আজেবাজে কথা এবং একটি চন্দ্রগ্রহণ (পার্ট ২)

আমার দুলাভাইয়ের বড় দুলাভাই আমার সামনে বসা। নাম আজমল কবির। কাপড়ের ব্যবসায়ী। ইসলামপুর, নারায়ণগঞ্জ বহু জায়গায় তার ব্যবসা। লম্বা-চওড়া মানুষ। বয়েস চল্লিশ থেকে কিছু বেশি।
বাসায় তার আগমনের উদ্দেশ্য আমার বোন-দুলাভাইয়ের ব্যাপারে কিছু ফয়সালা করা।

বাসায় কেউ নেই। আমি তাকে শুকনা চানাচুর আর চা এনে দিলাম। পাশে হাটার ছড়িটা রেখে উনি তা বসে বসে খাচ্ছেন। মুখে ফিচলে একটা হাসি।

“দেখ, রৌদ্র, তোমার বোনের একটু মাথায় সমস্যা। সে চাকরী করে। তার নিজের চলতে টাকা-পয়সা লাগে না। আমাদের ছেলের তো তাতে কোন সমস্যা নাই। কিন্ত বাসায় মেহমান আসলে আদর-আপ্যায়ন করতে জানে না”।
“জ্বী , দুলাভাই”।
“হ্যাঁ, তোমার বোন প্রথমে ঠিক ছিল। কিন্ত শেষবার যখন তোমার রেহানা আপা গেল বাসায়, সে নাকি খুব একটা ভালো চোখে দেখে নাই। কোন কাজ দিলে করে না। রান্না-ঘরে যায় না”।

“কবের কথা দুলাভাই?”
“এইত গত পরশু”

রেহানা আপা প্রতি সপ্তাহে দুলাভাইয়ের বাসায় যায়। আপুর তাতে কোন সমস্যা নাই। কিন্ত প্রতিবার সে যখন আসে, সাথে করে কাউকে নিয়ে আসে। তার সাহায্যের দরকার থাকে। দুলাভাই অত্যন্ত আনন্দের সাথে তাকে সাহায্য করেন। যদিও রেহানা আপার নিজেদের যথেষ্ট টাকা-পয়সা আছে, কিন্ত সাহায্য-দাতা হিসেবে দুলাভাই সর্বোত্তম!

“জ্বী, দুলাভাই, বলেন”
“এখন দেখ, আমিতো কিছু জানি না, তোমাদের দুইজন বাদে তো আর কেউ নাই, তোমার আব্বাজান বলেছেন, তোমাদের সম্পত্তি ভাগ হলে অর্ধেক তোমার বোনকে দেবেন। তা ওইটা যদি লিখে দেন, আমরা ছেলেকে তোমাদের বাড়ির জামাই রাখতে পারি”।

“জ্বী, দুলাভাই। আপাদের সবার খবর কী?”
“তোমার রেহানা আপা তো তার বোনদের নিয়াই আছে। রসু, রাশিদা আর সাবিনাতো ভালো জামাই পেয়েছে। আর ওরা তোমার দুলাভাইয়ের উপর খুব খুশি”।

প্রতিমাসে যদি বেতনের পাঁচভাগের একভাগ করে প্রতি বোনকে আর জামাইদের কাপড় গয়না কিনে দেয়া হয়, যে কোন বোন-জামাই অবশ্যই খুশি থাকবেন।

আমি মুখে হাসি ঝুলিয়ে বললাম, “তাই নাকি?”
“তুমি এরকম করে হাসছ কেন, রৌদ্র? আমি কি মজার কিছু বলেছি?”
আমি এইবার হাসিটা আরেকটু বাড়িয়ে বললাম, “না, দুলাভাই, আপনি হাসির কথা বলবেন কেন? আপনি হলেন সিদ্ধ সুপুরুষ”।

“কি? তুমি আমার সাথে মশকরা কর? ফাজিল, বেয়াদব ছেলে”।
“ছি দুলাভাই, আপনি রেগে যাচ্ছেন কেন? সিদ্ধ সুপুরুষরা রাগে না। তা আপনি কত করে যেন মাসে খরচ করেন আপনার বোনদের পিছনে?”
আজমল কবিরের বোন ২ জন। দুই জনই দেশে থাকেন। কখনো তাদের দেখতে যান না আজমল কবির।

“চো**র পোলা, তুই আমার সাথে মশকরা করিস? তুই জানিস আমি কে?”
“জ্বী, জানি। আপনি আজমল কবির। কিপটের হাড্ডি। মানুষকে টাকা দেন না। মানুষের টাকা খেতে বড় সুখ আপনার”। আমার হাসিটা আরেকটু বিস্তৃত হল।

“মাদা***দ, খা**র পোলা” বলে আজমল কবির তার পাশে হাত দিলেন। ছড়িটা ধরলেন। আমার মাথার উপর তুললেন আমাকে মারবেন বলে। তার হাতটা আমার মাথার উপর এসে আটকে গেল। উনি প্যারালাইজ হয়ে আবার সোফায় বসে পড়লেন।

আজমল কবির হাত নাড়াতে পারছেন না। তার ডানহাত শূন্যে ঝুলে আছে। আমি বসে বসে দেখছি।
বামহাত দিয়ে ডানহাত ধরে নাড়াচাড়ার চেষ্টা করছেন আজমল কবির। আর মুখ দিয়ে অনবরত গালির নিঃসরণ হচ্ছে, “খা***র পুত, আ***র পুত, আমি তরে *দি। তুই আমারে কালা যাদু করছস”।

ডানহাত ওইখানে থাকা অবস্থায় তিনি বামহাতে পকেট থেকে মোবাইল বের করার চেষ্টা করলেন। পারলেন না। আমি আমার মোবাইলটা এগিয়ে দিলাম। তিনি টিপে টিপে একটি নাম্বারে ফোন দিলেন,

“এই রমিজ, উপরে আয়, আমাকে নিয়ে যা”
রমিজ তার ড্রাইভারের নাম। নিচে সিগারেট খেতে গিয়েছিল। ফোন পেয়ে দৌড়ে এল।

“মালিকের কি হইসে রৌদ্র ভাই?”
“তোমার মালিকের প্রেশার বাড়সে। বেশি নাড়াচাড়া করতে গিয়া মাইনর স্ট্রোক করসে। হাত অবশ হয়া গেসে। হাসপাতালে নিয়া যাও”।

রমিজ আজমল কবিরকে ধরে ধরে নিয়ে যাচ্ছে। আজমল কবির চেঁচিয়েই যাচ্ছেন, “মা*র পুত, তোর কালা যাদু আমি ছুটাবো। দাঁড়া। আমি খালি আইসা নেই”।

আমি চেয়ে চেয়ে দেখছি। আমার হাসিটা এখনো মনে হয় আলগোছে ঝুলে আছে। আজমল কবির গাড়িতে করে দৃষ্টির বাইরে চলে গেলেন। আমি গেটটা বন্ধ করে দিলাম।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৩ thoughts on “আজেবাজে কথা এবং একটি চন্দ্রগ্রহণ (পার্ট ২)

  1. ভাষার ব্যবহারে আপনার
    ভাষার ব্যবহারে আপনার মুন্সিয়ানা আছে। বেশ লাগে পড়তে। কিন্তু গল্পের চরিত্রগুলোর পারস্পরিক সম্পর্ক কেমন যেন জট পাকিয়ে ফেললাম। :চিন্তায়আছি:

  2. গল্পের মোড় টা খুব তাড়াতাড়ি
    গল্পের মোড় টা খুব তাড়াতাড়ি চলে এসেছে। গুছিয়ে আনলে ভালো হতো। সার্বিক ভাবে বেশ ভালো লেগেছে! :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ:

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

17 + = 22