নয়ন জলে ভাসি

‘মা তোর বদন খানি মলিন হলে আমি নয়ন জলে ভাসি’ জাতীয় সঙ্গীতের শেষ লাইন এটা। একটা সময় আমরা স্কুলে প্রতি বৃহস্পতিবার প্যারেড করে ক্লান্ত হতাম। প্যারেড শুরু হত জাতীয় সঙ্গীত আর স্বপথ ব্যাক্য পাঠ করার মধ্য দিয়ে। তারপর জাতীয় পতাকার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করার পর শুরু হত ক্লান্তিকর প্যারেড। আমাদের স্কুল ডায়েরীর প্রথম পাতায় লিখা থাকতো স্বপথ ব্যাক্য আর জাতীয় সঙ্গীত। তখন শুধুই গেয়ে জেতাম, উপলব্ধি করিনি, বুঝিইনি এর মানে। চিৎকার করে বলতাম ‘আমি স্বপথ করিতেছি যে……………’। আজ ‘দেশ ও দশের কল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত করব’ স্বপথের এই লাইনটা আমরা আমাদের কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের আগেই ভুলে গেছি। বাঙলা মা’য়ের বদন খানি আজ শুধু মলিন নয়। যন্ত্রনায় কাতর, তার সাড়া দেহে আমরা অনবরত ক্ষত সৃষ্টি করে চলেছি। কিন্তু তাঁর আর্তনাদ আমরা শুনতে পাই না। আবার পেলেও নয়ন জলে ভাসাতো দূরে থাক, বলি আমি কি করতে পারি। জাতীয় পতাকা আজ ধুলোয় লুটায়, আগুনে পোড়ায়- আমার কিছুই করার নেই।

ব্যালটের মধ্যদিয়ে নিবার্চিত সরকারেরই সব দ্বায়িত্ব। আমি কি করব। চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই এসবতো দূর থেকে দেখি- খুন হলে ‘উফ মানুষ কতটা নির্দয় হতে পারে’ বলে দ্বায়িত্ব শেষ করি। ধর্ষণের ঘটনা পড়ে অসহায় মেয়েটার প্রতি সমবেদনা জাগে মনে, নিযার্তনের খবর শুনে নিযার্তনকারী কে জানোয়ার বলে গালি দেয়া ছাড়া আমাদের আর কিছুই করার নেই। যার যা ইচ্ছা করুক এ জন্যই গণতন্ত্র। দেশে স্বাধীন ভাবে কাজ করার জন্যই তো স্বাধীনতা। যা খুশি তা বলার জন্যই তো ভাষা আন্দোলন। আমি কি করবো- সরকার আছে, আছে প্রশাসন, আইন আছে, আছে আদালত তারা কিছু করতে না পারলে আমার কি করার আছে? যখন নিজে আহত হই কোন ঘটনা দেখে আর অসহায় বোধ করি তখন ‘শালা বাঙালি’ বলে গালি দেই অনায়াসে। সাথে সাথে কেউ আবার সুর মেলায় জাতটাই খারাপ। শুনে কোন কষ্ট লাগে না মনে। নিবোর্ধ মন নিয়ে বসে থাকি। আমার কিছুই করার নেই।
রফিক, শফিক, জাব্বার, বরকত আসে, আসে তাদের গুলি খাওয়া রক্তাক্ত দেহ নিয়ে, গুলিতে উড়ে যাওয়া খুলি নিয়ে- বলে তোমাদের বাঙলা ভাষা এনে দিতে গিয়ে প্রাণ দিয়েছি, এর জন্য কি আমাদের গালি দিচ্ছো? মুক্তিযুদ্ধে শহীদরা আসে, দাঁড়ায় তাদের ছিন্নভিন্ন দেহ নিয়ে, উপড়ে যাওয়া চোখ নিয়ে, বোয়ানেটের আঘাতে বিকৃত হয়ে যাওয়া চেহারা নিয়ে। আসে শহীদ বুদ্ধিজীবীরা হাত বাঁধা, চোখ বাঁধা অবস্থায় সাড়া শরীরে আঘাতের ক্ষত চিহ্নসহ, এসে দাঁড়ায় বীরঙ্গনারা –কাঁদে, উন্মাদের মতো হাসে আর ফিস ফিস করে বলে তোমাদেরকে একটা জাতীয় পরিচয় এনে দিয়েছি প্রাণ-মান-সম্মান হারিয়ে এটাই কি আমাদের দোষ, একারনেই আমাদের গালি দিচ্ছো? তোমাদের স্বাধীনতা এনে দিয়েছি এটাই কি আমাদের দোষ? তোমাদের জন্য একটা সুন্দর ভবিষ্যত, নিশ্চিন্ত জীবনের জন্যে আমাদের জীবন দিয়েছি- এটাই কি আমাদের অপরাধ? নুর হোসেন আসে পিঠে ‘গণতন্ত্র মুক্তি পাক’ লিখে আর রক্তাক্ত দেহ নিয়ে তাঁর দু-চোখে শত শত প্রশ্ন- আমি অসহায় বোধ করি, শহীদের বিকৃত দেহ দেখে আতঙ্কিত হই, বীরঙ্গনা’র আর্তনাদ শুনে আমি কান চেপে ধরি।

আমাকে প্রশ্ন করে স্বাধীনতা এনে দিলাম প্রানের বিনিময়ে, রক্ষা করতে ব্যার্থ হয়েছ- দ্বায় কার? গনতন্ত্র এনে দিলাম প্রানের বিনিময়, হারিয়ে ফেলেছ- দ্বায় কার? ভবিষ্যতের জন্যে সুন্দর দেশ এনে দিলাম প্রানের বিনিময়ে, নষ্ট করেছ- দ্বায় কার? মাথা নিচু করে বলি আমি দ্বায়ী নই, আমার কোন দ্বায় নেই। তবে কে দ্বায়ী? নিবির্কার আমি। ত্রিশ লক্ষ শহীদ আর তিন লক্ষ মা-বোনের ত্যাগের বিনিময়ের যে স্বাধীনতা কে তা ভোগ করছে? নিবার্ক আমি। গনতন্ত্রের সুবিধা কে নিচ্ছে? নিশ্চুপ আমি। আমাদেরও পরিবার ছিল, সুন্দর সংসার করার স্বপ্ন আমাদেরও ছিল। আমাদের নিয়েও পরিবার সুন্দর ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখতো। শুধু আমার নয় আমার পরিবারের ত্যাগের ফসল কে ভোগ করছে? লজ্জায় মাথা নিচু করে আছি। সকল শহীদের ত্যাগের দ্বায় আমরা তোমাকে দিচ্ছি না- শহীদদের কথায় স্বস্তি পাই। অন্তত একজন শহীদের ত্যাগের দ্বায় তো তুমি নিবে? আতঙ্কিত হই। আ-আমি কেন? আমিতো ভোট দিয়ে দ্বায় সরকারের কাছে সমর্পণ করেছি। তাহলে ভুল ব্যাক্তি বেছে নেওয়ার জন্য তুমি দ্বায়ী আমাদের কি দোষ- শহীদের প্রশ্নে আমি হতবাক হই। আমি দ্বায় কেন নেব অন্য কেউ কেন নয়? সব বিবেকেরই দ্বায় আছে। দ্বায় এড়িয়ে কত দূর যাবে তুমি?

যে দেশ, স্বাধীনতা লক্ষ প্রানের বিনিময়ে আমরা অর্জন করেছি, তা রক্ষায় আমার কি কোন ভূমিকা আছে? তবে কোন অধিকারে আমি দ্বায় এড়িয়ে আমি আমার জাতিকে দোষারোপ করছি। না, প্রাণ বিপন্ন করে রুখে দাড়িয়ে শহীদ হওয়ার দুঃসাহস আমার নাই, তবে প্রতিবাদ করে বাঁধা দেয়ার ইচ্ছা প্রবল। আজ থেকে একজন শহীদের ত্যাগের দ্বায় আমি গ্রহন করছি। আমি স্বপথ করে বলছি– অন্যায়ের প্রতিরোধ করতে না পারলে অন্তত প্রতিবাদ করবো। দেশমাতৃকাকে কথা দিচ্ছি- আজ থেকে অন্যায়ের প্রতিবাদী কণ্ঠে আমি সামিল হয়েছি, থাকব। আপনি? কি করবেন আপনি………. জানিনা, তবে এতটুকু জানি যে আজ থেকে আমি দ্বায়বদ্ধ……………

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৫ thoughts on “নয়ন জলে ভাসি

  1. আমি স্বপথ করে বলছি– অন্যায়ের

    আমি স্বপথ করে বলছি– অন্যায়ের প্রতিরোধ করতে না পারলে অন্তত প্রতিবাদ করবো। দেশমাতৃকাকে কথা দিচ্ছি- আজ থেকে অন্যায়ের প্রতিবাদী কণ্ঠে আমি সামিল হয়েছি, থাকব। আপনি

    ?

    আজ থেকে নয় ! আমি জন্ম থেকেই প্রতিবাদী। জীবণ চলার পথে সর্ব ক্ষেত্রেই আমি অন্যায়ের প্রতিবাদী। আমি প্রতিবাদী ছিলাম, আছি এবং আমৃত্যু থাকবো.. ইনশাল্লাহ…

  2. আমরা সবাই দায়বদ্ধ। চেতনাহীনরা
    আমরা সবাই দায়বদ্ধ। চেতনাহীনরা দায় নিতে চায় না , কিন্তু আমরা চাই।

  3. শপথ বাক্যগুলো পড়েছিলাম জীবনে
    শপথ বাক্যগুলো পড়েছিলাম জীবনে কিছু একটা করে দেখাবো বলেই। আমরাই দেশের জন্য দায়বদ্ধ, দেশ নয়।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 1 = 1