বিপ্লবী রাজনীতি ও কাল্পনিক রাজনীতি : মার্কসীয় দৃষ্টিভঙ্গি

রাজনীতি বা বিপ্লব বলতে সাধারণ লোকে বোঝে মারামারি, কাটাকাটি, অত্যাচার, পৃথিবীকে ধ্বংস করে দেওয়া। তাই আগেই বলে রাখা উচিত এই সব ভ্রান্ত এবং বীভৎস ধারণা থেকে রাজনীতিকে মুক্ত করতে হবে। তবে’ই রাজনীতি কাজে আসবে।

বিপ্লব বা বিপ্লবী বলতে কী বুঝায়? পৃথিবী যে কোনো অলৌকিক শক্তিদ্বারাা পরিচালিত নয় এবং আজ যে অবস্থায় পৃথিবী আছে এবং তা মানুষ তার নিজের শক্তি দিয়ে তাকে উন্নত এবং নতুন করে গড়ে তুলতে পারে- এই ধারণা যার আছে সেই বিপ্লবী। বিপ্লবী আরও বলে যে, পৃথিবীকে বহুবার নতুন করে গড়া হয়েছে এবং প্রয়োজনের তাগিদেই তা করা হয়। পুরো পৃথিবীর বিভিন্ন ভূখন্ডে যেসব মানুষ তাদের সেই ভূখন্ডকে বা পুরো পৃথিবীকে নতুন করে গড়ে তোলবার প্রয়োজন অনুভব করে এবং বিশ্বাস করে যে, পুরো পৃিথবীর জনসাধারনের সেই শক্তি আছে, তারাই হলো প্রকৃত বিপ্লবী। সাধারণ বৈজ্ঞানিক জ্ঞান ব্যতিরেকে কেউই বিপ্লবী হতে পারে না, প্রকৃত বিপ্লবী হতে হলে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রয়োজন। বিপ্লবী হতে হলো এই দৃঢ় আত্মবিশ্বাসের প্রয়োজন যে মানুষ শুধু জগৎকেই নতুন করে গড়তে পারে তাই নয়, মানুষ তথাকথিত ভগবান-প্রভুদেরকেও তৈরি করতে পারে, ধ্বংসও করতে পারে এবং সৃষ্টির শুরু থেকেই তা মানুষ করে আসছে। মানুষদের প্রকৃতিই হচ্ছে তথাকথিত ভগবান-প্রভু প্রতিষ্ঠা করা, এবং তাকে ধ্বংস করে নতুন করে বারর বার সৃষ্টি করা।

সমাজের বিবর্তনের সাথে সাথে রাষ্ট্রীয় গঠনে কতগুলি মূল সিদ্ধান্ত রচনা করা হয়। যদি সেই সিদ্ধান্তগুলিকেই আমরা চিরন্তন, অপরিবর্তনীয় বলে মনে করি তাহলে জগৎকে নতুন করে গড়ে তোলার প্রশ্নই ওঠেনা। বিবর্তন- ভীরু লোকেরা বিপ্লবীদের হয় পাগল- না হয় কল্পনাবিলাশী মনে করেন। এটা নিতান্তই তাদের ভুল ধারনা। রাজনৈতিক সূত্রগুলি শুধুই কল্পনামূলক নয়, মানুষের দৈনন্দিন সামাজিক জীবনের অবস্থার উপরই তার ভিত্তি এবং সেই সামাজিক অবস্থার প্রতীক হলো প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রব্যবস্থা সুতরাং রাষ্ট্রীয় রীতিনীতির মূলগত ব্যবহারিক সংজ্ঞা আছে।

সামাজিক অবস্থার তো রাষ্ট্রীয় রীতিনীতিও মানুষের জীবনের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে সংশ্লিষ্ট; তাই যখনই প্রচলিত সমাজব্যবস্থা অসহ্য হয়ে ওঠে তখনই আমরা তাদের পরিবর্তন করতে প্রবৃত্ত হই। কিন্তু আমাদের যদি এই দৃঢ় বিশ্বাস না থাকে যে, আমরা তাদের পরিবর্তন করতে পারি- তাহলে এর প্রয়োজনীয়তাও উপলব্ধি করতে পারি না। আমরা যদি গোড়াতেই ধরে নিই যে, সমস্ত কিছুই পূর্বপরিকল্পিতভাবে এবং ঐশ্বরিক ইচ্ছা অনুযায়ী ঘটে তাহলে আমরা সেই সামাজিক ব্যাবস্থা বা প্রচলিত রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তগুলি পরিবর্তনের কোনো প্রয়াস পাই না। ভগবদ্ ভয়ে ভীত লোক কখনও ভগবান বা প্রভুর সৃষ্টিকে পরিবর্তন করার উৎসাহী হতে পারে না।

পরিবর্তন করার ইচ্ছা আমাদের তখনই আসেতে পারে যখন আমরা জানতে পারি যে, ভগবান-প্রভু আমাদেরই সৃষ্টি আমরাই তাদের পরিচালনা করি, আমরাই আবার ইচ্ছানুযায়ী যে কোনো দেবতাকেই তার উচ্চাসন থেকে নামাতে পারি। যখনই আমরা উপলব্ধি করি যে, আজকের জগৎ যা হওয়া উচিত তা নয়, এর আমূল পরিবর্তন প্রয়োজন, তখনই আমরা মানুষের তৈরি স্রষ্টা- ঈশ্বরকেও অকর্মণ্য, অনুপযুক্ত বলে সরিয়ে দিতে পারি। যখনই আমরা জানতে পারবো যে, ভগবান বা প্রভু আমাদেরই সৃষ্টি, তখনই আর আমাদের সেই কালাপাহাড়ি (Iconoclastic) শক্তির প্রতি কোনো ভীতি থাকবে না। এবং এই মানসিক শক্তি আমরা বিজ্ঞান-জ্ঞান থেকে লাভ করি, যার দ্বারা আমরা উপলব্ধি করতে পারি যে, পরিবর্তনশীল দর্শন- বিজ্ঞান থেকে উচ্চতর কোনো শাস্ত্র নেই।

তথ্যসূত্র এবং সহায়ক বই-

“মার্কস-এঙ্গেলস”
“লেনিন রচনাবলি”
“মার্কসবাদ”
“সমাজতান্ত্রিক রাজনীতি ও অর্থনীতি”

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 23 = 33