প্রতিক্রিয়াঃ সাভার ট্র্যাজেডি

৭ম শ্রেণীতে পড়ি তখন। সামাজিক বিজ্ঞান বইয়ে ফখরুদ্দীন মুবারক শাহের আমলের বর্ণনা ছিল। তখনকার সময় ভারতবর্ষের অন্যান্য জায়গার তুলনায় বাংলায় জিনিসপত্রের দাম খুব কম ছিল। এ নিয়ে পর্যটক ইবনে বতুতার একটি তালিকাও দেয়া ছিল। সেই তালিকা অনুসারে, যতদূর মনে পড়ে, একজন দাস বা দাসীর দাম ছিল ৭ টাকা। সেই ত্রয়োদশ শতাব্দীর কথা।

এখন একবিংশ শতাব্দী। জিনিসপত্রের দাম বেড়েছে।দাস – দাসী অর্থাৎ শ্রমিকের দামও বেড়েছে। এখন একজন মানুষের (পড়ুন দাসের) জীবনের মূল্য ২০,০০০ টাকা হয়েছে। অতিশয় আনন্দের বিষয়। তাই না? আচ্ছা ২০ হাজারে কি এই মানুষগুলোর পরিবার তাদের প্রিয়জনকে ফিরে পাবে? ২০ হাজার কি তাদের অন্তরের হাহাকার প্রশমিত করতে , শুন্যতা পূরণ করতে পারবে? পারবে কি মায়ের বুকে ছেলেকে, বোনের কাছে ভাইকে, মা বাবাকে তাদের সন্তানের কাছে ফিরিয়ে দিতে?

আজকে একজন শ্রমিকের কথা শুনলাম।

“আমাদের জীবনের কোন নিরাপত্তা নাই, মূল্য নাই। আমরা কি আমাদের মা বাপ ভাই বোনের লাশের উপ্রে দারায়া কাম করুম?”

কথাটা ভাবায়। আসলেই তাদের কোন নিরাপত্তা নাই। তবে মূল্য আছে, ঐযে, ২০ হাজার। সবাইকে ২০ হাজার টাকা, পারলে একটা ছাগল( একসময় লঞ্চ ডুবিতে প্রাণহানির জন্য যা দেওয়া হত) আর কিছু সান্ত্বনা আর বক্তৃতা দিয়ে ঘরে পাঠিয়ে দেন। আরেকটা ভাঙ্গা দালান বানান, এইবার তো আরাইশোর বেশি গেছে, পরেরবার হয়ত আপনারা এই রেকর্ড ও ভেঙে ফেলবেন।

টক শো তে বসে সবাই ইরানের মাঠ গরম করেন। টক শো কে আরও টক বানান, মিয়াসাব, হেডম থাকলে সাভার গিয়ে পারলে একটা কংক্রিটের চাই তুলে দেখেন। একটা মানুষকে বাঁচিয়ে দেখেন। একটা লাশ নিজ হাতে করে বের করে দেখেন। এক ব্যাগ রক্ত দিয়ে দেখেন। তখন বুঝবেন, মাঝরাতে ওইরকম সবাক অবাক চারুবাক মুক্তবাক আর মাত্রা নিয়ে লাফালাফি সবাই করতে পারে। কিন্তু বাস্তবতা সামলানোর কেউ নেই।

পারবেন কি সেই শিশুকে সান্ত্বনা দিতে, যে গতকাল মা তুমি কই বলে গলা ফাটিয়ে কেঁদেছে? পারবেন তার মাকে ফিরিয়ে দিতে? পারবেন না। কারণ তার কান্না আপনাদের দামি দেয়াল আর মার্সিডিজ – বিএমডব্লিউএর কাচ ভেদ করতে পারে না।

অনেকে বিচার বিভাগীয় তদন্ত, এই তদন্ত, হেন তেন হাবিজাবির দাবি তুলেছেন। একটা কথা তাদের জন্য। বাংলাদেশে আজ পর্যন্ত কয়টা তদন্ত কমিটি হয়েছে, কয়টা তদন্ত শেষ করতে পেরেছে আর কয়টার রিপোর্ট বাস্তবায়িত হয়েছে বলতে পারবেন? সঠিক পরিসংখ্যান আমার কাছেও নেই। তবে সেটা না দেখাই ভাল। (কারণ লজ্জা পাওয়ার চাইতে না দেখাই ভাল) আগে রানা প্লাজার মালিক কে ধরেন। সে কোথায়? আপনি জানেন কালপ্রিট কে। তাহলে এত ভাঁওতাবাজি কেন? আর একজন সম্মানিত (সংবিধান প্রদত্ত পদানুসারে) ব্যক্তি যে শেকিং থিওরি মানে নাড়াচাড়া তত্ত্ব আবিষ্কার করেছেন তার জন্য তাকে সাধুবাদ জানাবো নাকি আইক্কা বাঁশ দিয়ে মারবো বুঝতে পারছি না। আমি হতবিহবল।

আরেকজন এসে দাবি করেছেন সরকার তাদের দাবি নস্যাৎ করতে এই কান্ড ঘটিয়েছে। কোথায় যাবো? মানুষ মারা গেছে, এখানেও তাদের নোংরা রাজনীতি বন্ধ নেই। রঙ্গে ভরা বঙ্গদেশ, তার রঙ্গের নাই যে শেষ। এরপরও মানুষ এদেরকেই ভোট দেয়। ইলিয়াস!

মিডিয়া এখন হটকেক পেয়েছে, তারা এটা নিয়ে কিছুদিন গ্যাংনাম নাচবে। বাংলাদেশের মিডিয়া রিপোর্টারদেরকেও বাহবা দিতে হয়। একজন মানুষ কয়েকটন কংক্রিটের নিচে চাপা পড়ে কাতরাচ্ছেন, আর তাকে তারা জিজ্ঞেস করছেন, “আপনার অনুভূতি কি?” মনে হচ্ছে যেন এখানে কোন রিয়েলিটি শো চলছে! আমি ঐ মানুষটার জায়গায় থাকলে জিজ্ঞেস করতাম, তোরে রিপোর্টার বানাইসে কেডা?

কি আর হবে? মিডিয়া কয়েকদিন নাচবে, দেশবাসী কাল হয়ে কয়েকদিন শোক পালন করবে। এরপর সবাই ভুলে যাবে। কিন্তু স্বজনহারাদের অশ্রুর দাগ মুছবে না, শ্রমিকদের অধিকার বঞ্চিত করা বন্ধ হবে না, আরেকটি দুর্ঘটনা যে ঘটবেনা সে নিশ্চয়তাও কেউ দেবে না। সবাই যার যার মত “বোতাম আটা জামার নিচে শান্তিতে শয়ান”* জীবন নিয়ে বেশ আছি বলে চালিয়ে দেবে। আফসোস।

সেই সব ব্যাক্তিকে শ্রদ্ধা জানাই। যারা শুরু থেকে উদ্ধার কাজের সাথে জড়িত আছেন। যারা আহতদের সেবা দিচ্ছেন। তাদের সস্রদ্ধ সালাম।

*[দুরন্ত আশা – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।]

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৩ thoughts on “প্রতিক্রিয়াঃ সাভার ট্র্যাজেডি

  1. হেডম থাকলে সাভার গিয়ে পারলে

    হেডম থাকলে সাভার গিয়ে পারলে একটা কংক্রিটের চাই তুলে দেখেন। একটা মানুষকে বাঁচিয়ে দেখেন। একটা লাশ নিজ হাতে করে বের করে দেখেন। এক ব্যাগ রক্ত দিয়ে দেখেন।

    সত্য কথা। আমরা পারি শুধু লাইক-শেয়ার-ট্যাগ দিতে আর আজাইরা প্যাচাল পাড়তে :দীর্ঘশ্বাস:

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

71 + = 79