বাঙালির পরিচয়

ইদানীং, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বাংলাদেশে আদিবাসীদের অধিকার নিয়ে মাত্রাতিরিক্ত নেতিবাচক Post চোখে পড়ার মতো বৃদ্ধি পেয়েছে।
কিছু অপ্রত্যাশিত ঘটনাকে কেন্দ্র করে কিছু সুযোগ সন্ধানী দুষ্কৃতিকারী, সুযোগসন্ধানী ব্যক্তি, তথাকথিত বুদ্ধিজীবী, বিচ্ছিন্নতাবাদের আগুনকে উস্কে দিচ্ছে।
দুঃখের বিষয় হচ্ছে, আমাদের কেউ সহানুভূতি দেখাতে গিয়ে, কেউ স্বচ্ছ ধারণার অভাবে, কেউবা সীমিত জ্ঞানের কারণে, না জেনে- না বুঝে এসব হঠকারীদের সাথে সুর মিলিয়ে ফেলছেন। যা বিচ্ছিন্নতাবাদের আগুনে “ঘি” ঢেলে দিচ্ছে।

আর এই সব হচ্ছে মূলত, আমাদের “আদিবাসী” প্রত্যয় সম্পর্কে কোন স্পষ্ট ধারনা না থাকার দরুন। এই সংশয় হতে মুক্ত হতে সর্বপ্রথম জানতে হবে “আদিবাসী” কারা?

এজন্য, আমি আমার ব্যক্তিগত তথ্যভাণ্ডার থেকে কিছু তথ্য সকলের জ্ঞাতার্থে প্রদান করছি;

আদিবাসী কারা?
মূলত কোন নির্দিষ্ট ভৌগলিক সীমারেখায় দীর্ঘকাল বসবাসকারী জনসমাজ নিজেকে আদিবাসী বলে দাবি করে।
তাহলে প্রশ্ন আসে, বাংলাদেশের আদিবাসী কারা?
এর উত্তর পেতে হলে আমাদের কিছু ধাপ পার হতে হবে,
১ম ধাপ-
ঐতিহাসিক ও নৃতত্ত্ববিদদের মতে, খ্রিস্টপূর্ব ৬০০০ অব্দে (প্রায়) সর্বপ্রথম এদেশে, অস্ট্রেলিয়া ও ইন্দোনেশিয়া হতে সমুদ্রপথে জনসমাজের আবির্ভাব ঘটে। এদের “অস্ট্রিক” বলা হয়। এরা কৃষিকাজ জানতো, এদেশে সর্বপ্রথম চাষাবাদ এরাই শুরু করে।
২য় ধাপ-
প্রায় ৪০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে এদেশে ইন্দোচীন (লাওস, ক্যাম্বোডিয়া, ভিয়েতনাম) ও তিব্বত থেকে “মঙ্গোলয়েড” নৃগোষ্ঠীর মানুষ এসে বসতি গড়ে তোলে। এরাও কৃষিভিত্তিক সমাজ গড়ে।
৩য় ধাপ-
এর অর্থ এই নয় যে, অস্ট্রিক বা মঙ্গোলয়েড এর পূর্বে এদেশে জনবসতি ছিলনা। তবে যারা ছিল, ধারনা করা হয় তারা ছিল অসভ্য, বর্বর ও পশ্চাৎপদ জনসম্প্রদায়। ইতিহাসবেত্তা এবং নৃতাত্ত্বিকদের মতে এরা “নিগ্রোটা”। এরা এদেশের প্রাগৈতিহাসিক নিবাসী।
৪র্থ ধাপ-
নিগ্রোটা, অস্ট্রিক ও মঙ্গোলয়েড নরগোষ্ঠীর সংমিশ্রণে এবং প্রায় ১০০০ বছরের রূপান্তর প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নতুন এক চতুর্থ ধারার ভাষাভিত্তিক নরগোষ্ঠী গড়ে ওঠে, যার নাম “বাঙ্”। প্রাচীনকালে নরগোষ্ঠীর নামে জনপদের নামকরণ করা হতো; আর এভাবেই খ্রিস্টপূর্ব প্রায় ৩০০০ অব্দে বাঙ্ নৃগোষ্ঠী যে জনপদ গড়ে তোলে তার নাম “বঙ্গ”।
৫ম ধাপ-
প্রায় ৪০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে দ্রাবিড় এবং ৩০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে আর্যগণ ভারতবর্ষে যথাক্রমে “সিন্ধু” ও “গাঙ্গেয়” বা “বৈদিক” সভ্যতা গড়ে তোলে। তাদের ধর্ম, ইতিহাস, সাহিত্য ইত্যাদিতে “বঙ্গ” জনপদের উল্লেখ “বাঙ্” নৃগোষ্ঠীর উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ নিশ্চিত করে।
৬ষ্ঠ ধাপ-
স্পষ্টত বোঝা যায় যে, ঐতিহাসিক বিবর্তনের ধারাবাহিকতায় “বাঙ্” নৃগোষ্ঠীই “বাঙালি” জাতিতে রূপান্তরিত হয়েছে। সুতরাং, বলা যায় যে, বাংলাদেশে “আদিবাসী” প্রত্যয় দ্বারা যদি কিছু বোঝায়, তবে তা “বাঙ্” নৃগোষ্ঠী এবং তা হতে উদ্ভূত “বাঙালি জাতি”।

প্রশ্ন উঠতে পারে, তবে যারা নিজেদের আদিবাসী দাবি করেন, তারা কারা?
উত্তর খুব সহজ, উপরে যে হাজার বছরের ইতিহাস বিবৃত হয়েছে সেই হাজার বছরের ইতিহাস পরিক্রমায় নানা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও জনপদ বঙ্গপ্রদেশে আগত ও আশ্রিত হয়েছে। কালচক্রে এরা এখন এদেশের স্থায়ী বাসিন্দা। অনেকে এদের “উপজাতি” বলতে চান, কিন্তু, এই উপজাতি প্রত্যয় নিয়ে নৃতাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব আছে বিধায় এদের “ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী” বলাই নিরাপদ।
কারণ, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীকে আদিবাসী ঘোষণার পায়তারা, বিচ্ছিন্নতাবাদী ষড়যন্ত্রের বীজরোপণ মাত্র।

মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে প্রাপ্ত স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব এবং বাংলাদেশের অখণ্ডতা অক্ষুণ্ণ রাখার জন্য আমাদের বাঙ্গালি জাতির ঐক্য ও বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী হওয়া একান্ত প্রয়োজন। তবেই অসাম্প্রদায়িক, সমতা ও সাম্যের বাংলাদেশ গড়ে উঠবে।

তথ্যসূত্র-
http://www.bd-pratidin.com/editorial/2014/12/06/48041

প্রতিক্রিয়া: বাঙালিরাই আদিবাসী এবং আদিবাসীরাই বাঙালি

ইতিহাসের খেরোখাতা (সংগৃহীত)
ভারতের ইতিহাস পরিক্রমা ১ – অধ্যাপক ড. প্রভাতাংশু মাইতি
ঋগ্বেদঃ ঐতরেয়ঃ আরণ্যক
মহাভারত (আদিপর্ব) ১ম খন্ড- কালী প্রসন্ন সিংহ

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

1 + 1 =