এক যুগে ফুলবাড়ি আন্দোলন

“পাইপলাইনে রক্ত যাবে, কিন্তু কয়লা যাবে না।“

হাজার হাজার জমায়েত জনতার মুখে একই কথা। নিরস্ত্র জনতা। ভিটেমাটি, ফসলি জমি থেকে উচ্ছেদের চক্রান্তের বিপরীতে মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়ানো জনতা। দেশের সম্পদ রক্ষা করতে দৃঢ় প্রত্যয়ী জনতা। ২০০৫ সালের ২৬শে আগস্ট, রাষ্ট্র আবারও প্রমাণ দিলো সে শ্রেণী নিরপেক্ষ না, কখনোই হতে পারে না। স্পষ্টতই সে অবস্থান নিলো বুর্জোয়াদের, সাম্রাজ্যবাদীদের। রাষ্ট্রের পেটোয়া বাহিনী চালাল গুলি, নিহত হল নিরস্ত্র সাধারণ মানুষ।

১৯৯৪ সালের ঘটনা, অস্ট্রেলিয়ার কোম্পানিকে ঠিকাদারি দেওয়া হল। ফুলবাড়িতে কয়লার খনি আছে কিনা, থাকলে কি অবস্থায় আছে, কতোটুকু আছে খোঁজ করতে। খোঁজ পাওয়া গেলো। ৫৭২ মিলিয়ন টন কয়লা মজুত আছে। এই খনিটি ৩০ বছরের জন্য লিজ দেয়ার চক্রান্ত চলছিলো। সেজন্য ১৯৯৪ সালে খালেদা জিয়ার প্রথম প্রধানমন্ত্রীত্ব কালে বিএইচপি নামে অস্ট্রেলিয়ার এক কোম্পানির সাথে অনুসন্ধান চুক্তি করে সরকার। পরে ১৯৯৭ সালে ঐ কোম্পানি লিজিং লাইসেন্স এক ব্রিটিশ কোম্পানি এশিয়া এনার্জির কাছে বিক্রি করে। ১৯৯৭ সালে আওয়ামী লীগ শাসনামলে শেখ হাসিনার প্রধানমন্ত্রীত্বকালে সরকারের সাথে এশিয়া এনার্জির চুক্তি হয়। ২০০৫ সালের অক্টোবরে এশিয়া এনার্জি অনুসন্ধানের কাজ সম্পন্ন করে সরকারের কাছে রিপোর্ট পেশ করে। এই রিপোর্ট গৃহীত হলে ওই কোম্পানিকে ৩০ বছরের জন্য উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা খননের জন্য লিজ দেয়া হতো। উত্তোলিত কয়লার পুরোটার (অর্থাৎ পুরো কয়লাখনির) মালিক হতো এশিয়া এনার্জি কোম্পানি। তারা ঐ কয়লা রপ্তানি করার এবং বিক্রি করার অধিকার পেতো। বিনিময়ে বাংলাদেশ পেতো উত্তোলিত কয়লার ৬ শতাংশ মাত্র রয়্যালটি হিসেবে। জ্বি হ্যাঁ। ৬ শতাংশ। ঠিক যেন মগের মুল্লুক। আমার দেশের কয়লা, আমরাই পাবো মাত্র ৬ শতাংশ। ঠিক যেন ব্রিটিশ কলোনির প্রেতাত্মা ঘুরে বেড়াচ্ছে!

আমরা হামেশাই শুনে থাকি, বিএনপি – আওয়ামী লীগের মধ্যে পূর্ণ বিরোধ। কোন মিল নেই। উভয় দলই তাই প্রমাণ করতে চায়। কিন্তু এই ক্ষেত্রে উভয়ে মিলেই দেশের সম্পদ তুলে দিচ্ছিল সাম্রাজ্যবাদী শক্তির হাতে। কিন্তু ওই জনতা চিনে নিয়েছিলও। দেশপ্রেমিক – বামপন্থিদের নিয়ে গড়ে উঠা জাতীয় কমিটির নেতৃত্বে সেদিন দিনাজপুর সহ সারা দেশের মানুষ জেগে উঠেছিলো। শক্ত হাতে তাড়িয়েছিল সাম্রাজ্যবাদিদের। জাতীয় কমিটির এই আন্দোলনে জয়ী হয়েছিলো সমগ্র বাংলাদেশ। এই নিঃস্পৃহ সময়ে যা অনুপ্রেরণার।

এটাই প্রকৃত দেশপ্রেম। ভাবালুতা নয়, বরং দেশের সম্পদ রক্ষার্থে লড়ে যাওয়া। দেশ যদি মাতৃকা হয় তবে তাঁর খনিজ সম্পদ অঙ্গ স্বরূপ। কেউ যদি মায়ের অঙ্গ বিক্রি করতে উদ্যত হয় তার সাজা তাকে দিতেই হবে। এটাই দেশপ্রেম। ফুলবাড়ির সেই সকল বীরকে স্মরণ করছি আজ। সম্পদ রক্ষার লড়াই আজও চলছে। আজ সুন্দরবন বিপন্ন, কাল বঙ্গোপসাগরের গ্যাস ব্লক হবে। লড়ে যেতে হবে প্রাণপণে। কেউ না থাকুক, একা হলেও। এটাই ফুলবাড়ি দিবসের শিক্ষা।

জয় হোক জনতার।
ফুলবাড়ির শহিদদের লাল সালাম।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

54 + = 64