আজটেক প্রার্থনা ৩ঃ ত্‌লালক এর প্রার্থনা

/508172580/Tlaloc.jpg” width=”500″ />
[চিত্রঃ দেবতা ত্‌লালক]

১। মেহিকোতে১ দেবতা২ আবির্ভূত হন; তার ঝাণ্ডা সবদিকে উদঘাটিত হয়, এবং কেউ বিলাপ করে না।
২। আমি, দেবতা, ফিরে আসি আবার; রক্তার্ঘ্যের প্রাচুর্যের স্থানে৩ আমি আবার ফিরে আসি; সেখানে যখন দিন পুরাতন হয়, আমি আরোহণ করি দেবতা হিসেবে।
৩। তোমার কাজ যেনো কোনো অভিজাত জাদুকর; যথার্থরূপে তুমি তোমার নিজেকে তৈরী করো আমাদের মাংস থেকে; তুমি তোমার নিজেকে তৈরী করো, এবং কে তোমার মুখোমুখি হওয়ার সাহস রাখে?
৪। বস্তুতপক্ষে যে আমার মুখোমুখি হওয়ার চেষ্টা করে, আমার কাছে সে তার নিজেকে ভালো হিসেবে পাবে না। আমার পিতারা বাঘ এবং সাপের মাথা দিয়ে তাকে গ্রহণ করবে।
৫। ত্লালকায়৪, তৃণশ্যামল ঘরে, তারা গোলা দিয়ে খেলে, তারা নিক্ষেপ করে নলখাগড়া।
৬। সম্মুখপানে যাও, সম্মুখপানে যাও যেখানে মেঘেরা প্রচুর পরিমাণে ছড়িয়ে পরে, যেখানে ঘন কুয়াশা তৈরী করে ত্লালকের মেঘাচ্ছন্ন ঘর৫।
৭। সেখানে শক্তিশালী কণ্ঠ এবং উচ্চৈঃস্বরে ক্রন্দন আমাকে জাগ্রত করে।
৮। আমাকে খুঁজতে তোমরা সেখানে যাও, আমার শব্দ খুঁজতে যা আমি বলি; যখন আমি জেগে উঠি, ভয়ঙ্কর একজন, এবং উচ্চৈঃস্বরে ক্রন্দন করো।
৯। চার বছর পরপর তারা অবশ্যই সেখানে যাবে; পরিচিত না হোক, চিহ্নিত না হোক, তারা অবশ্যই চমৎকার সুদৃশ্য ঘরে অবরোহণ করবে, তারা নিজেদের একত্রিত করবে এবং উপদেশাবলী জানবে।
১০। সম্মুখপানে যাও, সম্মুখপানে যাও যেখানে মেঘেরা প্রচুর পরিমাণে ছড়িয়ে পরে, যেখানে ঘন কুয়াশা তৈরী করে ত্লালকের মেঘাচ্ছন্ন ঘর।

টিপ্পনী

১ মেহিকো
মেহিকো, প্রচলিত বাংলায় মেক্সিকো। বর্তমানে উত্তর আমেরিকার মহাদেশে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণে এবং গুয়েতেমালা এবং বেলিজ এর উত্তরের রাষ্ট্রটিই মেক্সিকো। এর পূর্ব পাশে মেহিকো উপসাগর এবং আটলান্টিক মহাসাগর, পশ্চিমে প্রশান্ত মহাসাগর। মেহিকোর রাজধানীর নাম মেহিকো সিটি। মেহিকো আজটেকদের প্রাচীন সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকার।

[চিত্রঃ মেহিকোর জাতীয় প্রতীক]

মেহিকো শব্দটি আজটেকদের ভাষা নাহুয়াত্ল থেকে এসেছে। এর মূল শব্দবন্ধটি হলো মেহত্লি+কো। ‘মেহত্লি’ আজটেকদের প্রধান দেবতা হুইটসিলোপোশ্তলির আরেকটি নাম। ‘কো’ মানে শহর। অর্থাৎ মেহিকো শব্দের মানে ‘হুইটসিলোপোশ্তলির শহর’। আজটেকদের সময় এই শহরের নাম ছিলো মেহিকো-তেনোশতিত্‌লান। আজটেকরা নিজেদের সাম্রাজ্যের রাজধানী হিসেবে ‘তেহকোকো হ্রদের’ মাঝখানে, প্রথম যে শহরটি গড়ে তুলেছিলো তার নাম ছিলো ‘তেনোশতিত্‌লান’। পরবর্তীতে স্প্যানিয়ার্ডরা তেনোশতিত্‌লানকে কেন্দ্র করে গড়ে তোলে মেহিকো সিটি। তেনোশতিত্‌লান হচ্ছে মেহিকো সিটির হৃৎপিণ্ড। মেহিকো সিটিকে কেন্দ্র করে পরবর্তীতে ‘মেহিকো’ রাষ্ট্র হিসেবে আবির্ভূত হয়।
আজটেক ঐতিহ্য এখনো মেহিকানরা ধরে রেখেছে। স্প্যানিশদের কাছ থেকে স্বাধীন হওয়ার পরই মেহিকানরা তাদের পতাকায় আজটেক দেবতা হুইটসিলোপোশ্তলির একটা প্রতীক বসায়। এই প্রতীক একই সাথে মেহিকানদের জাতীয় প্রতীক। প্রতীকে একটি ঈগল পাখি একটি ক্যাকটাস গাছের উপর দাঁড়িয়ে। ঈগলের মুখে একটি সাপ। এখানে ঈগল দেবতা হুইটসিলোপোশ্তলির প্রতীক, ক্যাকটাস গাছটি তেনোশতিত্‌লান শহর এবং সাপ জ্ঞানের দেবতা কুয়েতজালকোয়াত্‌ল এর প্রতীক।

২ দেবতা
দেবতা ত্‌লালক। আজটেকদের অন্যতম প্রধান দেবতা। ত্‌লালক বৃষ্টি, বজ্র, পানি, কৃষি, উর্বরতা, পাহাড়, ঝর্না এবং গুহার দেবতা। দেবতা ত্‌লালক, দেবতা হুইটসিলোপোশ্তলির মতোই গুরুত্বপূর্ন দেবতা। তেনোশতিত্‌লান শহরে আজটেকদের প্রধান মন্দিরে দুইজন দেবতার আরাধনা করা হতো। একজন হুইটসিলোপোশ্তলি, আরেকজন ত্‌লালক।

৩ রক্তার্ঘ্যের প্রাচুর্যের স্থান
যে স্থানে দেবতাদের উদ্দেশ্যে নরবলি দেয়া হতো। তেনোশতিত্‌লান শহরের প্রধান মন্দির। নাহুয়াত্‌ল ভাষায় ‘উইই তেওকাল্লি’ বা স্প্যানিশ ভাষায় ‘তেমপ্লো মায়োর’। সেখানে প্রধানত দুইজন দেবতার উদ্দেশ্যে নরবলী দেয়া হতো। একজন হুইটসিলোপোশ্তলি এবং অপরজন ত্‌লালক। দুইজন দেবতার উদ্দেশ্যে দেয়া নরবলীর সময়কাল আলাদা ছিলো।
/1200px-Rekonstruktion_Tempelbezirk_von_Tenochtitlan_2_Templo_Mayor_3.jpg” width=”500″ />
[চিত্রঃ তেনোশতিত্‌লানের প্রধান মন্দির। একসাথে দুইটি মন্দির। একটি হুইটসিলোপোশ্তলির, অপরটি ত্‌লালকের।]

৪ ত্‌লালকা
দেবতা ত্‌লালকের বাসস্থান। জীবিতদের জন্য পৃথিবীর স্বর্গ, মৃতদের জন্য স্বর্গে যাবার আগের ধাপ। ‘ত্‌লালক পাহাড়ে’ অবস্থিত ত্‌লালকের মন্দিরকেই ত্‌লালকা বলা হয়। বছরের নির্দিষ্ট সময়ে সমস্ত আজটেকদের জন্য এই মন্দির পরিদর্শন অত্যন্ত মাহাত্ম্যপূর্ন বলে বিবেচিত হতো।

[চিত্রঃ দেবতা ত্‌লালকের আশীর্বাদপুষ্ট আত্মারা স্বর্গের দিকে যাত্রা করছে।]

৫ ত্লালকের মেঘাচ্ছন্ন ঘর
ত্লালক পাহাড়। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৪,১২০ মিটার বা ১৩,৫১৭ ফুট উচ্চতায় মেহিকোর নবম উচ্চতম পাহাড়। আজটেকদের কাছে অতি পবিত্র পাহাড়। মৃত্যুর পর আত্মারা এই পাহাড়ে একত্রিত হতে থাকে। প্রতি চার বছর পরপর মৃতের আত্মীয়স্বজনেরা এই পাহাড়ে একত্রিত হয় এবং দেবতা ত্‌লালকের উদ্দেশ্যে স্তুতি গায় এবং বলি দেয়। দেবতা সন্তুষ্ট হলে মৃতের আত্মা স্বর্গে গমনের জন্য প্রস্তুত হতে পারে। প্রতি চার বছর পরপর দেবতা ত্‌লালক এবং মৃত পূর্বপুরুষদের স্মরণে আজটেকরা মিলিত হতো ত্‌লালকের উৎসবে।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

8 + 1 =