস” রচনা করেছেন। বিদ্যাসাগর বারো বছর সংস্কৃত কলেজে পড়েছিলেন। বঙ্কিমচন্দ্র শিক্ষা জীবনে সংস্কৃত পড়েননি। পরে পণ্ডিতের কাছে সংস্কৃত শিখেছিলেন। তাঁর “কৃষ্ণচরিত” “ধর্মতত্ত্ব ” এগুলো শাস্ত্রজ্ঞানের প্রমাণ। জ্যোতিরিন্দ্রনাথ সংস্কৃত নাটক অনুবাদ করেছেন। রবীন্দ্রনাথ অল্প বয়সে ম্যাকবেথ অনুবাদ করেছিলেন আর কালিদাস পড়েছিলেন সেই কথা তাঁর স্মৃতিকথায় লেখা আছে। উপনিষদ তো তাঁর আত্মস্থ ছিলই। বিবেকানন্দ পাণিনি ও পতঞ্জলি পড়ে তারপর শাস্ত্র পাঠে প্রবৃত্ত হন। রামমোহন, ঈশ্বরচন্দ্র, বিবেকানন্দ, দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরেরা যেভাবে যে প্রক্রিয়ায় ধর্ম সংস্কারের মাধ্যমে সমাজ সংস্কারে প্রবৃত্ত হয়েছিলেন সেটাকে মাথায় রাখলে বাংলার রেনেসাঁকে ইটালির রেনেসাঁর সাথে তুলনা না করে বরং তৎপরবর্তী জার্মানির মার্টিন লুথার কিং প্রবর্তিত রিফরমেশন আন্দোলনের সাথে তুলনা করা যেতে পারে বলে আমার মনে হয়। বাংলার রেনেসাঁ যুগের এই মনীষীরা যেভাবে বেদ আর উপণিষদমুখী হয়েছিলেন, রিফরমেশন আন্দোলনের নেতারা তেমনি হয়েছিলেন ধর্মগ্রন্থ বাইবেল আর প্রাচীন ধর্মযাজক সেন্ট অগাস্টিনের দিকে।

এখানে বিশ শতকের একজন বঙ্গবিদ্যা বিশারদের কথা স্মরণ করতে হচ্ছে। তাঁর নাম ডেভিড কফ। বাংলা ভাষায় তাঁকে নিয়ে যথেষ্ট লেখালেখি হয়েছে বলে মনে হয়না।গোলাম মুশরিদ তাঁকে একটা লেখায় একটু পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন “বঙ্গবিদ্যা বিশারদ” বলে। সেই লেখা থেকে জানতে পারছি যে ডেভিড কফের পিএইচডি এর বিষয়বস্তুু ছিল বাংলার রেনেসাঁ। অমলেশ ত্রিপাঠীর “ইতালীর রেনেশাঁস বাঙালীর সংস্কৃতি” বইয়ে ডেভিড কফের সেই অভিসন্দর্ভ থেকে লেখা বইয়ের উল্লেখ পেলাম। British Orientalism and Bengal Renaissance নামে ১৯৬৯ সালে কলকাতা থেকে প্রকাশিত হয় সেই বই। কফ সেখানে বলেছেন এই যে বাঙালিরা সংস্কৃত ভাষা,সাহিত্য ও সংস্কৃতি নিয়ে উৎসাহিত হলো এটা এশিয়াটিক সোসাইটি আর ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের অবদান। কিন্তুু অমলেশ ত্রিপাঠী কফের এই দাবী মানছেন না। ত্রিপাঠী বলছেন এটা সত্য যে বাংলায় সংস্কৃত চর্চা অবক্ষয়ের পথে ছিল, টোলের সংখ্যাও কমে যাচ্ছিল। তারপরও কিছু সংস্কৃত পণ্ডিত ছিলেন। তাঁদের কাছেই তো এশিয়াটিক সোসাইটি আর ফোর্ট উইলিয়ামের ব্রিটিশ পণ্ডিতেরা সংস্কৃত শিখেছেন।আর সে যুগের শ্রেষ্ঠ বাঙালি মনীষারা সংস্কৃত শিখেছিলেন নিজেদের চেষ্টায়। সুতরাং রামমোহন বা বিদ্যাসাগরের অবদানের জন্য ওরিয়েন্টালিস্টরা কৃতিত্ব দাবী করতে পারেন না।

চলবে …

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

26 − = 22