‘ক্লু’

ঠিক হচ্ছে হচ্ছে করেও দেশের রাজনৈতিক অবস্থা কেন যেন ঠিক হচ্ছে না। সরকার মাঝে মাঝে হঠাৎ একটু নমনীয় ভাব দেখিয়েই আবার শক্ত অবস্থানে ফেরত চলে আসছে। বিরোধী দল কি করবে এখনও ঠিক করে উঠতে পারছে না। এলেবেলে হরতাল ডাকলে উপকারের চেয়ে ক্ষতিই বেশী। খুব সফল হরতাল না হলে পাবলিক নাক শিটকায়, ‘বিরোধী দল বেশ চিপায় আছে’। তাই শুধু হরতাল ডাকলেই আজকাল হয় না, জোরপূর্বক হরতাল সফল করাতেও হয়। এর জন্য চাই ডেডিকেটেড ক্যাডার বাহিনী। গ্রেফতারের ঝুঁকি মাথায় নিয়ে ঝাপিয়ে পড়তে হবে ‘গাড়ী ভাংচুর’ ‘হাতবোমা’ আর ‘কক্টেল’ প্রোজেক্টে।
এসব করবার লোক এতদিন পেতে সমস্যা হয় নি। আসলে কিছুদিন আগে পর্যন্তও খেলা সমানে সমানে চলছিল। কখনও সরকার এক কদম এগোয় তো কখনও বিরোধী দল জয়ের দ্বারপ্রান্তে চলে আসে। ফলে এই কয়দিন বিরোধী দলের হয়ে জ্বালাও পোড়াও করলে কিছুদিন পরে কিছু টেন্ডার জুটবে এমন ভরসায় লোক পেতে সমস্যা হচ্ছিল না। সাবধানী গ্রুপটা অন্য চিন্তা করছে। বিরোধী দলের ক্ষমতায় আসার ব্যাপারে তাঁরা খুব নিশ্চিত হতে পারছে না। তাই বিরোধী দলের হয়ে কামলা খাটবে না সরকারী দলের নৈকট্য লাভের চেষ্টা করবে সেই সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না। ওদিকে সাংবাদিক সম্মেলন করার জন্যও চাই বড় মাপের নেতা, তাঁরাও প্রায় সকলে চৌদ্দ শিকের পেছনে।
কেন যেন মনে হচ্ছে এর জন্য দায়ী আমরা অর্থাৎ জনগণ। আমরাই সব সময় ক্লু খুঁজে বেড়াই, ‘এই খেলায় কে জিতছে’। এই আন্দোলন এবং আন্দোলনের বিরুদ্ধে সরকারের কঠোর অবস্থানের মূল কারণ হচ্ছে ‘জনগণ কি ভাববে’। এর ওপর ভিত্তি করেই দুই দলই তার অবস্থান ঠিক করছে। সরকার ছাড় দিতে ভয় পাচ্ছে, জনগণ ভাববে সরকার দুর্বল হয়ে গেছে তাই বিরোধী দলের দাবী মেনে নিচ্ছে। আর বিরোধী দল আন্দোলন না করলে জনগণ ভাবে, ‘বিএনপি দল হিসেবে শেষ। একটা সমাবেশ করারও সাহস নাই।‘ তার চেয়েও বড় কথা নির্বাচন এখনও বেশ কিছু দূরে। ফলে এখনই সমঝোতা কেউই চাচ্ছে না। একে অপরকে তিরস্কার করে কথা না বললে কেন যেন দুর্বল মনে করে সবাই।
আমার সবচেয়ে মজা লাগে ‘হুঁশিয়ার’ করার স্বভাব টা। কোন খেলার সবচেয়ে উপকারী ব্যাপার তো হচ্ছে বিপক্ষের ভুল। দাবা খেলায় যেমন একটা ভুল চাল পুরো খেলার মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে, তেমনি সরকার কিংবা বিরোধী দলের ভুল তো অপর পক্ষের জন্য আশীর্বাদ। তারপরও চলে, ‘আমাদের দাবী না মেনে সরকার ভুল করছে’। সরকার যদি শুধরে যায়, তবে কি তা অপর পক্ষের জন্য ভালো ঘটনা? মজা হচ্ছে অন্য জায়গায়। ভুল শুধরালেই বলা হবে, ‘আমাদের হুমকিতে সরকার ভয় পেয়েছে। এই সরকার দুর্বল।‘
দুর্বল সবল প্রমানের এই খেলায় আসলে বিরোধী দল বুঝে উঠতে পারছে না ঠিক কোন রাস্তায় গেলে সাপ ও মরবে আর লাঠিও ভাঙবে না। যদিও জামায়াত এর জন্য তাঁদের প্রাণ কাঁদছে তারপরও তা সরাসরি দেখাতে যাওয়ার কিছু সমস্যা আছে। কিছু ভোট কাটা পড়তে পারে। তাই ‘পাখি হত্যা’ ফর্মুলার আমদানী করে সমর্থন দেয়ার চেষ্টা হল। যুগপদ কিছু হরতাল হল। আগ্রাসী এসব হরতালে বেশ কিছু লাশ পড়ল। প্রচুর সমালোচনা হল। লাশের ভিতর কিছু শিশু, নারী থাকায় বহির্বিশ্বে একটু প্রচারণায় পেল। উৎসাহ আরও বেড়ে গেল। এসবই কিছুদিন আগের ঘটনা। বিরোধী দল তখন ‘জিতছে’ অবস্থানে।
এমন সময় হঠাৎ কথা থেকে হেফাজতের উত্থান হল। ‘নাস্তিক’ ফর্মুলার আমদানী করে বিশাল সমাবেশ করে সবাইকে চমকে দিল। বিশাল সমাবেশের সঙ্গে বনাস হিসেবে কিছু জ্বালাও পোড়াও হল। সরকার তখন গণজাগরণ মঞ্চের সফলতা নিজের পকেটে ঢুকাতে ব্যস্ত। তাই ‘গণজাগরণ মঞ্চে’র চেয়ে বড় একটা সমাবেশ দেখে সরকার কিছুটা ভড়কে গেল। তাদেরকেও দলে টানা যায় কি না ভাবতে বসল। সমাবেশের আকার দেখে উৎসাহিত বিরোধী দল ‘পাশে দাঁড়াতে’ আগ্রহী হয়ে উঠলো। হেফাজতকে ঠাণ্ডা করতে, অবস্থা বেগতিক দেখে সরকারী দল, মৃদু কণ্ঠে ‘আলোচনা’ ‘সংলাপ’ এমন সব কথা বার্তা বলতে শুরু করল। মনে হল সরকার ভয় পেয়েছে কিংবা সমাবেশের বিশালতা দেখে একটু নরম সুরে কথা বলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। জনগণ এসবের ভেতর ক্লু খুঁজে নিল ‘সরকার ব্যাকফুটে’।
এমন সময় ঘটলো রবিবার রাতের ‘ক্র্যাক ডাউন’। ‘হেফাজত বাহিনী’ এতো সহজে রণে ভঙ্গ দিবে তা বোধহয় সরকার নিজেও ভাবে নি। তার চেয়েও বড় আশীর্বাদ হয়ে দাঁড়ালো তাঁদের ভীরু পলায়ন। বড় বড় বক্তৃতা আর হুংকার এর পরে এতো সহজে এলাকা খালি করায় ‘হেফাজত বাহিনী’কে নিয়ে তৈরি হওয়া উচ্চাকাঙ্ক্ষাও ধুলিস্যাত হয়ে গেল। এরপর পরই এলো আরও একজনের রায়। নিয়ম রক্ষার একটা হরতাল হবে জানা ছিল। উৎকণ্ঠা নিয়ে সবাই অপেক্ষা করছিল ‘হরতাল’ টা কেমন হয়। টিপিক্যাল জামায়াত প্যাটার্নের আগ্রাসী হরতাল না ঢিলেঢালা। ‘ক্লু’ পেয়ে গেল সবাই।
‘হেফাজত বাহিনী’ আবার সংগঠিত হতে পারবে কি না বোঝা যাচ্ছে না। আর হলেও, আগের সেই ইম্প্যাক্ট তৈরি করতে পারবে কি না? ‘পানি সমর্থন’ আর ‘পাশে দাঁড়ানো’ সমর্থন পাবে কি না? জামায়াতের পরবর্তী পদক্ষেপ কি হবে? তাঁদের মূল নেতার রায় যেকোনো সময়ে। সেই রায়ের পরে দারুণ আগ্রাসী কিছু না করতে পারলে আবার তাঁদের জাত যাবে। ওদিকে তেমন আগ্রাসী কোন আন্দোলন করলে সেটায় সমর্থন দেয়া আবার বিরোধী দলের জন্য কিছুটা অস্বস্তিকর। বিশেষ করে এখন জনগণ একটু ‘জ্বালাও পোড়াও’ অ্যালার্জিতে ভুগছে।
সব মিলিয়ে সরকার বেশ আরামেই আছে। নরম সুরে কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছে। প্রথমটায় মনে হয়েছিল অন্তর্বর্তী কালীন সরকারের প্রধান কে হবে সেখানে হয়তো ছাড় দিবে। এখন হাব ভাব দেখে মনে হচ্ছে তাও করবে না। বিরোধী দল সেনা শাসন চাইবে? না প্রভু দেশের হস্তক্ষেপ চাইবে? ঠিক করতে পারছে না। আবার কিছু একটা আন্দোলন না করলে সরকারও কথা কানে তুলবে না। জনগনই বা কি ভাববে? একটা নেগেটিভ ‘ক্লু’ পেতে পারে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার আসলে সুশীল সমাজ বেশ কিছুদিন লাইম লাইটে থাকে। তাই এমন কিছু আসলে তাঁদের অনেক সময় শিকে ছেড়ে। এই আশায় তাঁরাও টক শো মাতিয়ে রাখছেন। খেলা কোন দিকে মোড় নিবে তা এখনও বোঝা যাচ্ছে না। সবাই এই সময় বিভিন্ন ভাবে ক্লু খোঁজে। আমেরিকান কিংবা ভারতীয় রাষ্ট্রদূত এর বক্তব্যে কিংবা জরিপে। টক শোতে কিংবা বিদেশী সংবাদ মাধ্যমে এদেশ সম্পর্কে রিপোর্টে। সবকিছুর ভেতরই লুকিয়ে আছে ‘ক্লু’।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

২ thoughts on “‘ক্লু’

  1. আমার অভিমতঃ
    ১) সরকার যদি

    আমার অভিমতঃ
    ১) সরকার যদি সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক কোন পন্থা অবলম্বন বা সংবিধান সংশোধনের কোন পন্থা অবলম্বন করেন তাহলে সরকারকে পাবলিক দুর্বল ভাববে ফলে সরকারি দলের জনপ্রিয়তা কমে যাবে।
    ২) বিরোধী দল যে তত্বাবধায়ক সরকারের জন্য আন্দোলন করছেন সেটা আদায় করতে পারলে তাদের ক্ষমতায় যাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল হবে বলে তাদের বিশ্বাস ! প্রকৃত পক্ষে পাবলিক কি করবে সেটা এখনও পরিস্কার না।
    পরিশেষে বলতে চাই, বিশ্বের অন্যান্য গণতান্ত্রিক দেশে যেভাবে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় সেভাবেই আগামি নির্বাচন হওয়া উচিত ! অন্যথায় ২০০৭ সালের মত সেনা সমর্থিত সরকার আসার সম্ভাবনা প্রবল থাকবে এবং সরকারের মেয়াদ শেষে ক্ষমতা হস্তান্তরের সময় দেশের অস্থিতিশীল পরিস্থিতির অবতারণা হওয়ার সম্ভাবনা থেকেই যাবে…

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

68 − 61 =