ইসলামে তালাক ও আমাদের দৃষ্টিভঙ্গী

ভালকে ভাল আর মন্দকে মন্দ বলা সত্যবাদীতার পরিচয়। কিন্তু ভাল মন্দে মিশ্রীত কোনো কিছু হলে সেটাকে আমরা বিচার করি কীভাবে? কথায় আছে, এক মণ ঘি এর মাঝে এক ফোটা কেরোসিনই যথেষ্ঠ এক মণ ঘিকে দোষীত প্রমাণ করে দিতে। আর সেই ঘি যে, কেউ কেরোসিনের দামেও কিনবেনা তা বলারই অপেক্ষা রাখেনা। ইসলামের ধর্মগ্রন্থ কোরান-হাদিস সহ অন্যান্য সকল ধর্মগ্রন্থেও এ রকম অনেক কথা বা বাণী আছে যার কিছু ভাল আর কিছু খারাপ। তবে যে সকল ভাল কথা ধর্মগ্রন্থ রচনাকারীগণ বা ধর্মপ্রবর্তকগণ মানুষকে শুনিয়েছেন তা কিন্তু নতুন কিছু নয়, মানুষ এর আগে থেকেই তা জানতো এবং মানতো। হাজার হাজার বছর যাবত ধর্মগ্রন্থ চুরি করা পাপ, মিথ্যা বলা পাপ বলে এসেছে, তাই বলে কেউ মিথ্যা বলা আর চুরি করা ছেড়ে দেইনি, তা যত বড়ই পরকালের শাস্তির ভয় দেখানো হউক না কেন। মানুষের খাদ্য ও যৌন চাহিদা বা লোভের কাছে পরকাল আল্লাহ রাসুল বেহেস্ত দোজখ খুবই তুচ্ছ। ইসলাম ধর্ম যে মানবিকতা আর নৈতিকতা শিক্ষায় চরম ব্যর্থ তার প্রমাণ ইসলামি রাষ্ট্রগুলো ও মুসলিম সমাজ। কথাটা অন্যান্য ধর্মবাদী সমাজ বা রাষ্ট্রের বেলায়ও প্রযোজ্য। এ নিয়ে প্রচুর যুক্তি তর্ক হয়েছে আজ সেদিকে যাবোনা।

আজ ইসলামের ভাল একটি দিক নিয়ে কিছু আলাপ করতে চাই। তার আগে হাদিসগ্রন্থ নিয়ে আমার মতামতটা জানিয়ে দেই। আমি মনে করি, মুহাম্মদের মৃত্যুর প্রায় তিন শত বৎসর পরে রচিত হাদিস গ্রন্থগুলোর প্রচুর হাদিস কিছু কামুক পার্ভার্টেড বদমায়েশ লোকের দ্বারা রচিত এবং মিথ্যা। তিন শত বছর অনেক দীর্ঘ সময়। এতোদিন একটা মিথ্যা চর্চা করলে তা সত্য বলে মানুষ বিশ্বাস করতেই পারে। তেমনি দুটো পরিচিত হাদিস হলো; (১) ‘সুদূর চীন দেশে গিয়েও বিদ্যা অর্জন করো’ (২) স্বামীর চরণতলে স্ত্রীর বেহেস্ত’। অথচ এগুলো কোনো হাদিসই নয়। কিন্তু আমাদেরকে তা বিশ্বাস করতেই হয় যেহেতু হাদিসগুলো মুহাম্মদের নামেই মুহাম্মদের সাহাবীদের হাতের লেখা এবং ১৫ শো বছর যাবত ইসলামী স্কলাররা এর কোনো প্রতিবাদ করেন নি। চুল পাকনা বুড়োরা দুনিয়ায় নারী খুঁজে পেতেন না, তারা ১৮ বছরের বিধবা সুন্দরী যুবতি আয়েশার কাছে যেতেন সঙ্গম আর গোসলের ফতোয়া জানতে। নবির সাথে আয়েশা সঙ্গম কেমনে করতেন, সঙ্গমের পরে কাপড়ে লাগা শুকনো বীর্য নখ দিয়ে তিনি খুঁটে খুঁটে কীভাবে সাফ করতেন, কীভাবে আয়েশা গোসল করতেন সব তারা লিখে রেখেছেন হাদিসে। বোখারি ও মুসলিম শরিফ থেকে কিছু হাদিসের নমুনা দেখা যাক;

‘নবি মুহাম্মদের স্ত্রী হজরত মায়মুনা (রাঃ) বলেছেন: ‘সঙ্গম-পরবর্তী স্নানকালে আল্লাহর রসুল প্রথমে নামাজের জন্যে ওজুর (ablution) মতো ওজু করতেন, তবে পা ধুতেন না। অতঃপর তাঁর পুরুষাঙ্গে স্খলিত বীর্যের দাগ ধুয়ে সাফ করতেন, তারপর সারা দেহে জল ঢালতেন এবং সবশেষে অন্যত্র সরে গিয়ে পা ধুতেন। এটাই ছিল নবির সঙ্গম-পরবর্তী স্নানের নিয়ম।’ (দ্রষ্টব্য: বোখারি শরিফ, ভলিউম ১, বুক ৫, নম্বর ২৪৯)।

হজরত আয়েশা (রাঃ) বর্ণনা করেছেন: ‘একজন লোক নবিকে জিজ্ঞেস করেন, কোনো ব্যক্তি যদি তার স্ত্রীর সাথে সঙ্গম করে এবং বীর্যপাতের আগেই তার পুরুষাঙ্গ সরিয়ে নেয়, তাহলে তার উপর কি গোসল ফরজ হয়। (বিবি আয়েশা তখন নবির পাশেই বসা ছিলেন) নবি উত্তর দিলেন আমি আর আয়েশা তা করি, অতঃপর আমরা গোসল করি।’ (দ্রষ্টব্য: মুসলিম শরিফ, চ্যাপ্টার ২১, বুক ৩, নম্বর ৬৮৫)। ( বুঝা গেল নবি আয়েশার সাথে সঙ্গম কালে বীর্য বের হওয়ার আগেই তার শ্লীশ্ন সরিয়ে নিতেন। আর ১৪/১৫ বছরের যুবতি আয়েশাকে মাঝে বসিয়ে তারা এ সব বিষয় নিয়ে মিটিং করতেন।)
Muslim Shareef, Book 003, Number 0685:
‘A’isha the wife of the Apostle of Allah reported. A person asked the Messenger of Allah (may peace be upon him) about one who has sexual intercourse with his wife and parts away (without orgasm) whether bathing is obligatory for him. ‘A’isha was sitting by him. The Messenger of Allah said: I and she do it and then take a bath.
হজরত আবু সালামাহ (রাঃ) বলেছেন: ‘অমি আর আয়েশার (বৈমাত্রীয়) ভাই একদিন আয়েশার কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, নবি গোসল করতেন কিভাবে-কোন নিয়মে? হজরত আয়েশা (গোসলের নিয়ম দেখাতে) এক বালতি জল নিয়ে আসলেন। যখন তিনি নিজের মাথায় জল ঢাললেন তখন তাঁর আর আমাদের মাঝখানে পর্দা ছিল।’ (দ্রষ্টব্য: বোখারি শরিফ, ভলিউম ১, বুক ৫, নম্বর ২৫১)।

(পর্দার আড়ালে থেকে নিজের শরীরে জল ঢেলে দুই পুরুষকে বিবি আয়েশার এই ‘স্নান শিক্ষা’ প্রদান এক অভিনব অত্যাশ্চার্য ঘটনাই বটে।)

হজরত আবু মুসা (রাঃ) বলেছেন: ‘সঙ্গম-পরবর্তী গোসল নিয়ে একবার একদল মোহাজির (মক্কার শরণার্থী) ও আনসারদের (মদিনাবাসী) মধ্যে তুমুল তর্ক শুরু হয়। আমি বললাম, তোমাদের সমস্যার সমাধান নিয়ে আসছি। এই বলে আমি বিবি আয়েশার কাছে চলে গেলাম। তাঁকে বললাম, মা, আমি তোমার কাছে এসেছি এমন কিছু জিজ্ঞেস করতে যা বলতে আমার লজ্জা হচ্ছে। আয়েশা (রাঃ) বললেন, লজ্জার কিছু নেই, তোমার মাকে যা জিজ্ঞেস করতে পারো আমাকেও তা জিজ্ঞেস করতে পারো। আমি বললাম, কোন্ ব্যক্তির উপর স্নান করা ফরজ (অবশ্যই করণীয়) হয়? বিবি আয়েশা জবাব দিলেন, যে ব্যক্তি কোনো মহিলার গুপ্তাঙ্গের সম্মুখে বসে তার পুরুষাঙ্গের খৎনাংশ (Circumcised parts) মহিলার গুপ্তাঙ্গে লাগালেই গোসল ফরজ হয়ে যায়।’ (দ্রষ্টব্য: মুসলিম শরিফ, চ্যাপ্টার ২১, বুক ৩, নম্বর ৬৮৪)।

যখন মাদ্রাসায় পড়তাম এই সমস্ত হাদিস আমাদের ফিকহের বা মাসালা মাসায়েল জামাতে (ক্লাসে) হাদিস থেকে উদৃতি দিয়ে পড়ানো হতোনা। আমাদের জামাতে ফারসি ভাষায় লেখা ফিকহের কিতাব যিনি পড়াতেন তিনি সম্পর্কে আমার নানা ছিলেন। অত্যন্ত রসিক মনের সদা হাস্যমূখী মানুষ ছিলেন তিনি। ক্লাসে বাহিরের কিতাবের চেয়ে তার নিজের ভেতরের কিতাবই পড়াতেন বেশি। একদিন নানা হুজুর ক্লাসে তালাকের ফতোয়া পড়াতে এসে বললেন, ‘তোমাদেরকে আজ প্রথমেই একটি গল্প শুনাবো’। গল্পটি ছিল এ রকম; আদম (কাল্পনিক নাম) আর হাওয়ার ভালবাসা ছিল কায়েস আর লায়লার প্রেমকাহিনির মতো। তারা দুজন একই গ্রামের বাসিন্দা ছিল। একই মক্তবে একই ওস্তাদের কাছে আরবি পড়তো আর সেখান থেকে তাদের ভালবাসার শুরু। লায়লা আর কায়েসের পরিবারের মতোই আদম আর হাওয়ার পরিবারের মধ্যে দীর্ঘদিনের শত্রুতা ছিল। আদম আর হাওয়ার প্রেম যখন জানাজানি হয়ে গেল, হাওয়ার পিতা হাওয়াকে গৃহবন্দি করে ফেললেন। এক পর্যায়ে তারা উভয়েই তাদের মাতা পিতাকে জানিয়ে দিল যে তারা আত্মহত্যা করবে যদি তাদের ভালবাসাকে স্বিকৃতি না দেয়া হয়। বাধ্য হয়ে উভয় পরিবার বিয়েতে সম্মতি জানালেন। কিন্তু ভেতরে পারিবারিক শত্রুতা আগের মতোই রইলো। উল্লেখ্য, আদম হাওয়ার বিয়েতে আকদ পড়িয়েছিলেন তাদের ওস্তাদ মক্তবের হুজুর।

হাওয়া যখন বাপের বাড়ি বেড়াতে যায়, তার আত্মীয়রা বিশেষ করে তার বড় ভাই, আদমের জাতপাত আর্থিক অবস্তার কথা তার কানে শুনিয়ে দেন। একদিন আদম রুজি রোজগারের উদ্দেশ্যে বিদেশ যাওয়ার প্রস্তুতি নেয়। যাবার প্রাক্ষালে সে তার স্ত্রী হাওয়াকে পরিবারের সকলের সামনে বলে যায়, ‘আমার অনুপস্থিতে তুমি যদি তোমার বাপের বাড়ি যাও, তোমার তালাক হয়ে যাবে’। দু’মাসের মাথায় হাওয়ার পিতা বার্ধক্যজনিত কারণে ইন্তেকাল ফরমান। পিতার মৃত্যু সংবাদ পেয়ে হাওয়া আগপিছ কিছু না ভেবেই তার বাপের বাড়ি দৌড় দেয়। পিতার দাফন কাফন শেষে হাওয়া যখন স্বামীর বাড়ি ফিরে আসলো, তার শশুর শাশুড়ি বাড়ির কেউ তাকে গ্রহণ করতে রাজি হলোনা। হাওয়া তার বাপের বাড়ি ফিরে যায়। ইতোমধ্যে সংবাদটা আদমের কানেও পৌছে যায়। আদম বাড়ি চলে আসে। হাওয়াকে বাড়িতে না দেখে অস্থির মনে আদম তার শশুড় বাড়ি গেল, কিন্তু কেউ তাকে পাত্তাই দিলনা। গ্রামে জানাজানি হয়ে যায়, আদম হাওয়াকে তালাক দিয়ে দিছে তাদের ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে। পাগলপ্রায় অসহায় আদম কোনো উপায় খুঁজে পায়না। একদিন সে তার মক্তবের ওস্তাদের কাছে গিয়ে পায়ে পড়ে মিনতি জানায় ‘হুজুর আমাকে বাঁচান, হাওয়াকে ছাড়া আমি বুকে ছুরি দেবো’। হুজুর বলেন ‘আত্মহত্যা মহাপাপ ব্যাটা তুমি তা করতে যাবেনা’ তুমি বাড়ি যাও দেখি আমি কোরান হাদিস খোলে এর ফয়সালা কী দেয়া আছে।
এখানে মক্তবের হুজুরের কিছু পরিচয় জেনে নেয়া যাক। এই হুজুর শুধু মক্তবের সাধারন একজন ওস্তাদ নয়, তিনি বিজ্ঞ একজন আলেম, রাজনীতিবীদ, ইসলামী চিন্তাবিদ, বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনে সামনের কাতারের সৈনিক ছিলেন, সাত গ্রামে সুপরিচিত একজন দক্ষ বিচারক। লোকে তাকে কাজী সাহেব বলে ডাকে। মক্তবটি তার নিজের বাড়িতে গড়ে তুলেছেন, নিজের টাকায় পরিচালনা করেন, ছাত্ররা বিনে পয়সায় এখানে পড়ে।

হুজুর গ্রামের মুচি রমেশ চন্দ্রকে ডেকে এনে বললেন, ‘আগামী কাল গ্রামের বাজারে ঘোষণা দিয়ে দাও, শুক্রবার বাদ জুম্মা মসজিদ প্রাঙ্গনে জমায়েত আছে’। রমেশ পরের দিন প্রফুল্লচিত্তে কেরোসিনের টিনের বাক্সে জোরেসুরে আওয়াজ তোলে এলান করে দেয় ‘আগামীকল্য রোজ শুক্রবার কাজী বাড়ির কাজী সাহেবের উদ্যোগে বড় মসজিদে বাদ জুম্মা পাঞ্চায়েত বসিবে, সকলকে উপস্থিত থাকিবার জন্যে অনুরুধ করা যাইতেছে’।

কানাঘুষার মাধ্যমে বিষয়বস্তু সকলেরই জানা হয়ে গেছে। কাজি সাহেবের অনুররোধে আদম ও হাওয়াকেও সভায় উপস্থিত করা হলো। কাজি সাহেব বললেন ‘স্বামী স্ত্রীর মধ্যে তালাক হয়ে গেলে একসাথে বসবাস করা বড় গোনাহের কাজ, আর সহবত করলে তা হবে জেনা, কবিরা গোনাহ, জাহান্নামের আগুনের শাস্তি ছাড়া এই গোনার মাফ নাই’। হাওয়ার পরিবারের মানুষের চোখে মুখে এক ঝিলিক হাসি ফুটে উঠলো, একে অপরের দিকে চোখ টিপলেন। আর এদিকে আদম তার বুকের পাজড়ে যেন এক পাহাড়সম পাথরচাপা অনুভব করলো। কাজি সাহেব বললেন ‘ কিন্তু, যদি তালাক ইসলাম সম্মত না হয় আর এই তালাকের সাক্ষী যারা হবেন বা তালাককে জায়েজ বলে যারা বিশ্বাস করে নিবেন তারা সকলেই পাপের ভাগি হবেন’। সবাই বলাবলি করলো, কাজি সাহেব তো ঠিক কথাই বলেছেন। কাজি সাহেব হাওয়ার বড় ভাইকে জিজ্ঞেস করেন ‘তোমার বাবার মৃত্যুর পরে এই বাড়ির মালিক কে’? হাওয়ার বড় ভাই উত্তর দেন ‘আমি হুজুর’। কাজি সাহেব বলেন ‘তাহলে আদমের তালাক সঠিক হয় নাই, হাওয়া তার বাপের বাড়ি যায় নাই গিয়েছিল ভাইয়ের বাড়ি। হাওয়াকে তার স্বামীর কাছে ফিরিয়ে দেয়া হউক, অন্যতায় গ্রামশুদ্ধ সকলের পাপ হবে’।

আমি সেদিন ক্লাসে নানা হুজুরকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, আদম হাওয়ার সেই তালাক নিয়ে। নানা বললেন, হাওয়া যদি স্বামীর অনুপস্থিতে তার পিতা জীবিতকালেও সেই বাড়িতে যেতো তবুও তাদের তালাক হতোনা। আমি জিজ্ঞেস করলাম, কেন নানা? তিনি বললেন, এক তালাকে তালাক তো হয়ই না, এমন কি এক সাথে তিন তালাকেও তালাক হয়না। এরপর নানা হুজুর আমদেরকে তালাকের সবক শেখালেন যতটুকু না কোরান আর হাদিস থেকে তার চেয়ে বেশি যুক্তি ও বিবেক বা কেয়াসের আলোকে। হুজুর বললেন; ‘তালাক’ নামে কোরানে একটি সুরা লেখা আছে যেমন;

يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ إِذَا طَلَّقْتُمُ النِّسَاء فَطَلِّقُوهُنَّ لِعِدَّتِهِنَّ وَأَحْصُوا الْعِدَّةَ وَاتَّقُوا اللَّهَ رَبَّكُمْ لَا تُخْرِجُوهُنَّ مِن بُيُوتِهِنَّ وَلَا يَخْرُجْنَ إِلَّا أَن يَأْتِينَ بِفَاحِشَةٍ مُّبَيِّنَةٍ وَتِلْكَ حُدُودُ اللَّهِ وَمَن يَتَعَدَّ حُدُودَ اللَّهِ فَقَدْ ظَلَمَ نَفْسَهُ لَا تَدْرِي لَعَلَّ اللَّهَ يُحْدِثُ بَعْدَ ذَلِكَ أَمْرًا

‘হে নবী, তোমরা যখন স্ত্রীদেরকে তালাক দিতে চাও, তখন তাদেরকে তালাক দিয়ো ইদ্দতের প্রতি লক্ষ্য রেখে এবং ইদ্দত গণনা করো। তোমরা তোমাদের পালনকর্তা আল্লাহকে ভয় করো। তাদেরকে তাদের গৃহ থেকে বহিস্কার করো না এবং তারাও যেন বের না হয় যদি না তারা কোন সুস্পষ্ট নির্লজ্জ কাজে লিপ্ত হয়। এগুলো আল্লাহর নির্ধারিত সীমা। যে ব্যক্তি আল্লাহর সীমালংঘন করে, সে নিজেরই অনিষ্ট করে। সে জানে না, হয়তো আল্লাহ এই তালাকের পর কোন নতুন উপায় করে দেবেন’।
O Prophet! When ye do divorce women, divorce them at their prescribed periods, and count (accurately), their prescribed periods: And fear Allah your Lord: and turn them not out of their houses, nor shall they (themselves) leave, except in case they are guilty of some open lewdness, those are limits set by Allah. and any who transgresses the limits of Allah, does verily wrong his (own) soul: thou knowest not if perchance Allah will bring about thereafter some new situation.

فَإِذَا بَلَغْنَ أَجَلَهُنَّ فَأَمْسِكُوهُنَّ بِمَعْرُوفٍ أَوْ فَارِقُوهُنَّ بِمَعْرُوفٍ وَأَشْهِدُوا ذَوَيْ عَدْلٍ مِّنكُمْ وَأَقِيمُوا الشَّهَادَةَ لِلَّهِ ذَلِكُمْ يُوعَظُ بِهِ مَن كَانَ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا

অতঃপর তারা যখন তাদের ইদ্দতকালে পৌঁছে, তখন তাদেরকে যথোপযুক্ত পন্থায় রেখে দেবে অথবা যথোপযুক্ত পন্থায় ছেড়ে দেবে এবং তোমাদের মধ্য থেকে দু’জন নির্ভরযোগ্য লোককে সাক্ষী রাখবে। তোমরা আল্লাহর উদ্দেশ্যে সাক্ষ্য দিবে। এতদ্দ্বারা যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাস করে, তাকে উপদেশ দেয়া হচ্ছে। Thus when they fulfil their term appointed, either take them back on equitable terms or part with them on equitable terms; and take for witness two persons from among you, endued with justice, and establish the evidence (as) before Allah. Such is the admonition given to him who believes in Allah and the Last Day. And for those who fear Allah, He (ever) prepares a way out,

أَسْكِنُوهُنَّ مِنْ حَيْثُ سَكَنتُم مِّن وُجْدِكُمْ وَلَا تُضَارُّوهُنَّ لِتُضَيِّقُوا عَلَيْهِنَّ وَإِن كُنَّ أُولَاتِ حَمْلٍ فَأَنفِقُوا عَلَيْهِنَّ حَتَّى يَضَعْنَ حَمْلَهُنَّ فَإِنْ أَرْضَعْنَ لَكُمْ فَآتُوهُنَّ أُجُورَهُنَّ وَأْتَمِرُوا بَيْنَكُم بِمَعْرُوفٍ وَإِن تَعَاسَرْتُمْ فَسَتُرْضِعُ لَهُ أُخْرَى

তোমরা তোমাদের সামর্থ অনুযায়ী যেরূপ গৃহে বাস কর,তাদেরকেও বসবাসের জন্যে সেরূপ গৃহ দাও। তাদেরকে কষ্ট দিয়ে সংকটাপন্ন করো না। যদি তারা গর্ভবতী হয়, তবে সন্তানপ্রসব পর্যন্ত তাদের ব্যয়ভার বহন করবে। যদি তারা তোমাদের সন্তানদেরকে স্তন্যদান করে, তবে তাদেরকে প্রাপ্য পারিশ্রমিক দেবে এবং এ সম্পর্কে পরস্পর সংযতভাবে পরামর্শ করবে। তোমরা যদি পরস্পর জেদ কর, তবে অন্য নারী স্তন্যদান করবে।

নানা হুজুর এর ব্যাখ্যায় বিশেষ গুরুত্ব দিলেন কয়েকটি শব্দে যেমন; ‘তালাক দিলে ইদ্দতের প্রতি লক্ষ্য রেখে এবং ইদ্দত গণনা করো’ ‘তাদেরকে তাদের গৃহ থেকে বহিস্কার করো না’ ‘তারা যখন তাদের ইদ্দতকালে পৌঁছে, তখন তাদেরকে যথোপযুক্ত পন্থায় রেখে দেবে অথবা যথোপযুক্ত পন্থায় ছেড়ে দেবে’ ‘তোমরা তোমাদের সামর্থ অনুযায়ী যেরূপ গৃহে বাস কর,তাদেরকেও বসবাসের জন্যে সেরূপ গৃহ দাও। তাদেরকে কষ্ট দিয়ে সংকটাপন্ন করো না। যদি তারা গর্ভবতী হয়, তবে সন্তানপ্রসব পর্যন্ত তাদের ব্যয়ভার বহন করবে’ ‘যদি তারা তোমাদের সন্তানদেরকে স্তন্যদান করে, তবে তাদেরকে প্রাপ্য পারিশ্রমিক দেবে’।

পর্যায়ক্রমে পরের ক্লাসগুলোতে তালাকপ্রাপ্ত নারীর ও তার সন্তানের ভরণ পোষণ, কাবিন, তার অধিকারের সমুহ বস্তু সহ, দেন মোহর ফেরত দেয়া, এবং হিলা বিবাহের কথাও এসেছিল। হুজুর বুঝালেন, ইসলামে বিবাহ একটাই, দ্বিতীয় প্রকারের কোনো বিবাহ ইসলামে নেই। তিন ইদ্দতে তিন মাস চিন্তা ভাবনা পুনঃবিবেচনা করার কথা বলা হয়েছে। আর বলা হয়েছে স্বামী স্ত্রীর মধ্যে কোনো মতানৈক্য মতবিরোধ মনোমালিন্য দেখা দিলে তৃতীয় পক্ষকে এতে না জড়ায়ে না শুনায়ে, আপোসে নিজেদের মধ্যে মিমাংসা করে নেয়া উত্তম।এ ই তিন মাসের মধ্যে দেহ মিলন নিষেধ করা হয়েছে এ জন্যে যে, তালাক চলাকালীন অবস্তায় স্ত্রী যেন গর্ভবতী না হন, স্বামী স্ত্রী উভয়ে যেন বিরহব্যথা বা শুন্য বিছানায় একা থাকা বা দূরে থাকার বেদনা অনুভব করতে পারে্ন, যেন তারা অনুতপ্ত হওয়ার সুযোগ পান এবং বিয়েটি পুর্ণভাবে ভেঙ্গে দেয়ার আগে বারবার পুনর্বিবেচনা করেন, যুক্তি বিবেকের মাধ্যমে এবং পরামর্শ সাম্য সমঝোতা করতে পারেন। প্রথম মাসে এক তালাক, দ্বিতীয় মাসে আবার এক তালাক এর মধ্যেও পুনঃমিলন বা ফিরে আসার (reuniting, reunion, bringing (back) together (again) সুযোগ আছে। তৃতীয় মাসে তৃতীয় তালাকের পরে আর কোনো সুযোগ থাকেনা, কারণ এর পরে এই স্বামীর ঘরে সেই নারীর ফিরে যাওয়া তার জন্য কল্যাণকর হবেনা। হয়তো এই বিচ্ছেদের মধ্যেই উভয়ের জন্যে মঙ্গল আছে।

এ ছিল আজ থেকে পঞ্চাশ বছর পূর্বে আমার মাদ্রাসা জীবনের অভিজ্ঞতা। এরপরে এই পঞ্চাশ বছরের মধ্যে নানা হুজুরের সাথে আমার দুইবার দেখা হয়েছে। মাদ্রাসায় থাকতে ইসলামের এক পৃষ্ঠা আমার পড়া হয়েছিল অপর পৃষ্ঠা পড়েছি ইংল্যান্ড আসার পরে। ইংল্যান্ড থেকে চল্লিশ বছরে দুইবার দেশে গিয়েছিলাম, দুইবারই নানা আমাকে দেখতে এসেছিলেন। ঘরে বসে নীরবে তার সাথে সময় কাটিয়েছি আর আলাপ করেছি ইসলামের বিভিন্ন বিষয়াদী নিয়ে। নানাকে একদিন বললাম –

– নানা, সেই বহুদিন আগে আপনার শুনানো আদম হাওয়ার কিচ্ছা আমি আজও ভুলি নাই।
– শোনো, দুইটা পরিবারের শত্রুতার কারণে নিরপরাধ আদম হাওয়ার দুইটা জীবন ধ্বংস করে দেয়ার মা’নে হয়না। মানুষের কল্যাণে যা কিছু করা হয় তারই নাম ধর্ম আর যা কিছু অকল্যাণ তা’ই অধর্ম। যে কোনো সমস্যায় আগে বিবেচনায় নিতে হবে মানুষের শান্তি ও মঙ্গলের কথা। ধর্ম এসেছে মানুষের শান্তি ও মঙ্গলের জন্যে।

আমি আশরাফ আলী থানভি সহ অনেক ইমাম মুফাসসিরিন, মুফতি শরিয়া আইন প্রবর্তকগণের বহু কিতাব পড়েছি দেখেছি কী প্রচন্ডরকম জঘন্যভাবে তালাকের মাসয়ালা বা ফতোয়া তারা লিখে রেখেছেন। কেউ কেউ এমনও লিখেছেন যে, পুরুষ যদি মনে মনে ইরাদা করে তার বউ তালাকের তাতেও বউ তালাক হয়ে যায়’। আঙ্গুলের ইশারায়ও স্ত্রী তালাক হয়। আমি জানি তালাকের ব্যাপারে শরিয়া নারীকে সম অধিকার দেয়নি। পুরুষ যে ভাবে তালাক দিতে পারে নারীকে সেভাবে তালাক দেয়ার অনুমতি দেয়া হয়নি। কিন্তু আমি এও বুঝি যে, আমার নানা হুজুর সেদিকে তাকাবেন না। তাই ইসলামের অপর পৃষ্ঠা দেখায়ে আমি আমার বৃদ্ধ ওস্তাদকে বিব্রত করতে চাইনি। নানা হুজুর আগেই বলে দিয়েছেন বিবেক কিয়াস যুক্তির মাধ্যমে যা কিছু মানুষের জন্যে অশান্তি অকল্যাণকর মনে হবে তার সবই অধর্ম, সুতরাং তাকে অপর পৃষ্ঠা দেখানোর কোনো মা’নে নেই। কাজি সাহেবের মতো বিদ্বান, নানা হুজুরের মতো মানবিক আলেম মানুষ কম হলেও আজও মুসলমান সমাজে আছেন। তাই মুসলমান মাত্রই অমানুষ বোকা অসভ্য,সন্ত্রাসী বলার কোনো সুযোগ নেই। একজন রাজাকার যেমন কোনোদিন মুক্তিযোদ্ধা হতে পারেনা তেমনি একজন জাতিবিদ্বেষী কোনোদিন মুক্তমনা হতে পারেনা।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

১ thought on “ইসলামে তালাক ও আমাদের দৃষ্টিভঙ্গী

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 5 = 2