অর্থমন্ত্রীর অনর্থক কথা


-রনি রেজা

কুতার্কিকদের সময়টা বেশ ভালোই কাটছে । আপনি তর্ক পছন্দ করুন আর না করুন; সমসাময়িক রসালো কোনো প্রসঙ্গ নিয়ে আলোচনা নিশ্চয়ই খারাপ লাগবে না। আদিম এই রসালো আমুদে ব্যবস্থায় যদি থাকে গুরুত্বপূর্ণ কারও উপস্থিতি তাহলে তো কথাই নেই। মাঝে মধ্যেই রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ অনেকের বক্তব্যে রসালো খোরাক পায় সাধারণ জনগণ। মজাদার বক্তব্যগুলো কিছুদিন পাড়া-মহল্লার চায়ের দোকান থেকে শুরু করে কর্পোরেট অফিস ঘুরে হাওয়ায় মিশে যায়। অনেক ক্ষেত্রে একই সঙ্গে হাওয়ায় মিশে যান বক্তব্য উৎপাদকারী নিজেও। অথবা আলোচনার মুখে গুটিয়ে নেন নিজেকে। এদিকে বেশ এগিয়ে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত। কী বলবেন- অর্থমন্ত্রীর সময় বেশ ভালো যাচ্ছে? বাদ সাধবে কুতার্কিকরা। বলবে- ‘নিশ্চই নয়। তার একটি কথাও শেষ পর্যন্ত টিকছে না। নিজের দলের লোকজনও তার বক্তব্যের মর্ম বুঝছে না। এ অবস্থায় কোনোভাবেই বলা যাবে না- অর্থমন্ত্রীর সময় ভালো কাটছে।’ আবার যদি একই যুক্তিতে অন্য কোথাও বলেন, অর্থমন্ত্রীর সময় ভালো যাচ্ছে না। সেখানেও নিশ্চয়ই কোনো না কোনো কুতার্কিকের উপস্থিতি থাকবে। আপনার কথার বিরোধিতা করে যৌক্তিকভাবেই বলবে- ‘বেশ ভালো আছেন দাদুর বয়সী এ লোকটি। আমোদ-প্রমোদমূলক কথা উপহার দিয়ে মাতিয়ে রেখেছেন গোটা দেশ। একই সঙ্গে আলোচনায় থাকছেন তিনি নিজেও। মন্দ কী?’ তবে আলোচনায় থাকা অর্থমন্ত্রী এতদিনে সঠিক জায়গায় পৌঁছেছেন। শিক্ষায় ভ্যাট আরোপ, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদেরকে নিয়ে ‘অবমাননাকর’ বক্তব্য প্রদান, গ্রামীণ ব্যাংকে পরিচালক নিয়োগ প্রক্রিয়া প্রশ্নবিদ্ধ করা, আবগারি শুল্ক নিয়ে গো ধরা, বিড়ি শ্রমিকদের বিপক্ষে বক্তব্য প্রদান ও সর্বশেষ সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনীকে অবৈধ ঘোষণা করে দেওয়া সর্বোচ্চ আদালতের রায়ের প্রতিক্রিয়া; কোথাও তেমন যুৎ করতে পারেননি তিনি। সম্প্রতি সাংবাদিকদের বেতন কাঠামো নিয়ে মন্তব্য আবারো আলোচনায় এসেছেন। সাংবাদিকদের জন্য কোনো বেতন কাঠামোর প্রয়োজন নেই মন্তব্য করে গত মঙ্গলবার সচিবালয়ে অর্থমন্ত্রী বলেছেন, ‘বর্তমানে সাংবাদিকদের বেতন সরকারি কর্মকর্তাদের চাইতেও বেশি। তাদের বেতন দেওয়ার ক্ষেত্রে ওয়েজ বোর্ডের কোনো দরকার নেই।’ এসময় তিনি অভ্যাসমত ‘রাবিশ’, ‘বোগাস’ শব্দগুলোও ব্যবহার করেন। কিন্তু দুঃখের বিষয়, এর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই গোপালগঞ্জ প্রেসক্লাবে বসে অর্থমন্ত্রীর বক্তব্য উড়িয়ে দিয়ে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ইকবাল সোবহান চোধুরী বলেন, শেখ হাসিনা সাংবাদিকবান্ধব প্রধানমন্ত্রী। তিনি মুক্ত গণমাধ্যম নিশ্চিত করেছেন। সাংবাদিকদের স্বাধীনতা নিরঙ্কুশ করেছেন। সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্ট গঠন করেছেন। আমরা অচিরেই প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে সাংবাদিকদের জন্য নবম ওয়েজবোর্ড গঠন করবো। কে কী বলল, তাতে কিছু যায়-আসে না।
এরপর ২৪ ঘণ্টা পার হতে না হতেই আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের অর্থমন্ত্রীর বক্তব্য একান্ত নিজস্ব মন্তব্য করে বলেছেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে সাংবাদিকদের ৯ম ওয়েজবোর্ড এর চেয়ারম্যান নিয়োগসহ ৮০ ভাগ কার্যক্রম শেষ হয়েছে। অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যে ওয়েজবোর্ড বাস্তবায়নের পথ বন্ধ হয়ে যায়নি।

এর আগে সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনীকে অবৈধ ঘোষণা করে দেওয়া সর্বোচ্চ আদালতের রায়ের প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে বিপাকে পড়েন অর্থমন্ত্রী। তার এ বক্তব্যে প্রতিবাদে আইনজীবী মানজিল মোরসেদ বলেন, অর্থমন্ত্রীর বয়স হয়ে গেছে। সকালে যা বলেন, বিকালে ভুলে যান। এখন উনাকে প্রশ্ন করা হলে বলবেন, এমন কথা বলেননি। তাই উনার বিরুদ্ধে আমরা আদালত অবমাননার মামলা করব না। অর্থমন্ত্রীর অনর্থক কথা বলে প্রথম আলোচনায় আসেন ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের টিউশন ফি’র ওপর সাড়ে সাত শতাংশ ভ্যাট আরোপ করে। যদিও শিক্ষার্থীদের তীব্র আন্দোলনের মুখে শেষ পর্যন্ত তা বাস্তবায়ন হয়নি। এরপর থেকে একের পর অর্থমন্ত্রী ‘রাবিশ’, ‘বোগাস’ তত্ত্ব দিয়েই যাচ্ছেন। রসিক এ মানুষটি নিজেকে নিয়েও রসিকতা করতে ছাড়েননি। গতবছর ২৬ মে সচিবালয়ে জাতীয় প্রতিবন্ধী ফোরামের নেতাদের সঙ্গে এক বৈঠককালে নিজেকে ‘প্রতিবন্ধী’ দাবি করেন তিনি। এরপর থেকে তার কথায় কেউ ক্ষুদ্ধ হন না। দলের লোকজনও তার কথা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন না। চলতি অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাবনায় সব পর্যায়ে ১৫ভাগ ভ্যাট আরোপ ও ব্যাংক জামানতের ওপর আবগারি শুল্ক বৃদ্ধির প্রস্তাবসহ বেশ কয়েবটি বিষয়ে সরকারকে বিব্রত পরিস্থতিতে ফেলেন তিনি। এজন্য সংসদে নিজ দলীয় সাংসদদের তোপের মুখে পড়েন। তখন তাকে কম কথা বলারও পরামর্শ দেওয়া হয়। কিন্তু তিনি থেমে থাকার মানুষ নন। সেই সুযোগে কুতার্কিকরাও আলোচনায় রাখেন তাকে। আর সাধারণ জনগণ নেয় মজা। সবাই একরকম মেনেই নিয়েছে, অর্থমন্ত্রীর কথার কোনো অর্থ নেই। অনর্থক কথা নিয়ে এত বেশি মাতা-মাতিরও কিছু নেই।

লেখক: কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

55 + = 61