একটি “আত্মহত্যা” অথবা “হত্যা”

হাতে গতমাসে কেনা সিম্পনির এ্যান্ড্রয়োয়েড ফোনটি নিয়ে বসে আছে বিশাল। নিজের জন্য কিনলেও ফোনটা মূলত লোপাকে সারপ্রাইজ গিফট দেবার জন্য কেনা। স্মার্ট ফোনের প্রতি তার তেমন আগ্রহ নেই। ফোন হচ্ছে কথা বলার জিনিস,এইটার মধ্যে হুদাই ইন্টারনেট,চ্যাটিং মেটিং আরো কত্তকিছু যে ঢোকাচ্ছে! বাবার কাছে ফোন কেনার আবদার করার মতো অবস্থাতেও সে ছিলোনা তখন। দুই মাস আগেই এসএসসি পরীক্ষার রেজাল্ট দিয়েছে এবং সবাইকে অবাক করে সে কৃতিত্বের সাথে পদার্থবিজ্ঞানে ফেল করেছে।ফিজিক্স পরীক্ষা ভালো হয়নি তেমন কিন্তু তাই বলে ফেল করে বসবে সেটা সে দুঃস্বপ্নেও ভাবেনি। এক বড় ভাইয়ের কাছে কিছুদিন ফিজিক্স পড়েছিলো বিশাল আর তার বন্ধুরা। সেই ভাইয়াকে ফোন করিয়েছিলো রক্তিমকে দিয়ে যে, খাতা আবার রিচেক করা যায় কি না। কিন্তু ভাইয়া ত তেমন কোনো আশার কথা বলেন নি। রিচেক করলে নাকি খালি নাম্বারগুলোতে যোগে ভুল আছে কি না সেটা দেখে। আর যদি ট্যাস্ট পরীক্ষার রেজাল্ট খুব ভালো হয় তাহলে খাতা আবার দেখতে পারে। কিন্তু সে ত টেস্টেও ডাব্বা পেয়েছে,তাই চ্যালেঞ্জ করার সাহস আর হলোনা। আম্মু-আব্বু এমনিতেই আমার উপর খেপা,এই মুহুর্তে এ্যান্ড্রয়েড ফোনের আবদার করাটা তার জন্য অক্সিজেন মাস্ক ছাড়া হিমালয়ের চুড়োয় উঠার মতো ভয়ঙ্গকর চিন্তা। কিন্তু না চেয়েও যে উপায় নেই। সেইদিন লোপা বলছিলো যে স্মার্ট ফোন তার ভীষন পছন্দ। তার বড় ভাইয়ের নাকি একটা আইফোন আছে। অনেক মজার মজার গেমস আছে নাকি ফোনে। কিন্তু সে গেম খেলতে গেলেই ভাইয়া ফোন নিয়ে যায়গিয়া। এমনভাবে বললো, “ইশ! আমার যদি একটা স্মার্ট ফোন থাকত!” যা শুনে সাথেসাথেই সিদ্ধান্ত নেয় যে সে লোপাকে একটা স্মার্ট ফোন গিফট করবেই। বাজারে সিম্পনির সস্তা দরে অনেক স্মার্ট ফোন আছে,সেখান থেকে একটা কিনে দিবে। কিন্তু বাবাকে বলা সম্ভব না তাই মাকে বললো, “আমাকে একটা এ্যান্ড্রোয়েড ফোন কিনে দাওনা আম্মু। খুব বেশি দাম না। ৮-১০ হাজারের মধ্যেই কেনা যাবে। আমি আর ঘুরাঘুরি,আড্ডাবাজি করবোনা। সারাদিন বাসায় থাকব।”…একদমে কথাগুলো বলে দিলো বিশাল। বাবা-মায়ের একমাত্র ছেলে সে,তাই কোনো আবদার আজ পর্যন্ত অপূর্ণ রাখেনি তাঁরা। যদিও এখন সময় খারাপ তাও ক্ষীন আশা নিয়েই আর্জিটা পেশ করলো বিশাল। বিশালের মুখের দিকে কিছুক্ষন তাকিয়ে থেকে বললেন, “সত্যি ত? পরে যদি বের হস তাহলে কিন্তু ফোন নিয়ে যাবো আমি।” ইয়াহু(মনে মনে) “ না আম্মু,বিশ্বাস করো, আমি বের হবোনা। সামনের বার ফিজিক্সে এপ্লাস তুলব,দেখে নিও”।. এরপর আব্বুকে আম্মু কিভাবে ম্যানেজ করেছে কে জানে। দুইদিন পরেই আব্বু তাকে নিয়ে “ইসলামিয়া সুপার মার্কেট” থেকে একটি স্মার্ট ফোন কিনে দিলেন।

২।

লোপাকে ফোন দেয়া উচিৎ হবে কি না। লোপা ফোন ধরবে নাকি ধরবেনা,ধরলেই বা সে কি জবাব দিবে নানা চিন্তাতে মাথা জট পাকিয়ে গিয়েছে। আর ভাবতে পারছেনা কিছু। বারবার লোপার নাম্বারটা চাপে কিন্তু স্ক্রিনে “ডায়ালিং” ভেসে উঠলেই কেটে দেয়। সাহসে কুলোচ্ছেনা। এইভাবে বার দশেক করার পর হঠাত ফোন করেই বসল বিশাল। কিন্তু যা ভেবেছিলো তাই। লোপা ফোন ধরছেনা। এই জিনিসটা বিশালের খুবই অপছন্দ। জন্ম থেকেই তার ঘাড় ত্যাড়া রোগ আছে। ফোন ধরছেনা দেখে তার জীদ চেপে গেলো। ‘দেখি সে কতক্ষন ফোন না ধরে থাকতে পারে’ এইটা ভেবে সে রিডায়ালের পর রিডায়েল করেই যাচ্ছে। সপ্তমবারের মাথায় লোপা ফোন ধরল।
-“কি হলো বারবার ফোন দিচ্ছি ,ধরোনা কেনো?”
-“তুমি আমাকে ফোন দিচ্ছো কেনো? তুমি নন্দিতাকে ফোন দাও”
-“ আবার সেই এক কথা!আরে বাবা নন্দিতার সাথে আমার কি?”
-“কিছুনা তাহলে রাত তিনটা পর্যন্ত তার সাথে কেন আলাপ করলা?তুমিনা বড় গলায় বলতা আমি অন্য কোনো মেয়ের সাথে কথাই বলিনা,তাহলে নন্দিতা যখন ফোন দিলো তার সাথে রাত ১২টা থেকে ৩টা পর্যন্ত কথা বললা কেন?”
-“ এই একটা কথা আর কতবার বলবা? তোমাকে আর কতভাবে বোঝাবো? নন্দিতাকে কি আমি ফোন করেছি নাকি সে আমাকে ফোন করেছে?”
-“ কথা সেটা না, কথা হচ্ছে অচেনা একটা মেয়ে তোমাকে ফোন করলো আর তুমি তার সাথে তিনঘন্টা মিষ্টি মিষ্টি করে কথা বলে গেলা,কেনো? মেয়ে মানুষ দেখলে মাথা ঠিক থাকেনা? কল করলেই কথা বলতে হবে?”
-“ দেখো কথা কিন্তু আমি আগাইনি। সে নিজ থেকেই কথা এগিয়েছে। সে বারবার বলছিলো তার খুব একা লাগছে। তার বয়ফ্রেন্ড অন্য মেয়ের সাথে এ্যাফেয়ার করেছে,তার কিছু ভালো লাগছেনা। আমার যদি সময় থাকে তাহলে তাকে যেনো একটু সংগ দেই। তাই আমি কথা বলেছি। তা না হলে আমার কি ঠ্যাকা পরেছে অচেনা একটা মেয়ের সাথে রাত তিনটা পর্যন্ত কথা বলার?”
-“ হুম। তুমি ত মেয়েদের মনের দুঃখ দূর করার সোল এ্যাজেন্ট খুলেছো। তোমাকে এক মেয়ে ফোন করে বললো, আমি ছ্যাকা খাইছি এখন আমার সাথে একটু কথা কন আর তুমি কথা বলা চালায়ে গেলা।এই তোমাকে আমি বিশ্বাস করেছিলাম?”
-“ দেখো লোপা তুমি যে কাজটা করেছো সেটাও কিন্তু ঠিক না। নন্দিতা তোমার বান্ধবি। তুমি তাকে শিখিয়ে পড়িয়ে আমাকে কল দিতে বলেছো। এভাবে কেউ প্রেমিকের পরীক্ষা নেয়?”
-“অবশ্যই ঠিক করেছি আমি। তুমি আসলে কেমন সেটা আমার জানতে হবেনা? তাই আমি নন্দিতাকে দিয়ে ফোন করিয়েছি যেনো তোমার আসল চেহারাটা বেড়িয়ে আসে।”
-“ কোনো একটা মেয়ে ফোন করে তার দুঃখ শেয়ার করতে চাইলে আমি কি করব?ফোন রেখে দিবো? সেটা কি ঠিক কাজ হতো? আর প্লীজ মাফ করে দাও, আমি ত আর তার সাথে প্রেম করার চেষ্টা করিনি। আমি ত বলেছিই যে আমার বান্ধবি আছে। তাহলে সমস্যাটা কই?”
-“ বান্ধবি আছে বলে আমাকে উদ্ধার করেছো! বান্ধবি আছে ত আরেক মেয়ের সাথে তিনঘন্টা কিসের আলাপ?
-“আরে আলাপ ত সে করেছে,আমি তাকে সান্ত্বনা দিয়েছি মাত্র। দোহাই লাগে লোপা,মাফ করে দাও। আর করবোনা। জীবনে তুমি ছাড়া অন্য কোনো মেয়ের দিকে তাকাবও না। শেষবারের মতো মাফ করে দাও। তোমাকে ছাড়া আমি বাচবোনা লোপা”
-“ঐসকল সিনেমার ডায়লগ অন্য জায়গায় গিয়া মারো। আমার কাছে মেরে লাভ নাই। বহু দেখেছি তোমার মতো। আমাদের সামনে ভেজা বিড়াল আর চান্স পেলেই অন্য মেয়ের সাথে ফষ্টিনষ্টি”
এই কথাটা শুনে বিশাল হঠাত উত্তেজিত হয়ে গেলো।
-“হ, আমরা ফোনে কথা বললে ফষ্টিনষ্টি আর তুমি যে রাজীব ভাইয়ের সাথে বাইকে করে ঘুরে বেড়াও,ক্যাসেল সালামে রাজীব ভাই তোমাকে চাইনিজ খাওয়ায় সেটা খুব ভালো,তাই না?”
-“দেখো রাজিব ভাই আমার বড় ভাইয়ের মতো। উনার সাথে আমি ঘুরলে তোমার কি?”
-“ হ, কত দেখছি ভাই!! আজকে ভাই,কালকে জামাই। তোমাদের চেনা আছে। তোমরা মেয়েরা সব এক। আমি পরীক্ষাতে ফেল করেছি আর রাজীব ভাই কলেজে পড়ে,বাপের টাকা আছে। দামি দামি গিফট কিনে দেয় ,তাই এখন রাজীব ভাইয়ের সাথে প্রেম করতেছো। আবার আমার টেস্ট নাও নিজের বান্ধবিকে দিয়ে আমাকে ফোন করিয়ে”
-“ হ, আমি রাজিবের সাথে প্রেম করি। আমি রাজিবরে বিয়া করুম। তোমার যা খুশি তুমি করোগা। আমার কিছু বলার নাই… লাইন কেটে দিলো লোপা। এ্যান্ড্রোয়েড স্যাটটা গায়ের সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে ছুড়ে মারল বিশাল। কয়েকটা টুকরা হয়ে সেটটি পড়ে গেলো ফ্লোরে ঠিক যেমন বিশালের হৃদয়টা।

৩।
সারারাত ঘুম হয়নি। এপাশ-ওপাশ করতে করতে শুধু সেইদিনগুলোর কথা মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিলো বিশালের।লোপাকে এক নজর দেখার জন্য তাদের বাসার সামনে ঘন্টার পর ঘন্টা দাঁড়িয়ে থাকত সে। মাঝে মাঝে জানালা দিয়ে উঁকি দিয়ে কিছুক্ষন দাড়িয়েই চলে যেতো লোপা। তার বাবা আবার ভীষন কড়া মানুষ। জানতে পারলে মেরে হাত-পা ভেংগে দিবে। এরপর লোপা যে কোচিং এ ভর্তি হয় সেও সেই কোচিং এ ভর্তি হলো। কিসের কোচিং ? সারাদিন মাথায় শুধু ঐ “লোপা” “লোপা”।. কোচিং শেষ করে লোপাদের বাসারদিকের রাস্তায় গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এবং তাকে দেখেও না দেখার ভান করে লোপার মুচকি হাসি। দুইজন রাস্তার দুইপাশ ধরে হাটত কিন্তু মনে হতো যেনো একসাথে চলছে তারা। লোপা যখন বাসায় ঢুকে যেতো তখন মনে হতো, ‘ধ্যাত লোপাদের বাসাটা এত কাছে কেনো? রাস্তাটা আরেকটু বেশি হলে আরেকটু বেশি সময় তাকে দেখতে পারতাম। রাত জেগে জেগে ফেসবুকে চ্যাট করা। কবে কিভাবে দেখা করব, কেউ দেখে ফেললে কি হবে,কোন কালারের শার্ট পরে যাবো,হাতের নখ কেটে আসতে হবে ,খালি হাতে ত যাওয়া যাবেনা,টাকা যোগার করার জন্য স্যারের টিউশনির টাকা না দিয়ে চলে আসতে হবে কত কত চিন্তা থাকত মাথায়। এখন কোনো চিন্তা নেই ,শুধু একটাই চিন্তা, “লোপা”। ধুর বাল! আমি-ই বা এমন গাধা কেনো? নন্দিতা ফোন করে কথা বলা শুরু করলো তার একটু সন্দেহও হলোনা? কিছুদিন আগেই রায়হান বলেছিলো তার এক বন্ধুকে তার গার্লফ্র্যান্ড এভাবে আরেক মেয়েকে দিয়ে কল করিয়েছিলো। দেখার জন্য যে তার বয়ফ্রেন্ড অন্য মেয়ের সাথে কথা বলে কিনা। ঐ ছেলে নাকি একেবারে গদগদ হয়ে কথা বলেছে। তার কোনো গার্লফ্র্যান্ড নাই ,সে একা,নিসংগ জীবন আর ভালো লাগেনা…এইসকল কথাও নাকি বলেছিলো। ব্যাস আর পায় কে! পরেরদিনেই ব্র্যাক-আপ।কিন্ত লোপা তার সাথে এমন করবে এটা সে দুঃস্বপ্নেও ভাবেনি। আর সে ত অস্বীকার করেনি যে তার গার্লফ্র্যান্ড আছে। সে শুধু তার সাথে কথা বলেছে। কথা বললেই কি ক্যারেকটার খারাপ হয়ে যায়? এই মেয়েদের বোঝা এত্ত জটিল কেনো?

৪।

“বিশাল…এই বিশাল, ১১টা বাজে এখনও ঘুমাচ্ছো? একবার ফেল করে শিক্ষা হয়নি? বন্ধুরা সব কলেজে ভর্তি হয়ে গিয়েছে আর তুমি এখন স্কুলে পরীক্ষা দিবা। পাড়ার মানুষের সামনে মুখ দেখাতে পারিনা তোমার জন্য। এই যুগে কেউ ফেল করে?তাড়াতাড়ি উঠে পড়তে বসো। আর মাত্র একমাস আছে পরীক্ষার সেই হুশ আছে?” … আম্মুর চেঁচামেচিতে ঘুম ভাঙল বিশালের। পরীক্ষার রেজাল্টের পর থেকেই এই এক কথা শুনতে শুনোতে অস্থির। আর কত ভালো লাগে? ঘরে আম্মুর হইচই,বাইরে গেলে মানুষের টিকা টিপ্পনি। সবাই সহানুভুতির ভাব ধরে আসে কিন্তু আসলে আসে খোঁচা দিতে।

-“কিরে বিশাল পরীক্ষা করে?” ,
– “ এইবার শুনতেছি প্রশ্ন নাকি কঠিন হবে,পাসের হার নাকি কমাবে”, “বিশাল ঠিকমতো পড়তেছিস ত?” ,
– “কলেজের পড়া যা কঠিনরে বুঝবি ঠ্যালা কলেজে আসলে”

যে সকল পোলাপানের সাথে স্কুলে জীবনে কথাও বলেনি তারা এসে এখন এইসকল উপদেশবানী শুনিয়ে যায় আর বিশাল মুখের মধ্যে একটি মলিন হাসি এনে সেটি শুনে যায়। এছাড়া আর করারই বা কি আছে? পাড়ার মরুব্বীরা পর্যন্ত দেখা হলে ডেকে জিজ্ঞাস করে, “বাবা,এইবার ঠিকমতো পড়ে পরীক্ষা দিবা। পড়ালেখা ছাড়া আজকাল কোনো উপায় নাই বাবা। মেট্রিকেই যদি ফেল করে বস তাহলে পরে কি করবা? মাথা থাইকা এইসকল গানা-বাজনা আর আড্ডাবাজি ছেড়ে পড়াশোনাতে মন দাও। তোমার বাবা-মা কত কষ্ট করছে তোমার জন্য। একমাত্র ছেলে তুমি। কত আশা-ভরসা তোমাকে নিয়ে। ঠিকমতো পড়ো বাবা।” এই এক ডায়লগ শুনে আসছে সেই ৮মাস ধরে। আরে বেটা আমাকে পড়ার উপদেশ দিস আর তোর পোলাযে মেট্রিক ফেল করে রাজনীতি করে এখন ট্যান্ডারবাজি আর চান্দাবাজি করে হেইডা দেখস না? নিজের পোলার খবর নাই ,আমার দুঃখে তার পরান জ্বলে যাচ্ছে। শালারপুত। আসল কথা হইলো আমাকে খুঁচা দিয়ে মজা পায়। আচ্ছা মানুষের দুঃখ নিয়ে আরেকজন মানুষ মজা করে কি আনন্দ পায়? আমি ফেল করছি ঐটা আমার ব্যাপার। তোদের বাপের কি? তোদের বাপের টাকার খাই না পড়ি? কিশোরগঞ্জ শহরটার মানুষের কি খাইয়া দাইয়া আর কোনো কামকাজ নাই? খালি ফুটা খুঁজে বেড়ায় আরেকজনের আর চান্স পাইলে ঢুকিয়ে দেয়। সব শালা কুত্তারবাচ্চা। মনে মনে গালি দেয়া ছাড়া আর কি-ই বা করার আছে? আম্মুর হইচইয়ে অবশেষে উঠতে হলো। উঠে বাথরুমে ফ্রেশ হয়ে এককাপ চা আর একটা বিস্কুট খেয়ে বেড়িয়ে পড়ল বিশাল। পিছন থেকে আম্মু ডাকাডাকি করছে, “বিশাল বের হবানা, বিশাল বের হবানা বললাম। বের হলে আজকে তোমার আব্বু আসলে পরে তোমার শাস্তি হবে। বিশাল…বিশাল…” আম্মুর গলার আওয়াজ আস্তে আস্তে ক্ষীন হয়ে মিলিয়ে গেলো বাতাসে। বুলবুলভিলা পুকুরের পাড়ে এসে একটা সিগারেট ধরালো বিশাল। সিগারেটটা হাতে নিয়ে মন চাচ্ছে আগুনটা ঠিক তার বুকের মাঝখানে বসিয়ে দিতে। পকেটে টাকাও নেই। মাত্র ৫০টা টাকা আছে। ৬টার বেশি সিগারেটও কিনতে পারবেনা। তাই বুকে ছ্যাকা দিয়ে একটি সিগারেট নষ্ট করার চিন্তা বাদ দিয়ে গুরুদয়াল কলেজের দিকে হাঁটা ধরল সে। ফোনটাও ভেংগে ফেলেছে। রক্তিমরা কি কলেজে আছে নাকি প্রাইভেটে? একমাত্র এই বন্ধুগুলার সাথে থাকলে সে একটু শান্তি বোধ করে। কেউ টিপ্পনি কাটেনা,উপদেশ দেয়না এমনকি আমি যে কলেজে ভর্তি হতে পারিনি সেটিও বুঝতে দেয়না। বাকিগুলার ভাব দেখে মনে কয় গুলি করে দিই। সেইদিনত রাব্বি হারামজাদা তাকে “জুনিয়র” বলে ডাকও দিয়েছিলো। বিশাল উঠে যাচ্ছিলো রাব্বিকে ধরতে যদি না চঞ্চল তাকে আটকাতো। কষে শুয়োরের বাচ্চার গালে একটা চড় বসিয়ে দিতে পারলে বুঝত কে জুনিয়র আর কে সিনিয়র!! স্কুলে কোনোদিন এ্য গ্রেডও পায়নি আর মেট্রিকে এ্যা প্লাস পেয়ে কলার উচিয়ে হাঁটে। ভাব দেখে মনে হয় গর্ভমেন্ট স্কুলের ফার্স্ট বয়!

৫।

গুরুদয়াল কলেজের ব্রীজে উঠতেই দেখতে পেলো দূর থেকে রক্তিম আর মুরাদ সিগারেট ফুঁকছে। আহা! কলেজ লাইফটা কি মজার! স্কুলে স্যাররা দৌড়িয়ে ক্লাসে ঢুকাত,পালানো যেতোনা আর কলেজে…ক্লাস করলেই কি আর না করলেই কি! স্যারদেরও ঠ্যাকা নাই নাকি ক্লাসের। পোলাপান সব কলেজে আসে আড্ডাবাজি আর মেয়েদের সাথে টাংকি মারতে। কয়েকটা গ্রুপ আছে তারা তাস খেলে আর কিছু ছেলেপেলে টেবিলটেনিস খেলে। স্কুলে একটা সিগারেট খাওয়ার জন্য একঘন্টা ধরে প্ল্যান করতে হতো আর কলেজে সবাই খোল্লামখোল্লা সিগারেট খায়। ইশ! তখন যদি লোপার প্রেমে না পড়ত তাহলে ত আজকে সেও ঐ রক্তিমদের সাথেই থাকতে পারত। কলেজে আসলে বুকের ভীতরটা হুহু করে উঠে।

-“ কি মামা?ক্লাস নাই?” রক্তিমকে জিজ্ঞাস করলো বিশাল।
-“ আর ক্লাস। রুহুল আমিন স্যার সেই দুইমাস আগে ভেক্টর পড়ানো শুরু করেছে এখনও উনার ভেক্টর পড়ানো শেষ হয়নি। অথচ ইয়ার ফাইনালের টাইম নাকি চলে এসেছে।”
– “ভালোই ত , ফিজিক্সে খালি ভেক্টর থেকেই সব প্রশ্ন দিবো” পাশ থেকে বললো তন্ময়।
-“হ তোমার শ্বশুর লাগে ত। প্রশ্ন করবো বই থেকে দুনিয়ার সব আনকমন প্রশ্ন। শুধু স্যারের কাছে যারা প্রাইভেট পড়েছে তারাই পারবে উত্তর দিতে। ঐদিন সেকন্ড ইয়ারের রফিক ভাইকে জিজ্ঞাস করেছিলাম। তিনি বললেন এই কথা।”
– আরে বেটা ভাবিস না। আমার আরিফ আর রানা আছেনা? ওরা ত রুহুল আমিন স্যারের কাছেই পড়ে। পরীক্ষার আগেরদিন ওদের কাছ থেকে প্রশ্ন নিয়ে আসব আমি,ভাবিস না।
ওদের কথা শুনতে শুনতে আরেকটা সিগারেট ধরালো বিশাল। ঐ যে লোপা। রাজিবভাইয়ের বাইক থেকে নামল। হেসে হেসে কথা বলছে রাজিব ভাইয়ের সাথে। ঘটনা তাহলে এতদূর গড়িয়ে গিয়েছে? রাজিবভাই এখন তাকে কলেজে ড্রপ করে দিয়ে যায়? আর আমাকে বলে কিনা বড় ভাই?! বড় ভাইয়ের সাথে কেউ এভাবে হেলেদুলে কথা বলে? হারামজাদি আমার সাথে প্রেম করে এখন আমি ফেল করেছি বলে তার বান্ধবিকে দিয়ে নাটক সাজিয়ে রাজিব ভাইয়ের সাথে প্রেম করছে? চট করে উঠেই হাঁটা শুরু করলো বিশাল। বাকিরা খেয়াল করার আগেই সে ক্যান্টিন থেকে বেড়িয়ে মাঠের মাঝখানে চলে গিয়েছি। দ্রুত থেকে দ্রুততর হচ্ছে তার হাঁটার গতি। রাজিব যদিও চ্যায়ারমেনের ছেলে কিন্তু বিশালের এখন এইসব কিছু মনে নেই। লোপা তার…শুধুমাত্র তার। সেই লোপার সাথে আর কাউকেই সে সহ্য করতে পারেনা। বিশালের হাঁটা দেখে প্রথমে তার বন্ধুরা কিছুই বুঝতে পারছিলোনা। হঠাত তন্ময় বললো, “ঐ যে লোপা,রাজিব ভাইয়ের সাথে। বিশাল ঐদিকেই যাচ্ছে। উঠ উঠ,দৌড়া। রাজিব ভাইয়ের কাছে চলে গেলে খবর আছে।” বলে সবাই দৌড় শুরু করলো,উদ্দেশ্য বিশাল।

ততক্ষনে বিশাল অনেকদূর এগিয়ে গিয়েছে। দ্রুত হাঁটা এখন অনেকটা হাঁটা আর দৌড়ানোর মাঝখানে কিছু একটা হয়ে গিয়েছে। রক্তিমরা তার কাছে আসার আগেই সে লোপাদের সামনে গিয়ে দাঁড়াল।

-“লোপা,শোনো তোমার সাথে কথা আছে।” কঠিন কিন্তু ধীরে ধীরে কথাটি বললো বিশাল। পিছন দিকে ফিরে বিশালকে দেখেই লোপার হাস্যজ্জ্বোল মুখটি ফুটো হয়ে যাওয়া বেলুনের মতো চুপসে গেলো। লোপা কিছু বলার আগেই রাজিবভাই বললো, “তুমি কে?”
– “আমি আপনার সাথে কথা বলছিনা। আমার লোপার সাথে কথা আছে।”
এই ধরনের কথা শুনে অভ্যাস নেই রাজিবের। তাই বিশালের কথা শেষ হবার আগেই সে বাইক থেকে নেমে দাঁড়াল। লোপা কিছু একটা বলতে নিলো কিন্তু হাতের ইশারাতে তাকে থামিয়ে দিলো রাজিব। “লোপার সাথে তোমার কি কথা?”
“ব্যাক্তিগত কথা” ।

-“ কি ব্যাক্তিগত কথা? আমার সামনে বলো”
-“আপনার সামনে বললে সেটা ব্যাক্তিগত হলো কিভাবে? আমার তার সাথে ব্যাক্তগত কথা আছে।”
-“ লোপা আমার গার্লফ্র্যান্ড। এই বছর আমি তাকে বিয়ে করব।তাই আমার হবু বউয়ের সাথে তোমার ব্যাক্তিগত কথা থাকলে সেটি আমার সামনেই বলতে হবে। স্বামীর সামনে স্ত্রীর আলাদা কোনো ব্যাক্তিগত কথা নাই” কঠিন স্বরে কথাটি বলল রাজিব।
-“লোপা আপনার গার্লফ্র্যান্ড? কিন্তু লোপা যে বলে আপনি তার ভাই?” তারপর লোপার দিকে তাকিয়ে বলে গেলো বিশাল, “ কি ব্যাপার লোপা? কাল রাতেও না তুমি বললে যে, রাজিব ভাই তোমার বড় ভাইয়ের মতো। সকাল বেলাই বড় ভাই গার্লফ্র্যান্ড হয়ে গেলো কিভাবে?”

লোপা এখন ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে দাঁড়িয়ে। কি করবে,কি বলবে কছুই তার মাথায় আসছেনা। রাজিবও মনে হয় কিছুটা হোঁচট খেয়েছে কারন তার দৃষ্টি এখন লোপার দিকে।
“জবাব দাওনা কেনো?কি হলো? রাতের বড় ভাই সকালে জামাই হয় কেমনে? আমার চরিত্র খারাপ? আমি খারাপ ছেলে? আমাকে ট্র্যাপে ফেলে তোমার বান্ধবির সাথে কথা বলিয়ে আমার চরিত্র খারাপ বানিয়ে দিয়েছো কিন্তু তুমি কি?কি হলো জবাব দাওনা কেনো?” গলা এখনেকদম চড়মে উঠে গেছে তখন বিশালের। “ হারামজাদি তোর জন্য আমি পরীক্ষাতে ফেল করেছি। তোর জন্য আমি আজকে রাস্তায় বের হতে পারিনা। আর তুই কি না এই নেশাখোর রাজিবের জন্য আমাকে ছাইড়া দিলি,তুই…” কথা শেষ করার আগেই ঠাস করে একটা শব্দ হলো। রাজিবের সহ্যসীমা অতিক্রম হয়ে গিয়েছে। চড়ের পর আরো মারতে থাকল লাথি,ঘুষি কিন্তু বিশালের সেইদিকে খেয়াল নেই। একদিক দিয়ে মার খাচ্ছে আর আরেকদিক দিয়ে সে লোপাকে বকে যাচ্ছে, “হারামজাদি, তুই জীবনেও সুখী হবিনা। এই রাজিব তোরে দুইদিন পরেই খাইয়া-দাইয়া ছাইড়া দিবো। দেখিস , রাস্তায় রাস্তায় হাঁটবি আর কানবি;আমার অভিশাপ। তুই জীবনেও সূখী হবিনা,” রক্তিমরা এতক্ষন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছিলো, কিন্তু মারামারি শুরু হবার পর তারা কোনোমতে বিশালকে সেইখান থেকে টেনে হিঁচড়ে বের করে আনে। রাজিব বলে চলছে, “মাদারচোদ , তুই কিশোরগঞ্জে কেমনে থাকস আমি দেইখা লমু। খানকির পোলা তোর চৌদ্ধ গুষ্ঠিরে আমি চৌদ্দ হাত মাটির নিচে দাবাইয়া দিমু। আমারে চিনস না শূয়োরের বাচ্চা। দেখ,আমি তোর লগে কি করি।” এরপর লোপা দিকে তাকিয়ে বলল, “গাড়িতে উঠো” ।. লোপা তখন পুরোই অনুভুতিশূন্য। কিছুই বুঝতে পারছিলোনা । রাজিব আবার বললো ,এইবার একটু ধমকের সুরে, “ কি হলো? গাড়িতে উঠতে বলছিনা?” দুই পা গুটিয়ে রাজিবের বাইকে চড়ে বসল। বুম বুম আওয়াজ তুলে সাঁই করে চোখের পলকে বিলীন হয়ে গেলো রাজিবের গতমাসে দুইলাখ টাকা দিয়ে কেনা নতুন বাইকটি।

৭।
রক্তিম,বিশাল,তন্ময়,উমায়েরসহ দশবারোজন বসে আছে খড়মপট্টি সরকারী পুকুরপারে। বিশালের তেমন লাগেনি। কাটে টাটেনি কোথাও কিন্তু সবাই আতংকিত। রাজিব ভাই চ্যায়ারমেনের ছেলে। তারপর চ্যায়ারম্যান আবার আওয়ামীলীগের। এখন ত তাদেরই যুগ। এছাড়া রাজিব ভাই সারাদিনই থাকে নেশার উপর। কখন কি করে বসে তার আসলেই কোনো ঠিক নাই। উমায়ের বললো, “চল থানায় যাই, বড় কাউকে বলি”
– “বাল হবে থানায় গিয়ে। যাও এখন এইখানে বসে বাতাস খাচ্ছিস,থানায় গেলে সাথে সাথে ভরে দিবে জেলে।আর বাতাস খেতে হবেনা।চ্যায়ারমেনের পোলা।”
– আর তোরই বা কি সেন্সরে বিশাল? তোর লোপার সাথে সমস্যা,সেটা পরে ঠিক করতি। তাই বলে রাজিব ভাইয়ের সামনে গিয়ে সিনক্রিয়েট করতে হবে? উমায়ের বললো।
– বাদ দে উমায়ের। প্রেমের বেলায় অতকিছু খেয়াল থাকে?
– “বালের প্রেম আমার। মাইয়া জাতটাই খারাপ। প্রেম করবে একজনের সাথে আবার বিয়া করার সময় দেখবে কার বাপের কত টাকা,জামাইয়ের কি স্ট্যাটাস। মাইয়া জাতটাই খারাপ। অনেকক্ষন ধরে চুপ করে বসে থাকা আরিফ এইবার মুখ খুলল।

– “দেখ এভাবে জেনারালাইজ করাটা বোধহয় ঠিক না। সব মেয়ে খারাপ এইটা তুই কেমনে বলিস? তুই কয়টা মেয়ের সাথে মিশেছিস?” নারীজাতির পক্ষ থেকে কাউন্টার দেয়ার চেষ্টা করলো রক্তিম।

– ভাত সবগুলা টিপতে হয়না। একটা টিপলেই বোঝা যায়। দেহস নাই বিশালের সাথে কি পীরিতটাই না ছিলো লোপার। তন্ময়ের সাথে ছিলো লিজার। জেবিন ভাইয়ের কথা মনে আছে? ৮ বছর ধরে নাকি প্রেম করত জেবিন ভাই আর তারিন আপু। জেবিন ভাই ত চাকরিও পেয়েছিলো কিন্তু পরিবার রাজি না দেখে তারিন আপু জেবিন ভাইকে বিয়ে করলোনা। সেই জেবিন ভাইয়ের এখন অবস্থা দেখছিস? বেচারা চাকরি বাকরি ছেড়ে দিয়ে এখন সারাদিন গাঁজা খায়। আসলে শেষকালে সাফার করতে হয় ছেলেদেরই। আর মেয়েদের কি? প্রেমও করলো, আবার ভালো একটা জামাইও পাইল। এয়ারটেলের বান্ডেল অফারের মতো।

– ব্যাপারটা আসলে এইভাবে দেখা ঠিক না। একটি মেয়ের পরিবার আর আরেকটি ছেলের পরিবার এক না। মেয়েটিকে ছেলের উপর নির্ভর করতে হয় কিন্তু ছেলেকেত নির্ভর করতে হয়না। জেবিন ভাই কোনো সমস্যা ছিলোনা কিন্তু তারিন আপু মনে কর সব ছেড়ে চলে আসল আর পরে জেবিন ভাইয়ের সাথে তার সমস্যা হলো তখন তাকে কে দেখত? মেয়েরা ত বিয়ে করলে সেকেন্ড হ্যান্ড হয়ে যায়,ছেলেদের ত ফার্স্ট সেকেন্ড হ্যান্ড নাই। মেয়েদের তাই অনেক ভেবে চিনতে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। ” নারীজাতির রক্ষক হয়ে আবারো বলে গেলো রক্তিম।

– তাইলে প্রেম করস ক্যান? জানিসই যখন যে পারবিনা তাইলে একটা ছেলের জীবন নিয়া ফাইজলামি করার কি মানে? আর আসল কথা অইল মাইয়ারা কাউরে বিশ্বাস করেনা। এই যে বিশালের সাথে লোপা যেটা করলো। তার বান্ধবিরে দিয়ে কল করাইল এইটা কোনো কাজ হইলো? বিশ্বসই যদি না থাকে তাইলে কিসের বালের প্রেম? এইবার উমায়ের।

– “ হুম ঠিক আছে। কিন্তু এগুলো আসলে পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থারই কুফল। আমরাই মেয়েদেরকেই এইরকম করে গড়ে তুলেছি। রুমন ভাই বলছিলো একটা কথা,কোনো সমস্যারেই উপর থাইকা দেখা ঠিক না। ভিতর থেকে সমস্যাটার রুট না জেনে ভিক্টিমকে দোষ দেয়া ঠিক না। মেয়েরা ইনসিকিউড ফিল করে বলেই এমন হয়…”

কথা শেষ করার আগেই পারভেজ কথা বলা শুরু করলো, “আইছে রুমন ভাইয়ের চ্যালা। এই রুমন ভাই-ই তোর আর তোদের মাথাটা খাইছে। শালারপুত নিজে নাস্তিক। ধর্ম-কর্ম কিচ্ছু মানেনা আর তোরা গেছিস তার কাছে প্রাইভেট পড়তে। পড়ানি রাইখা এইসকল আজাইরা জিনিস শিখাইছে। হেতে দুনিয়ার সব জানে…

এরপর আলোচনা রুমন ভাইয়ের ব্যাক্তিগত জীবনের দিকে মোড় নিলো। কেউ পক্ষে কেউ বিপক্ষে। কিন্তু কোনো কথাই বিশালের কানে যাচ্ছিলোনা। তার মাথায় খালি একটি জিনিসই ঘুরছিলো। যে লোপা তার হাত ধরে প্রতিজ্ঞা করেছিলো তাকে ছেড়ে যাবেনা কোনোদিন সে লোপার সামনে আজকে রাজিব ভাই তাকে এইভাবে মারল আর সে চুপচাপ দাঁড়িয়ে দেখলো? একটু ব্যাথাও পেলোনা সে? তাহলে কি সবটাই অভিনয় ছিলো? কি দরকার ছিলো তার এই অভিনয়ের? সে ত তাকে জীবন দিয়ে ভালোবেসেছিলো। তার ভালোবাসাতে ত কোনো খাদ ছিলোনা ,তাহলে লোপা কেনো তার সাথে এমন অভিনয় করে গেলো। কি পেলো সে এই অভিনয় করে। আমাকে কষ্ট দিয়ে কি আনন্দটা পেলো সে? আমি তার কি ক্ষতি করেছিলাম? কি দোষ করেছিলাম? রাজিব ভাইয়ের মধ্যে কি আছে যা তার নেই? এখন সে কি করবে?বাসাতেও খবর চলে গিয়েছে। এরমাঝে দুইতিনবার খবর এসেছে বাসায় যেতে। বাসায় গেলে আব্বু-আম্মু কি করবে? মারবে? আমার জন্য আব্বু-আম্মুও এখন বিপদে। রাজিব ভাই আসলেই ডেঞ্জারাস লোক। আমার সমস্যাতে আমার আব্বু-আম্মুও সমস্যাতে পরল। লোপা এখন কি ভাবছে? তার জন্যে কি লোপার কি মায়া হচ্ছেনা একটুও। তার কাছে ত রক্তিমের নাম্বার আছে। মায়া হলে ত সে একটিবারের জন্য হলেও ফোন দিতো। দিলোনাতো। তারমানে আমার প্রতি তার একটুও ভালোবাসা ছিলোনা? আমি কাকে ভালোবাসলাম। আরো কত অর্থহীন কথা ভেবে যাচ্ছিলো বিশাল। হঠাত কে যেনো বললো, “এই দশটা বাজে রাত।চল” বিশাল চল বাসায় রক্তিম বললো। “না” বিশালের উত্তর। “না মানে? সারারাত কি এখানে বসে মাছ মারবি নাকি?চল” বলে একরকম টেনেই তুলল তাকে বন্ধুরা। তন্ময়ের উপর দায়িত্ব পরল বিশালকে বাসায় পৌঁছিয়ে দেয়ার। তন্ময় বিশালের বাড়ির গেটের মুখে তাকে রেখে বিদায় নিলো।

৮।
কিশোরগঞ্জ রেলস্টেশনে বসে আছে বিশাল। বাসায় যায়নি। এই মুখ সে তার বাবামাকে দেখাতে পারবেনা। হাঁটতে হাঁটতে তাই কখন রেলস্টেশনে চলে এসেছে খেয়ালও করেনি। এখন কি করবে সে? বাসায় গেলে কি হবে সেটা কল্পনাতেও আনতে পারছেনা। লোপাকে নিয়ে সমুদ্র দেখার ইচ্ছে ছিলো তার।এখন সেই লোপা রাজিব ভাইয়ের সাথে সমুদ্র দেখবে। ৬ মাসে একবারই সুযোগ পেয়েছিলো লোপাকে জড়িয়ে ধরার। এখনও সেই অনুভুতি লেগে আছে তার প্রতিটি রোমকূপে। ডান গালে একটা চুমুও দিয়েছিলো। সেই চুমুর স্বাদ এই মুহুর্তেও টের পাচ্ছে সে। এখন সেই গালে রাজিব ভাই চুমু খাবে। ঠিক তুলতুলে নরম না, একটু শক্ত লোপার হাত কিন্তু সবসময় গরম থাকত। সে ফাইজলামি করে বলত, “তুমি হট ত তাই তোমার হাতও হট!” কপট রাগের ভংগি করে লোপা ভেংচি দিয়ে হাত সড়িয়ে নিতো। আবার সেই হাত টেনে এনে নিজের কোলের উপর রাখত বিশাল। এখন সেই হাতের অধিকার হস্তান্তরিত হয়ে রাজিব ভাইয়ের কাছে। লোপার ঠোটে কখনও চুমু খাওয়া হয়নি। লোপা বলত, বাসর রাতের জন্য রেখে দিয়েছে সে এটা। হিন্দি সিনেমাতে যেভাবে রোমান্টিক পরিবেশে ক্যান্ডেল জ্বালিয়ে নায়ক-নায়িকা ঠোটে ঠোঁট লাগায় সেইভাবে নাকি ফার্স্ট কিস করবে লোপা। এখন ক্যান্ডেল লাইট থাকবে, রোমান্টিক পরিবেশও থাকবে শুধু লোপার ঠোটে চুমু দেয়ার মানুষোটি পালটে যাবে… নাহ, আর ভাবতে পারছেনা বিশাল।

৯।
দূর থেক আলোর ঝটকা দেখা যাচ্ছে। ট্রেনের হর্নের সাউন্ডও হচ্ছে। কিছু না ভেবেই উঠে দাঁড়াল বিশাল। অনেক রাত। প্লাটফর্মে বাস্তুহারারা ঘুমিয়ে আছে। একটি চা-সিগারেটের দোকান খোলা আর কেউ নেই। ট্রেনের আলোটি এখন অনেক বড় হয়ে গিয়েছে। শব্দের তীব্রতাও বেড়েছে অনেক। বিশালের পদক্ষেপও এগুচ্ছে। প্লাটফর্ম থেকে নিচে নেমে গেলো বিশাল। মাথায় কোনো চিন্তা নেই, কেউ মনে হয় তাকে ডেকে নিয়ে যাচ্ছে কোনো এক অজানা দেশে। ধীরে ধীরে সে শুয়ে পড়ল রেললাইনে। ট্রেনের আলো এখন অনেক সামনে। শব্দটি এখন কানে তালা লাগানোর মতো। কিছুতেই ভ্রুক্ষেপ নেই বিশালের। চোখটি বন্ধ করে ফেলল। বিশাল । লোপার চেহারাটা ভেসে আসছে। ঐতো লোপা হাসছে, আম্মু ডাকছে… বিশাল বাবু আরেকটা মাংস নে…উমায়ের তাকে বাটকু বলে খেপাচ্ছে… লোপা কি স্টেশনে এসেছে? একটিবারের মতো চোখ খুলে প্লাটফর্মের দিকে তাকালো বিশাল। শূন্যতা…লোপা আসেনি। প্রচন্ড তীব্র কিছু একটা অনুভুত হলো।
*************************************************************

সেকেন্ডেরও অর্ধেক সময়ের মধ্যে বিশালের শরীরটা দুইভাগ হয়ে রেললাইনের দুইদিকে ছিটকে পড়ল। বিশাল দেখছে তার অর্ধেক শরীর। ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরুচ্ছে কেটে যাওয়া পেটের ফাঁক দিয়ে। প্রচন্ড যন্ত্রনা হচ্ছে বিশালের। ব্যাখ্যাতীত যন্ত্রনা হচ্ছে বিশালের। তবে বেঁচে থাকার চাইতে এই যন্ত্রনাটা কম মনে হচ্ছে তার কাছে। ট্রেনটি চলে যাবার পরও কিছুক্ষন অস্তিত্ব ছিলো বিশালের। তাকিয়ে দেখল তার শরীরের বাকি অর্ধেক। এরপর ধীরে ধীরে চোখ ঘোলাটে হয়ে আসল। চারিদিকে সব অন্ধকার হয়ে যাচ্ছে কেনো? কারন তুমি মারা যাচ্ছো… বিশাল।

ভালো থেকো।

ডিসক্লেইমারঃ বিশাল আমার একজন ছাত্র। আমার প্রায় ৭/৮ বছরের শিক্ষাকতা জীবনের যে কয়েকটা ছেলে/মেয়ের কথা মনে পরে সে তাদের একজন। সে ভালো ছাত্র ছিলোনা।দুষ্টু প্রকৃতির ছেলে ছিলো কিন্তু কোনোদিন বেয়াদবি করতে দেখিনি তাকে। দেখা যেতো ক্লাসে সিরিয়াস কোনো টপিক নিয়ে আলোচনা করছি আর সে এমন একটা কমেন্ট করে বসল যে আমি নিজেই হেসে দিতাম। এইরকম প্রানোচ্ছ্বল একটি ছেলে সুইসাইড করবে সেটি আমি আমার ওয়াইল্ডেস্ট ড্রিমেও ভাবিনি। কিন্তু আমরা যা ভাবতে পারিনা তা করার ক্ষমতা ধারন করি বলেই ত আমরা মানুষ।

বিঃদ্রঃ এই গল্পে ব্যবহৃত কিছু নাম বাস্তব(বিশাল,রক্তিম,রুমন),বাকিগুলো অবাস্তব। কিন্তু গল্পের প্লটটাই পুরোটাই আমার মস্তিষ্ক প্রসুত। শুধুমাত্র রেলগাড়ির নিচে চাপা পরে মারা যাওয়ার ঘটনা বাস্তব। তাই কেউ এখানে নারীবাদিতা,পুরুষতান্ত্রিকতা এইসকল আতলামী না করলেই খুশি হবো। ব্লগে দুইবছর ধরে আছি। তাই আমার দর্শন যারা ব্লগে আসেন তাদের অজানা থাকার কথা না। তবে,আমার কাছে যেটি সত্য মনে হয় সেটি বলে দিতেও আমি দ্বিধা বোধ করিনা,সেটি যদি কোনো “…বাদের” জন্য অপমানকর হয় তাহলে আমার কিছু করার নেই। কারন আমি দেখাতে বিশ্বাসী(সেই সাথে বোঝাতেও)

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

১৮ thoughts on “একটি “আত্মহত্যা” অথবা “হত্যা”

  1. এমন বহু ঘটনার সাথে পরিচিত।এ
    এমন বহু ঘটনার সাথে পরিচিত।এ তো সাধারণ একটা গল্প। “বিঃদ্রঃ” কেন দিলেন বুঝলাম না। নারীবাদ, পুরুস্তান্ত্রিকতার কি সম্পর্ক??? :চিন্তায়আছি: :ভাবতেছি:

    1. লোপার চরিত্রটা এখানে
      লোপার চরিত্রটা এখানে নেগেটিবভসবে এসেছে যেটি গভীরভাবে ভাবলে একধরনের নারীবিদ্বেষতার দিকে মোড় নিতে পারে। তাই বিদ্র দিয়ে দিলাম। ত্যানা পেচানোর আগেই ত্যানা রেখে দিলাম 😀

  2. কিছু বলার নাই । শুধু একটি
    কিছু বলার নাই । শুধু একটি ”দীর্ঘশ্বাস” আর একটি শব্দ ”প্রেম” । এমনি হাজারো বিশাল দের জীবন শেষ হয়ে যাচ্ছে , এমনি অনেক লোপার জন্য । :মনখারাপ: :মনখারাপ:

  3. পুলাপাইনা গল্প হয়ে গেল না
    পুলাপাইনা গল্প হয়ে গেল না ভাই? আপনার লেখালেখির সাথে এই গল্প কেমন জানি বেমানান লাগছে। তবে বাস্তব ঘটনা লিখেছেন তাই পড়তে খারাপ লাগে নাই।

  4. বিশাল যা পেরেছে অনেকেই তা
    বিশাল যা পেরেছে অনেকেই তা পারেনা। কেন পারে না সে দিকে যাবো না। তবে কথা হলো, লোপারা চলে যায়, সব কিছু ভুলে যায়। কঠিন এক জিনিস লোপারা। কিন্তু এসব ভুলতে বা সহ্য করতে না পেরে বিশালরা হয় মরে যায় নয়ত প্রতিনিয়তই মরতে থাকে।

    কোন এক বড় ভাই বলেছিল, নারীদের মন হলো ষোলটা আর পুরুষদের মন দুইটা। নারীবাদ, পুরুষবাদ বুঝতে চাই না। প্রতারনার দায়ে এই সমাজে পুরুষরা শাস্তি পায় কিন্তু আজ পর্যন্ত কোন নারীকেই শাস্তি পেতে দেখলাম না। বড়ই অদ্ভুত এক সমাজে আছি আমরা।

    বাউল বানায়া দিলেন আবারো আমারে।

    1. বিশাল যা করেছে সেটি কখনই ঠিক
      বিশাল যা করেছে সেটি কখনই ঠিক নয়। প্রেমের রসায়নে বিক্রিয়াটি সম্পন্ন করতে হলে দুইনকেই বিক্রিয়াতে অংশ নিতে হবে। একজন যদি “নিষ্ক্রীয় গ্যাস” হয় তাহলে সেটি প্রেম না,পছন্দ। আর পছন্দের জন্য নিজের জীবন দিয়ে দেওয়াটা বোকামি। আই উইল ক্রাই ফর হার হু উইল ক্রাই ফর মি… আমার ফিলোসফি এইটা। সাফ কথা।

      আর আপনেযে প্রচন্ড পরিমানে নারী… তা আমরা জানি 😀 (ফিল ইন দ্যা গ্যাপস)

      1. দাদা মনটা বায়বীয় পদার্থ না যে
        দাদা মনটা বায়বীয় পদার্থ না যে ভাসমান থাকবে। কে কখন কাঁদিবে সেই আশায় বুক বাধিয়া উল্লুকের ন্যায় উন্মুখ হইয়া থাকিবার কি মানে হয়?

        নিজের মন বলে কি কিছু নেই? সেই মনের ঘুড়ি যে কখন কোন ঘুড়ির সাথে প্যাচ লেগে যায় তার কি ঠিক আছে? প্যাচ যদি লেগেই থাকে তাহলে থাকুক না। কিন্তু অপর ঘুড়ির সুতায় মিশ্রিত পদার্থ যদি ধারালো হয় তখন সেটি অনিবার্য ভাবেই কেটে পড়ে যাবে তখন সুতা টেনেও ঘুড়ি মিলবে না।

        ফিল ইন দ্যা গ্যাপ তো রাখিই কিন্তু তারা কোথা থেকে জানি এসে বসে পড়ে আবার প্রয়োজন ফুরালেই অন্যের গ্যাপ ফিলাপ করে দেয়। রাশির দোষ বলে কথা :মাথাঠুকি: :মাথাঠুকি: :মাথাঠুকি:

  5. দুঃখজনক।
    তবে লেখাটা অহেতুক

    দুঃখজনক।
    তবে লেখাটা অহেতুক টেনে লম্বা করে ফেলেছেন। একটা পর্যায়ে গিয়ে ধৈর্য্য হারিয়ে ফেলেছি। :দেখুমনা:

  6. যে যাই বলুক, আমি আপনার লেখাটি
    যে যাই বলুক, আমি আপনার লেখাটি ভাল হয়েছে। তবে এটুকুই বলতে চাই যারা আত্ম হত্যা করে তারা কাপুরুষ ! আবার সেটি যদি হয় প্রেমের কারণে, তাহলে তো আরও খারাপ । ব্যর্থতাকে সফলতায় রূপান্তর করাই একজন পুরুষের কাজ…

    1. ব্যর্থতাকে সফলতায় রূপান্তর

      ব্যর্থতাকে সফলতায় রূপান্তর করাই একজন পুরুষের কাজ…

      মুকুল ভাই বিশালের কি তাহলে উচিৎ ছিলো লোপারে রাজিবের থাইকা টাইনা আইনা ঘর করা?
      বিশালের মনে এওতো খেলতে পারে যে ঐ মাইয়ারে নিয়া সে সুখী হবেই না, আবার তারে ছাড়াও সে বাচবে না অথবা তার কারণে তার পরিবারের যে ক্ষতি হতে পারে সেটি সে নিজ চোখে দেখার সহ্য ক্ষমতা রাখতে পারে না কিনবা সে চলে গিয়ে তার পরিবারকে একটা ঝামেলার হাত থেকে বাঁচাতে চেয়েছে।

    2. আত্মহত্যাকে আমি ঠিক
      আত্মহত্যাকে আমি ঠিক “কাপুরুষতা” বলতে রাজী না। কাপুরেষের পক্ষে আত্মহত্যা করা সম্ভব না। আমি বরং আত্মহত্যকে ভুল সিদ্ধান্ত বলতে রাজী আছি। কোনো কারনেই আত্মহত্যা করা উচিৎ না,যেই কারনই হওক।আত্মহত্যা করে আমি কাউকে জিতিয়ে দিতে রাজি না।

  7. আত্ম হত্যা হলো, চিরস্থায়ী
    আত্ম হত্যা হলো, চিরস্থায়ী সমস্যার ক্ষনস্থায়ী সমাধান ! সুতরাং চিরস্থায়ী সমস্যার চিরস্থায়ী সমাধান না করে ক্ষনস্থায়ী সমাধান করা কি উচিত ? বিশাল আত্ম হত্যা করে তার পিতা-মাতাকে দুঃখের সাগরে ভাসিয়ে দিল আবার লোপা যদি ঐ লোকটার সাথে সুখি না হয় তাহলে দু,টি পরিবারের জন্য বিশাল একটা বড় সমস্যা তৈরী করে দিয়ে গেল না ?

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

48 − 43 =