সালমান রুশদীর ‘দ্য স্যাটানিক ভার্সেস’ ও কিছু কথা

?w=300&q=55&auto=format&usm=12&fit=max&s=83e02db6a502224b83c78ac793bdd344″ width=”500″ />

সালমান রুশদীর বিখ্যাত বা কুখ্যাত উপন্যাস ‘দ্য স্যাটানিক ভার্সেস’ নিয়ে বাংলাভাষী লেখ্যবলয়ে বা সাহিত্যশিবিরে তেমন কিছু নেই বললেই চলে। ৮০’র দশকের শেষ দিকে ভারতীয় বংশোদ্ভূত লেখক সালমান রুশদী এই উপন্যাস প্রকাশ করে বেশ বিপদেই পড়েছিলেন। একই সাথে পশ্চিমা জগতে এবং তারপর পুরো বিশ্বেই বাকস্বাধীনতা এবং মুক্তচিন্তার প্রকাশকে অনেকটা নতুন করে চিনবার এবং ব্যাখ্যা করবার একরকমের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয় যার রেশ এখনও কাটেনি। অপর দিকে বিশ্বায়নের দশকে পুরো পৃথিবী যখন পা বাড়ায় মুসলিম বিশ্বের রক্ষণশীল কাঠামো এবং বাকস্বাধীনতার চেতনার বিরোধ এই উপন্যাসের মাধ্যমে নতুনভাবে প্রস্ফুটিত হয়ে উঠে। এই উপন্যাসের কারণে পরবর্তী সব ঘটনাপ্রবাহ দ্বারা তৈরী অবস্থাটিকে পশ্চিমা গণমাধ্যমে ‘দ্য রুশদী অ্যাফেয়ার’ হিসাবে চিহ্নিত করা হয়। এই রুশদী অ্যাফেয়ারের ব্যাপারে আলোচনা করতে গেলে হয়তো অনেক পৃষ্ঠার প্রয়োজন যা এই প্রবন্ধের বিষয় নয় এবং এর ব্যাপ্তির বাইরে। এখানে সালমান রুশদীর উপন্যাসটির ব্যাপারে আলোচনা করা হবে এবং উপন্যাসে মূলত কি ছিল তার উপর আলোকপাত করা হবে। তবে তার আগে এইটুকু বলে রাখা উচিৎ যে এই উপন্যাসের কারণে যেই অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল, যাকে ইতিপূর্বে দ্য রুশদী অ্যাফেয়ার হিসাবে পাঠকদের কাছে পরিচিত করানো হয়েছে, তার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনাটি হলো ১৯৮৯ সালের বসন্তে ‘দ্য স্যাটানিক ভার্সেস’ উপন্যাসের লেখক, তথা সালমান রুশদী,-কে হত্যাযোগ্য হিসাবে আখ্যা দিয়ে ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ্‌ খোমেনীর কুখ্যাত বা বিখ্যাত ফতোয়া।

খোমেনীর ফতোয়া একজন ব্রিটিশ নাগরিকের উপর বিদেশী কারো দেওয়া প্রথম মৃত্যুদণ্ডাদেশ। এবং এই ফতোয়ার কারণে রুশদীকে বেশ অনেক দিন লোকালয়ে হতে পালিয়ে থাকতে হয় এবং তার ওই নন্দিত বা নিন্দিত উপন্যাসের অনুবাদেচ্ছুক তুর্কী লেখক আজীজ নেসিন তার ইচ্ছা প্রকাশের পর ইসলামপন্থীদের আক্রমণের শিকার হন এবং এর জাপানী অনুবাদক হিতোশী ইগারাশী আঁততায়ীর ছুরিকাঘাতে নিহত হন। জাপানী ইমিগ্রেশন অধিদপ্তরে গুজব আছে যে দ্য স্যাটানিক ভার্সেসের জাপানী অনুবাদক হিতোশী ইগারাশীকে একজন ‘বাংলাদেশী’ হত্যা করে এবং হত্যার পরদিন সে পালিয়ে যায়। বলা হয়ে থাকে যে জাপানী সরকার এই স্পর্শকাতর উপন্যাসের কারণে এই হত্যাকাণ্ডের সুরাহা করা থেকে বিরত থাকে। বাংলাভাষী লেখ্যবলয়ে বা সাহিত্যশিবিরে এই উপন্যাস নিয়ে কোন লেখা না থাকার কারণের মধ্যে একটা হলো যে এই লেখাটি খুব কম মানুষই পড়েছে। যতজন না আশেপাশের দেশে এই উপন্যাসটি পড়েছে বাংলাদেশ সেই হিসাবে কিছুই না। ভারতের অনেকে উপন্যাসটি নিয়ে অনেক মন্তব্য করেছেন। জনপ্রিয় ধর্মপ্রচারক জাকির নায়েক উনার এক বক্তৃতায় দাবী করেছেন যে উনি বইটি পড়েছেন যদিও এই ব্যাপারে উনার পুরো বক্তব্যটাই ৮০’র দশকের ধর্মপ্রচারক আহ্‌মদ দিদাতের এই উপন্যাসটির ব্যাপারে বক্তব্যের হুবহু নকল। জাকির কতটুকু সত্যি বলেছেন তা পর্যালোচনার দাবী রাখে। পাকিস্তানের মত রক্ষণশীল মুসলিম রাষ্ট্রেও এই নিয়ে ব্যাপক হইচই হয়। বাংলাদেশে হইচই হয়েছে কি না তা আমার জানা নেই তবে বাংলাদেশী এক প্রবাসী দ্বারা দ্য স্যাটানিক ভার্সেসের জাপানী অনুবাদকের হত্যাকাণ্ড সত্যি তাজ্জব করার মত।

যাই হোক, উপন্যাসটি নিয়ে একটু কথা বলা যাক। শুরুতেই বলি যে উপন্যাসটি আমি বেশ সময় নিয়ে পড়েছি। ৫০০ পৃষ্ঠার অধিক এই বিশাল উপন্যাসটি পড়তে ধৈর্য্য আবশ্যিক। কারণ লেখক এই উপন্যাসে অনেক বর্ণনা দিয়েছেন যা আপাতদৃষ্টিতে অপ্রয়োজনীয় বা পৃষ্ঠাক্ষেপণ বলে মনে হতে পারে কিন্তু উনি তা মূলত করেছেন উপন্যাসটির মূল বক্তব্যটি সকলের কাছে তুলে ধরবার জন্য এবং চিন্তার খোরাক যোগানোর খাতিরে। উল্লেখ্য, সালমান রুশদী উনার সব উপন্যাসে প্রাচ্য এবং পাশ্চাত্যের মধ্যে যুগ যুগান্তর ধরে চলে আসা বিরোধ এবং পরস্পরকে অভিজ্ঞতা ও অনুভব করবার যেই বিস্তর ইতিহাস ও সম্পর্করেখা আছে তা তুলে ধরেন। রুশদীর উপন্যাসের আরেকটা দিক হলো প্রাচ্য হতে পাশ্চাত্যে দেশান্তর বা প্রবাসন এবং যারা এই বাস্তবতা বা অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যান তাদের আত্মবিরোধিতা ও স্বীকারনীতিকে সাহিত্যিকভাবে তুলে ধরা। দ্য স্যাটানিক ভার্সেস উপন্যাসে এই দিকগুলো নৈপুণ্যতার সাথে তুলে ধরেছেন রুশদী। এবং অন্যন্য উপনিবেশোত্তর সাহিত্যকর্মের মত উনি প্রাচ্যের ভাষা, রীতি ও শব্দচয়ন উল্লেখ করবার পর তা ব্যাখ্যা করবার প্রয়োজনবোধ করেননি। ইংরেজী বা ইউরোপীয় ভাষায় যেসব পূর্ববর্তী ইউরোপীয় উপনিবেশের লেখকরা লিখে থাকেন তাদের লেখায় এরকম প্রাচ্যদেশীয় ভাষা, রীতি ও শব্দচয়ন ব্যবহারের পর কিছুটা ব্যাখ্যাধর্মী লেখা পেশ করবার প্রবৃত্তি খেয়াল করা যায়। রুশদী উনার এই উপন্যাসে তা করেননি বরং দেদার লিখে গেছেন পংক্তির পর পংক্তি আর তাতে ব্যবহার করেছেন হিন্দি, উর্দু এবং অনেক জায়গায় বাংলা শব্দ বা বাক্য। যারা সেসব শব্দের সাথে পরিচিত তারা বুঝতে পেরেছে ওই পংক্তিগুলোর মাধুর্য আর যারা তা বুঝেনি তারা চিন্তা করেছে বা গবেষণা করেছে তা নিয়ে। ঠহর করবার ঠেকা যে পাঠকের তা ঠাট্টার ছলে রুশদী বুঝিয়ে দিয়েছেন ‘দ্য স্যাটানিক ভার্সেস’-এ এবং উপনিবেশোত্তর সাহিত্যে পশ্চিমা পাঠকদের ব্যাখ্যা দেবার সাহিত্যিক দাসত্বের অলিখিত রীতির প্রতিও বুড়ো আঙুল দেখিয়ে দিলেন বোম্বাই হিন্দি গালিগালাজকে ইংরেজী সাহিত্যে স্থান দিয়ে। অবলীলায় উপন্যাসের চরিত্রদের দিয়ে বলিয়েছেন ‘বেহেনচোদ’-এর মত গালি। ইংরেজী যে প্রবাসীদেরও ভাষা তা বুঝিয়ে দিয়েছেন সাহিত্যের ছলে। এবং উপন্যাসের কাহিনীতে উপমহাদেশীয় অভিজ্ঞতাগুলোকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন পশ্চিমা পাঠকদের কাছে। ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হ্যারোল্ড ব্লুম হয়তো এই কারণেই দ্য স্যাটানিক ভার্সেস সম্বন্ধে বলেছেন যে এটি রুশদীর সবচেয়ে বড় সৌন্দর্যশৈল্পিক অর্জন।
বাঙালী মুসলমানরা রুশদীর এই সাহিত্য কর্মটি নিয়ে তেমন কিছু জানে না। যা-ও জানে তা ৮০’র দশকের শেষের দিকে আহ্‌মদ দিদাতের দেওয়া বক্তৃতাগুলো থেকে এবং জাকির নায়েকের মুখসৃত সেই একই বক্তৃতাগুলোর উদ্ধৃতি থেকে। মুসলমানরা উপন্যাসটির যেই অংশটুকু নিয়ে আপত্তি করেছে তা উপন্যাসের ছয় ভাগের এক ভাগ বা একটু বেশী। এবং যতগুলো আপত্তি মুসলমানরা করেছে সেগুলোর থেকে সবচেয়ে মারাত্মক যেই আপত্তিটি তাও ভুল ব্যাখ্যাপ্রসূত- এই ব্যাপারে পরে আসছি। উপন্যাসটির শব্দনৈপুণ্যতা ও মূল বক্তব্যটি উপরে দেওয়া হয়েছে, এখন আসা যাক উপন্যাসটির বিষয়বস্তু নিয়ে। প্রথমেই উল্লেখ্য যে রুশদীর অন্যন্য উপন্যাস যেমন বিখ্যাত ও নন্দিত ‘মিডনাইটস্‌ চিল্ড্রেন’ ও সাম্প্রতিককালে প্রকাশিত ‘টু ইয়ার্স এইট মান্থস্‌ এন্ড টুয়েন্টি এইট নাইটস্‌’-এর মত ‘দ্য স্যাটানিক ভার্সেস’-এরও সাহিত্যশৈলী (genre) হলো যাদুবাদী বাস্তবতা (magical realism)। এই সাহিত্যশৈলী দ্বারাও রুশদী প্রাচ্যের কিস্‌সা-কাহিনী ও লোককাহিনীর প্রচলিত ধারার প্রচার করেছেন। প্রাচ্যের গল্পগুচ্ছ যেমন ‘আলিফ লায়লা’ বা বঙ্গদেশে প্রচলিত পুঁথিগুলোও এই সাহিত্যশৈলীর ধারায় রচিত বা কথিত। এখানে অবাস্তবিক কল্পনাকে বাস্তবতার অংশ হিসাবে ধরে নেওয়া হয়। যেমন বেমানবিক সত্ত্বার অস্তিত্ব, সহস্রাব্দিক আয়ূষ্কাল, জন্তু-জানোয়ারের সাথে মানুষের কথাবার্তা ইত্যাদি। রুশদীর এই উপন্যাসের শুরুতে বলা হয় যে দুজন ভারতীয় নাগরিক, জিব্রীল ফারিশ্‌তা ও সালাডিন চামচা, একটি হাইজ্যাককৃত বিস্ফোরিত বিমান হতে সুউচ্চ আকাশ থেকে ইংলিশ চ্যানেল জলধারায় পতিত হন। পরে এই বিমানের বিস্ফোরণের কারণ এবং হাইজ্যাক নিয়ে, যা বিচ্ছিন্নতাবাদী শিখরা করেছিল বলে উপন্যাসে বলা হয়, বিস্তর কাহিনী এবং বিমানে হরেক রকমের যাত্রীদের কথা বর্ণনা করা হয়। এই বর্ণনাতেও প্রাচ্য এবং পাশ্চাত্যের বিরোধী মতবাদ এবং দর্শনের কথা সেসব চরিত্রদের মাধ্যমে খুব সূক্ষ্মভাবে প্রকাশ করা হয়। জিব্রীল ফারিশ্‌তা, যার পয়দায়েশনাম ইসমাঈল নাজমুদ্দিন, ও সালাডিন চামচা, যার পয়দায়েশনাম সালাহুদ্দীন চামচাওয়ালা, ইংলিশ চ্যানেলে এই সুউচ্চ পতনের ফলেও অলৌকিকভাবে বেঁচে যায়। জিব্রীল ভারতীয় সিনেমার একজন জনপ্রিয় অভিনেতা যিনি বিভিন্ন হিন্দু দেবতার ভূমিকায় অভিনয় করতেন- ঔপন্যাসিক রুশদী এই চরিত্রের মাধ্যমে অমিতাভ বচ্চন ও নন্দমুরী তারকা রামা রাওয়ের দিকে ইঙ্গীত করেছেন। উল্লেখ্য, উপন্যাসে জিব্রীল ফারিশ্‌তার এক প্রেমিকার নাম থাকে রেখা মার্চেন্ট যিনি জিব্রীলের বিদেশ গমনের কারণে আত্মহত্যা করেন এবং রেখার প্রেতাত্মা পুরো উপন্যাস জুড়েই জিব্রীলকে তাড়া করে ফিরে। এখানে রুশদী বেশ রূপকার্থে অমিতাভ বচ্চন ও অভিনেত্রী ‘রেখা’-র গোপন প্রণয়ের প্রতি ইঙ্গীত করছিল যা ৭০-এর দশকের শেষার্ধে ও পুরো ৮০’র দশকের জুড়েই সিনেমা জগতে বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। রেখার সাথে প্রণয়ের ব্যাপারটিও অমিতাভ বচ্চনকে বেশ তাড়া করে ফিরে। রুশদীর এই উপন্যাসের মাধুর্য হয়তো এখানেই যে উনি পুরো উপন্যাস জুড়ে সব রকমের উপমহাদেশীয় পুরাণ ও উভয় প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের তৎকালীন জনসাংস্কৃতিক (pop-culture) ব্যাপারগুলোর দিকে নির্দেশ করেছিলেন যা এম ডি ফ্লেচার উপন্যাসটির ব্যাপারে উনার মস্তপুস্তকালোচনায় (commentary review) উল্লেখ করেছেন। এটা বলা ভুল হবে না যে রুশদীর এই উপন্যাস তৎকালীন প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের উল্লেখযোগ্য ঘটনাসমূহ রূপকার্থে তুলে ধরেছেন- প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচারের অভিবাসীনীতি থেকে শুরু করে অমিতাভ-রেখার গোপন প্রেম পর্যন্ত। অপরদিকে, সালাডিন একজন ব্রিটিশ ভারতীয় যিনি অল্প বয়সে বিলেতে আসেন এবং ইংরেজপ্রেমী হয়ে যান যার ফলস্বরূপ উনি সালাহুদ্দীন চামচাওয়ালা থেকে সালাডিন চামচা (Saladin Chamcha) হয়ে যান- এই চরিত্রের মাধ্যমে রুশদী পরিচয় সংকটের (identity crisis) কিছুটা ধারণা দেন। উপন্যাসে দেখা যায় জিব্রীল সালাডিনকে ‘স্পুনো’ (Spoono; চামচাওয়ালা নামটিকে ইংরেজকরণ করে ঠাট্টা করার জন্য; হিন্দিতে ‘চামচা’ মানে চামুচ বা spoon) বলে ব্যঙ্গ করতে। সালাডিন উনার বাবার সাথে একরকমের বিরোধে জড়িয়ে পরেন এবং তাদের মধ্যে সম্পর্কের অবনতি ঘটে যার কারণ, পরে জানা যায়, সালাডিনের পেশাচয়ন। সালাডিন ব্রিটেনে কণ্ঠকলাকার (voice artist) হিসাবে কাজ করা শুরু করেন যা তার বাবা পছন্দ করেনি। এখানে রুশদী উপমহাদেশীয় সন্তানদের প্রতি তাদের পিতা-মাতাদের কর্তৃত্বের প্রতি ইশারা করেন। সালাডিনের সাথে উনার বাবার সম্পর্কের টানপোড়ন এবং উপন্যাসের শেষে দুজনের সমঝোতা বেশ রোমাঞ্চকর।

এই দুই ব্যাক্তির বিমান হতে পতন তাদের দুজনকেই ভিন্ন দুই সত্ত্বায় রূপান্তর করে। সালমান রুশদী এই দুই ব্যাক্তির রূপান্তরের মাধ্যমে পাশ্চাত্য ও প্রাচ্যের বিরোধ এবং যত রকমের দ্বৈতবাদ সমাজ, বিশ্বাস, ধর্ম ও দর্শনে প্রচলিতি- তথা ভালোর সাথে খারাপ, দেশপ্রেমের সাথ দেশান্তরের, আলোর সাথে আঁধার ও বস্তুবাদের সাথে আধ্যাত্মিকতার- তা বেশ নৈপুণ্যতার সাথে তুলে ধরেন এবং সেই বিরোধগুলোকে বস্তুনিরপেক্ষভাবে দেখার প্রেক্ষাপট তৈরী করে দিয়ে আবার সেগুলো কথার যাদু দিয়ে বিলীন করে দেন। রুশদীর সার্থকতা হয়তো এখানেই। উপন্যাসটিতে উনি প্রবাসীদের কথা, তাদের সংগ্রাম ও আবেগ তুলে ধরেছেন কিন্তু পরে এই প্রবাসীরাই উনার উপন্যাস নিষিদ্ধ করতে মরিয়া হয়ে উঠেন এবং শাস্ত্রপূজারীদের উক্তি অনুসারে উনাকে হত্যা করতেও উদ্যত হয়।

জিব্রীল দেবদূত বা ফেরেস্তাসুলভ সত্ত্বা ধারণ করেন আর সালাডিন শয়তানসুলভ সত্ত্বা ধারণ করেন। জিব্রীল উনার রূপান্তরের মাধ্যমে অনেক দৃশ্য দেখতে পান যেগুলো এই উপন্যাসের একেকটা ভিন্ন কাহিনী যা খুব অল্পই সম্পর্কিত। এরকম এক দৃশ্যে জিব্রীল দেখতে পান জাহিলিয়া (Jahilia) নামক নগরীতে মাহুন্ড (Mahound) নামক এক নবী যিনি সাবমিশন (Submission) নামক এক একেশ্বরবাদী ধর্ম প্রচার করতে থাকেন। আর এই অংশটিই মুসলমানদের ক্ষিপ্ত করে তুলে। উল্লেখ্য, মাহুন্ড ‘মুহম্মদ’ নামের ল্যাটিনকরণ যা মধ্যযুগে ইউরোপে প্রচলিত ছিল। দান্তে উনার ডিভাইন কমেডিতে মুহম্মদকে এই নামেই উল্লেখ করেছেন। অনেকে মূর্খতাবসত বলে থাকেন যে মাহুন্ড মূলত মুহম্মদকে কুকুরের (hound) সাথে তুলনা করার জন্য একটি ব্যঙ্গাত্মক বানানরীতি। এটা সম্পূর্ণ ভুল কারণ এই নামের ব্যবহার সর্ব প্রথম ল্যাটিনভাষী লেখ্যবলয়ে ব্যবহৃত হয় আর hound শব্দটির ব্যুৎপত্তি জার্মানিক ভাষাপরিবারে। এই বানানের মাধ্যমে রুশদী সম্ভবত প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের প্রাচীন যোগাযোগ নির্দেশ করেছেন। উপন্যাসের অনেক ক্ষেত্রেই রুশদী এরকম অপর ভূশিবিরের বানান বা ভাষার ব্যবহার করেছেন। যেমন জিব্রীলকে দিয়ে গাইয়েছেন, ‘Oh my shoes are Japanese, theses trousers are English, if you please. On my head, red Russian hat; my heart’s Indian for all that’- এটি ১৯৫৫ সালের ‘শ্রী ৪২০’ চলচ্চিত্রে মুকেশ চাঁদ মাথুরের গাওয়া ‘ मेरा जूता है जापानी, ये पतलून इंगलिस्तानी, सर पे लाल टोपी रूसी, फिर भी दिल है हिन्दुस्तानी’ (মেরা জুতা হ্যা জাপানী, ইয়ে পতলুন ইংলিস্তানী, সর পে লাল টোপী রুসী, ফির ভী দিল হ্যা হিন্দুস্তানী) গানটির অনুবাদ। আর এরকম বানানের বদল ইতিহাসে অনেক- ইবনে সীনা হয়ে গেছে আভিসেনা (Avicenna), ইবনে রুশ্‌দ হয়ে গেছে (Averroes), ইবনে হাইসাম হয়ে গেছে (Alhazen), দামশক্‌ হয়ে গেছে ড্যামাস্কাস (Damascus), মক্কা হয়ে গেছে মেক্কা (Mecca) আবার উলটো দিকে কন্সটান্টিনোপোল (Constantinople) হয়ে গেছে ইস্তাম্বুল, স্মিরনা (Smyrna) হয়ে গেছে ইজমির, ইয়েশুয়া হয়ে গেছে ঈসা। এখানে জিব্রীল দেখেন যে মাহুন্ড উনার অনুসারীদের সুযোগ-সুবিধা ও উনার নতুন ধর্মের খাতিরে জাহিলিয়া নগরের পৌত্তলিক সর্দার আবু সিম্বালের সাথে আপোষ করেন জাহিলিয়ার তিন দেবী আল্লাত, আল-মানাত ও আল-উজ্জার দৈবত্ব মেনে নিয়ে প্রত্যাদেশপ্রাপ্ত হয়ে। পরে মাহুন্ড সেই প্রত্যাদেশ প্রত্যাহার করে নেন এই বলে যে উনাকে শয়তান ধোঁকা দিয়েছিল। উল্লেখ্য, এই একই কাহিনী মুহম্মদের ব্যাপারে খোদ ইসলামী ঐতিহাসিকগণ ও মুহম্মদের জীবনীকারগণ লিখেছেন উনাদের লেখায়। তাবারী, ইবনে ইসহাক ও আল-ওয়াক্বিদীর লেখায় এই কাহিনী আজও লিপিবদ্ধ আছে ‘কিস্‌সাতুল গ্বারানিক্ব’ নামে। জিব্রীল আরও দেখেন যে সালমান নামের মাহুন্ডের এক সহচর, যিনি মাহুন্ডের প্রত্যাদেশ লিপিবদ্ধ করতেন, লক্ষ্য করেন যে মাহুন্ড নিজের সুবিধা মতন প্রত্যাদেশ সজাচ্ছে এবং ফলস্বরূপ সালমান মাহুন্ডের ধর্মত্যাগ করেন। কাহিনীধারায় ব্যাল (Baal) নামক এক কবির কথা উল্লেখ করা হয় যিনি জাহিলিয়াতে মাহুন্ডকে ব্যাঙ্গ করে কবিতা রচনা করেন।

এগুলো সবই ইসলামী সাহিত্যে অন্য চরিত্রের নামে লিপিবদ্ধ আছে কিন্তু যেই অংশটি মুসলমানদের সবচেয়ে বেশী আঘাত করে তা মুসলমানদের ভাষ্যে এই যে রুশদী নাকি উনার উপন্যাসে মুহম্মদের স্ত্রীগণদের বেশ্যা হিসাবে উপস্থিত করেছেন। এটা সম্পূর্ণ সত্যি নয়। কাহিনীটা অনেকটা এরকম যে মাহুন্ড নিজের জন্য ১২ জন স্ত্রী রাখেন কিন্তু উনার অনুসারীদের জন্য ৪ টি পর্যন্ত স্ত্রী রাখার অনুমতি দেন। ফলস্বরূপ অনেকের মধ্যে মাহুন্ডের স্ত্রীদের প্রতি এক রকমের আকর্ষণ তৈরী হয়। উল্লেখ্য, এরকম আকর্ষণের কথা খোদ হাদীস ও তফসীরেই উল্লেখ আছে এইভাবে যে নবী মুহম্মদের সাহাবীদের মধ্যে কেউ কেউ আকাঙ্খা জাহির করে বলতে থাকেন, যেমন সাহাবী তালহা ইবনে উবায়দুল্লাহ্‌, যে নবীর এত যুবতী স্ত্রী রেখে যদি নবী মারা যান তবে অমুক ওই স্ত্রীকে করবেন এবং অমুক ওই স্ত্রীকে বিয়ে করবে। যেমন কোরানের এই আয়াতটি (সূরা ৩৩, আয়াত ৫৩) তালহাকে উদ্দেশ্য করে নাজিল করা হয়-

‘আর এটাও ঠিক নয় যে তোমরা আল্লাহ্‌র রসূলকে বিরক্ত করবে বা উনার বিধবা স্ত্রীদের কখনো বিয়ে করবে।’

প্রখ্যাত তফসীর আল-কুরতুবীর ১৪ নম্বর খন্ডের ২২৮ পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে যে-

رَوَى إِسْمَاعِيل بْن إِسْحَاق قَالَ حَدَّثَنَا مُحَمَّد بْن عُبَيْد قَالَ حَدَّثَنَا مُحَمَّد بْن ثَوْر عَنْ مَعْمَر عَنْ قَتَادَة أَنَّ رَجُلًا قَالَ : لَوْ قُبِضَ رَسُول اللَّه صَلَّى اللَّه عَلَيْهِ وَسَلَّمَ تَزَوَّجْت عَائِشَة , فَأَنْزَلَ اللَّه تَعَالَى : “وَمَا كَانَ لَكُمْ أَنْ
تُؤْذُوا رَسُول اللَّه” الْآيَة . وَنَزَلَتْ : ” وَأَزْوَاجه أُمَّهَاتهمْ

…ক্বাতাদা রেওয়ায়েত করেছেন যে- “একজন ব্যাক্তি বলেন- ‘যদি রসূলুল্লাহ্‌ মারা যান, আমি আয়েশাকে বিয়ে করবো।’ অতঃপর আল্লাহ্‌ নাজিল করেন ‘আর এটাও ঠিক নয় যে তোমরা আল্লাহ্‌র রসূলকে বিরক্ত করবে’ ও তারপর নাজিল করেন ‘এবং উনার স্ত্রীরা তাদের মা।’

মুহম্মদের স্ত্রীদের প্রতি উনার সাহাবীদের বা অন্যন্য লোকদের যে আকর্ষণ প্রবল ছিল তা দেখা যায় ইসলামী আলেম আবু বকর আল-জাজায়েরীর আয়সার আল-তাফাসীরের চতুর্থ খন্ডের ১৪২২ পৃষ্ঠায়-

روي أن رجلاً من المنافقين لما تزوج رسول الله صلى الله عليه وسلم أم سلمة وحفصة بعد خنيس بن حذافة قال : فما بال محمد يتزوج نساءنا والله لو قد مات لأجلنا السهام على نسائه ، فأنزل الله تعالى هذه الآية
فحرم الله نكاح أزواجه من بعده وجعل لهن حكم الأمهات

রেওয়ায়েত করা হয়েছে যে রসূলুল্লাহ যখন উম্মে সালমা ও হাফসাকে, যখন উনি খুনাইস বিন হুদাফা থেকে আলাদা হয়ে গেলেন, বিয়ে করেন তখন এক মুনাফিক বললেন, ‘মুহম্মদ আমাদের নারীদের শাদী করছে কেন? আল্লাহ্‌র কসম উনি মারা গেলে আমরা উনার বউদের দিকে আমাদের তীর ছুড়বো।’ অতঃপর আল্লাহ্‌ এই আয়াত নাজিল করলেন। অতঃপর আল্লাহ্‌ রসূলের স্ত্রীদের সাথে বিয়ে অবৈধ করে দেন এবং উনাদের স্থান মায়ের স্থানে দিয়ে দেন।

তা ছাড়া মুহম্মদের স্ত্রীদের প্রতি, বিশেষ করে যুবতী আয়েশার প্রতি, তালহার আকর্ষণ এমন কি মুহম্মদের মৃত্যুর পর তাদের গোপনে বিয়ের কথাও শিয়া মুসলমানদের ইতিহাস ও তফসীর গ্রন্থে লিপিবদ্ধ আছে। যেমন শিয়া আলেম আলী বিন ইব্রাহিম আল-কুম্মী উনার তফসীর, তফসীর আল কুম্মী,-তে কোরানের সূরা ৬৬’র আয়াত ১০-এর ব্যাখ্যাতে রেওয়ায়েত করেছেন যে ইমাম আলীর বিরুদ্ধে বসরাতে জঙ্গে জামালে যাবার জন্য যখন আয়েশা প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন তখন তালহা বিন উবায়দুল্লাহ্‌ বলেন-

“তোমার জন্য মাহ্‌রাম ছাড়া গৃহত্যাগ করা জায়েজ নয়।” এবং অতঃপর আয়েশা নিজেকে উনার (তালহা) কাছে বিবাহের জন্য সমর্পণ করেন।
(তফসীর আল-কুম্মী, খঃ ২, পৃঃ ৩৭৭)

সালমান রুশদী এই আকর্ষণের কাহিনীটিকেই ব্যবহার করেছেন উপন্যাসের এক প্রবাহে। উপন্যাসের এক পর্যায়ে দেখা যায় জিব্রীল উনার এক ঘোরে দেখতে পান যে মাহুন্ড উনার শক্তিশালী সৈন্যদল নিয়ে জাহিলিয়া নগর দখল করেন এবং উনার পূর্ববর্তী দুশমনদের খুঁজতে থাকেন যাদের মধ্যে কবি ব্যাল অন্যতম। নিজের জান বাঁচাতে ব্যাল জাহিলিয়া নগরীর ‘কার্টেইন’ (Curtain) নামক এক ভূতলীয় পতিতালয়ে আশ্রয় নেয় ছদ্মবেশ ধারণ করে। এবং সেখানে প্রহরীর কাজে নিয়োজিত হয়। ওখানেই ব্যাল পতিতালয়ের খদ্দেরদের কথোপকথনের মাধ্যমে মাহুন্ডের ধর্মপরিচালনা ও উনার স্ত্রীদের মাতৃসম্মানধার্যপর্ব ও অন্যদের উনার স্ত্রীদের প্রতি আকর্ষণের কথা জানতে পারে। ব্যাল পতিতালয়ের সর্দারনীকে উনার ব্যবসার জন্য লাভজনক এক উপদেশ দেয়। সে বলে পতিতালয়ের পতিতাদের মাহুন্ডের স্ত্রীদের চরিত্র ধারণ করতে এবং খদ্দেরদের সাথে সেই চরিত্র মোতাবেক যৌনভূমিকা (role play) পালন করতে। এর দ্বারা পতিতালয়ের ব্যবসা রমরমা হয়ে উঠে। এখানে মাহুন্ডের স্ত্রীদের পতিতা করা হয়নি বরং বিপরীত বিরোধী শক্তির অনুকরণের যেই প্রবৃত্তি সমাজ সমাজন্তরে দেখা যায় তা বুঝানো হয়েছে। আর যদি এর দ্বারা মুসলমানরা আঘাতপ্রাপ্ত হয়েও থাকে দেখতে হবে সালমান রুশদীর বিরুদ্ধে মৃত্যুদন্ডাদেশবাদী ফাতোয়াটা দিয়েছে কে- আয়াতুল্লাহ্‌ খোমেনী যিনি একজন শিয়া নেতা এবং নবীর স্ত্রীদের ব্যাপারে শিয়া আলেমদের রেওয়ায়েতের নমুনা উপরে দেওয়া হয়েছে। উপন্যাসের এক পর্যায়ে ব্যাল মাহুন্ডের বাহিনী দ্বারা গ্রেফতার ও অতঃপর মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত হন।

জিব্রীল উনার আরেক দৃশ্যঘোরে দেশ (Desh) নামক এক রাষ্ট্রে এক বিদ্রোহী ইমামের সাহায্যে আসেন যিনি আল্লাত দেবীর বিরুদ্ধে সংগ্রামে নিয়োজিত ছিলেন। এই ইমাম আল্লাতকে উৎখাত করে দেশ নামক রাষ্ট্রটির ক্ষমতায় আসীন হতে চান। এই ইমাম উনার জনপ্রিয়তার মাধ্যমে অনেক নিরস্ত্র শিশুদের এই রাজনৈতিক হাঙ্গামায় কাজে লাগান স্বার্থ হাসিলের জন্য। উল্লেখ্য, এর দ্বারা রুশদী আয়াতুল্লাহ্‌ খোমেনীর চরিত্র অঙ্কন করেছেন যিনি বিপ্লবী সংগ্রামের মাধ্যমে ইরানে ক্ষমতায় আসেন এবং ততকালীন শাহ্‌ রেজা শাহ্‌ পহ্‌লবীকে ‘তাগুত’ (মিথ্যা দেবতা) হিসাবে আখ্যা দেন। ৮০’র দশক পুরোটা সময় জুড়েই ইরাক-ইরান যুদ্ধ হয় যখন ইরানের সেনাবাহিনীতে অনেক শিশুসৈন্য ব্যবহৃত হয়। আয়াতুল্লাহ্‌ খোমেনীর ফাতোয়াটা কি তবে ইসলামী ধর্মানুভূতি আঘাতের কারণে নাকি স্বীয় অনুভূতি আঘাতপ্রাপ্ত হবার কারণে? প্রশ্নটা রয়ে যায়।

এরকম আরেক দৃশ্যঘোরে জিব্রীল এক প্রজাপতিখেকো মেয়েকে দেখতে পান- নাম আয়েশা। এই মেয়ে অলৌকিকত্ব প্রদর্শন করে তার গ্রাম তিতলীপুরের লোকদের বিস্মিত করে। গ্রামের জমিদার মীর্জা সাঈদের বেগমের ক্যান্সার হয় এবং আয়েশা বলেন যে পুরো গ্রাম যদি পায়ে হেঁটে মক্কায় তীর্থযাত্রায় যায় তবে উনার ক্যান্সার সেরে যাবে এবং আয়েশা আরও বলে যে মাঝপথে যে সাগর রয়েছে তা আল্লাহ্‌ দ্বিখন্ডিত করে পথের ব্যবস্থা করে দিবেন। বেশ রোমাঞ্চকরভাবে এই কাহিনীটির বর্ণনা করা হয়।

অপরদিকে সালাডিন শয়তানের রূপধারণ করতে থাকে। তাঁর ছাগলের মত শিং গজায় এবং পায়ের পাতা খুরাকার ধারণ করে। ইংলিশ চ্যানেলে ভূপাতিত হবার পর সালাডিন ও জিব্রীল রোজা ডায়ামন্ড নামক এক আর্জেন্টিনীয় ভদ্রলোকের বিধবার বাসায় আশ্রয় নেয়। এই আর্জেন্টিনীয় জাতীয়তার উল্লেখ দ্বারা রুশদী ৮০’র দশকের শুরুর দিকের ফকল্যান্ড যুদ্ধের প্রতি ইঙ্গিত করেন ও উপন্যাসের এই জায়গায় মার্গারেট থ্যাচারের কথা উল্লেখ করে উনার নীতিরীতির ব্যাপারে প্রবাসীদের মনোভাব তুলে ধরেন। উপন্যাসের এই অংশটি রাজনৈতিকভাবে বেশ তথ্যবহুল। উল্লেখ্য, ফকল্যান্ড যুদ্ধের কারণেই মার্গারেট থ্যাচার পুনরায় নির্বাচিত হন এবং অভিবাসন আইন কঠোর করবার সূচনা করেন তখন থেকেই। উপন্যাসের অনেক চরিত্র মার্গারেট থ্যাচারকে ‘মিসেস টর্চার’ বলে ব্যাঙ্গ করে থাকেন। সালাডিনকে পরে ব্রিটিশ পুলিশ গ্রেফতার করে নিয়ে যায় এবং জিব্রীল তাকে সাহায্য করবার অবস্থায় থাকলেও সাহায্য করে না। এখানে প্রবাসীদের স্বার্থপরতার দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে। পুলিশ সালাডিনকে অবৈধ নাগরিক হিসাবে সন্দেহ করার কারণে গ্রেফতার করে আর জিব্রীল রোজা ডায়ামন্ডের মৃত স্বামীর কাপড় পরে ছিল বলে তাকে সন্দেহ করে না। সালাডিন জিব্রীল দ্বারা ধোঁকাপ্রাপ্ত হয় বলে নাখোশ হয়। সালাডিনের ছাগলরূপধারণ করাটা তার নিজের কাছে অবিশ্বাস্য বলে মনে হলেও সবাই সাধারণভাবেই তা দেখতে থাকে। পুলিশের নির্মমতার শিকার হয় সালাডিন এবং এক পর্যায় এটা বুঝা যায় যে প্রবাসীদের প্রতি শ্বেতাঙ্গদের আচরণের কারণেই প্রবাসীরা ভিন্ন রূপধারণ করে এবং সালাডিনের এরকম রূপান্তরের মাধ্যমে তারই ইঙ্গিত দিয়েছে রুশদী।

এরকম আরও অনেক আনুষঙ্গিক চরিত্র উপন্যাসে উপস্থিত করে রুশদী উপন্যাসটিকে করে তুলেছে উপভোগ্য। পরিচয় সংকট, বর্ণবাদ, বিভেদতন্ত্র ও পশ্চিমা বস্তুবাদের মত অনেক বিষয় তুলে ধরা হয়েছে এই উপন্যাসে। রুশদীর লেখা এই উপন্যাসে অনেকের বিরক্তি লাগতে পারে কিন্তু প্রতিটি পংক্তির পেছনে আছে বিশদ কাহিনী ও গবেষণা। দুর্ভাগ্যক্রমে খোমেনীর ফাতোয়াটি এখনও জারী আছে। উপন্যাসটি যদি বর্তমান সময়ে বের হতো যখন শিয়া-সুন্নী দাঙ্গা তুঙ্গে তাহলে হয়তো বইটি কেবল ইরানেই নিষিদ্ধ হতো। এর কারণ বিবেচনা করাটা পাঠকদের উপর ছেড়ে দিলাম।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৬ thoughts on “সালমান রুশদীর ‘দ্য স্যাটানিক ভার্সেস’ ও কিছু কথা

  1. বাহ চমৎকার লেখা
    বাহ চমৎকার লেখা

    আমার ফেসবুকের মূল ID হ্যাক হয়েছিল ২ মাস আগে। নানা চেষ্টা তদবিরের পর গতকাল আকস্মিক তা ফিরে পেলাম। আমার এ মুল আইডিতে আমার ইস্টিশন বন্ধুদের Add করার ও আমার ইস্টিশনে আমার পোস্ট পড়ার অনুরোধ করছি। লিংক : https://web.facebook.com/JahangirHossainDDMoEduGoB

    1. ভাই ডঃলজিক্যাল বাঙালি আপনার
      ভাই ডঃলজিক্যাল বাঙালি আপনার এই কমেন্ট ইস্টিশনে প্রত্যেক টা লিখায় ধারাবাহিক ভাবে দিচ্ছেন। এতে করে ইস্টিশনের সৌন্দর্য টা নস্ট হচ্ছে। যারা জানার আপনার সম্পর্কে জেনে গেছে, রিকুয়েস্ট ও পাঠিয়েছে। আশা করি এবার থামবেন। বিরক্তির কারণ হবেন না। ভালো থাকবেন।
      এভাবে বলার জন্য দুঃখিত।

    2. ভাই ডঃলজিক্যাল বাঙালি আপনার
      ভাই ডঃলজিক্যাল বাঙালি আপনার এই কমেন্ট ইস্টিশনে প্রত্যেক টা লিখায় ধারাবাহিক ভাবে দিচ্ছেন। এতে করে ইস্টিশনের সৌন্দর্য টা নস্ট হচ্ছে। যারা জানার আপনার সম্পর্কে জেনে গেছে, রিকুয়েস্ট ও পাঠিয়েছে। আশা করি এবার থামবেন। বিরক্তির কারণ হবেন না। ভালো থাকবেন।
      এভাবে বলার জন্য দুঃখিত।

  2. স্যাটানিক ভার্সেস নিয়ে বাংলা
    স্যাটানিক ভার্সেস নিয়ে বাংলা কন্টেন্ট তেমন একটা নাই। আপনার বিশ্লেষনগুলো চমৎকার লেগেছে। ইস্টিশনে স্বাগতম।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 1 = 2