আশ্রয় না দিলে রোহিঙ্গারা যাবে কোথায়

যখন কোন মানুষের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি থাকে না, তখন তাঁর চেয়ে অসহায় মানুষ পৃথিবীতে দ্বিতিয়টি পাওয়া যায় না। উদ্ভাস্তু মানুষদের জন্য আইন কোন ধরণের সহায়তা দেয় না, যেটুকু দেয় সেটুকু হচ্ছে নানান রকম বাধা। কাজ করতে গেলে বাধা, কিছু শিখতে গেলে বাধা, লড়তে গেলে বাধা। বাধা দেয়া ছাড়া উদ্ভাস্তুর জন্য আইন আর কোন কাজ করতে পারে না।

?itok=JUSZxhT1″ width=”512″ />

১৯৬২ সন থেকে রোহিঙ্গাদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি কেড়ে নেয়া হয়েছে। এরা নিজ দেশেই, নিজ ভূ-খন্ডেই, নিজ মাতৃভূমিতেই উদ্ভাস্তু জীবন যাপন করছে এরপর থেকে। রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি না থাকায়, এদের নেই ন্যুনতম নাগরিক অধিকার। আইন এদেরকে নিপীড়ন ছাড়া আর কোন ধরণের সহায়তা দেয়নি, নাগরিকত্ব নেই এমন কাউকে সহায়তা দেয়ার কথাও না।

আইন বিহীন জনপদে অপরাধ প্রবণতা বাড়বে এটা তো স্বাভাবিক ব্যপার। আইন ছাড়া সমাজ আর মাতসান্যায়ে তো কোন পার্থক্য থাকার কথা না। প্রায় পঁচিশ লক্ষের মত জনগোষ্ঠীর রোহিঙ্গা জনপদের লোকজনের কাছ থেকে আইনি পরিবেশ আশা করাটাও বাতুলতা। প্রায় একটা প্রজন্ম যদি আইনি পরিবেশ ছাড়া বেড়ে উঠে, আইনের সাথে তাদের পরিচয়ই না ঘটে তাহলে তাদের কাছ থেকে স্বাভাবিক আইনি আচরন আশা করাটা এক ধরণের অলীক-কল্পনা ভিন্ন কিছু নয়।

আবার নির্বাসিত রোহিঙ্গাদের যারা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে, তাদের জীবনে তাক করে রাখা বন্দুকের নলটাই শুধু আড়াল হয়েছে, এছাড়া এদের জীবনে আর কোন পরিবর্তন হয়নি। এরা এখনো এদেশে অবৈধ মানুষ ছাড়া আর কিছুই নয়।

বৈধ-অবৈধতার সীমায় জীবন তো আর থেমে থাকে না, থেমে থাকে না জীবনের প্রয়োজন, যে করেই হোক জীবনের জন্য করতে হয় জীবিকার আয়োজন। ফলে, স্বভাবতই এই পাঁচ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে জড়িয়েছে নানা অবৈধ কার্যকলাপে, অবৈধতা ছাড়া তাদের জন্য বৈধ কোন পথও তো খোলা নেই। এরা বাংলাদেশের জন্য সমস্যার সৃষ্টি ছাড়া ভিন্ন কোন কিছু দিতে পারেনি। উদ্ভাস্তু জনগোষ্ঠীকে পুনর্বাসনের কোন ধরণের চিন্তা না করে শুধু আশ্রয় দিলে এই ধরণের সমস্যা তৈরী হওয়াটা খুব স্বাভাবিক ব্যপার।

রিফিউজি কনভেনশনে স্বাক্ষর করা বিশ্বের আটাশটি দেশ রিফিউজিদেরকে আইনি স্বীকৃতি দিয়েছে ১৯৫১ সনে। কিন্তু এদের মধ্যেও হাতে গণা কয়েকটি দেশে ব্যতিত আর কেউ রিফিউজিদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা নিতে নারাজ। হয়ত দেশগুলোর নিজেরাই সমস্যায় জর্জরিত, অন্যদেরকে সহায়তা করার সময় কই? আর যারা সহায়তা করছে, তাঁরা ষোল আনাই করার চেষ্টা করছে, যেন উদ্ভাস্তুরা সত্যিকার অর্থেই পুনর্বাসিত হতে পারে, মিশে যেতে পারে মূল স্রোতে।

২৫ ধরে তো রোহিঙ্গাদেরকে আশ্রয় দিয়েই রাখা হয়েছে, ফেরত পাঠানো কিংবা পুনর্বাসনের কোন ধরণের ফলপ্রসু চেষ্টা করা হয়নি। ফলে সমস্যা সৃষ্টি ছাড়া এরা আর কিছু করেনি, যা আমাদের কাছে অপ্রত্যাশিত হলেও স্বাভাবিক।

আরেকটা কথা যেনো আমরা ভুলে না যাই, সিরিয়া ক্রাইসিসের সময় এক সাথে দশলক্ষাধিক শরণার্থিকে আশ্রয় দিয়েছিল জার্মানি। এই বৃহৎ সংখ্যার জনগোষ্ঠীর শরণার্থীদেরকে আশ্রয় দিতে গিয়ে জার্মানী যেসব সমস্যা বর্তমানে মোকাবেলা করছে, স্বয়ংসম্পুর্ন ও উন্নত একটা রাষ্ট্র হওয়ার পরেও তা তাদের জন্য গলার কাটার মতই ঠেকছে। যে জার্মান নাগরিকেরা “ওয়েলকাম রিফিউজি” প্লেকার্ড হাতে নিয়ে রাস্তায় নেমেছিল, ওরাই এখন বলছে “এনাফ ইজ এনাফ, গো ব্যাক রিফিউজিস”।

মানবতাবোধ দেখাতে গিয়ে বাংলাদেশ যদি এখন নতুন করে আরও রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে আশ্রয় দেয়, তাহলে আজকে যারা আশ্রয়ের জন্য কন্ঠ তুলছেন, তারাও যে কাল এনাফ ইজ এনাফ বলে রোহিঙ্গাদের উপর ঝাপিয়ে পড়বেন না, তাঁর নিশ্চয়তা কোথায়? এমনিতেই পাঁচ লক্ষ রোহিঙ্গার কারণে কক্সবাজারসহ গোটা পার্বত্য চট্টগ্রামে দিনের পর দিন সমস্যা বেড়েই চলছে। নতুন করে আবার আশ্রয় দিতে গেলে তা যে গোদের উপর বিষফোড়া হয়ে দেখা দেবে না, তার নিশ্চয়তা কোথায়?

আর একবার আশ্রয় দিয়ে দিলে তাদেরকে ফেরত পাঠানো যে কি জটিল তা বাংলাদেশে আটকে পড়া পাকিস্তানিদের দিকে তাকালে সহজেই বুঝতে পারবেন।

তাই, হুজুগে শুধু আশ্রয় দাও, আশ্রয় দাও বলে গলা না ফাটিয়ে বাংলাদেশ সরকারের উপর চাপ সৃষ্টি না করে আন্তর্জাতিকভাবে সমাধান করার জন্য গলা বাড়ান। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ভূমিকা রাখতে পারেন এমন আন্দোলন গড়ে তুলুন। তাতে যদি মায়ানমার সরকার বাধ্য হয় রোহিঙ্গাদেরকে তাদের নাগরিক অধিকার ফিরিয়ে দিতে। জাতিসংঘকে ভূমিকা রাখার জন্য চাপ তৈরিতে আন্দোলন গড়ে তুলুন।

হ্যাঁ, যারা বর্তমানে নো-ম্যানস ল্যান্ডে আছে, তাদের জন্য বাড়িয়ে দিন সহায়তার হাত, ওখানে পাঠান রেড-ক্রস (সরি মুসলমানদের তো আবার রেড-ক্রিসেন্ট)। ব্যক্তিগতভাবে ফান্ড সংগ্রহ করে পাঠাতে পারেন নো-ম্যানস ল্যান্ডে। অতি মানবতা দেখাতে গিয়ে পুনর্বাসনের চিন্তা না করে শুধু আশ্রয় দাও, আশ্রয় দাও বলে চেচালেই সমস্যার সমাধান হবে না, এতে এই রোহিঙ্গারা কড়াই থেকে উনুনেই পড়বে, আর তা সমস্যার কারণ হয়ে উঠবে অদুর বাংলাদেশের।

আসুন, শুধু আশ্রয় দাও, আশ্রয় দাও বলে চিৎকার না করে রোহিঙ্গাদেরকে যে আন্তর্জাতিকভাবে সহায়তা করা হয় সেই দাবী তুলি, সাথে তাদের নাগরিকত্ব যেন ফিরিয়ে দেয়া হয় সেই দাবীতে সোচ্চার হই, কাঁপিয়ে দিই আন্তর্জাতিক অংগন।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

১ thought on “আশ্রয় না দিলে রোহিঙ্গারা যাবে কোথায়

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

30 − = 25